মনজিৎ গাইন
শিবুর ছোটো ছেলের এখন আট বছর বয়স। শিবু ওর নাম দিয়েছে বরুণ। খুব দুরন্ত ও। শিবু চ্যাঁচায়— অ্যাই বরুণ, কোথায় গেলি রে তুই, শিগগির বাড়ি আয়! তোর মা তোর জন্যে অপেক্ষা করছে খাবার নিয়ে।
—মা কোথায়?
—কেন, বাড়িতে?
—না, মা এখানে থাকে না।
—তাহলে তোর মা কোথায় থাকে?
—ওই দেশে, অনেক দূরে।
—আর তোর বাবা?
—সেও থাকে মায়ের কাছে ওই দেশে।
—তাহলে আমি কে?
—তুমিও বাবা।
—তাই বল, তাহলে তোর দুটো বাবা-মা?
—হ্যাঁ, গো হ্যাঁ।
শিবু ছুটে গিয়ে বরুণকে ধরে। তারপর কোলে তুলে নিয়ে খুব চুমু খায় আর আদর করে— খুব দুষ্টু হয়েছিস তুই, দুটো বাবা-মা তোর, দেখিস একদিন তোকে আমি ওই দেশে তোর সেই বাবা-মায়ের কাছে রেখে আসব, তখন বুঝবি ঠ্যালা।
ছোট্ট বরুণের মুখে কোনো হেলদোল নেই, ও বরং আগ্রহ পেয়েছে— তুমি কবে নিয়ে যাবে আমাকে ওপারে আমার ওই বাবা-মায়ের কাছে?
শিবু হতাশ হয়। ও ভেবেছিল বরুণকে এইটা বলে বেশ ভয় দেখানো যাবে। কিন্তু কোথায় ভয় পাওয়া, উলটে ছেলেটা বরং আগ্রহ দেখাচ্ছে ওর আরেক বাবা-মার কাছে যাওয়ার জন্যে। ওর সামান্য মাথায় ছেলের এইসব কথার মাথামুণ্ডু কিছুই ঢোকে না। কেন যে ছেলেটা একটু জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বলে—সেই দেশে ওর আর একটা বাবা-মা আছে।
সেদিনকে মালাও বলছিল— জানো গো, বরুণ কীসব বলে।
—কী বলে?
—ওর নাকি বাংলাদেশে আর একটা বাবা-মা আছে। কী অদ্ভুত কথা বলো তো।
—সেটাই তো ভাবছি।
শিবু ভাবে এসব কী কথা। ওইটুকু ছেলে ওসব কেন বলবে। ওর কি পূর্বজন্মের কথা মনে আছে? তাহলে ছেলেটা কি জাতিস্মর?
শুধু ওরা নয়, পাঁচপোতার অনেকেই এখন এই ব্যাপারটা জানে। সবাই খুব আগ্রহ দেখায় শিবুর ছেলেকে নিয়ে। তারপর এইসব পূর্ববঙ্গীয় নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের কাছে পূর্বজন্মের কথা স্মরণ করতে পারে এমন ছেলে নির্ঘাত ভগবান না হয়ে যায় না। সবাই শিবু আর মালাকে বলে— তোদের এ ছেলে নিশ্চয়ই এক অবতার, একে তোরা খুব যত্নে রাখিস।
ছেলেটার বয়স যত বাড়ছে, এইসব কথা ও যেন আরও বাড়াচ্ছে। এই তো সেদিন মালা ওকে জিজ্ঞাসা করল— অ্যাই, ওদেশের কোথায় তোর বাড়ি রে?
—ফরিদপুরে।
—তুই নিশ্চয়ই বানিয়ে বানিয়ে সব বলছিস।
—না-না, আমি বানাইনি। আমার আগের বাবা-মা ফরিদপুরেই থাকে।
—ফরিদপুরে নিয়ে গেলে তুই ওদের ওখানে নিয়ে যেতে পারবি?
—পারব না কেন, অবশ্যই পারব।
শিবু চুপচাপ ছেলের সব কথা শোনে। মাঝে মাঝে ভাবে ছেলে কী সব সত্যি বলছে, নাকি ছেলেমানুষি করে বানিয়ে বলছে। ও একবার ভাবে ছেলেকে নিয়ে সত্যি একবার ওপারে যাবে। ফরিদপুরে যাবে। ওর পুরোনো গাঁয়ে একবার ঘুরে আসবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই ওর রমাকান্তর বউ আর মেয়ের কথা মনে পড়ে। ওরা যে ওকে অভিশাপ দিয়েছে যে ও কখনও সুখী হতে পারবে না। ও নিজেকে প্রশ্ন করে— ও কি সত্যি নিজে দোষী, না কি জয়বাংলার গান গাওয়াই দোষের? ও কোনো উত্তর পায় না।
তারপর ভাবে ওর মনে অনেক স্বপ্ন ছিল জয়বাংলায় একবার যাওয়ার। কিন্তু খানসেনারা যে সব শেষ করে দিয়েছে। এরমধ্যে আবার মুজিবকে রাজাকাররা পরিবারসহ গুলি করে মেরেছে। মেয়ে হাসিনা বিদেশে ছিল বলে বেঁচে গিয়েছে। তখন ওর মনে প্রশ্ন আসে, যে জয়বাংলা গড়ল, জাতির জনক হল, সেই বঙ্গবন্ধুকে কেন মরতে হল? শিবুর মনে মুজিবের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে— ভাইসব, তোমরা ভয় পেয়ো না, আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না.....
তারপরেই রমাকান্তর বউ, রত্না, মহাদেব সবার কথা মনে আসে। সবার স্মৃতি যেন মিছিল করে আসে ওর মনে। ও ভাবে তার বরুণ কি এইসব স্মৃতি ওর মায়ের গর্ভ থেকেই পেয়েছে? ওর মনে হাজারো প্রশ্ন এইভাবে আসে আর যায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।