চতুর্বিংশ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

উর্মিল আর নব্যা দুজনেই ফেরার… তাদের এক গোপন ডেরার কথা জেনেও ফেলেছে মেয়ে দুটো। এই আহাম্মকগুলো যে তাদের দু'জনকে একই জায়গায় নিয়ে যাবে… কে জানতো! আন্ডারগ্রাউন্ড-এ যাওয়া দরকার, সময় ব্যয় না করে।

ধরা যে সে একদিন পড়বেই, তা তো জানা কথা। ড্রাগ-নারী পাচার, জালি ওষুধের কারবার, আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি করে, তা সন্ত্রাসবাদীদের হাতে তুলে দেওয়া… কোন অপরাধে যে তার বিচার হবে, তা জানে না সঞ্জয়।

চেহারা বদলিয়ে, বিদেশে পালাবার পরিকল্পনাটা মনে ধরলো সঞ্জয়ের। নকল পাসপোর্ট বানাতে হবে… ঝুঁকি তো আছেই। পুলিশ আর নারকোটিকস ব্যুরো নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে নেই!

ভারতবর্ষের পাট চুকিয়ে দিয়ে সঞ্জয়ের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্ল্যান প্রায় রেডি।

সুসজ্জিত বসবার ঘরে বসে কাগজপত্রগুলো জরিপ করছিল সে। মাকে ছোটোবেলাতেই হারালেও তাঁকে কোনোদিন ভুলতে পারেনি সঞ্জয়… বাড়ির নাম ‘কণিকা-স্মৃতি’ তাঁরই স্মরণে রাখা।

কলিং বেলের আওয়াজে চোখ তুলে তাকালো সঞ্জয়।

আই হোল-এ চোখ রাখতেই সে দেখলো ইমরান ভাই দাঁড়িয়ে। ইমরানের হাত ধরেই অপরাধ জগতে প্রবেশ সঞ্জয়ের। মামিমার বঞ্চনার শিকার হয়ে মাত্র আঠেরো বছর বয়সে যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মরছিল… অভুক্ত-হাক্লান্ত সঞ্জয়― ইমরানের নজর পড়ে তার ওপরে। তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাবার-দাবার দিয়ে, বিশ্রামকক্ষে পাঠিয়েছিল ইমরান… “আরাম করো। তোমার সব কথা বলতে পারো আমাকে, আমি শুনবো।”

মহাতকার চাচার পরে আরো কাউকে নিজের বলে মনে হয়েছিল সঞ্জয়ের।

অতীতের কথা শোনাতে বসে চোখের জলে ভেসে গিয়েছিল সঞ্জয়। স্নেহের পরশে সেই অশ্রুধার মুছে দিয়ে ইমরান বলেছিল, “আজই তোমার চোখের জলের শেষ দিন। এরপরে অন্যের চোখের জলে নিজের পাপ ধুয়ে ফেলতে শেখাবো তোমাকে…”

কড়া ট্রেনিং-এর পরে সঞ্জয়কে নিজের যোগ্য উত্তরসূরী তৈরি করেছিল ইমরান সিদ্দিকি।

দরজা খুলতেই সঞ্জয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলো ইমরান। চুলে রূপোর টান লেগেছে তার… ইস্পাতের মতো ধারালো শরীরটাতে বাসা বেঁধেছে নানান রোগ।

“হো গয়ী তৈয়ারি?”

“হ্যাঁ ভাই… এবারে শুধু প্লেনে বসতে হবে।”

বিদেশের ব্যবসা সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো বুঝে নিতে ভাইকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেল সঞ্জয়।

বিদেশের ব্যবসা সংক্রান্ত মাল-মশলার যোগান দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ইমরান। এখন কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা প্রয়োজন। নাম-ধাম সবই বদলে যাবে। এদিককার সবকিছুর খেয়াল রাখবে ইমরান… আরো অনেক হাত নুড়কুৎ আছে তার হেফাজতে, তবে সঞ্জয়কে হারালে, তার ডানহাত কাটা যাওয়ার ব্যথা অনুভূত হবে… সবই সাময়িক। এদিক একটু ঠান্ডা হলেই ফিরে আসবে সঞ্জয়।

“বুঝতে পারছো তো, এখানে তোমার অভাব কতটা বাজবে আমার! যেমন যেমন বললাম, মাথায় রেখে কাজ করবে। তোমার নিজের বুদ্ধির ওপরেও যথেষ্ট ভরসা আছে আমার। আশা করছি, মাস আট-দশের মধ্যেই ফিরিয়ে আনতে পারবো তোমাকে…”

টুক টুক করে দরজাতে টোকা পড়তেই সজাগ হয়ে গেল দুই কর্মী।

“খোলা আছে।”

দরজা একটুকু ফাঁক করে মুখ ঢুকিয়ে ওয়াচম্যান বললো, “পুলিশ ঘিরে ফেলেছে বাড়ি… আপনারা পালিয়ে যান। এদিকটা আমরা ক'জন সামলে নিচ্ছি।”

তার মুখটা অদৃশ্য হতেই ছটফট করে কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সঞ্জয়। এতদিন ধরে সবরকমের বিপদ কেটে বেরিয়ে আসতে পেরেছে সে… আর বোধহয় শেষরক্ষা হলো না। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলো, তার মুখে ভাবান্তর নেই। ওই স্টেজে পৌঁছতে এখনো অনেক সময় লাগবে সঞ্জয়ের।

ভয়ে বিভ্রান্ত সঞ্জয়ের বিস্ফারিত চোখে চোখ রেখে ইমরান বললো, “আমি তোমাকে ভীতু বানিয়েছি? সেই সাবালকত্ব পাওয়া বয়স থেকে আমার সঙ্গে আছো, এই জায়গায় পৌঁছতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তোমাকে… ঘোড়া আছে তো সঙ্গে?”

মুখে কথা সরলো না সঞ্জয়ের, ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানালো।

ইমরান উঠে দাঁড়াতেই, সঞ্জয়ের হুঁশ ফিরলো। ড্রওয়ার থেকে দুটো রিভলবার বার করে, একটা তুলে দিলো ইমরানের হাতে। ইমরানের কথামতো কাগজপত্রগুলোতে আগুন লাগিয়ে,

বাথরুমের পেছনের দরজা-যুক্ত লোহার সিঁড়ি ধরে নেমে যাওয়ার জন্যে এগিয়ে গেল তারা।

ভালো করে চারদিক দেখে নিলো ইমরান।

সিঁড়ি বেয়ে নামার জন্যে তৈরি হলো ইমরান। কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। দু'তিনটে ধাপ নামতেই গুলি ছুটে এলো। ইমরানের বাঁ’পায়ের হাঁটু জখম হতেই বসে পড়লো সে। গুরুর প্রাণরক্ষায় এগিয়ে যেতেই আর একটা গুলি এসে সঞ্জয়ের কাঁধে বিঁধলো।

কমিশনার ব্যাকআপ পাঠিয়েছিলেন। এসে পৌঁছেছিল আরো অনেক সন্ত্রাসবাদীও। প্রচুর গোলাগুলি চলে, দু'দলেরই অনেক হতাহতের পরে ধরা পড়লো আহত সঞ্জয় আর ইমরান।

কোর্ট-এ কেস উঠলো… কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে গেল ইমরান আর তার চেলা সঞ্জয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%