সপ্তবিংশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

আমতুস সালামের এখন বয়স অনেক। ক-দিনই বা আর বাঁচবেন। টিভিতে, কাগজে, সুটিয়ার ঘটনা জেনে তিনি নিজে ভাবছেন হায় ঈশ্বর, স্বাধীন ভারতেও এমন ঘটত। আর যে ছেলেটা এইভাবে গণধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল, তার প্রাণটাই চলে গেল।

ওঁনার মনে পুরোনো কথা ছবির মতো ভেসে আসছে। তখনও ভারত স্বাধীন হয়নি। স্বাধীনতার দোরগোড়ায় তখন পুরো দেশ। সালটা ১৯৪৬।

কলকাতার দাঙ্গা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালিতে ছড়িয়ে পড়ল। অসংখ্য নারী ধর্ষিতা হচ্ছে। একটি ধর্মের মানুষ আর একটি ধর্মের নারীদের ধর্ষণ করছে। কাউকেই ওরা ছাড়ছে না। বালিকা থেকে বৃদ্ধা সবাই এই অত্যাচারের শিকার হচ্ছে।

কাগজে এ খবর বেরোচ্ছে না। চাপা থাকছে। শেষপর্যন্ত কয়েকদিন বাদে অমৃতবাজার পত্রিকায় নোয়াখালির কথা ছাপা হল। মানুষ জানল নোয়াখালিতে নারীদের ওপর কী অত্যাচার হচ্ছে।

গান্ধীজির নজরে এল নোয়াখালির ঘটনা। উনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। উনি ছুটলেন নোয়াখালিতে। পুলিশ-প্রশাসন ওঁনাকে ওইভাবে নোয়াখালিতে যেতে বারণ করল, একেতে ওঁনার তখন ৭৭ বছর বয়স। বয়সের ভারে উনি ভারাক্রান্ত। তারপর আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তখন ওখানে খুব বাজে। কিন্তু গান্ধীজি নোয়াখালিতে চললেন দাঙ্গা থামাতে, নারীদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে।

বীণা দাস, বেলা বোস, অশোকা গুপ্ত, উজ্জ্বলা রক্ষিত রায় ও আরও অনেকে গান্ধীজির সঙ্গে নোয়াখালিতে গেলেন। কিন্তু গান্ধীজির কথা ওখানকার মানুষ শুনতে চাইছে না। গান্ধীজির অহিংস নীতির ওখানে এক চরম পরীক্ষা। নির্যাতিতা নারীরা অহিংসভাবে কী করে ওই পশুদের প্রতিরোধ করবে? উনি নবগ্রামের একটি সভায় বললেন— ভীরুতা প্রদর্শন অপেক্ষা বরং হিংসার পথ গ্রহণীয়।

তিনি অন্য একটি সভায় বললেন— দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হইয়া যে সকল নারী বিনা অস্ত্রে প্রতিরোধ করিতে পারিবেন না, তাঁহাদিগকে অস্ত্র হাতে লওয়ার পরামর্শ দিতে হয় না; তাঁহারা নিজেরাই অস্ত্র হাতে লইবেন।

কিন্তু গান্ধীজি দেখলেন তাঁর কথা কেউ শুনতে চাইছে না। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ চলছেই। তিনি ভাবলেন ব্যর্থতা নিয়েই হয়তো তাঁকে মরতে হবে, তিনি প্রার্থনা করলেন— আমি যদি ব্যর্থ হই, ঈশ্বর যেন আমাকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেন।

এই অবস্থায় তিনি, আমতুস সালাম এসব অত্যাচারের বিরুদ্ধে চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। একজন নারী হয়ে তিনি কী করে নারীদের ওপর এত অত্যাচার সহ্য করবেন? তিনি শুরু করলেন অনশন। গান্ধীজি তাকে বারণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি শোনেননি। হয় নারীদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হবে, নাহলে তিনি নিজে অনশন করে প্রাণত্যাগ করবেন।

হ্যাঁ, তাঁর অনশনে কিছুটা হলেও কাজ হয়েছিল। গান্ধীজিও তাঁকে বারবার অনুরোধ করছেন— তুমি এইভাবে আর অনশন কোরো না, অনেকদিন তো হল, তোমার শরীরও ভেঙে পড়ছে, আমার অনুরোধ তুমি রাখো, আমতুস।

গান্ধীজির মতো মহান ব্যক্তি কাউকে কোনো অনুরোধ করলে, সেই অনুরোধ না রেখে পারা যায় না। গান্ধীজি হাতে করে তাঁকে ফলের রস খাইয়ে তাঁর পঁচিশ দিনের অনশন ভাঙেন।

সেইসব পুরোনো কথা তাঁর মনে পরপর ভেসে আসছে। সুটিয়ার এই ছেলেটিও তো গান্ধীর মতোই সামনে থেকে সুটিয়ার নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে, ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তাদেরকে জেলের মধ্যে পুরেছিল, আর সেইজন্যেই ওই অপরাধীরা এই মহান যুবককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল।

আমতুস সালামের দুই চোখ জলে ভিজে যায়। বরুণের সম্বন্ধে আরও কিছু কথা উনি জানতে পেরেছেন। মানুষজনের জন্যে খুব নিঃস্বার্থভাবে ও কাজ করত। মানুষের কাজ করবে বলে ও নিজে বিয়ে করেনি, সংসার করেনি। আজকালকার যুগে এরকম কেউ থাকতে পারে, তা ভাবাও বেশ কষ্টকর।

আমতুস সালাম ঠিক করে নেন এই মহান যুবকের আত্মত্যাগের কথা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। গান্ধীজি যেরকম নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্যে কাজ করতে গিয়ে ভোগের জীবন ছেড়ে ত্যাগের জীবন বেছে নিয়েছিলেন, এই বরুণ বিশ্বাসও একইভাবে সুটিয়ার মানুষদের পাশে থাকার জন্যেই কলকাতায় চলে যায়নি। গান্ধীজি যেরকম ব্যারিস্টারি ছেড়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, এই বরুণও সিভিল সার্ভিসের মতো বড়ো চাকরিতে উত্তীর্ণ হয়েও মানুষের সেবা করার জন্যে সুটিয়ায় থেকে গিয়েছিল।

আর শেষপর্যন্ত দুজনকেই আততায়ীর গুলিতে লুটিয়ে পড়তে হল। গান্ধীজির মৃত্যু তাও শেষবয়সে, আর এ ছেলে তো তার পূর্ণ যৌবনেই পৃথিবী থেকে চলে গেল।

আমতুস সালাম শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। উনি চান বরুণের উদাহরণকে দেশের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। একসময় গান্ধীজিকে দেখে যেমন সারা বিশ্ব অনুপ্রাণিত হয়েছিল, বরুণের আত্মত্যাগ দেখে যেন সারা দেশ অনুপ্রাণিত হয়।

উনি বেলা বোসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। বেলা বোসও নোয়াখালিতে নির্যাতিতা নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। উনিও অশক্ত শরীরে একমত হলেন— না, বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যু, তার আত্মবলিদান, তার এই লড়াই সারা দেশের সামনে তুলে ধরতে হবে আমাদের।

—কিন্তু বেলাদি, কীভাবে আমরা বরুণের এই লড়াইকে সবার সামনে তুলে ধরতে পারব?

—কেন, সামনেই আগস্ট মাস। গান্ধীজি তো এই আগস্ট মাসেই ডাক দিয়েছিলেন করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে, ইংরেজ ভারত ছাড়ো। সেই ১৯৪২ সালের আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে আমরা গান্ধীজির পাশাপাশি বরুণকেও স্মরণ করব।

—হ্যাঁ বেলাদি, আপনি ভালো বলেছেন। তাহলে আমরা বেলেঘাটার গান্ধী ভবনে এই বছরে বরুণ বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা জানাব, তার প্রতিবাদের ভাষাকে সবার মধ্যে তুলে ধরব।

সেইমতো ব্যবস্থা হল। পূর্ব কলকাতা গান্ধী মেমোরিয়াল সমিতির প্রধানের সঙ্গে ওঁনারা কথা বললেন। সমিতির সবাই এই দুই প্রবীণ সৈনিকের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেন। গান্ধীজির নোয়াখালির লড়াইয়ের ব্যাটন যে বরুণ স্বেচ্ছায় তুলে নিয়ে শহিদের মৃত্যুবরণ করল তাকে শ্রদ্ধা জানাবে বেলেঘাটার গান্ধী ভবন।

বরুণের পরিবারের সবাইকে অনুষ্ঠানে আসার আমন্ত্রণ জানানো হল। আমন্ত্রিত হলেন সুটিয়া প্রতিবাদী সংস্থার অনেকেই।

গান্ধীজির স্মৃতিধন্য বেলেঘাটার এই গান্ধীভবন। কলকাতার দাঙ্গার সময় তিনি এখানে এসে অনেকদিন ছিলেন। দাঙ্গা বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।

আজকে সেখানে উপস্থিত বরুণের শোকাহত পরিবার, সুটিয়ার প্রতিবাদী সংগঠনের অনেকে।

শিবু কিছুতেই তার চোখের জল ধরে রাখতে পারে না। বসে বসে হাপুস নয়নে কাঁদছে। বরুণের মাও পুত্রশোকে পাগলের মতো কেঁদেই চলেছে।

আমতুস সালাম বলে যেতে লাগলেন— আজকের এই যুগে আমরা এইরকম একজন স্বার্থহীন, প্রতিবাদী ছেলেকে পেয়েছিলাম, তার জন্যে আমাদের গর্ব হয়, আবার দুঃখ হয় এই ছেলেকে আমাদের হারাতে হল। প্রতিবছর এই দিনে আমরা গান্ধীজির স্মৃতিচারণ করি, কিন্তু এবারে আমরা গান্ধীজির পাশাপাশি বরুণ বিশ্বাসকেও স্মরণ করছি। বরুণের মতো সন্তানের জন্ম হোক ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে। এরাই গান্ধীজি যেভাবে ভারতবর্ষকে দেখতে চেয়েছিলেন সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে।

এবারে বরুণের বাবা শিবুকে কিছু বলতে ডাকা হল। শিবু মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু অঝোরে কাঁদছে, কিছু বলতে পারছে না। কী বলবে, তার বুকের কলজেটাই তো ওরা উপড়ে নিয়েছে।

সবাই ওকে বারবার অনুরোধ করল— আপনি অন্তত সামান্য কিছু কথা বলুন, আপনার ছোটো ছেলের কথা, বরুণের কথা।

শিবু খানিকক্ষণ চুপ করে ফ্যাল-ফ্যাল করে দাঁড়িয়ে থাকে। দু-চোখে শূন্যতা। তারপর ধরা গলায় মাইক্রোফোনে বলে— আমারে ক্ষেমা করবেন, আমি কিছু বলতে পারছি না, আমি কথা বলতে গেলেই কান্নায় আমার গলা বুঁজে আসছে। আমি বরং কিছু গাই।

সমবেত সম্মতি— হ্যাঁ-হ্যাঁ, অবশ্যই।

বৃদ্ধের গলায় রামায়ণের সিন্ধুবধের গান— ''এমন পুত্র যার ছেড়ে যায়, তার বেঁচে থাকা দায়।''

আগে শিবু সব ধরনের গানই গাইত। যে যা শুনতে চাইত, সবকিছুই। কিন্তু এখন শিবুর গলায় শুধু পুত্রহারা পিতার যন্ত্রণার গান। শিবু গান্ধীভবনে এক এক করে গাইতে থাকে মহীরাবণ, অহীরাবণ, তরনী সেন, বীর ইন্দ্রজিতের শোকে রাবণ, পুত্রশোকে দশরথের বেদনার গান।

গান্ধীভবনের সবার মধ্যে গুনগুন হতে শুরু করেছে সেই গান— ''এমন পুত্র যার ছেড়ে যায়, তার বেঁচে থাকা দায়...''

__

অধ্যায় ২৭ / ২৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%