মনজিৎ গাইন
সুকান্তর বউ চন্দনা। ও কিছুতেই ভুলতে পারে না ওই নরক যন্ত্রণার দিনগুলো। প্রতিদিন রুটিনের মতো হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। রাত হলেই দস্যুগুলো আসত। একের পর এক ওর ওপরে চড়াও হত। ও দাঁতে দাঁত চেপে সেই যন্ত্রণা সহ্য করত।
যেদিনকে সুকান্তর সামনে প্রথম ওরা ওকে একের পর এক ধর্ষণ করছিল, ও চোখ বুজে শুধু ঈশ্বরের নাম স্মরণ করছিল। কেউ যদি এসে তাকে বাঁচায় কিন্তু না, কেউ আসেনি। মহাভারতের কৃষ্ণের মতো তার ওপরে এই অত্যাচার বন্ধ করতে কেউ সাড়া দেয়নি। ও মাঝে মাঝে ভাবে মহাভারতের ঘটনাটা কি তাহলে পুরো কাল্পনিক? শুধু গল্পেই এমন হয়, বাস্তবে নারীর লজ্জা, সম্মান বাঁচাতে কোনো কৃষ্ণই এগিয়ে আসে না।
প্রথম রাতে যাওয়ার আগে শাসিয়ে গিয়েছিল— থানা-পুলিশ করলে তোদের সবার জীবন কিন্তু নরক-গুলজার করে দেব। মনে রাখিস।
সুকান্ত মনে রাখেনি। পরের দিন সকালেই ও থানায় যেতে চাইল। গাইঘাটা থানায়। চন্দনা ওকে পইপই করে বারণ করল— না গো, তুমি থানায় যেও না, ওরা কিন্তু তাহলে আরও সাংঘাতিক ভাবে ফিরে আসবে।
সুকান্তর চোখ-মুখে তখন ভীষণ ক্রোধের ছাপ। ও গর্জায়— শয়তানগুলো তোমার ওপরে যা অত্যাচার করল, তার বিরুদ্ধে একটা কথাও তখন বলতে পারিনি ওদের ভয়ে। কিন্তু এখন দিনের আলোয় অন্ধকারের ভয় আমাকে দমাতে পারবে না, আমি ঠিক থানায় যাব।
—শোনো, তুমি একটু ঠান্ডা হও। দেখো যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে, জীবনের এই কালো রাতটা আমরা আমাদের নিজেদের জীবন থেকে মুছে ফেলব, তাহলে দেখো আমরা দুজনে শান্তি পাব। নাহলে আমার মনে কিন্তু ভীষণ কু গাইছে।
সুকান্ত চলে গেল থানায়। কোনো বারণই আর ও শুনল না। যেদিনকে থানায় গেল সেদিন রাতেই ওরা ঢুকল। তারপর সায়া-শাড়ি খুলে ওকে বীভৎসভাবে ধর্ষণ করল ওরা। দুজনে আবার ওর খোলা থাইয়ে বন্দুকের বাঁট দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করতে লাগল। ওফ, সে কী যন্ত্রণা! একদিকে একের পর এক পশু ওকে ধর্ষণ করছে, আবার অন্যদিকে দুই থাইয়ে ওরকম আঘাত! প্রতি রাতে ঘণ্টা তিন-চার ওর ওপরে এই অত্যাচার চলত। আর শয়তানগুলো শুধু বলত— কী আর থানায় যাবি? খুব সাহস হয়েছিল তোদের! বলেছিলাম না তোদের সবার জীবন নরক-গুলজার করে দেব।
প্রতিদিন রাতে এই অত্যাচার চলত। পুরো পনেরো দিন ওর ওপরে ওরা চড়াও হয়েছিল। ওরা দিতে চেয়েছিল এক শিক্ষা।
সে দিনগুলো এখনও চন্দনার কাছে অতীত হয়নি। মাঝে মাঝেই ওর কাছে সেইসব ভয়ানক স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। মাঝে মাঝেই রাতে ও সুকান্তকে ডাকে— দেখো না, বাইরে কী যেন আওয়াজ হল।
—কই, কীসের আওয়াজ?
—মনে হচ্ছে, ওরা আবার এসেছে। ওরা আবার আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে রেপ করবে। আমাকে তুমি বাঁচাও। ওই তো ওরা এসে গেল, তুমি আমায় বাঁচাও। ওই যন্ত্রণা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না, আমি মরে যাব।
চন্দনা ভয়ে-আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়। ওর সারা শরীর যন্ত্রণায় নীল। সুকান্ত ওকে জড়িয়ে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে— এই তো আমি আছি চন্দনা, কেউ আসবে না।
চন্দনা যেন বুকে একটু বল পায়— তুমি সত্যি বলছ কেউ আসবে না? কেউ আমাকে তোমার কাছ থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে রেপ করবে না?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, সত্যি বলছি। এখন কি আর কোনো আওয়াজ বাইরে শুনতে পাচ্ছ?
চন্দনা কান খাড়া করে বাইরের কিছু যেন শোনার চেষ্টা করে। সুকান্ত ওকে জিজ্ঞাসা করে— কী, কিছু শুনতে পেলে?
—না। আর কিছু শুনতে পাচ্ছি না। তাহলে ওরা আর আসবে না বলো?
—না গো, কেউ আর আসবে না।
—বাঃ, তুমি তাহলে ওদের হাত থেকে আমায় বাঁচালে। তুমি তাহলে আমার কৃষ্ণ! বলো, তুমি আমার কৃষ্ণ।
—হ্যাঁ, বলছি তো আমি তোমার কৃষ্ণ।
—তুমি তাহলে প্রতিদিন আসবে তো ওদের হাত থেকে আমায় বাঁচাতে?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, আসব।
—মিথ্যে কথা। ওরা যখন আমায় ধর্ষণ করত, তুমি তো আমায় বাঁচাতে আসতে না। তুমি শুধু দ্রৌপদীকে বাঁচাতে আসো। আমাদের মতো সুটিয়ার মেয়েদের বাঁচাতে কোনো কৃষ্ণই আসে না। তুমি কৃষ্ণ নও, তুমি আমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচাতে পারোনি।
প্রায়ই চন্দনা ওইভাবে বিলাপ বকে। ওর বুকে যন্ত্রণার যে দগদগে ঘা ওরা করে দিয়েছে, তা কিছুতেই শুকোতে চায় না।
সুকান্ত শুধু ঈশ্বরকে ডাকে— আমার চন্দনাকে তুমি সুস্থ করে দাও, ও অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছে।
ও মাঝে মাঝে নিজে আপশোশ করে কেন সেদিন ও চন্দনার বারণ শুনল না, কেন ও থানায় গেল অভিযোগ জানাতে, আজকে ওর জন্যেই চন্দনাকে এতদিন এইভাবে যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে।
ও হতাশায় নিজের বুকে জোরে জোরে আঘাত করে। ও আঘাত করতেই থাকে। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়ে।
* * *
সুটিয়ায় খুব আনন্দ। রবি মল্লিক বেঁচে গিয়েছে। বর্ডার গ্যাং ওকে মেরে ফেলতে পারেনি। পিজির ডাক্তাররা অনেক কষ্ট করে ওর জীবন বাঁচিয়েছে। বরুণ এখন নিশ্চিত ওদের প্রতিবাদী সংস্থার আন্দোলনকে কেউ থামাতে পারবে না। যেভাবে হোক ওরা এই গণধর্ষণ বন্ধ করবেই।
রবি মল্লিককে বাড়িতে আনা হয়েছে। বরুণ ওর সঙ্গে দেখা করতে যায়।
—কী কাকু, এখন কেমন আছেন?
—বেশ ভালোই। আর এদিকের খবর কী?
—খবর বলতে আপনাকে হত্যা করে ওরা যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, সেটা পুরোপুরি পেরে ওঠেনি। আপনি প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় সুটিয়ার লোকও একটু বুকে বল পেয়েছে। এবার আবার আমাদের কাজ শুরু করতে হবে।
—এখন তুমি প্রতিবাদী সংস্থার কী কাজ করতে চাও?
—আমি এখন যারা ধর্ষিতা হয়েছে তাদের কাউকে কাউকে দিয়ে পুলিশে অভিযোগ করাতে চাই।
—কেউ পুলিশে যেতে রাজি হয়েছে?
—এখনও সেইভাবে কারো কাছে পৌঁছোনো যায়নি। তবে দেখছি চেষ্টা করে।
—প্রথমে কার কাছে যাবে ঠিক করেছ?
—ভাবছি রজতদের বাড়িতে যাব।
—যাও, দেখো কী বলে।
কিন্তু রজত কিছুতেই রাজি নয় ওর বউ আর বোনকে পুলিশে অভিযোগ করতে দিতে। বরুণ ওকে যত বোঝায়— দ্যাখ রজত, কেউ যদি এগিয়ে এসে থানায় অভিযোগ না জানায়, তাহলে আমরা অপরাধীদের ধরব কী করে?
—তুই আমায় মাপ কর বরুণ, অনেক যন্ত্রণা আমার বউ আর বোন পেয়েছে। এবার আবার তোর কথায় যদি ওরা থানায় যায়, তাহলে সুকান্তর বউ চন্দনার মতো প্রতিরাতে এসে এদের ওপরে অত্যাচার করবে না, তার গ্যারান্টি কোথায় বলতে পারিস?
—কেন, এখন আমাদের সুটিয়া প্রতিবাদী সংস্থা আমরা তৈরি করেছি। আমরা সবসময় তোদের পাশে থাকব।
—আর বলিস না তোদের ওই সংস্থার কথা। তোদের প্রতিবাদী সংস্থার সভাপতিকেই তো ওরা গুলি করল। তোদের নিজেদেরই নিরাপত্তা নেই, তোরা আমাদের কীভাবে নিরাপত্তা দিবি?
বরুণ কিছুতেই রজতকে রাজি করাতে পারল না ওর বোন আর বউকে দিয়ে পুলিশে অভিযোগ করাতে। ও তারপরেও আরও কয়েকজনের কাছে গেল, কিন্তু সবাই ভয়ে পিছিয়ে গেল। কাউকেই রাজি করাতে পারল না। বরুণ ভাবছে তাহলে যে ওর পরিকল্পনাই মাঠে মারা যাবে। কাউকে না কাউকে তো পুলিশে অভিযোগ জানাতেই হবে।
বরুণ শেষপর্যন্ত সুকান্তর বাড়িতে যায়। ও জানে চন্দনার ওপরে যা অত্যাচার হয়েছে সুকান্ত কিছুতেই রাজি হবে না চন্দনাকে দিয়ে পুলিশে অভিযোগ করাতে। তবুও ও উপায় না পেয়ে সুকান্তর বাড়িতে গেল।
সুকান্ত বরুণকে দেখে বলল— এসো বরুণদা, এসো।
বরুণ ভিতরে ঢুকে বলল— সুকান্ত, একটা দরকারে এলাম।
—বলো, কী দরকার।
—বলছি চন্দনার ওপরে যা ঘটেছে সবই আমরা জানি, তবুও এই কথাটা আমাকে বলতেই হবে।
—কী কথা?
—বলছি, চন্দনা যদি আমাদের একটু সাহায্য করে।
—কী সাহায্য?
—ও যদি থানায় গিয়ে একটা অভিযোগ জানায়।
বরুণের কথা শুনে সুকান্ত যেন আকাশ থেকে পড়ে। একবার থানায় গিয়ে চন্দনার কী হাল করল ওরা, আবার বরুণদা কী করে বলে চন্দনাকে থানায় অভিযোগ জানানোর কথা।
সুকান্ত পরিষ্কার জানিয়ে দেয়— না বরুণদা, সেটা কোনোমতেই সম্ভব নয়। একে তো চন্দনার ওপরে এত অত্যাচার হয়েছে, মাঝে মাঝেই ও অস্বাভাবিক আচরণ করে, তারপর তোমার কথাতে ও থানায় গিয়ে অভিযোগ করলে আবার যদি কিছু হয়, তখন তার দায়িত্ব কে নেবে?
—কেন, আমরা সুটিয়া প্রতিবাদী সংস্থা থেকে চন্দনার পিছনে থাকব।
—না, সেটা কোনো কথা নয়। এই তো তোমাদের সংস্থার সভাপতি নিজেই গুলি খেয়ে মরতে বসেছিল। ওঁনাকে যারা গুলি করেছিল, তারা কেউ কি গ্রেফতার হয়েছে? কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না, পুলিশ ওদের কেনা, ওদের কাছে গেলে নিজেদের বিপদ বাড়বে বই, কমবে না। তুমি এ অনুরোধ আমায় আর কোরো না। আমরা অনেক কিছু সহ্য করছি। উফ, ভাবতেও পারি না বরুণদা, চোখের সামনে নিজের বউকে যে দিনের পর দিন গণধর্ষিতা হতে দেখে তার অবস্থা কীরকম হয়, আর ভাবো চন্দনার কথা, ওর শরীর-মন কী মারাত্মক যন্ত্রণা ভোগ করেছে।
—আমিও সবটাই বুঝতে পারছি। কিন্তু চন্দনাকে যারা যন্ত্রণা দিয়েছে, তাদের শাস্তি দিতে গেলে পুলিশে তো কাউকে না কাউকে অভিযোগ জানাতেই হয়।
—না বরুণদা, তোমার এই অনুরোধ আমি কিছুতেই রাখতে পারব না।
বরুণ সুকান্তর কথায় খুব হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসছে। ও জানে কোনো ধর্ষিতা মেয়েকে দিয়ে যদি থানায় অভিযোগ না জানানো যায়, তাহলে আসল অপরাধীদের কিছুতেই ধরা যাবে না। ওরা আরও অনেক অনেক মেয়েদের এইভাবে গণধর্ষণ করবে। কিছুতেই ওদের থামানো যাবে না। ও ভেবেছিল যেভাবে হোক সুকান্তকে রাজি করিয়ে চন্দনাকে দিয়ে থানায় অভিযোগ জানাবে। কিন্তু তা আর হল না।
ও সবে দরজা দিয়ে বাইরে বেরোবে। হঠাৎ করে পিছন থেকে কেউ যেন ডাকে— ও বরুণদা, একটু দাঁড়াবেন।
বরুণ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে চন্দনা ওকে দাঁড়ানোর জন্যে বলছে। বরুণ দাঁড়িয়ে পড়ে। চন্দনা বরুণকে প্রচণ্ড বিস্মিত করে দিয়ে বলে— আমি যাব বরুণদা, আমি থানায় যাব, অভিযোগ করব। আপনি সব ব্যবস্থা করুন।
সুকান্ত ওকে বারণ করতে যায়— না চন্দনা, এই ভুল আর কোরো না। একবার আামি তোমার বারণ না শুনে থানায় গিয়েছিলাম অভিযোগ জানাতে, তার ফল কী হয়েছে তুমি জানো, আর না।
—না, আমি থানায় যাব। তোমার সঙ্গে বরুণদা যখন কথা বলছিল আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনেছি। যে সমস্ত মানুষরূপী পশুরা আমার মতো অসহায় মেয়েদের ওপর ওইভাবে অত্যাচার করছে, তাদের সবাইকে শাস্তি দিতে হবে। আমাকে বরুণদার সঙ্গে অবশ্যই থানায় যেতে হবে।
—কিন্তু তুমি অভিযোগ জানালে যদি শয়তানগুলো আবার আসে, আবার তোমার ওপর অত্যাচার করে, তোমাকে রেপ করে?
—আসুক, আবার রেপ করুক। ও যন্ত্রণা আমার গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। ও তো শরীরের যন্ত্রণা, ও যন্ত্রণায় এখন আমি অভ্যস্ত। কিন্তু আমার মনের যে যন্ত্রণা আমি ভোগ করছি, তার থেকে আমার মুক্তি চাই। আমি ওই শয়তানগুলোর শাস্তি চাই। নাহলে ওরা আরও অনেক নিরীহ মেয়ের সর্বনাশ করবে। ওদেরকে আমি রুখবই। আমি বুঝেছি মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো আমাদের কোনো কৃষ্ণ নেই, যে আমাদের দুঃশাসনের মতো শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করবে। আমাদের মেয়েদের নিজেদের সাহস করে এগিয়ে আসতে হবে নিজেদের রক্ষা করতে। বলুন বরুণদা, কখন থানায় যাবেন?
—দেরি করলে আবার ওরা আরও মেয়েদের ওপর হামলা করবে। এখনই আমরা গাইঘাটা থানায় যাব।
—আমি একটু শাড়িটা বদলে আসি, আপনি একটু অপেক্ষা করুন।
চন্দনা ভিতরের ঘর থেকে চট করে শাড়িটা চেঞ্জ করে আসে। তারপর সুকান্তকে বলে— তুমি যাবে না আমাদের সঙ্গে?
সুকান্ত আজকে অন্য চন্দনাকে দেখছে। ওর মধ্যে বিন্দুমাত্র কিছু অস্বাভাবিকতা নেই, কোনো গ্লানিবোধ নেই। এই সময়ে ওকে সঙ্গ না দিলে হয়। সুকান্ত উত্তর দেয়— যাব না কেন, অবশ্যই যাব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।