মনজিৎ গাইন
পরের দিন সারা সুটিয়ায় এই খবর ছড়িয়ে পড়ল। সুকুমার, মন্টুরা অ্যারেস্ট হয়েছে। যেসব মেয়েরা ভয় পাচ্ছিল থানায় অভিযোগ জানাতে, তারা নতুন করে সাহস পেল। চন্দনা সবাইকে পথ দেখিয়েছে, ও যদি থানায় না যেত, তাহলে এতকিছু কিছুই ঘটত না।
বরুণ অন্য সব মেয়েদের নিয়ে থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে শুরু করল। দীর্ঘদিনের সুটিয়ার ধর্ষণ-সন্ত্রাসের কথা সবাই জানতে শুরু করল। কাগজে-টিভিতে এখন শুধু সুটিয়ার কথা, আর বলতে গেলে বরুণের কথা। সভ্য দেশে এরকম অপরাধ দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে চলছে, তা ভেবেই সবাই বিস্মিত।
সুটিয়ার যে মেয়েগুলো ভেবেছিল তাদের জীবন একেবারে শেষ, তারা নতুন জীবন পেল। শয়তানগুলো জেলের ভিতরে যাওয়ায় তাদের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও কমল। অফিসার অমিতাভ চন্দ্র সুটিয়া, গোবরডাঙা, গাজনা, নাগবাড়ি এইসব এলাকায় রেড করে বর্ডার পার্টির আরও অনেককে অ্যারেস্ট করলেন।
সারা সুটিয়ায় মিষ্টিমুখ চলছে। ভয়ে আতঙ্কে সুটিয়ায় যে স্বাভাবিক জনজীবন নষ্ট হয়েছিল, তা আস্তে আস্তে ফিরে আসতে লাগল। যারা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা অনেকেই সুটিয়ায় ফিরছে। আত্মীয়স্বজন-কুটুম আসা বন্ধ ছিল, সেগুলো আবার শুরু হল।
চন্দনা বিছানায় উপুড় হয়ে অনেকক্ষণ ধরে অঝোর নয়নে কাঁদল। ওর চোখের জল আর কোনো বাঁধ মানছে না। অনেক কষ্ট, অনেক যন্ত্রণা যেন বুকের মধ্যে পাথর হয়ে চেপে বসেছিল, সেটা আস্তে আস্তে নামল।
ও সুকান্তকে বলল— আজকে অনেকদিন বাদে একটু ঘুমোতে পারব, কত রাত ঘুমোতে পারি না বলো তো।
চন্দনা শান্তিতে ঘুমোতে যায়। অনেক অনেক দিন পরে ওর চোখে ঘুমপরিরা ঘুমের পালক বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
আরও নতুন তথ্য উঠে আসতে লাগল এবার। জয়ন্তী বলে একটা মেয়ে থানায় অভিযোগ জানাল— তাকে যেমন ধর্ষণ করা হয়েছে, তেমনি তাকে ধর্ষণ করার পুরো দৃশ্য ক্যামেরায় ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়েছে। তারপর সেই ভিডিও রেকর্ডিং ব্লু-ফিলম হিসাবে ছড়িয়ে দেওয়া হবে এই অজুহাতে ওদের কাছ থেকে অনেক অনেক টাকা তোলা হয়েছে।
বরুণ কল্পনা করতে পারেনি কত মেয়েদের এরা সর্বনাশ করেছে। আজকে সুটিয়ার ভয় মুছে গিয়েছে। প্রতিদিন পুলিশ কাউকে না কাউকে বর্ডার পার্টির লোকজনকে ধরছে। যে ক-টা ধরা পড়েনি তারা এলাকা ছেড়ে যে কোথায় পালিয়েছে তার হদিশ কেউ দিতে পারছে না।
তবে সারা রাজ্যে ওদের খোঁজ তল্লাশি চলছে। বরুণ সেদিনকেও থানায় গিয়েছে যারা পালিয়েছে, তাদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে।
—স্যার, তাহলে যারা পালাল তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
—কাউকেই ছাড়া হবে না বরুণবাবু। শুধু দেখে যান সবকটা জন্তুকে কীভাবে জেলের ভিতরে ঢোকাই।
—আচ্ছা অমিতাভবাবু, আমার একটা প্রশ্ন আছে, জিজ্ঞাসা করব?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, করুন।
—বলছি এত বড়ো একটা অপরাধ, আমি এসে আপনার কাছে অভিযোগ করলাম, আপনি স্টেপ নিতে শুরু করলেন, তারপর আপনি গাইঘাটা থানায় নতুনও, ব্যাপারটা আমার কাছে খটকা লাগছে।
অমিতাভবাবু বরুণের কথা শুনে একটু মুচকি হাসেন তারপর বলেন— আপনার সন্দেহ অমূলক নয়। সুটিয়া অঞ্চলে যে এইভাবে গণধর্ষণ হচ্ছে, তা আমাদের কাছে আগেই খবর ছিল।
—আগে বলতে কি আপনার গাইঘাটা থানায় আসার আগেই এই খবর ছিল?
—হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। বরুণবাবু, আপনি সুটিয়া থেকে এইসব নিয়ে কিছু গণদরখাস্ত ওপর লেভেলে পাঠিয়েছিলেন মনে আছে?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, সে ভোলা যায়?
—সেই গণদরখাস্তেই তো সব পরিষ্কার লেখা ছিল। এখানকার পুলিশ অপরাধীদের ধরতে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, উলটে অপরাধীদের আড়াল করছে। তাই তো এখানকার পুরোনো অফিসারকে সরিয়ে আমাকে পাঠানো হল। আর আমাকে পরিষ্কার নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হল আমি যেন এদের বিরুদ্ধে স্টেপ নিই।
—ও, তাই আপনি একটা অভিযোগ পেতেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন বর্ডার পার্টির বিরুদ্ধে।
—হ্যাঁ, আসলে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ জানাচ্ছিল না। বলতে গেলে অভিযোগ জানাতে ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু আপনি অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করায় ওদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়ার সুবিধা হল।
* * *
বনগাঁ কোর্টে কেস উঠেছে। ম্যাটাডোর করে শয়ে শয়ে লোক সুটিয়া থেকে কোর্টে ভিড় করেছে। অনেক নির্যাতিতা মহিলাও আছে তাদের মধ্যে।
সুকুমারদের আইনজীবী প্রমাণ করতে চাইছে চন্দনা মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ, তাই ওর অভিযোগে কোনো কান দিলে চলবে না।
কিন্তু চন্দনা সাক্ষী দিতে উঠে যেভাবে ওর ওপর হওয়া পাশবিক অত্যাচারের বিবরণ দিল, সবাই তাই শুনে শিউরে উঠল। চন্দনা বলল— ওদের অত্যাচারেই আজকে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ওরা শাস্তি না পেলে আমি মানসিকভাবে শান্তি পাব না। হুজুর, শয়তানগুলোকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
শুধু চন্দনা নয়, আরও অনেক অনেক মেয়েও সাক্ষী দিল তাদের ওপর হওয়া অত্যাচারের। সবারই বিবরণ মর্মান্তিক। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে বনগাঁ কোর্ট। সুকুমারদের ওপরে সুটিয়ার সবাই পারলে তখনই চড়াও হয়। ওরা চায় ওই শয়তানগুলোর শাস্তি।
বরুণকেও সাক্ষী দিতে ডাকা হল। জজসাহেব প্রশ্ন করলেন— আপনি এই গণধর্ষণ মামলার অন্যতম সাক্ষী, আপনি বলুন আপনার বক্তব্য।
—মাননীয় জজসাহেব, আপনি এই সমস্ত নির্যাতিতা মহিলাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে সব বিবরণ শুনেছেন, এরপরে আমার নতুন কোনো বক্তব্য থাকতে পারে না। তবে আমি চাই এই মেয়েদের যন্ত্রণার অবসান ঘটান এই অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি দিয়ে।
—আপনি বলুন আপনার মতে এরা কী ধরনের শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।
—দেখুন আইনের চোখে এরা অপরাধী, এদের শাস্তি আইন নিজেই দেবে। তবে আমার একটা মত আছে।
—কী মত?
—আমার মতে এদের সংশোধিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এরা নিজেরা বুঝুক এরা কী জঘন্য অপরাধ করেছে, এদের আত্মোপলব্ধি হোক।
জজসাহেব যেদিন কোর্টে রায় ঘোষণা করছেন, সেদিন কোর্টে জনারণ্য। সুটিয়া আর আশেপাশের গ্রাম থেকে দলদল লোক এসেছে রায় শুনতে।
জজসাহেব বললেন— সুটিয়ায় এরা যা করেছে, হিসেব মতো এদের ফাঁসিই উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু আমরা চাইছি এরা নিজেরা বুঝুক এরা কী জঘন্য অপরাধ করেছে, এরা সংশোধিত হোক। এদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হল।
এই সাজা শুনে প্রাথমিকভাবে উপস্থিত মানুষের মধ্যে একটা হতাশা এল, কিন্তু বরুণ তাদের বোঝাল উপযুক্ত শাস্তিই এরা পেয়েছে। এরা জেলে বসে নিজেদের সংশোধিত করবে সেটাই ঠিক হবে।
সুকুমারকে যখন বাইরে বার করা হচ্ছে, তখন বরুণ এগিয়ে গিয়ে সুকুমারের হাতে রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দের রচনা সংগ্রহ তুলে দিয়ে বলল— নে, জেলে গিয়ে এবার এই বইগুলো নিজে পড়িস ও অন্যদের পড়াস, এগুলো পড়ে যদি তোদের সুমতি হয়, তাহলেই ভালো।
সুকুমার হাত বাড়িয়ে বইগুলো নিল। তারপর বরুণের দিকে একবার ফিরে তাকাল, কোনো কথা বলল না।
সুকুমারকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হল। চারিদিকে প্রেসের লোকের ভিড়। তারা শুধু ক্যামেরায় ছবি তুলছে। কেউ কেউ আবার বরুণকে প্রশ্ন করছে— আপনি ওদের ফাঁসি চাইলেন না কেন?
—আমি বিশ্বাস করি না ফাঁসি দিলে এদের প্রকৃত শাস্তি হবে। আমি বিশ্বাস করি এরা যদি নিজেরা নিজেদের সংশোধিত করতে পারে, তাহলেই এদের সংশোধনাগারে পাঠানো সফল হবে। এরা এখন এক একটা পশু, এদেরকে আবার মানুষে রূপান্তরিত করতে হবে।
—আপনি এদের হাতে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের বই তুলে দিলেন কেন?
—আমি মনে করি রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দের রচনা এদের পুনরায় মানুষ হতে সাহায্য করবে।
ততক্ষণে লোকজন বরুণকে কোলে তুলে নিয়ে নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। বরুণ না থাকলে আজকে এই শয়তানগুলোকে কিছুতেই জেলের ঘানি টানানো যেত না, ওরা এখনও সুটিয়ায় রাজত্ব চালাত। আজকে তাই বরুণ শুধু ওদের কাছে নায়ক নয়, বরুণ ওদের কাছে সাক্ষাত ভগবান। ওরা বরুণকে কেউ জড়িয়ে ধরছে, কেউ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, কেউ-বা বরুণের মুখে মিষ্টি তুলে দিচ্ছে, কেউ-বা আবার পটকা ফাটাচ্ছে। সত্যিই আজকে সুটিয়ার মানুষদের উৎসবের দিন।
সুকুমারদের নিয়ে পুলিশের প্রিজনভ্যান আস্তে আস্তে বনগাঁ কোর্ট চত্বর ছেড়ে এগিয়ে যায়।
বরুণরাও আস্তে আস্তে ওখান থেকে চলে আসে, ও তখন কিছুটা আনমনা, ওর মনে তখন অন্য ভাবনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।