পঞ্চবিংশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

সারা সুটিয়া হায়-হায় করছে, ছেলে-বুড়ো-বউ-মেয়ে সবাই কাঁদছে। সে কী কান্না! সুটিয়ায় যে পুলিশ ফাঁড়ি ছিল সেখানে মহিলারা চড়াও হল— তোমরা আমাদের শয়তানদের হাত থেকে বাঁচাতে পারোনি, আমাদের যে বাঁচিয়েছিল, রক্ষা করেছিল শয়তানদের হাত থেকে, তাকেও তোমরা বাঁচালে না। তোমাদের আজকে কেউ আর আমাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।

সুটিয়ার পুলিশ ফাঁড়ি মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ, সুটিয়ার মেয়েরা ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করে পুলিশগুলোকে এলাকা ছাড়া করল।

পরের দিন সকাল থেকে সুটিয়া অঞ্চলে মানুষজন বেরিয়ে পড়ে রাস্তা অবরোধ করল। ওদের একটাই দাবি— বরুণ বিশ্বাসের খুনিকে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে, সুটিয়ার মানুষদের নিরাপত্তা দিতে হবে।

হাবড়া থানার থেকে বড়ো এক গাড়িতে পুলিশের ফোর্স গিয়েছে। তারা বোঝানোর চেষ্টা করছে পুলিশ ঠিক বরুণের খুনিকে গ্রেফতার করবে, বরুণের খুনি একজন বা যতজন হোক, তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না।

কিন্তু মানুষ মানতে চায় না। সুটিয়ার রক্ষাকর্তাকে আজকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেয়েরা সবাই আতঙ্কে কাঁপছে। এই বুঝি সেইসব কালো রাতগুলো আবার সুটিয়ায় ফেরত আসবে। আবার ওদের গণধর্ষণের শিকার হতে হবে।

চন্দনা কাঁদছে আর পাগলের মতো চিৎকার করছে— এবারে আর আমাদের কেউ বাঁচাতে আসবে না। শয়তানগুলোর জেল থেকে বেরোনোর সময় হয়েছে, ওরা তাই বরুণদাকে আমাদের মধ্যে থেকে সরিয়ে দিল।

বরুণের বডি সুটিয়ায় আনা হয়েছে। ওর মৃতদেহকে ঘিরে সারা সুটিয়ার যা কান্না, তাকে মুখে প্রকাশ করা যায় না। লোকজন ওর মৃতদেহের পাশে আছাড় খেয়ে পড়ে আউরি-চাউরি দিয়ে কাঁদছে— কেন, তুমি আমাদের ছেড়ে গেলে? কেন তুমি আমাদের সঙ্গে থাকলে না?

সুটিয়ার কোনো ঘরে আজ হাঁড়ি চড়েনি। সবার ঘরেই আজকে অরন্ধন। পরিবারের কেউ চলে গেলে কেউ কি আর খাওয়া-দাওয়া করতে পারে? সুটিয়ায় আজকে শোকের দিন। জুলাইয়ের বর্ষার আকাশের বৃষ্টিও লজ্জা পাচ্ছে সুটিয়াবাসীর চোখের জলের ধারার থেকে।

বরুণের জন্যে ফেলা সুটিয়াবাসীর চোখের জলে সারা সুটিয়ার মাটি ভেজা।

কত ছেলেমেয়ে ভাবছে বরুণকাকু আর নেই, তাদের পড়াশুনাও আর হবে না। কত লোক ভাবছে এবারে অসুবিধা হলে আর কার কাছে যাওয়া যাবে। কোনো উত্তর নেই কারো কাছে। চোখের জলে ভেজা মাটিতে রচনা হচ্ছে অন্য ইতিহাসের। এ ইতিহাস শোকের, এ ইতিহাস প্রতিবাদের।

পরের দিন বরুণের মৃতদেহ নিয়ে শেষযাত্রা হবে। সেদিন রাতে বরুণের মৃতদেহকে আগলে রাত জাগল সারা সুটিয়া। আজকের রাতটাই তো ওদের সবথেকে কাছের জনকে কাছে রাখা যাবে। তারপর তার নশ্বর দেহ বিলীন হয়ে যাবে। অস্তিত্ব থাকবে শুধু তার কাজের, তার প্রতিবাদের, তার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। এই রাতটা সুটিয়া কী করে ঘুমিয়ে কাটায়?

* * *

সুকুমাররা বরুণের মৃত্যুর খবরে খুব আনন্দিত হয়েছিল। ভেবেছিল এবারে ওদের মুক্তি পাওয়ার সময় এসে গিয়েছে, এই সময়ে বরুণকে সরিয়ে দিতে পারলে ওদের বিরুদ্ধে যেমন কেউ আর রুখে দাঁড়াতে পারবে না, তেমনি সুটিয়ার মানুষদেরও বেশ আতঙ্কে রাখা যাবে, এই ছিল ওদের ভাবনা। তাই ওরা উল্লাসিত হয়েছিল বরুণের মৃত্যুর খবরে।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ক্রমশ ঘোরালো হচ্ছে। মানুষজন বরুণের মৃত্যুতে আতঙ্কিত না হয়ে পথে নেমেছে, ওরা হত্যাকারীদের শাস্তি চায়। আর সন্দেহের তির বর্ডার পার্টির পান্ডা হিসাবে সুকুমারের ওপরেই পড়েছে। ওরা কী ভাবল আর কী হল!

সুকুমার পাঁচুকে ফোন করে— পাঁচু, এখন তো বরুণের মার্ডার নিয়ে খুব হট্টগোল হচ্ছে, আমরা ফেঁসে যাব না তো?

—না-না, ফাঁসবার কোনো চান্স নেই। যে গুলি করেছে তাকে কেউ চেনে না। আর ও ধরা না পড়লে আমাদের টিকিটিও কেউ ছুঁতে পারবে না।

—তুই দেখিস পাঁচু, আমরা যেন না ফাঁসি।

পাঁচু যতই সুকুমারকে আশ্বাস দিক, সুকুমার নিশ্চিত হতে পারে না। ওর মনে ভয় হয়, এখন ওর কাছে জীবন্ত বরুণের থেকে মৃত বরুণ আরও ভয়ংকর। ও প্রমাদ গোনে।

* * *

বরুণের মৃতদেহ প্রথমে কলকাতায় ওর কর্মস্থল ওর ইস্কুলে যাবে, তারপর নিমতলা শ্মশানে। সেখানে ওর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। সুটিয়া থেকে অনেক ট্রাক, ম্যাটাডোর হয়েছে। সুটিয়ার সব মানুষ বরুণের শেষযাত্রায় সঙ্গী হতে চায়।

প্রায় হাজার পঞ্চাশেক লোক নিয়ে বরুণের মৃতদেহের শেষযাত্রা শুরু হল। ম্যাটাডোর, ট্রাক, লরি থেকে ঘনঘন শ্লোগান উঠছে— শহিদ বরুণ বিশ্বাস তোমায় আমরা ভুলছি না, ভুলব না। প্রতিবাদীর মৃত্যু হয়, প্রতিবাদের মৃত্যু নেই। তোমার প্রতিবাদ বেঁচে থাকছে, থাকবে। বরুণ বিশ্বাসের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে শাস্তি দিতে হবে।

যশোর রোড দিয়ে যখন বরুণের শেষযাত্রা যাচ্ছে লোকে লোকারণ্য। হাবড়া, অশোকনগর, বিড়া, গুমায় অজস্র লোক। তারা বরুণকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে চায়। মাঝে মাঝেই গাড়ি থামাতে হচ্ছে। লোকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ছে।

এইভাবে দাঁড়াতে দাঁড়াতে কলকাতায় বরুণের ইস্কুলে যখন ছাত্রদের প্রিয় স্যারের মৃতদেহ ঢুকল, তখন সেখানেও তিলধারণের জায়গা নেই। ছাত্ররা খুব দুঃখ করছে। ওদের চোখেও জলের ধারা। ওরাও বলছে— স্যার খুব ভালো ছিলেন। কোনোদিন আমাদের মারতেন না, সবসময় আমাদের বুঝিয়ে বলতেন। স্যার, কেন আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন?

ছোটো ছোটো ছেলেরা পর্যন্ত বলছে— স্যার, আপনার আদর্শ আমরা কোনোদিন ভুলব না, আপনাকে আমরা সারাজীবন মনে রাখব।

বরুণের মৃতদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সারা কলকাতা থেকেই অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি এসেছেন।

তারা বরুণের এইভাবে লড়াই করতে করতে চলে যাওয়াকে সম্মান জানাতে চায়। বরুণের লড়াইকে প্রণাম জানাতে চায়।

খবরের কাগজ আর টিভিতে বরুণের মৃত্যুর পরে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, যে শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে বরুণের কথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়েছে।

বরুণের মৃত্যুতে শোক জানাতে কলকাতার রাস্তায় মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিলে হাঁটছে অসংখ্য মানুষ।

নিমতলাতেও অনেকে গিয়েছে। অনেক কান্নার মধ্যে দিয়ে, অনেক হাহাকারের মধ্যে দিয়ে, অনেক মানুষের বিলাপের মধ্যে দিয়ে বরুণের শেষকৃত্য সম্পন্ন হল।

* * *

পুলিশের ওপরতলার ভালোই চাপ। বরুণের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার না করতে পারলে এলাকায় অসন্তাোষ ছড়াবে।

অবশ্য পুলিশের কাজে খুব একটা কষ্ট হল না। প্রতিবাদী মঞ্চের সভাপতি পুলিশকে জানাল বরুণের শেষ কথা। সেইদিন শিয়ালদা থেকে ওর ডান পাশের সিটে বসে ওর হত্যাকারী গোবরডাঙা পর্যন্ত এসে বরুণকে গুলি করে।

বরুণের সঙ্গে যে সমস্ত টিচাররা ট্রেনে আসে, তাদের সঙ্গে কথা বলে আততায়ীর একটা ছবি লালবাজার থেকে শিল্পী নিয়ে আঁকানো হল। তারপর সেই ছবি সব থানায় ছড়িয়ে দেওয়া হল। কিন্তু থানায় যে সমস্ত অপরাধীদের ছবি রয়েছে, তাদের সঙ্গে এই ছবির কোনো মিল নেই। আর মিল থাকবে কী করে, এ অপরাধী তুহিন যে একেবারে আনকোরা।

পরের দিন কাগজে ওই ছবি ছাপিয়ে দিয়ে বলা হল এর সন্ধান জানা থাকলে অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় জানাতে।

আর ওতেই কাজ হল। তুহিনের সন্ধান পেতে পুলিশের আর দেরি হল না। আর কান টানলে মাথা আসে। তুহিনকে জেরা করে নীরজ, নীরজকে জেরা করে পাঁচু আর পাঁচুকে জেরা করে বরুণ খুনের মূল পরিকল্পনাকারী সুকুমারের নাম জানা গেল।

পুলিশ তৎপরতা তুঙ্গে ওঠায় অতনুকেও এতদিন বাদে ধরা গেল। ও কোচবিহারের এক জায়গায় নামগান করছিল। সুটিয়া গণধর্ষণকাণ্ডে আরও অনেকে পালিয়ে এদিক-ওদিক ছিল, তারাও আস্তে আস্তে ধরা পড়ল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%