মনজিৎ গাইন
জয়িতার মতো ধর্ষিতা অনেক মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নতুন জীবন দিল বরুণ। অনেকের বিয়ের ব্যবস্থা করল। সে একেবারে ছেলে দেখা থেকে শুরু করে বিয়ের সব খরচা পর্যন্ত।
তারপরেও ওর কত কাজ। এই তো সেদিনকে এক বয়স্কা মহিলা এলেন ওর বাড়িতে— বাবা, কিছু টাকা দেবে?
—কেন মাসিমা, আপনি টাকা নিয়ে কী করবেন?
—আমি ডাক্তার দেখাব, বাবা।
—কেন, কী হয়েছে আপনার?
—আর বোলো না, সারা হাত-পায়ে ব্যথা আর তার সঙ্গে ভয়ানক সর্দি। কবিরেজের ওষুধ অনেকদিন খেলাম, কিন্তু কোনো কাজ হল না, তাই ভাবছিলাম একটা ডাক্তার দেখাব।
—শুনুন মাসিমা, আমি টাকা আপনাকে দিচ্ছি, কিন্তু এই টাকা দিয়ে আপনি ডাক্তার দেখাবেন না।
—তাহলে তোমার টাকা নিয়ে কী করব?
—ওষুধ কিনবেন।
—কিন্তু ডাক্তার না দেখিয়ে ওষুধ খাব কী করে?
—ডাক্তার আপনি হসপিটালে দেখান, কোনো পয়সা লাগবে না। তারপর ডাক্তার দেখিয়ে যদি কোনো ওষুধ কিনতে হয়, তাহলে এই টাকা দিয়ে কিনবেন।
এই বলে বরুণ ওই মহিলার হাতে পাঁচশো টাকা তুলে দেয়। মহিলা তোমার ভালো হোক, তোমার মঙ্গল হোক, বলতে বলতে বেরিয়ে যায়।
এইরকম সাহায্য পাওয়ার জন্যে কতজন যে বরুণের কাছে এভাবে হাত পাতে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বরুণও কাউকে নিরাশ করে না। সবাইকেই সে সাহায্য করবেই। আর এই করতে গিয়ে মাসের শুরুতেই ওর মাইনে শেষ। বলতে গেলে মাইনে পাওয়ার ক-দিনের মধ্যেই বরুণকে আবার এর ওর কাছে হাত পাততে হয় অপরকে সাহায্য করার জন্যে। সবাই বরুণের স্বভাব জানে, হাসিমুখেই ওর হাতে টাকা তুলে দেয়। টাকা নিতে নিতেই বরুণ বলে— তুমি চিন্তা কোরো না দাদা, আমি সামনের মাসে মাইনে পেলেই তোমার টাকাটা শোধ দিয়ে দেব।
শুধু কথার কথা না, বরুণ সত্যিই ধার নেওয়া টাকা শোধ দেওয়ার চেষ্টা করত কিন্তু সবসময় পেরে উঠত না। পরের মাসেও শোধ দিতে না পারলে বাড়ি চলে যেত— দাদা, এ মাসে পারলাম না, সামনের মাসে ঠিক শোধ দিয়ে দেব।
আর ও টাকা শোধ দেবে কী করে, এলাকার কত গরিব ছেলে-মেয়েকে ওকে সাহায্য করতে হয়, কারো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খরচ, কারো বা ডাক্তারির, কারো বা আবার এমনি স্কুল-কলেজের পড়াশুনার খরচ। কতজনকে যে এইভাবে সাহায্য করে, তা ও নিজেই মাঝে মাঝে ভুলে যায়। কিন্তু এদের সবার কাছেই ও ভগবান।
সেদিনকেও সকালে বরুণ বাড়িতে রয়েছে। সেই মহিলা আবার এসেছেন। বরুণ তাকে দেখে বলে— ও মাসিমা, ডাক্তার দেখাওনি?
—হ্যাঁ দেখিয়েছি, কিন্তু আবার যে একটা অসুবিধা হল।
—কী অসুবিধা?
—ডাক্তার বলেছে শুধু ওষুধ খেলে হবে না।
—তাহলে আর কী করতে হবে?
—বলেছে মেঝের ঠান্ডায় আমার বুড়ো বয়সের শরীরে ব্যথা হচ্ছে, মেঝে শোয়া বন্ধ না করলে আমার এই ব্যথা কমবে না, যতই ওষুধ খাই।
—তাহলে তুমি খাটে বা চৌকিতে শুচ্ছ না কেন?
—আমি গরিব মানুষ, আমি খাট, চৌকি এসব কেনার পয়সা কোথায় পাব বলো তো?
—ও এই ব্যাপার, তুমি এখানে একটু দাঁড়াও, আমি একটা ব্যবস্থা করছি।
এই বলে বরুণ বেরিয়ে পড়ে। খানিকক্ষণ পরে একটা ভ্যান নিয়ে আসে। তারপর ভ্যানওয়ালার সঙ্গে ধরাধরি করে নিজের খাটটা ভ্যানে তুলে দেয়। তারপর ভ্যানওয়ালাকে কুড়ি টাকা দিয়ে বলে— এই মাসিমার বাড়িতে খাটটা তুই ঠিক করে তুলে দিয়ে আয়।
এদিকে সেই মহিলা লজ্জা পেয়েছেন— না-না বাবা, এটা তুমি কী করছ, তোমার খাট এইভাবে আমাকে দিও না।
—এরকম বোলো না, এখন আমার হাতে টাকা-পয়সা একটু কম আছে, তাই নতুন খাট কিনে দিতে পারলাম না, আমারটাই তোমাকে দিয়ে দিলাম। আমি টাকা পেলে নতুন একটা খাট কিনে নেব।
বরুণ প্রায় জোর করেই খাটটা ওঁনাকে দিয়ে দেয়। তারপর নিজে মেঝেতে একটা পলিথিন পেতে শুতে থাকে।
তবুও বরুণের মনে আপশোশ যায় না ওই মহিলাকে সে একটা নতুন খাট কিনে দিতে পারল না। পরে আবার বরুণ তাঁর বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসেছে তাঁর শরীর ঠিক হয়েছে কিনা, শরীরের ব্যথা কমেছে কিনা।
* * *
আগের সেচ দফতরের টিম ফেরত যাওয়ার পরেও বরুণ বসে নেই। ও ঢিপির বাঁধ কাটবেই। তারপর ইটভাটার মালিক আর ঘেরি মালিকদের যারা জোর ছিল সেই সুকুমাররা এখন কেউ জেলে, কেউ বা গ্রেফতার এড়াতে এলাকাছাড়া। এখন ওদের জোর অনেকটা কমে গিয়েছে। এই সময়েই বরুণ জানে ঝাঁপানোর সময়। ও আবার সেচ দফতরে চিঠিপত্র নিয়ে যাতায়াত শুরু করে। সরকারি দফতর থেকে ঢিপির বাঁধ কাটার এবং বলদেঘাটার খাল কাটার জন্যে সরকারি একটা প্রজেক্টও পাশ হয়েছে। বরুণকে বারবার তাই বারাসাতে জেলায় সেচ দফতরে ছুটতে হচ্ছে।
সেদিনও ও বারাসাতে সেচ দফতরে গিয়েছে। গিয়ে দেখে সেখানে আরও কয়েকজন বসে আছে। বরুণ একাই গিয়েছে। বরুণকে দেখে ওরা নিজেরা কী সব যেন বলাবলি করছে। খানিকক্ষণ পরে ওদের একজন বলল— আপনি কি সুটিয়ার বরুণ বিশ্বাস?
—হ্যাঁ, কেন?
—ও, আপনিই সেই সুটিয়ায় গণধর্ষণ কাণ্ডে প্রতিবাদী সংস্থা করে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে আমাদের খুব ভালো লাগল।
—আপনারা কোথা থেকে আসছেন?
—আমরা চাঁদপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
—এখানে কী দরকারে এসেছেন?
—আমাদের ওখানে একটা পুরো নদী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দখল হয়ে যাচ্ছে। সেই নদী সংস্কারের জন্যে আবেদন করতেই এখানে আসা।
—কোন নদী?
—চালুন্দিয়া নদী।
—ও, আমিও তো ইছামতি আর যমুনা নদীর সংস্কার, বলদেঘাটার খাল কাটা এইসব নিয়ে আন্দোলন চালাচ্ছি, তার সঙ্গে আপনাদের চালুন্দিয়া নদী সংস্কারের ব্যাপারটা জুড়ে দিয়ে আমরা একসঙ্গেই আন্দোলন করি।
—বাঃ, আপনি আমাদের সামনে থাকলে আমাদের খুব সুবিধা হয়।
বরুণ চালুন্দিয়া নদী সংস্কারের আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়ে। গোপালনগরের কাঁচিকাটায় ইছামতির থেকে বেরিয়ে স্বরূপনগরের কাছে এই নদীটি যমুনায় মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় তিরিশ কিমি। অনেক জায়গায় এই নদী একেবারে মজে গিয়েছে আবার অনেক জায়গায় লোকে এই নদী দখল করে নিচ্ছে। এমনকি প্রোমোটারদের নজরও এখন এই নদীর ওপর। অথচ লোককথায় আছে এই নদীতে একসময় চাল আর হাঁড়ি নিয়ে পার হওয়া যেত না। আর আজকে কোথায় সেই নদী? বরুণ চালুন্দিয়ার হাল দেখে হতাশ হয় কিন্তু চেষ্টা ছাড়ে না। চালুন্দিয়াকে বাঁচাতে হবেই। নদীর মৃত্যু মানে মানুষের মৃত্যু। নদীর ধার ঘেঁষে মানুষের বসতি তৈরি হয়, আর সেই নদী শুকিয়ে এলে, মজে এলে মানুষের জীবনও মরে যায়, শুকিয়ে যায়।
ওইসব এলাকার মানুষও চালুন্দিয়া নদী বাঁচানোর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদেরও নদীটা মজে যাওয়ায় খুব অসুবিধা হচ্ছিল। একটু বৃষ্টিতেই এলাকায় জল জমে যাচ্ছিল, জল নিকাশির খুব অসুবিধা।
বনগাঁ, চাঁদপাড়া, কাঁচিকাটায় এই নিয়ে মিটিং মিছিল চলছে। মানুষজনের সাড়া ভালোই।
প্রোমোটার ভোলা আর তার দলবল বরুণদের ওপরে কড়া নজর রাখছে। এখন চাঁদপাড়া, গাইঘাটা, বনগাঁ অঞ্চলে একেবারে জমি পাওয়া যাচ্ছে না। আর পাওয়া গেলেও তার যা দাম, সেখানে বলতে গেলে এই মজে যাওয়া নদীতে প্রোমোটিং করে জমি প্লটে প্লটে বেচলে ভালোই লাভ। কিন্তু এই সুটিয়ার বরুণ আর তার দলবল এই চালুন্দিয়া নিয়ে যা শুরু করেছে, ওদের কাজকর্ম করাই যে মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
ভোলা ওর চ্যালাদের নিয়ে বসেছে। শঙ্কর বলছে— ভোলাদা, এইসব চালুন্দিয়া রক্ষা মঞ্চের লোকেরা যে খুব লাফড়া করছে, ওদের এবারে যে একটু চমকে দিতে হবে।
—হ্যাঁ, ওই সুটিয়ার বরুণ ওদের মধ্যে আসার পরে এদের জোর যেন আরও আরও বেড়ে গিয়েছে। ওরা ভাবছে সুটিয়ায় যেমন সুকুমারদের জেলে পুরেছে, তেমনি আমাদেরকেও চালুন্দিয়ার জমিতে হাত দিতে দেবে না।
—কিন্তু গুরু, তা হলে যে আমাদের সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে।
—হ্যাঁ, সেটা আমিও ভেবেছি। এবারে ওদের ভালো রকম চমকে দেব।
পরের দিন চাঁদপাড়া সিনেমা হলের সামনে চালুন্দিয়া রক্ষা মঞ্চের মিটিং ছিল। সেখানে ওরা দল বেঁধে হামলা করে। মঞ্চ বাধা হয়েছিল সেসব ভেঙে দেয়। চেয়ার ছুড়ে ফেলে দেয়। উপস্থিত লোকজনকে ভালোরকম শাসাল— একদম এইসব রক্ষা মঞ্চ-টঞ্চ করা যাবে না, তাহলে কিন্তু সবার খুব বিপদ হবে।
বরুণকেও ওরা বেশ ধাক্কাধাক্কি দিল। কিন্তু বরুণ দমবার পাত্র নয়। ও হামলাকারীদের সামনে বুক চিতিয়েই বলল— তোমরা ভাবছ হামলা করে, ভয়ে দেখিয়ে আমাদের থামিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু তা হবে না, চালুন্দিয়া নদীকে আমরা বাঁচাবই।
বরুণের নেতৃত্বে চালুন্দিয়া নদী বাঁচানোর আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে। ভোলারাও সুযোগ খুঁজছে ওদেরকে থামিয়ে দেওয়ার, ভয় দেখানোর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।