মনজিৎ গাইন
বাংলাদেশ থেকে নতুন এপারে এসেছে অতনু। ও নাকি ওপারের বেশ নামি গুন্ডা ছিল। পুলিশের খাতায় ওর নামে নাকি অনেক অনেক অভিযোগ আছে বাংলাদেশে। তাই ও পালিয়ে এপারে চলে এসেছে। ওর কোন মাসি নাকি নাগবাড়ি এলাকায় থাকে। কিন্তু এই কীর্তির কথা তো আর চাপা থাকে না, সুকুমারের কাছেও পৌঁছে গিয়েছে। সুকুমার শুনেই বলে— এইবার অতনুকে আমার দলে নিয়ে নিলে সবাই বেশ আমাদের ভয় করবে।
অতনুর মাসির বাড়িতে গিয়ে ও হাঁক পাড়ে— ও মাসি, একটু বাইরে আসবে, তোমার সঙ্গে দরকার আছে।
অতনুর মাসি বাইরে বেরিয়ে দেখে সুকুমার। মাসি খুব অবাক হয়। সুকুমার তো আবার ওর বাড়ির চারপাশে ঘেঁসে না, আজকে আবার এল কী করতে? মাসি জিজ্ঞাসা করে— কী ব্যাপার সুকুমার, হঠাৎ কী মনে করে?
—এই এলাম তোমাদের খোঁজখবর নিতে।
—তা আগে তো কোনোদিন আসিসনি।
—আগে আসিনি বলে এখন কি আর আসতে নেই? আর তারপর শুনলাম তোমার বাড়িতে ওপার থেকে তোমার বোনপো এসেছে, তার সঙ্গে ভাবলাম একটু পরিচয় করে যাই।
—ও, এবারে বুঝেছি তুই কোন মতলবে আমার উঠোন মাড়িয়েছিস। কিন্তু আমার বোনপো তো এখন এখানে নেই।
—সে কোথায় এখন?
—ও এখন পাঁচপোতা বাজারে।
—কী করছে ওখানে ও?
—ওখানে নাকি এক অষ্টম-প্রহর নাম-সংকীর্তন হচ্ছে। ওখানে গিয়েছে।
—নাম-সংকীর্তনে গিয়েছে ও কী করতে, শুনতে?
—না-না, শুনতে যাবে কেন, ও ভালো কীর্তন করে, তাই তো আমাদের এই নাগবাড়ির কীর্তনের দল ওকে ওখানে গাওয়াতে নিয়ে গিয়েছে।
—তাহলে তোমার বোনপো যে দেখছি খুব বড়ো ভক্ত।
—সত্যি তাই, তুই এখন পাঁচপোতা বাজারে যা, দেখবি আমার বোনপো দু-হাত তুলে বিভোর হয়ে কৃষ্ণ নাম গাইছে। আমাকেও বারবার বলছিল মাসি চলো, আমার গান শুনে এসো।
—তুমি বোনপোর গান শুনতে গেলে না কেন?
—ধুস, সে আর আমি পারি? বয়স হয়েছে, আর সে পাঁচপোতা কী এখানে, কতটা হাঁটতে হবে ওখানে যেতে! অত ধকল যে আমার শরীর নিতে পারবে না।
—আচ্ছা, তোমার বোনপোর নাম অতনু তো?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, অতনু! তুই আমার বোনপোর সম্বন্ধে এত কিছু জানলি কী করে?
—জানব না? তোমার বাড়িতে এসেছে, তার ওপর এত বড়ো গুণী শিল্পী, খবর তো এমনিতেই চলে আসে।
সুকুমার অতনুর মাসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাবতে থাকে, তাহলে কী ও ভুল শুনল। এ অতনু যে আবার ভালো কীর্তন করে। কিন্তু ওর সোর্স তো এত ভুল খবর দেবে না। বাংলাদেশে নিশ্চয়ই ও বড়ো মস্তান। আচ্ছা, মাসিকে ধাপ্পা দেওয়ার জন্যে ও কীর্তনের গল্প শোনায়নি তো? কিন্তু মাসিকে ও ধাপ্পা দেবে কেন? ও যদি এখানে অন্য কেত্তন গাওয়ার চেষ্টা করে, সেটা সুকুমার কিছুতেই মেনে নেবে না। এই অঞ্চলের শের হচ্ছে ও, ওর এলাকায় অন্য কেউ দাদাগিরি করলে ও ঠিক বুঝে নেবে।
ও ঠিক করল পাঁচপোতা বাজারে গিয়ে দেখে আসবে কেসটা আসলে কী। ও রওনা দেয় পাঁচপোতা বাজারের দিকে। যেতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগল। পাঁচপোতা বাজারে সত্যিই নাম-সংকীর্তনের আসর বসেছে। দূর থেকেই তার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
ওখানে গিয়ে দেখে বেশ বড়ো করেই হচ্ছে নাম-সংকীর্তন। ও গিয়ে জিজ্ঞাসা করল— এখন পালাগান করছে কারা?
ভিড়ের মধ্যে থেকেই একজন বলল— নাগবাড়ির দল এখন পালাগান করছে।
তাহলে সত্যিই এখানে পালাগান চলছে। অতনু তাহলে এইটা ওর মাসিকে মিথ্যা বলেনি। সুকুমার দেখে একজন খুব বিভোর হয়ে গলা ছেড়ে নাম-সংকীর্তন করছে। সবাই ওর গান বিভোর হয়ে শুনছে। ওদের দলের নাম-সংকীর্তন শেষ হলে সুকুমার এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল— তোমাদের দলে যে বিভোর হয়ে গাইছিল তার নাম কী?
—ও, তুমি ওর নাম জানো না, আর জানবেই বা কী করে, ও তো সবে ওপার থেকে এপারে এসেছে।
—ওর নাম কি অতনু?
—হ্যাঁ, এই তো ঠিক বলেছ, কী গলা বলো তো ওর! এতদিন বাদে আমরা সত্যি একজন ভালো কৃষ্ণভক্ত পেয়েছি। কী, বলো ঠিক কি না?
সুকুমার সহমত পোষণ করে— হ্যাঁ, একেবারেই ঠিক, ওই লোকের গলা মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়।
—শুধু ওই লোকের জন্যেই আমাদের এখন সব জায়গায় নাম-সংকীর্তনে গান গাইবার ডাক আসে, আর এসব ব্যাপারে না করতে নেই। আমাদের তাই ক-দিন বেশ খাটনি হচ্ছে।
সুকুমার আর কথা বাড়ায় না। ওর স্থির বিশ্বাস, যে এত সুন্দর নাম-সংকীর্তন করতে পারে, সে কখনই মস্তান বদমাইশ হতে পারে না। ও নিশ্চিত যে ওকে অতনুর সম্বন্ধে অমন কথা বলেছে, সে ভুল বলেছে।
সুকুমার তার সঙ্গে দেখা করে— কী হল রবীন, তুমি আমায় কী খবর দিলে?
—কোন খবরটা বলো তো?
—ওই যে নাগবাড়ির অতনুর সম্বন্ধে?
—কেন, কী হল আবার, ও নাগবাড়িতে আসেনি?
—না, আসবে না কেন, ওপার থেকে এসে দিব্যি ওর মাসির ঘরে বসে রয়েছে।
—তাহলে তোমার অসুবিধাটা কোথায় হল, ও কি তোমার সঙ্গে দেখা করেনি?
—না, সে প্রশ্ন না, আমার মনে হয় তোমার ভুল হয়েছে।
—কী ভুল হল আমার?
—ওর সম্বন্ধে তুমি যেগুলো বলেছ সেগুলো মনে হয় আদৌ সত্যি নয়।
—কোনগুলো সত্যি নয়?
—ওই যে তুমি বলেছিলে না, ওই অতনু ওপারে বাংলাদেশের একজন দাগি আসামি। অনেক খুন-অপরাধের অভিযোগ আছে ওর নামে থানায়। ও পালিয়ে এসে এপারে মাসির বাড়িতে উঠেছে।
—হ্যাঁ, সব ঠিকই তো, তোমার অসুবিধা ঠিক কোথায় হচ্ছে আমি যে বুঝে উঠতে পারছি না। আচ্ছা, ওকে কি তুমি এইসব জিজ্ঞাসা করেছিলে, আর ও এসবের কোনো উত্তর দেয়নি?
—না, আমি ওকে এ-ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি।
—খুব অদ্ভুত ব্যাপার তো, তুমি ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করোনি, অথচ আমাকে বলছ আমি ওর সম্বন্ধে যা বলেছি সব মিথ্যা, ভুল। তুমি ঠিক কী আমাকে বলতে চাইছ একটু পরিষ্কার করে বলো তো, আমি আগে ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝে নিই।
—আমি দেখলাম ওই অতনু পাঁচপোতা বাজারে বিভোর হয়ে নামগান করছে। সে কী করে অত বড়ো অপরাধী হবে?
—অ্যায়, এখানেই সবাই ভুল করে। ওর নামগান যে আসলে ওর একটা মুখোশ, তা কেউ বুঝে উঠতে পারে না, আর সেই সুযোগেই ও নানা অপরাধ করে পার পেয়ে যায়।
—ধুস, তুমি যাই বলো, যে লোক ওরকম বিভোর হয়ে নামগান করে, তাকে গিয়ে আমি যদি খুন করার কথা বলি, তাহলে আমার নিজেরই পাপ হবে।
—ঠিক আছে, আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি, আমার ওর সঙ্গে একটু কথা বলে নিতে হবে।
সুকুমার ভাবে একটা লোককে ওর ধান্দায় ঠিক মতো পাওয়া গিয়েছিল বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি। আবার নতুন করে ছক সাজাতে হবে। রাজেন, বোঁচা, ভন্তু এদের দিয়ে সত্যিই এই ধান্দা চলবে না। যতসব ভিতুর ডিম। এখন ওর চাই ডাকাবুকো, চনমনে ছেলে। যাদের দিয়ে সহজেই পাবলিককে চমকে দেওয়া যাবে। পাবলিক যাদের একেবারে জুজুর মতো ভয় করবে, সেইরকম কিছু ছেলে ওর দল চালানোর জন্যে দরকার। রবীন যেভাবে অতনুর কথা বলেছিল, তাতে বেশ আনন্দই হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল পুরো উলটো ছেলেটা।
তারপর আবার কমলের কাছে থেকে টাকা নেওয়ার ব্যাপারটা রয়েছে। ও যদি ঠিক সময়ে টাকা না বার করে তাহলে একটা ভালো মতো হেস্তনেস্ত করতেই হবে। ও ঠিক করে নিয়েছে ওই ছেলেটাকে একেবারে টপকে দেবে। তা নাহলে অন্য কেউ আর ওর দলকে ভয় পাবে না। এটাকে মার্ডার করা হোক, তারপর দেখা যাবে কী হয়।
* * *
দু-দিন বাদে সুকুমারের বাড়িতে একজন হাঁক মারে— ও সুকুমারদা, বাড়ি আছ?
—কে এল এখন?
—আমি অতনু।
—কোন অতনু?
—ওই যে নাগবাড়ির অতনু। তুমি রবীনদার কাছে আমার খোঁজ নিচ্ছিলে, তাই রবীনদা বলল তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে যেতে।
সুকুমার ওকে দেখে ভাবল রবীনটার কী কোনো আক্কেল নেই, এই কৃষ্ণনাম করা বড়ো ভক্তকে পাঠিয়েছে তার মতো একজন মহাপাপীর বাড়িতে। ও একটু ইতস্তত করে। অতনু মনে হয় ব্যাপারটা ভালোই আন্দাজ করতে পেরেছে। ও নিজেই কথা পাড়ল— রবীনদা বলছিল তোমার দলে নাকি লোক লাগবে।
—হ্যাঁ, সে তো লাগবে, কিন্তু আমার আবার যে অন্যরকম কাজ, সে কি রবীন তোমায় কিছু বলেছে?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ, সবকিছুই রবীনদা আমায় বলেছে।
—কিন্তু, তুমি তো নামগান করো।
—সেটাও করি, আবার অন্য কাজও করি। ওপারে যশোরে আমার নিজের একটা বড়ো দল ছিল। এমন কোনো কাজ নেই, যেটা আমরা করতাম না।
—তা হঠাৎ করে এপারে চলে এলে কেন?
—একটা মার্ডার কেসে পুলিশ ওপারে এমন পিছনে লাগল, যে না এসে পারলাম না। ধরতে পারলেই আমাকে এমন কেস দিয়ে গারদের মধ্যে পুরত যে জামিনও পেতাম না। তাই ভাবলাম একটু মাসির বাড়িতে এসে ক-দিন কাটিয়ে যাই। তারপর ওপারে সবকিছু ঠান্ডা হলে না হয় যাওয়া যাবে।
—দেখো, আমি তোমার মতো ছেলেকেই খুঁজছিলাম যার এসব ব্যাপারে হাতটা একটু পাকা। কাঁচা হাতে আবার এসব কাজ হয় না।
—ঠিক আছে, আমি তোমার হয়েই কাজ করব। নেক্সট কাজ কী?
—সুটিয়ার একজন বাড়ি করছে, তার কাছে টাকা চাইছি, মালটা দিচ্ছে না।
—কবে যাবে ওখানে?
—পরশুদিন যাব ভাবছি।
—কী নাম ছেলেটার?
—কমল, একটা ইস্কুলের মাস্টার, আবার অনেক টাকার টিউশনিও করে। অথচ আমাদের টাকা দেওয়ার কথা বললে পকেট একদম ফাঁকা।
—দাঁড়াও, ওকে ভালো টাইট দিতে হবে। তাহলে তোমার সঙ্গে দেখা হবে সেই পরশুদিন রাতে।
—তোমার কাছে মেশিনপত্তর কিছু আছে তো?
—হ্যাঁ, সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি শুধু আমায় কাজ দিয়ে যাও, আর আমার ভাগের শেয়ারটা ঠিকঠাক দিয়ো, তাহলে দেখো আমাদের বর্ডার পার্টি আরামসে চলবে।
* * *
অতনু সুটিয়ায় গিয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে কমল ছেলেটা সম্বন্ধে। এমনকি ও যেখানে বাড়ি করছে, সেখানেও এক-দুবার চক্কর দিয়ে এসেছে। অ্যাকশন করতে গেলে আগে অ্যাকশনের জায়গাটা ভালো করে জেনেবুঝে না নিলে ফেঁসে যাওয়ার ভয় থাকে। ও দেখল কমলের বাড়িতে দুটো মিস্ত্রি আর কয়েকজন লেবার কাজ করছে।
ও ওখান থেকে সরে এল। তারপর মিস্ত্রিদের কাজ শেষ হলে ওরা যখন সবাই ফিরছে, তখন ছোকরা মতো একজন লেবারকে ধরল— অ্যাই, তুই এখানে কাজ করে ডেলি কত পাস?
—কেন, তোমাকে বলতে যাব কেন, তোমাকে আমি চিনিই না।
—না, একটা ভালো কাজ আছে তো তাই জন্যে বলছি।
—ও, কী কাজ?
—সেটা পরে বলব, কিন্তু ইনকাম ভালোই হবে। তুই আগে বল এখানে সারাদিন কত পাস?
—সে বোলো না, এখান থেকে খুব কম পাই।
—কত?
—সারাদিনে সত্তর টাকা আর দশটাকা টিফিন।
—শোন, তোকে একদিনের কাজের জন্যে পাঁচশো টাকা দেব, তুই করবি আমাদের কাজ?
—পাঁচশো টাকা একদিনে? হ্যাঁ-হ্যাঁ করব, না করলে তো পুরো লস। তা কী কাজ?
—সেটা এখন বলব না, কালকে সন্ধের পরে দেখা করিস বলে দেব।
—কোথায় দেখা করব?
—বড়ো রাস্তার ধারে যে চায়ের দোকান আছে ওখানে চলে আসিস। আর শোন, কাউকে যেন তোর এই কাজ নিয়ে বলিস না, তাহলে কিন্তু তোকে হঠিয়ে অন্য কেউ এই কাজ নিয়ে নেবে।
—না-না, আমি কাউকেই বলব না, এ কাজ কেউ সহজে হারাতে চায়। একদিনে পাঁচশো টাকা, ও আমি তো ভাবতেই পারছি না!
—এটা আর কী, পরে তোকে আরও বেশি দেব।
ছেলেটা ওই টাকার লোভে যেন এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গিয়েছে। ও চলে গেল। যাওয়ার আগে অতনু ওকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল— দেরি করিস না যেন, সন্ধের পরেই চলে আসিস ওখানে।
—ঠিক চলে আসব, তোমায় চিন্তা করতে হবে না।
অতনু যশোরে বড়ো একটা দল চালাত। ও জানে কীভাবে নতুন নতুন ছেলে দলে নিতে হয়। একটু কমবয়সি দেখেই নিতে হয়। এরা ভাববে কম, কাজ করবে বেশি। আর একটু বয়সি নিলে আবার তাদের হাজারো প্রশ্ন— কী কাজ, এত রাতে কেন, কোথায় গিয়ে কাজ করতে হবে, আরও অনেক। তার চাইতে এইসব কমবয়সি ছোকরাদের নিলে হ্যাপা সত্যি অনেক অনেক কম।
* * *
যেদিন যাওয়ার কথা কমলদের বাড়িতে, সেদিন বেলা থাকতে থাকতেই সুকুমার চলে এসেছে। অতনুর সঙ্গে ভালো করে সেটিংটা আগে করে নিতে হবে। তারপর দলের অন্যদের সঙ্গেও অতনুর বোঝাপড়াটা করিয়ে দিতে হবে। অতনুকেও খবর পাঠিয়ে দিয়েছে আগে আগে চলে আসার জন্যে। অন্যদেরও খবর দেওয়া রয়েছে। তবে ওরা একটু পরে আসবে। আগে অতনুর সঙ্গে ওর নিজের কথাবার্তাটা হয়ে যাওয়া দরকার।
অতনুও বেশি দেরি করল না। সুকুমার বলছে— বুঝলে অতনু, আমি কিন্তু ঠিক করেই এসেছি আজকে ওই কমল যদি টাকা না দেয়, গুলি চালিয়ে দেব।
—তারপর?
—তারপর আর কী ক-দিন একটু লুকিয়ে থাকতে হবে, সব ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার একই ফর্মে।
—কিন্তু পুলিশের ঝামেলা, গাইঘাটা থানায় তোমার কিছু ফিটিং আছে তো, বস?
—সে না থাকলে চলে? ওখানে আমার ফিটিং ভালোই। মাসে মাসে ভালো টাকা আমায় থানায় দিয়ে আসতে হয়।
—সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু টাকা না পেলে তুমি একজনকে মার্ডার করলে, তারপর তুমি পালালে। এতে কী হল, তুমি টাকাও পেলে না আবার ঝক্কিও খুব বাড়ল।
—তাহলে কী করব, টাকা না পেলে শুধু ফাউ আওয়াজ দিয়ে চলে আসব?
—না, ফাউ আওয়াজ দিলে আমাদের ধান্দাও ফাউ হয়ে যাবে। এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে ও সারাজীবন মনে রাখে আমাদের বর্ডার পার্টিকে টাকা না দিলে কী হয়।
—বাঃ, তুমি এসেই আমাদের দলটার একটা ভালো নাম দিয়ে দিয়েছ, বর্ডার পার্টি।
—হ্যাঁ, দুই দেশের লোক নিয়ে আমাদের দল তো। তাই আমাদের নাম বর্ডার পার্টি! বেশ ভালো হয়েছে নামটা বলো।
—শুধু বেশ ভালো নয়, খুব ভালো। তা তুমি বলছিলে ওদের এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে ও সারাজীবন মনে রাখে আর আতঙ্কে ভোগে, কী করবে ওদের, হাত-পা ভেঙে দেবে?
—দেখছি কী করা যায়, কিন্তু এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে শুধু ওরা নয়, আমাদের নাম শুনলেই ভয়ে সবাই টাকা বার করে দেয়। ও হ্যাঁ সুকুমারদা, আমি আর একটা ছেলেকে আসতে বলেছি আজকের কাজে।
—কে সে, কোথায় পেলে তাকে?
—ও ওই মাস্টারের বাড়িতেই মিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করছিল, ওকে নিলাম তার কারণ ওর কাছ থেকে ওদের বাড়ির অনেক কিছু জানা যেতে পারে।
—তুমি কি ওকে এইসব কাজের কথা বলেছ?
—না, এখনও বলিনি, তবে এলে বলব। ওকে শুধু টাকার লোভ দেখিয়ে দলে টেনেছি।
—ও কখন আসবে?
—এই আর কিছুক্ষণের মধ্যেই।
—তোমার সঙ্গে আমার দলের অন্য মেম্বারদেরও আলাপ হয়ে যাবে আর একটু পরেই।
—হ্যাঁ, আগে নিজেদের মধ্যে চেনাজানাটা ঠিক না থাকলে অ্যাকশনে গিয়ে ভালোই অসুবিধা হয়।
ওদের এই কথাবার্তার মধ্যে মিস্ত্রির জোগাড়ে ছেলেটা চলে আসে। অতনুকে দেখে গুটি গুটি পায়ে ওর দিকে এগিয়ে যায়। ওকে দেখেই অতনু বলে— এই তো এসে গিয়েছিস, তোর কথাই একে বলছিলাম।
তারপর সুকুমারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে— এই লোককে চিনে রাখ, এ লোকের নাম হচ্ছে সুকুমারদা। এর আন্ডারেই আমরা সবাই কাজ করব।
ওই ছেলেটা এগিয়ে গিয়ে সুকুমারের পায়ের ধুলো মাথায় নেয়। অতনুকেও নমস্কার করে। সুকুমার জিজ্ঞাসা করে— তোর নাম কী রে?
—মন্টু।
—তুই থাকিস কোথায়?
—মানিকহীরাতে।
—কী কাজ করতে হবে জানিস?
—না।
—শোন, আজকে রাতে তুই যে বাড়িতে কাজ করছিস, সে বাড়িতে আমরা যাব, তোকেও সঙ্গে যেতে হবে।
—কেন, আমরা যাব কেন?
—ওই বাড়ির কমলের আজকে আমাদের টাকা দেওয়ার কথা আছে, সেই টাকা নিতে আমরা যাব। অনেকদিন ধরে টাকাটা আমরা চাইছি, কিছুতেই দিতে চাইছে না। আজকে না দিলে ওকে একটা শিক্ষা দিতে হবে, আর সেইজন্যেই তোকে আমরা নিয়েছি।
—সে কী, তোমরা তাহলে জোর করে টাকা নিতে কমল মাস্টারের বাড়িতে যাবে, তোমরা তাহলে মস্তান, আমি তোমাদের সঙ্গে কখনই যাব না।
—শোন ওরকম করিস না, তোকে আমাদের পছন্দ হয়েছে। তুই আমাদের সঙ্গে থাক, তোকে আমরা ভালো পয়সাকড়ি দেব। শোন তোকে আমরা আজকের জন্যে দু-হাজার দেব।
—দু-হাজার কেন, দশ হাজার দিলেও আমি এই কাজ করব না।
অতনু দেখে ছেলেটা বিগড়ে যাচ্ছে। ও এবার কথা ধরে— সে থাকবি, না থাকবি সেটা তোর ওপর, আমরা কোনো জোর করব না। তুই শুধু বল ওই বাড়িতে কে কে আছে। তুই শুধু ওই কথাটা বললেই তোকে আমরা পাঁচশো টাকা দিয়ে ছেড়ে দেব।
মন্টু দেখে এতে তো কোনো বিপদ নেই। ও তাই বলে— কমল মাস্টার, ওর বাবা-মা আর মাস্টারের বোন।
অতনু মন্টুর কথা শুনে যেন উৎসাহ পায়— আচ্ছা, কমল মাস্টারের বোনের বয়স কত?
—ওই তো ইস্কুলে পড়ে, চোদ্দ-পনেরো হবে।
—কীরকম দেখতে রে ওর বোনটাকে?
এই প্রশ্নে মন্টুর মুখে অদ্ভুত এক ঝিলিক দেখা যায়— হেব্বি দেখতে, একেবারে যেন ডানাকাটা পরি।
অতনুর অভিজ্ঞ চোখ বুঝে নেয় ব্যাপারটা। ও এবার বলে— কী, লোভ হয় না মেয়েটাকে দেখে?
—সে আর হবে না, ওইরকম মাল! কিন্তু বেল পাকলে কাকের কী, আমি রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে, আমার দিকে কি আর ও ফিরে তাকায়?
—তুই ওর দিকে তাকাস নে?
—তাকাব না মানে, ওখানে কাজ করতে যাওয়ার ওইটাই তো সুখ। সবসময় ওই মেয়েটার ড্যাব-ড্যাবা মাইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি বলে তো আবার হেডমিস্ত্রি তাড়া দেয়।
—শোন, আজকে ওই মেয়েটাকে আমরা তোকে দেব যদি ওর দাদা টাকাটা না দেয়। তারপর তুই তোর ইচ্ছেমতো ওর ড্যাবা-ড্যাবা মাইগুলোকে চটকাস, তারপর তোর শাবলটারে দে ওরে ভালো করে চষে দিস। কী, যাবি তো?
মন্টু আর কোনো কথা বলে না। ও শুধু জিজ্ঞাসা করে— তারপর কোনো বিপদ হবে না তো?
—না-না, আমরা আছি কীজন্যে? থানা-পুলিশ সব আমাদের পকেটে পোরা। তুই শুধু খেয়াল রাখিস ডলন আর চষাটা যেন ঠিকঠাক হয়। তোর শরীরটা বেশ যুতের বলেই তোরে এ-কাজে নামাচ্ছি।
সুকুমার হাঁ করে অতনুর কথা শুনছে। ওর মাথায় এই ফন্দি তো কোনোদিন আগে আসেনি। কিন্তু এসব ঘটলে আবার অন্য গন্ডগোল হবে না তো? ও অতনুকে বলে— অতনু, এসব কী বলছ তুমি?
—ঠিকই বলছি, তুমি শুধু থানা-পুলিশটা খেয়াল রেখো, দেখো আমাদের বর্ডার পার্টিকে আমি কোথায় নিয়ে যাই। আর তোমার অন্য লোকজন কোথায়?
—ওই তো ওরা আসছে।
রাজেন, বোঁচা আর ভন্তুর সঙ্গে সুকুমার অতনু আর মন্টুর পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর কমলের বাড়ির দিকে ওরা রওনা হল।
কমলের বাড়ির সামনে এসে ওরা হাঁক দিচ্ছে— কমল-অ্যাই কমল, বাইরে আয়।
ওরা ভিতর থেকে বুঝতে পেরেছে সেই সুকুমারের দলবল এসেছে। ওরা দরজা খোলে না। মন্টুর নেশা পেয়ে গিয়েছে— কী হল, দরজা খুলতে কী হয়েছে? দরজা না খুললে আমরা দরজা ভেঙে ঢুকব।
তবুও ওরা ভিতর থেকে সাড়া দেয় না। অতনু ইশারা করে— মন্টু, ভাঙ দেখি দরজাটা।
মন্টু সপাটে দরজায় ধাক্কা মারে। দরজা হাট আলগা হয়ে যায়। কমল এগিয়ে আসে— কী হচ্ছে কী এটা? লোকের বাড়িতে দরজা ভেঙে ঢুকছ, খুব সাহস হয়েছে যে তোমাদের।
—তুই আগে টাকা বার কর, নাহলে খারাপ হবে।
—বললাম তো টাকা নেই আমার। আমি দেব কী করে?
—এখনও বলছি টাকা বার কর, নাহলে সর্বনাশ করে দেব তোদের।
—কোথায় টাকা, তোমরা এক্ষুনি এখান থেকে বেরিয়ে যাও।
—তাই নাকি টাকা দিবি না, তবে মজা দেখাচ্ছি তোদের। অ্যাই মন্টু, ভেতরে ঢোক, মেয়েটাকে নিয়ে আয়, তারপর এখানেই তুই তোর মজা শুরু কর।
ওরা এবার ভয়ানক ভয় পেয়েছে— না-না, এমনটা কোরো না, ও বাচ্চা মেয়ে, ওর এরকম ক্ষতি কোরো না।
কে শোনো কার কথা! মন্টু কণিকাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসে জন্তুর মতো ওর ওপর গিয়ে পড়ল। কণিকা সমানে পা ছুড়ছে। অতনু বলল— অ্যাই ভন্তু আর বোঁচা, তোরা ওই মাগির দু-পা চেপে ধর দু-দিক দিয়ে, মন্টু ওরে ভালো করে চষুক। অ্যাই মন্টু, তোর শাবল ঠিকঠাক চালা।
মন্টু সবার সামনে মেয়েটাকে ধর্ষণ করল। অতনু চ্যাঁচাচ্ছে— রাজেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী মজা দেখছিস, নে তোর প্যান্টটা খোল, পুরুষ মানুষ হয়েছে! তুইও চষ ওরে।
তারপর এক এক করে বোঁচা, ভন্তু, সুকুমার আর শেষকালে অতনু ক্রমান্বয়ে মেয়েটাকে ধর্ষণ করল। অতনু যখন মেয়েটারে চষছে ওর তখন কোনো জ্ঞান নেই। কমল আর ওর বাবা-মা সমানে চিৎকার করছে— এই শয়তানরা আমাদের কণিকার সব্বোনাশ করছে, তোমরা কেউ এসে ওদের আটকাও, মেয়েটা মরে যাবে।
অনেকেই এগিয়ে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু অতনু বন্দুক হাতে নিয়ে বলে— যে এগিয়ে আসবে তাদের সব ক-টাকে গুলি করে মারব, দ্যাখ আমাদের কথা না শুনলে কী হয়!
কণিকাকে ধর্ষণ করে উঠে অতনু বলে— শোন, এই ব্যাপার কেউ যেন না জানে, থানায় জানালে কিন্তু আরও সর্বনাশ হবে মনে রাখিস।
মা ছুটে গিয়ে কণিকার নগ্ন শরীরে একটা চাদর চাপিয়ে দেয়। মা ডাকে— কণিকা-কণিকা, মা আমার চোখ খোল, কথা বল।
কণিকা চোখ খোলে না। ওর মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সমানে কাঁদতে থাকে। ওর বাবা এই আঘাত সহ্য করতে পারে না, কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর সাড়া দেয় না।
এক রাতেই কমলের বাড়ি শ্মশান হয়ে যায়। বাবাকে চিতায় চড়াতে হয়। বোন চোখ খুললেও ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কাউকে চিনতে পারে না। কণিকা ধর্ষণের পরে বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই। সে এক মৃতা নারী মানসিকভাবে।
* * *
অনেকের পরামর্শে কমল থানায় ছুটেছিল। অফিসার শুনেই বলে— তাই, আপনার বোনকে রেপ করা হয়েছে, কবে ওকে রেপ করা হল?
—এই তো তিনদিন আগে।
—তখন আসেননি কেন?
—ওই ঘটনার পরে আমার বাবা হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যান, বোন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন কীভাবে আসব থানায়?
—তখন যখন আসেননি, এখন আর কিছু করার নেই। এত পরে আমরা ধর্ষণের অভিযোগ নিতে পারব না।
—সে কী বলছেন আপনি, এটা অন্যায়।
—ন্যায়-অন্যায় শেখাতে আসবেন না। যা বলছি তাই শুনুন, বাড়ি গিয়ে বোনের চিকিৎসা করান, তাতেই মঙ্গল হবে। যান, বাড়ি ফিরে যান। থানায় আসার জন্যে আপনাদের ওপর কী যে হামলা হবে, তাই নিয়ে বরং ভাবুন। যান বাড়ি যান।
কমল বুঝতে পেরেছে সুকুমাররা এই পুলিশদের পুরো কিনে নিয়েছে। এদের কাছে হাজার বার এলেও কিছু হবে না। ও চুপচাপ বাড়ি ফিরে আসে। অর্ধেক হওয়া বাড়িটা ওর সামনে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই বাড়িটাই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া। ও ওর চোখের সামনে থেকে এর অস্তিত্বকেই সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চায়। ও ছুটে গিয়ে বাড়ির ভিতর থেকে একটা হাতুড়ি নিয়ে আসে, তারপর পাগলের মতো চ্যাঁচাতে থাকে— এই শয়তান বাড়িটাই আমার বাবাকে খেল, বোনটাকে নষ্ট করল। আমি এই বাড়িটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলব, কোনো চিহ্ন রাখব না।
আশেপাশের সবাই ছুটে আসে। কিন্তু কেউ ওকে থামাতে পারে না। ও সমানে একই চিৎকার করে হাতুড়ি দিয়ে ওই বাড়ি ভাঙতে থাকে।
কমল মানসিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ হারায়। ওর মা ওকে বারবার ডাকে— কমল, তুই ঠিক হয়ে ওঠ, কণিকাও ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কারো ডাকেই কমল সাড়া দেয় না। সারাদিন শুধু ওই আধখানা হওয়া বাড়িটার দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।