দ্বিতীয় অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

ক্রমাগত বাজতে থাকা কলিং বেল-এর শব্দে চোখ মেললো উর্মিল। রাতে ভালো ঘুম হয়নি, ভোরের দিকেই চোখ জুড়ে নেমেছিল স্বপ্ন। চাকরি আর পাহাড়ের মধ্যে উপার্জনকেই বেছে নিয়েছিল ভেরোনিকা উর্মিল। তার নামের পেছনে নাকি একটা পদবিও ছিল… গৌতম! তা কবেই ছেঁটে ফেলেছে সে। মাদার সেবাস্টিয়ানের ছত্রছায়ায় বড়ো হয়েছে, তাই ভেরোনিকা নামটা রয়েই গেছে… নামই! ধর্মাধর্ম কিছুকেই মান দেয় না, বাবা-মায়ের স্নেহ বঞ্চিত উর্মিল।

মা-বাবার কথা কিছুই জানা নেই। অনাথ আশ্রমে বড়ো হয়েছে যখন, তখন এ'কথা তো বলে দিতে হবে না যে তার জন্মদাতা চাননি তাকে। ফুর্তি করতে গিয়ে ভুল হয়ে গেছে… দূর করো জীবনের জঞ্জাল, ছুঁড়ে ফেলে দাও।

মাদার সেবাস্টিয়ান আর প্যাট্রিসিয়া দুজনের কাছেই প্রশ্ন তুলেছিল উর্মিল তার বাবা-মায়ের ব্যাপারে। মাদার সেবাস্টিয়ান তো কেবল হাসতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন, “আমরা সকলেই ঈশ্বরের সন্তান।”

উর্মিলের চোখে চোখ রেখে মাদার প্যাট্রিসিয়া বলতেন, “জন্মের উপরে তো আমাদের হাত নেই চাইল্ড, তাই জন্মটা আসল নয়, কর্মই হলো জীবনের ধর্ম। অধর্মের সঙ্গে কখনো আপোষ করবে না… যখন যেমন সুযোগ পাবে, ভালো কাজ করে যাবে।”

পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা উর্মিলের কাছে পাহাড় আসে শুধু তার স্বপ্নেই। মেঘ নেমে আসে, পাহাড়ের কানে কানে কত কথা বলে যায়… খুশির খবর আনে আর দুঃখ হলেই টুপটাপ করে পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়ে তার চোখের জল, বৃষ্টি হয়ে।

যেদিন মেল এসেছিল, নতুন জীবনে পা দেওয়ার দ্বার খুলে গিয়েছিল… দিবাস্বপ্ন কাতর করেছিল উর্মিলকে।

পাহাড়ের সবুজকে দূরে সরিয়ে রেখে, আগ্রহভরে তাকিয়েছিল জোনাক জ্বলা বহুতলের দিকে… সিদ্ধান্তে অটল ছিল সে।

আর আজ… বার বার মনে করেছে ছেড়ে দেবে চাকরি, ফিরে যাবে তার প্রিয়, মহান-উদার-স্তব্ধ পাহাড়ের বুকেই, যারা ছোটো থেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার জীবনের সঙ্গে। পাহাড়ি ঝোরা তাকে অহরহই হাতছানি দিয়ে ডাকে… ফিরে আসতে বলে।

শহরে আসা থেকে একাই থাকে উর্মিল, একা থাকতেই ভালোবাসে। মানসিক অবসাদে ভুগলেও মানুষের সঙ্গ বিশেষ পছন্দ করে না সে… অ্যান্টি ডিপ্রেশন ওষুধ খেয়ে নেয় টুকটাক।

নাহ, উঠতেই হবে… বেল বেজেই চলেছে।

আই হোল-এ চোখ রাখলো উর্মিল। আরে সই যে!

হ্যাঁ, এই "ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষের কীট"-এর নরকে একজনই বন্ধু আছে তার― আর এক পাহাড়ি মেয়ে, কালিম্পং-এর আস্থা ছেত্রী। উর্মিলের মতো সে'ও মনখারাপের মেঘ বালিশ জড়িয়েই ঘুমোতে যায়।

আস্থা বলে, “রোজ রাতে আমি আমার চেনা পাহাড়ের অতি চেনা মেঘের মাঝেই ঘুমিয়ে পড়ি… ওদের ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে যে কতটা অসম্ভব, তা এই যন্ত্র নগরীতে ডেরা ডালবার পরেই বুঝতে পেরেছি।

দিনের বেলা কাজের মধ্যে ডুবে থাকি আমি কিন্তু রাত যত বাড়ে, মনখারাপের মেঘ ততই ঘন হতে থাকে… জমিয়ে বর্ষা ঝরায় মাঝে মাঝেই। পাহাড়ি ঝোরা তাদের ঘুঙুর বাজিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় আমাকে, ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলেই তারা আবার ডাকে, বলে ফিরে আয়…”

দরজা খুলে যেতেই, ভেতরে ঢুকে আস্থা জড়িয়ে ধরলো উর্মিলকে।

“কিরে… এত সময় লাগল ঘুম ভাঙতে?” চোখ টিপে বললো আস্থা।

“একা ছিলি নাকি কেউ ছিল সঙ্গে?”

আস্থার মাথায় একটা চাঁটি মেরে কলকল করে উঠলো উর্মিল।

―তুই কি আমার লেগ পুল করতে এলি সকাল সকাল? আয় আয়। কী খাবি বল…

―সকাল বসে আছে তোর জন্যে... ঘড়ি দেখেছিস? দুপুর হতে চললো, তুই বল কী খাবি… অর্ডার করি। আমারও কিছু খাওয়া হয়নি, খুব খিদে পেয়েছে।

―কালিম্পং-এ কল করেছিলি আস্থা, আঙ্কল-আন্টি কেমন আছেন?

―ভালোই আছেন… বসে আছেন আমার পথ চেয়ে, অনেকদিন দেখা হয়নি।

―লাকি চ্যাপ ইয়ার! আমার জন্যে অপেক্ষা করার তো কেউ নেই রে।

উদাস দেখালো উর্মিলকে।

―অর্ফ্যানেজ-এ বড়ো হয়েছি। বাবা-মা'র হদিসই নেই।

কাছে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আস্থা, এক প্রগাঢ় চুম্বন এঁকে দেয় উর্মিলের ঠোঁটে।

অস্বস্তিতে মুখটা সরিয়ে নিয়ে উর্মিল হাসলো, বললো ''আমাকে তোর বয়ফ্রেন্ড সাওন ভেবে বসলি নাকি?''

আস্থার নজর এড়িয়ে ঠোঁটটা মুছে নিলো সে।

―তা… তোরা সেট্ল করছিস কবে? সাওনের তো কোনো সমস্যা নেই… ভালো রোজগার করে, তোকে ভালোবাসে…

জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো আস্থা। সারা জগৎ জানে, আস্থার বয়ফ্রেন্ড আছে, সকলের সঙ্গেই খোলামেলা মেশে সে... কিন্তু কী করে সে বোঝাবে তার বন্ধুকে, আস্থা কাকে চায়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%