ষোড়শ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

সকাল থেকেই অনবরত বৃষ্টির জন্যে নির্মলা নিকেতনের চারপাশটা জলে থই থই করছে। সূর্যের দেখা নেই, ভর সকালেই নেমে এসেছে রাতের অন্ধকার। তিরের মতো হাওয়া, সাথে হিমশীতল জলের ফোঁটা বুঝিয়ে দিচ্ছে, কোথাও শিলাবৃষ্টি হয়েছে।

জল বাঁচিয়ে আশ্রমে পা রাখতেই কানে এলো, চাপা কান্নার শব্দ।

কৌতূহলী নব্যা জানার চেষ্টা করলো, সেই আওয়াজের উৎস।

ছোটো মেয়েগুলোর দায়িত্বে আছে নিবেদিতা মাসি।

তাড়াহুড়ো করে একটা ঘর থেকে নিবেদিতাকে বেরোতে দেখে, এগিয়ে গেল নব্যা।

“কী হয়েছে নিবেদিতা, এত গণ্ডগোল কীসের?”

“ম্যাম, দুটো নতুন মেয়ে এসেছে আজ, খুবই ছোটো। পোষ মানাতে সময় লাগবে।”

ঘরে ঢুকে নব্যা দুই ক্রন্দনরত বালিকাকে বুকে টেনে নিলো।

―কী হয়েছে সোনা, কাঁদছো কেন… কী কষ্ট হচ্ছে!

―আমি মরে যাচ্ছি, আমার সব রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে… আমি মা'র কাছে যাবো…

“অ্যাইও! কে চেল্লাছে এখানে… কে ম্যা ম্যা করছে?” ভীম ভবানী, যমের দোসর রামপেয়ারী এসে দাঁড়াতেই কান্না ভুলে বাচ্চা গুলো হাঁ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।

বিশাল চেহারা, খাঁড়া বিহীন মা কালীর মতো রক্তচক্ষু নিয়ে এসে যেন হাঁ করে গিলে নিলো বাচ্চাগুলোর চোখের জল।

“নিবেদিতা! ইয়ে দোনো কো তৈয়ার রাখ… কাস্টমার আসবে আজ রাতে।”

অবাক হয়ে গেল নব্যা। এরকম ভয়ানক আর হৃদয়হীন হতে পারে কোনো মহিলা? সে নাকি মায়ের জাত!

―এইটুকু বাচ্চাদের কোথায় পাঠাবে রামপেয়ারী?

নব্যা গিয়ে দাঁড়ালো তার পাশে।

―আরব কান্ট্রিতে যাবে এরা, এইটুকু বাচ্চা কি পহলী বার দেখলেন আপনি?

“আমি বাড়ি যাবো… আমার ভয় করছে… ও মা!”

নিবেদিতা বাচ্চাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।

―ঠিক আছে, ঠিক আছে… আমি নিয়ে যাবো। এখন চলো তো, তোমাকে পরিষ্কার করে দিই!”

অনেকদিন পরে নব্যার শুকনো চোখে অশ্রুর বাণ ডাকলো।

কত সহজে আমরা ঘৃণার চোখে দেখি এই সমাজ বহির্ভূত মেয়েদের। বেশ্যা নামে দেগে দিই… কিন্তু বেশিরভাগ মেয়েই আসে এখানে পরিস্থিতির শিকার হয়ে।

নিজের বাবা, দাদা… ওই মেয়েগুলোকে যাদের রক্ষা করার কথা, তারাই বেচে দিয়ে যায় তাদের নয়নের মণিদের, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জন্ম লগ্নে স্থির হয়ে যায় তা… মেয়েরূপে এক বোঝা এসে ঘাড়ে চেপে বসেছে, বিদায় কর… পৃথিবীর আলো দেখে না কত-শত নব্যারা, জন্মের সঙ্গেই দুধে ডুবিয়ে, মুখে নুন দিয়ে বা নর্দমায় বিসর্জন দিয়ে, সেই দায় থেকে মুক্ত হয় পুরুষ… শুধু পুরুষই বা কেন? সেখানে থাকে রামপেয়ারী, নিবেদিতা আর নব্যার মতো নারীরাও। পুরুষতন্ত্রের আসল ধারক কিন্তু মহিলারাই।

বিকেলে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে নব্যা আরেকবার খোঁজ করলো মেয়েদুটোর। তাদের নামও তো জানা হয়নি!

নিবেদিতা ভুলিয়ে ভালিয়ে খাইয়ে দিয়েছে তাদের।

ছোটো মেয়েটাকে পাশে বসিয়ে, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে, নব্যা জানতে চেয়েছিল, কীভাবে এখানে এলো সে।

উত্তর দেওয়ার আগেই ঘুমে ঢলে পড়েছিল তুতুল।

আগ্রা থেকে আনা হয়েছে মণিরাকে। পাঁচ বোনের তৃতীয় সে। বড়ো দুই বোনকে খাওয়া পরার কাজে আর বাচ্চা সামলানোর জন্যে বড়ো বাড়িতে লাগিয়ে দিয়েছে আব্বু। কাস্টমারের কাছে বিক্রি করলে অনেক বেশি দাম পাওয়া যায়, তাই এখানে পাঠিয়েছে তাকে। বছর বারো'র বুদ্ধিমতী মেয়েটা বুঝতে পেরেছে, তার আব্বু তাকে বিক্রি করে গেছে… মোটা টাকার বিনিময়ে।

অবাক হয়ে নব্যা জিজ্ঞেস করলো, “কাস্টমার কে?”

নিষ্পাপ দুই চোখে বিস্ময় দেখলো নব্যা।

“যারা আমাকে কিনে নিয়ে কাজ করাবে, তারাই কাস্টমার।”

নিবেদিতাকে যত দেখে, ততই আশ্চর্য হয় নব্যা।

বাচ্চাগুলোর সঙ্গে কীরকম সুন্দর ব্যবহার করে সে... নরমে-গরমে, মায়ের অভাব সাময়িকভাবে হলেও ভুলতে পারে মেয়েগুলো।

ছোটো মেয়ে, তুতুলের বাবার রিপোর্টের দরুণ, পুলিশ এসেছিল এই আশ্রমেও।

কী অভিনব দক্ষতায় যে মেয়ে দুটোকে লুকিয়ে রাখলো রামপেয়ারী, তা দেখলে তাজ্জব হয়ে যাবে তাবড়-তাবড় অপরাধী। বড়ো কাঠের বাক্সে, জামাকাপড়ের মধ্যে ওদের ঢুকিয়ে রাখলো ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে। সেই বাক্সের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছিল, রাজ্যের দরকারি-অদরকারি জিনিস। কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাববে না যে, ওই বাক্স দুটোতে ঘুমিয়ে আছে জলজ্যান্ত দুটো বাচ্চা।

নিবেদিতার কাছে শুনেছিল নব্যা, এর আগেও সে অনেকবার চেষ্টা করেছে… ছোটো ছোটো মেয়েগুলোকে রক্ষা করার। এই নিকেতন থেকে বেরোলেই কি মুক্তির রথ অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্যে, নাকি গরম ফ্রাই-প্যান থেকে তারা গিয়ে পড়ে জ্বলন্ত আগুনে? নিষ্কৃতি নেই।

"ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই

ছোটো সে তরী…"

নব্যা গিয়ে বসলো ছোটো মেয়েটার কাছে। মণিরা নাকি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

“তোমার নাম কী?”

―বাড়িতে সবাই আমাকে তুতুল বলে ডাকে। স্কুলের নাম তন্দ্রিমা।

প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়লো তুতুল।

বেশি কান্নাকাটি করছে বলে বার বার ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে, দুটো বাচ্চাকেই।

নিবেদিতার কাছে শুনলো, এই দিল্লিরই মেয়ে বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তুতুলকে দিল্লির বাইরে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশের ঝামেলা তো আছেই… তবে তাদের তো টাকা দিয়ে হাত করাই থাকে।

পাশে বসে তুতুলের মাথায় হাত রাখে নব্যা।

জলভরা চোখ তুলে তাকায় তুতুল। হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে নেয় সে, তার ফোঁপানি কিন্তু বন্ধ হয় না।

“মা'র কাছে যাবো। মা আমার জন্যে তেলাপিয়া মাছের ঝাল রান্না করেছে। বাবা আমার জন্যে জামা এনেছে, আজ আমার জন্মদিন।”

মেয়েটাকে বুকে টেনে নিয়ে নব্যা বলে, “ওমা, তাই? তাহলে তো আজ পার্টি করতেই হবে।”

“না… আমি বাড়ি যাবো। আমার বন্ধুরা আসবে।”

“তুমি আমাকে বলো তো, কীভাবে এখানে এলে তুমি!”

মনে পড়লো তুতুলের সেদিনের কথা। মা তৈরি হচ্ছিল তার জন্মদিনের জন্যে। তুতুলের পছন্দের রান্নার যোগাড় করছিল... পায়েস বসিয়েছিল। দিদু খুব রাগ করছিলেন… দিদুর গলাটা কানে বাজলো তুতুলের।

...মেয়ে নিয়ে তোমার এই আদিখ্যেতাগুলো বন্ধ কর মেজো বৌমা। তুমি জানো, তোমার বা আমার ছেলেরা কেউই খায় না ওই তেলাপিয়া মাছ। কখন শেষ হবে তোমার এই ঢং আর কখন রান্না বসবে…?

"দিদু ওই রান্না করা তেলাপিয়া মাছের পাত্র ধরে বাইরে ফেলে দিয়ে চান করতে চলে গিয়েছিল। মা তো ঠাকুরঘরে বসে কাঁদছিল। আমি দেখতে গিয়েছিলাম, ফেলে দেওয়া মাছ নিয়ে কুকুরগুলো ঝগড়া করছিল। একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছিল আমার পাশেই। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো বুবাইদের বাড়ি কোথায়, দেখিয়ে দিতে।

আমি বলে দিলাম, পাশের গলিতে ঢুকেই চার নম্বর বাড়ি। আমাকে ট্যাক্সিতে চড়তে বললো কাকুটা। বললো বুঝতে পারছে না, সঙ্গে গিয়ে দেখিয়ে দিতে।

তারপরেই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।"

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%