মনজিৎ গাইন
এদিকে বরুণের ইস্কুলে ওর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ছেলেরা শুধু বরুণ স্যার-বরুণ স্যার করে পেছনে ঘোরে। সেদিনকে ইস্কুলে একটা ব্যাপার ওর চোখে লেগেছে। হেডস্যার সর্বশিক্ষার টাকায় ঘর করছেন, অথচ টেন্ডার ছাড়া।
স্টাফরুমেও এই নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। অবিনাশদা বরুণকে বলল—বরুণ, ইস্কুলে কী চলছে বুঝতে পারছ তো?
—হ্যাঁ, সে তো বুঝতে পারছি, কিছু একটা করতে হবে।
—কী করবে তুমি, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এইসব দেখে আসছি, কিছু বলার সাহস হয় না। হেডস্যারের সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটির লোকেদের এত দহরম-মহরম বলতে ভয় লাগে।
—কিন্তু অবিনাশদা, আজকে না হয় হেডস্যার টেন্ডার ছাড়া ঘর তৈরির টাকা খরচা করছে নিজের পেয়ারের লোক দিয়ে কিন্তু যে নিম্নমানের মাল দিয়ে এই ঘর হচ্ছে, তাতে যেকোনো দিন কিন্তু ভেঙে পড়তে পারে। অত ছাত্র যদি কিছু হয়ে যায় কী হবে বলো তো?
অন্য স্যার ম্যাডামরাও সব শুনছে। কিন্তু সবাই নিঃশ্চুপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। বরুণ কিন্তু অবিনাশদাকে বেশ জোর দেয়— না অবিনাশদা, আমি আর সহ্য করতে পারছি না এই অন্যায়। জানো ক্লাসে যখন আমি 'অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে' এই ভাবসম্প্রসারণটা করাচ্ছিলাম আমার দু-চোখ ফেটে জল আসছিল। আমি ছাত্রদের যা পড়াচ্ছি সেটা আমি নিজেই করতে পারছি না। ধুস, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ না করতে পারলে এই শেখানোর কি কোনো মূল্য আছে?
—দেখিস, তুই মাথা গরম করিস না, হেডস্যারের চেন কিন্তু অনেকদূর।
—সে থাকুক, আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবই।
বরুণ সোজা এগিয়ে যায় হেডস্যারের ঘরের দিকে।
—স্যার, একটু আসব?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, এসো।
হেডস্যারের ঘরে ঢুকে বরুণ চেয়ারে বসে। হেডস্যার জিজ্ঞাসা করেন— হ্যাঁ, বলো বরুণ, কী ব্যাপার?
—বলছি স্যার, আমাদের ইস্কুলে দোতলায় সর্বশিক্ষার টাকা থেকে যে ঘর হচ্ছে, সেটা কীভাবে হচ্ছে দেখেছেন?
—হ্যাঁ, দেখলাম তো, কেন কী হয়েছে?
—ওই ঘরের জন্যে যা কিছু সিমেন্ট, তা ভেজাল মেশানো। ওইভাবে ঘর তৈরি হলে কিন্তু যেকোনো সময় একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটতে পারে, তখন এইসব ছোটো ছোটো ছেলে, ও আমি ভাবতে পারছি না।
বরুণের কথাগুলো হেডস্যারের মুখমণ্ডলে এক পরিবর্তন আনে, তাঁর কাছে বরুণের কথাগুলো সম্পূর্ণ অনাধিকার চর্চা। তাঁর বক্তব্য— দেখো বরুণ, তুমি ইস্কুলে এসেছ পড়াতে সেটাই করো, অন্যদিকে মাথা গলানোটা তোমার কাজ নয়।
—তাই বলে ইস্কুলে যা ইচ্ছা হবে?
—কোথায় যা ইচ্ছা হচ্ছে?
—ওই ঘরটা করতে আপনি কাকে বলেছেন, সেটা কি আমরা জানি না?
—সেটা জানতেই পারো, তাই বলে ইস্কুলের হেডস্যারের সঙ্গে তুমি এইভাবে কথা বলবে?
—কেন বলবো না, আপনি টেন্ডার ছাড়া এই ঘর তৈরির বরাত আপনার কাছের একজনকে দিয়েছেন, সেটা কীসের বিনিময়ে সবই আমাদের কাছে পরিষ্কার। আপনি যদি ওই ঘর ওই ভাবেই ওদের দিয়ে তৈরি করান, তাহলে কিন্তু খুব ভুল হয়ে যাবে।
—সেসব আমি বুঝব, তোমাকে ইস্কুলে বেশি মাতব্বরি করতে হবে না।
হেডস্যারের ঘর থেকে বরুণ বেরিয়ে আসে। ও বুঝতে পারে হেডস্যার ওর কথা শুনবেন না। ও ভাবার চেষ্টা করে কীভাবে হেডস্যারের এই অন্যায় বন্ধ করা যায়। ও অবিনাশদার সঙ্গে আলোচনা করে। অবিনাশদা ওকে সাবধান করে— দেখো বরুণ, হেডস্যার শুধু যে আজকে এই ঘর তৈরি করতে দুর্নীতি করছেন তা নয়, দীর্ঘদিন ধরেই উনি এইভাবে বিভিন্ন দু-নম্বরি কাজ করছেন, ওঁনাকে বাধা দিতে গেলে কিন্তু উনিও চুপ করে থাকবেন না।
—কী করবেন উনি?
—বিভিন্নভাবে তোমাকে হেনস্থা করার চেষ্টা চালাবেন।
—দেখো অবিনাশদা, আমার লক্ষ্য যদি সঠিক হয় আর সেই লক্ষ্যে যদি আমি অবিচল থাকি, তাহলে আমার উদ্দেশ্য সফল হবেই।
—দেখো কী হয়।
বরুণ একদিন ডি আই অফিসে চলে গিয়েছে। ডি আই অফিসের ক্লার্ক জিজ্ঞাসা করল— কী দরকার আপনার এখানে?
—আমি ডি আই সাহেবের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।
—উনি তো একটু বেরিয়েছেন, বিকেলের আগে অফিসে ঢুকবেন না।
—ঠিক আছে, আমি বিকেলেই আসব।
বিকেলে ডি আই অফিসে বরুণ আবার ঢোকে। ডি আই তখন অফিসে চলে এসেছেন। বরুণ তার সঙ্গে দেখা করে— স্যার, আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল।
—হ্যাঁ, বলুন।
—বলছি আমাদের ইস্কুলে হেডস্যার, সর্বশিক্ষার টাকায় যে ঘর তৈরি হচ্ছে, তা খুব নিম্নমানের জিনিস দিয়ে তৈরি করাচ্ছেন।
—সে কী, সে তো মারাত্মক ব্যাপার! কোন স্কুল আপনার?
বরুণ ওর ইস্কুলের নাম বলে আর যোগ করে।
—স্যার, আমি আশঙ্কা করছি যেকোনো সময় নতুন ঘর ভেঙে পড়ে বাচ্চাদের ক্ষতি করে দিতে পারে।
—আপনি হেডস্যারকে বলেছিলেন এই ঘটনাটা।
—হ্যাঁ, বলেছিলাম।
—উনি কী বললেন?
—উনি এ ব্যাপারে কোনো কথাই শুনতে চান না।
—ও বুঝতে পারছি কী ঘটছে, এখন সরকার থেকে হেডস্যারদের মাইনে কত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারপরেও মানুষ লোভে পড়ে এইরকম কীর্তি চালাচ্ছে।
—তাহলে স্যার, এই জিনিস বন্ধ করা যায় না?
—যাবে না কেন, আলবাত যাবে। আচ্ছা, আপনি বলুন তো ইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে আপনাদের হেডস্যারের কীরকম সম্পর্ক?
—একেবারে গলায় গলায়। কোনোরকম টেন্ডার ছাড়াই উনি সবকিছুর নির্দেশ দেন।
—ঠিক আছে, আমি দেখছি কী করা যায়।
* * *
কয়েকদিনের মধ্যেই বরুণদের ইস্কুলে ইনস্পেকশন হল। সমস্ত ব্যাপারেই খতিয়ে দেখা হল। দোতলার ঘর নিয়ে হেডস্যারকে ডি আই প্রশ্ন করলেন— কই, এই ঘরের টেন্ডার ডাকার ফাইলটা কই?
হেডস্যার আমতা আমতা করেন। ডি আই তার স্বর আরও চড়ান— কী হল দাঁড়িয়ে দেখছেন কেন, ফাইলটা তাড়াতাড়ি দিন। আর এসব কী দিয়ে আপনি এই ঘর তৈরি করাচ্ছেন?
ডি আই সিমেন্টের বস্তায় হাত ঢুকিয়ে আঁতকে উঠে বলেন— ইস, এটা কী, সিমেন্ট না গঙ্গামাটি! আপনি বাচ্চাদের জীবন নিয়ে এইভাবে ছেলেখেলা করছেন, জানেন আপনি যা করছেন এটা একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। আমি চাই আপনার দৃষ্টান্তমূলক একটা শাস্তি হোক।
হেডস্যারের মুখ একেবারে চুন। উনি নিশ্চিত এইসব ওই বরুণের প্ল্যান। হেডস্যার ভাবতে থাকেন বরুণের সঙ্গে উনি কীভাবে ব্যবহার করবেন। উনি সেক্রেটারিকে ফোন লাগান— হ্যালো, আমি চঞ্চলবাবু বলছি।
—হ্যাঁ, বলুন স্যার।
—বলছি আজকে হঠাৎ করে ইস্কুলে ইনস্পেকশন হয়েছে।
—তাতে কী হয়েছে?
—আমাদের দোতলায় যে ঘর তৈরি হচ্ছে সেখানে কাগজপত্রে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
—কী অসঙ্গতি?
—টেন্ডার ছাড়া ওই ঘর তৈরির অর্ডার দেওয়া হয়েছে, এছাড়া নিম্নমানের মাল দিয়েও ঘর তৈরি হচ্ছে বলে ইনস্পেকশনে ধরা পড়েছে।
—কিন্তু ডি আই অফিসে এই খবর গেল কী করে?
—আমাদের একজন শিক্ষকই ব্যাপারটা জানিয়েছেন।
—কোন শিক্ষক?
—বরুণবাবু।
—ও বুঝতে পেরেছি, ওই ছোকরা মতো মাস্টারটা। দাঁড়ান ওর সঙ্গে আমি বুঝে নিচ্ছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে সেক্রেটারি ইস্কুলে হাজির। সোজা স্টাফরুমে। ওখানে তখন হেডস্যারের এই বিপদে বেশ রগরগে আলোচনা চলছে। সেক্রেটারি সোজা গিয়ে বরুণকে বলল— বরুণবাবু, এটা আপনি ঠিক করলেন না।
—কোনটা ঠিক করিনি?
—ওই যে ইস্কুলের ব্যাপারটা ডি আই অফিসে জানিয়ে।
—দেখুন আমি জানিয়েছি এটা আপনাকে কে বলল?
—হেডস্যার বললেন।
—এটা ঠিক নয়, ইস্কুলে যেভাবে ঘর তৈরি হচ্ছে সেটা নিয়ে ডি আই ইনস্পেকশন হয়ে ভালোই হয়েছে, সেটা যেই জানাক না কেন।
—তবে বরুণবাবু, বেশি বাড়াবাড়ি করছেন না? এখানে চাকরি করতে আসেন সেটুকু নিয়েই থাকুন, বেশি কিছু করতে গেলে কিন্তু খুব সমস্যায় পড়বেন।
—দেখুন, আপনি যদি আমাকে ভয় দেখাতে চান, তাহলে জেনে রাখুন আমি ভয় পেয়ে দমে যাওয়ার পাত্র নই। আমি হচ্ছি অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছেলে, আমাকে কেউ দমাতে পারবে না।
—ওরকম ফুটুনি সবাই দেয়, তারপর গুঁতোয় পড়লে সবাই সাইজ হয়ে যায়। দাঁড়ান, আপনার কী অবস্থা করা হয় সেটা দেখুন।
—যা পারেন করুন, আমিও তোয়াক্কা করি না।
সেক্রেটারি বেরিয়ে গেলেন। বরুণ সেক্রেটারিকে যতই বলুক, ওর মনেও একটা আশঙ্কা কাজ করতে শুরু করেছে। কিন্তু ও সত্যিই ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। দেখা যাক এই ব্যাপারটা কতদূর গড়ায়। ও ঠিক করে নিল পরের দিন আবার ডি আই অফিসে যাবে।
যেরকম ভাবা সেরকম কাজ। ডি আই অফিসে গিয়ে ও সোজা ডি আই-এর ঘরে। ডি আই ওকে দেখেই বুঝতে পেরেছেন কিছু একটা ঘটেছে। ডি আই-এর উৎসুক প্রশ্ন— কী ব্যাপার বরুণবাবু, কোনো সমস্যা?
—হ্যাঁ, আমাকে সেক্রেটারি বেশ কড়া স্বরে শাসিয়েছেন।
—ও তাই, তাহলে দেখা যাচ্ছে আপনাদের হেডস্যার সঙ্গে সঙ্গেই সেক্রেটারিকে জানিয়েছেন।
—হ্যাঁ স্যার, এবারে আমি কী করব?
—আপনাকে আর কিছু করতে হবে না, যা করার আমিই করছি।
পরের দিন সকালে হেডস্যার তার নিজের বাড়ি থেকেই অ্যারেস্ট হলেন। সব টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে, বারবার বরুণের নামটাই টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে। উনি যেভাবে ইস্কুলের শিক্ষক হয়ে সেই ইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, তা অবশ্যই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা একটা উদাহরণ। সমস্ত মানুষকেই এইভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা উচিত।
বরুণকে ইস্কুলের সবাই শাবাশি দিচ্ছে। তবে বরুণের মুখে একটাই কথা— সত্যের জয় হবেই, কেউ সত্যকে চাপা দিয়ে রাখতে পারবে না। আর ওর নিজের সম্বন্ধে মন্তব্য হচ্ছে ও নিজে কেবলমাত্র একজন সত্যের সেবক, তার বাইরে কিছুই নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।