ঊনবিংশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

ওরা গাইঘাটা থানায় ঢুকে দেখে একজন নতুন অফিসার। বরুণ ধরে নেয় এই অফিসারকেও বর্ডার পার্টি কিনে নিয়েছে। হয়তো এই অফিসারও ধর্ষণের অভিযোগ নিতে চাইবেন না। ওদেরকে ঢুকতে দেখে অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন— কী ব্যাপার, আপনারা থানায় কি কোনো অভিযোগ জানাতে এসেছেন?

বরুণই কথা বলে— হ্যাঁ স্যার, আমরা অভিযোগ করতেই এসেছি।

—কীসের অভিযোগ?

—ধর্ষণের।

—ধর্ষণের, কে ধর্ষিতা হয়েছে?

—এই মহিলা ধর্ষিতা হয়েছে।

—কবে, কে এনাকে ধর্ষণ করেছে?

—এই মহিলাকে জনা পঞ্চাশ জন মিলে পালা করে প্রতিদিন ধর্ষণ করেছে টানা পনেরো দিন।

এই কথা শুনে অফিসার যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি এখানে আসার আগে শুনেছেন এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারেই ভালো নয়। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে ধর্ষণও হবে এটা উনি ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখানে এসে যা শুনলেন তাতে উনি একেবারে হতবাক। তারপর যখন শুনলেন যে এই মহিলাকে দিনের পর দিন ওইভাবে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল ওঁনার স্বামী পুলিশে অভিযোগ জানিয়েছিল বলে, তখন ওঁনার আরও অবাক হওয়ার পালা।

বরুণ ওঁনাকে ডিটেলসে সব বলল। কীভাবে এখানে সুকুমার, অতনু এরা বর্ডার পার্টি করে গণধর্ষণ করে, সব তিনি শুনলেন। সব শুনে ওঁনার বক্তব্য— এর আগে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?

—পুলিশে গেলে সাধারণ মানুষের কী হাল করে তা শুনলেন তো, তারপর গাইঘাটা থানার পুলিশ তো সুকুমার-অতনুদের হাতের মুঠোর মধ্যে ছিল। আজকে আপনি নতুন এসেছেন বলে হয়তো এরা আপনাকে মুঠোর মধ্যে পুরতে পারেনি, কিন্তু এদের আপনাকে মুঠোয় পুরতে কতক্ষণ?

অফিসার অমিতাভ চন্দ্র ওদের অভয় দিয়ে বলেন— আপনারা নির্ভয়ে বাড়ি যান, আমি অবশ্যই এই বর্ডার গ্যাঙের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আচ্ছা বরুণবাবু, এইসব ক্রিমিনালদের আমি এখন কোথায় পাব বলতে পারেন?

বরুণ অফিসারকে জানিয়ে দেয় বর্ডার পার্টির আড্ডা ঠিক কোথায়। তারপর অফিসারের সামনে হাতজোড় করে বলে— স্যার, দেখবেন এই চন্দনা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে এসেছে বলে ওই শয়তানদের আবার আক্রমণের শিকার না হয়। ওকে অনেক বুঝিয়ে আমি থানায় এনেছি। সুটিয়ায় এই বর্ডার পার্টির হাতে অনেক মেয়েই ধর্ষিতা হয়েছে, কিন্তু কেউ থানায় এসে অভিযোগ জানানোর সাহস পায়নি। এতটাই আতঙ্কে এখানকার মানুষ থাকে।

—না-না, আপনারা পুরোপুরি নিশ্চিত থাকুন, এদের বিরুদ্ধে কী কী স্টেপ নেই, তাই এখন দেখুন।

বরুণরা বেরিয়ে গেলে অমিতাভবাবু থানার সব পুলিশদের ডেকে পাঠালেন। তারপর উনি জিজ্ঞাসা করলেন— সুটিয়ায় পরপর গণধর্ষণ হচ্ছে আপনারা জানতেন?

থানার সবাই চুপ করে থাকে। কেউ কোনো উত্তর দেয় না। অমিতাভবাবু আবার চিৎকার করেন— কী হল, উত্তর দিচ্ছেন না কেন? স্পষ্ট জবাব দিন। আমি স্পষ্ট জবাব চাই।

হেড কনস্টেবল রঞ্জিত রায় উত্তর দিলেন— হ্যাঁ স্যার, আমরা জানতাম।

—কিন্তু আপনারা কোনো ব্যবস্থা নেননি, সেটা কী কারণে জানতে চাই।

—আপনার আগের অফিসার এই ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতেন না। সেইজন্যে আমরা কিছু করে উঠতে পারিনি।

—ও, তাহলে বুঝতে পারছি সরষের মধ্যেই ভূত ছিল। আমি কিন্তু অন্যরকম। কোনো উলটোপালটা কিছু হলেই কিন্তু আমি ব্যবস্থা নেব। শুনুন, সুটিয়ার এক মহিলা এসেছিলেন। তিনি পরপর পনেরো দিনের মতো গ্যাংরেপড হয়েছিলেন। ওঁনার অভিযোগে স্পষ্ট কয়েকজনের নাম রয়েছে। আমি এখনই তাদের সব ক-টাকে জেলের মধ্যে দেখতে চাই। এক্ষুনি আমরা ওদের অ্যারেস্ট করতে বেরোব। রঞ্জিতবাবু,আপনি আমাদের পথ দেখিয়ে সুটিয়ায় নিয়ে চলুন, তারপর দেখছি ক্রিমিনালগুলো কোথায় লুকোয়। ও হ্যাঁ, আর একটা কথা, আপনারা এই অভিযান যতক্ষণ না শেষ হয়, ততক্ষণ আমার চোখের সামনে থাকবেন, আমার চোখের আড়াল মানে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমি কিছু না কিছু ব্যবস্থা নেব।

অমিতাভবাবু দীর্ঘদিনের পুলিশ অফিসার। উনি জানেন অপরাধীরা ঠিক কোথা থেকে পুলিশের আসার খবর পেয়ে যায়। আর এই গাইঘাটার পুলিশ যে ওই গ্যাংরেপ দলের কেনা ছিল, এটা এখন জলের মতো পরিষ্কার। তাই এই সাবধানতা নেওয়া।

* * *

সুটিয়ায় তখন বর্ডার পার্টির মজলিস চলছে। মদের গ্লাসের ঠুকঠাক আওয়াজ আর সুকুমার-মন্টুদের তর্জন গর্জন শোনা যাচ্ছে। মন্টু বলছে— অতনুদা, ওই বরুণ কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে ভালোই লোক খ্যাপাচ্ছে, ওটাকে এবারে ওপরে পাঠিয়ে না দিলে কিন্তু আমাদের আর চলবে না।

—আমারও তো তাই মত, শুধু সুকুমারদা একটু অন্যরকম জানাচ্ছে বলে তো মালটাকে টেঁসে দেওয়া যাচ্ছে না, নাহলে কবে বরুণকে মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দিতাম। ও সুকুমারদা, তুমি একটিবার বলো, দেখো বরুণের কী হাল করি। আর ওর কী ওই প্রতিবাদী সংস্থা। ওটারে একেবারে সোজা নদীর জলে বিসর্জন দেব। শালা সভাপতিটারে গুলি করলাম, তাও বেঁচে গেল। একেবারেই কই মাছের প্রাণ।

—না, আমিও ভাবছি বরুণ আমাদের পক্ষে এখন আর একেবারেই নিরাপদ নয়। তবে মনে হয় ও কাউকে জোগাড় করতে পারেনি যে আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানাবে। ও তো সবার বাড়ি বাড়ি ঘুরছে, কিন্তু আমাদের ভয়ে কেউ রাজি নয়। আর আমাদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ জানালে সবার আগে আমরা জানব। কনস্টেবল সঞ্জীবকে কি আর এমনি মাসে মাসে টাকা দিয়ে পুষি?

—তবে দাদা, আগের অফিসার চলে গিয়ে আমাদের বেশ অসুবিধা হয়ে গেল। আগের অফিসার একেবারে আমাদের পুরো পকেটে পোরা ছিল। মাসের প্রথমে টাকাটা পৌঁছে দিয়ে এসো। তারপর পুরো নিশ্চিত। একেবারে নাক ডাকিয়ে ঘুমোনো আর কী!

—নতুন যে অফিসার এসেছে ওটাকে তাড়াতাড়ি ম্যানেজ করতে হবে। নাহলে কোনদিন আবার কী ফেকড়া তোলে তার ঠিক নেই। ভাবছি কালকেই থানায় গিয়ে মালটার সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।

—সঙ্গে কিছু টাকা নিয়ে যেও।

—অবশ্যই প্রথম মুখদর্শনে কিছু বউনি না করলে চলে।

—হ্যাঁ-হ্যাঁ, কালকেই বউনি হবে।

হঠাৎ বাইরে একটা হট্টগোল শোনা যাচ্ছে। অতনু চ্যাঁচায়— এই মন্টু, দেখ তো বাইরে কী ঝামেলা শুরু হল।

মন্টুর শাগরেদ সুকুমারও বাইরে বেরিয়ে দেখতে গেল কী হচ্ছে। আর যেই ওরা বাইরে বেরিয়েছে, অমনি অমিতাভ চন্দ্র বজ্রকঠিন গলায় হাঁক দিলেন— হ্যান্ডস আপ, তোমাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হল। রঞ্জিতবাবু এদের সবকটার হাতে হাতকড়ি পরিয়ে দিন। আর এদের দুটোকে চেনেন?

—হ্যাঁ, এরা হচ্ছে সুকুমার আর মন্টু।

—এদের আর একটা চাঁই অতনু এখনও ধরা পড়েনি। মনে হচ্ছে ভেতরেই আছে ওটা। সবাই ভেতরে চলো।

অমিতাভবাবু বন্দুক উঁচিয়ে ঘরের ভিতরে ঢোকেন। কিন্তু ততক্ষণে পাখি ফুড়ুত। অতনু ঘরের মধ্যে থেকে ঠিক বুঝতে পেরেছে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। ও উঁকি মেরে দেখে সর্বনাশ পুলিশ। এ যে একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাত! সুকুমারদা আর মন্টু পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। ও বিপদ বুঝে পিছন দিক দিয়ে পালাল। রঞ্জিতবাবু বললেন— না স্যার, আর একটা চাঁইকে ধরা গেল না, ও পালিয়েছে।

—ঠিক আছে, যে ক-টাকে পাওয়া গিয়েছে, সে-ক'টাকে আগে থানায় নিয়ে চলো। এরা সবকটা মানুষ না জন্তু, যেভাবে এরা মেয়েগুলোকে রেপ করেছে, এদের কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার।

সবকটাকে জিপে তোলা হল। জিপ গাইঘাটা থানার দিকে রওনা দিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%