ইন্দ্রাণী তুলি
জানালার ধারে বসেছিল সোনম গৌতম, মা কৌশল্যার সঙ্গে। চারপাশের মনভোলানো প্রকৃতিকে দু’চোখ দিয়ে লুটেপুটে নিচ্ছিল সে। ফিরে আসছে সে তার কৈশোরের ভালোবাসা, তার জন্মস্থান সোলানে। ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সবুজ পর্বতশ্রেণী, আকাশে হেলান দিয়ে যেন তুষারাবৃত হওয়ার অপেক্ষাতে দঁড়িয়ে আছে। একপাশে বিশাল মহীরুহ, যাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে গা জড়িয়ে উঠে আসা গুল্মলতা… অন্যপাশে সুগভীর খাদ, তল নজরে আসে না। মাঝে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলেছে তারই মসৃণ পিঠের মতো কালো রাস্তা।
গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছতে, মা আর মেয়ে তাদের চেনা পথ ধরে গিয়ে দাঁড়ালো সেন্ট পিটার্স গীর্জাঘরের আঙিনায়।
দলে দলে লোক আসছে উপাসনালয়ে। আজ কি রবিবার… হ্যাঁ তাই তো! তাহলে কি মাদার সেবাস্টিয়ানের দেখা পাওয়া যাবে? উনিও তো ব্যস্ত থাকবেন। হিসেবে গরমিল হয়ে গেছে।
সেই দুধসাদা চার্চের কেমন যেন মলিন দশা… বয়সের ছাপ পড়েছে তার শরীরে। সামনের বড়ো-খোলা মাঠ ভরে আছে আগাছা আর ঝোপঝাড়ে… অযত্ন-অবহেলার চিহ্ন সবখানে।
কিছু ছোটো ছেলে-মেয়েকে দেখা গেল, খেলছে তারা।
দু'ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে দালানে পৌঁছতেই চোখ গেল খালি বাস্কেটটার দিকে। এমনিই এক বাস্কেট-এ এক নবজাতককে শুইয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল তার মা আর দিদা। পেছনে ফিরে দেখার মতো মনের অবস্থা ছিল না তাদের।
একটা বাচ্চা এগিয়ে এসে উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইলো দুই নবাগতর দিকে।
“মাদার সেবাস্টিয়ান!”
আঙুল তুলে দরজার দিকে ইঙ্গিত করেই দৌড়ে চলে গেল সে।
কত বছর কেটে গেছে… উর্মিল আজ কত বড়ো হয়েছে… তার নাম কি উর্মিল নাকি অন্য কোনো নামে পরিচিত সে?
দরজা খুলে বেরিয়ে এলো মার্গারেট, বয়স থাবা বসিয়েছে তার শরীরেও।
হাত জোড় করে অভিবাদন করে সঙ্কুচিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকে দুই নারী।
“কী ব্যাপার, কাকে চাইছেন?”
“মাদার সেবাস্টিয়ান…?”
বুকে ক্রস এঁকে হাত ওপরে তুলে দেখায় সে।
“মাদার প্যাট্রিসিয়া আছেন, কিন্তু তিনি খুব অসুস্থ।”
―আমরা একজনের কথা জানতে এসেছি, বেশি সময় নেবো না।
মার্গারেট পথ দেখিয়ে তাদের পৌঁছে দেয় মাদার-এর ঘরে।
“আপনার সু-স্বাস্থ্য কামনা করি, মাদার। আমরা একটি মেয়ের খোঁজে এসেছি। বহুদিন আগে এই অনাথাশ্রমের দরজায় একটি শিশুকন্যাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম আমরা। সেইসময়ে তাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। আমি তার নাম লিখে রেখেছিলাম একটা চিরকুটে… উর্মিল!”
আনমনা দেখায় মাদারকে।
“হ্যাঁ, ভেরোনিকা উর্মিল আমাদের কাছেই বড়ো হয়ে উঠেছিল। বড়ো সুন্দর, বড়ো উজ্জ্বল ছিল প্রভুর সেই সন্তান।
বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে, তার কোনো খোঁজ পাইনি আমরা।”
“কোথায় আছে সে?” এবারে আগ্রহ দেখায় উর্মিলের জন্মদাত্রী সোনম।
“পড়াশোনা করে কাজ নিয়ে দিল্লি গিয়েছিল উর্মিল। নিয়মিতভাবেই তার চিঠি বা ফোন আসতো। অনেকদিন খবর পাইনি। দাঁড়ান, কল করে দেখি।”
মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলেন তিনি।
“সুইচড অফ বলছে… আর কোনো যোগাযোগের মাধ্যম তো আমার জানা নেই।”
“এখানেই আমাদের আশ্রয় দিন মাদার… বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই, মানুষেরা সেবায়…”
আশায় আশায় থাকে মা আর মেয়ে, সেই অবাঞ্ছিত-পরিত্যক্ত মেয়েটার সঙ্গে যদি কখনো দেখা হয়!
।সমাপ্ত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন