মনজিৎ গাইন
সুকুমার, অতনু, মন্টু ওরাও ওদের ডেরায় বসেছে। সব খবরাখবর ওরাও রাখছে। প্রতিবাদী সংস্থার ওই মিটিঙে ওদের দু-চারজন ছিল। মন্টু বলছে— দাদা, বরুণ দলবল জুটিয়ে যা শুরু করেছে আমাদের কাজকর্ম এবার না গুটিয়ে ফেলতে হয়।
অতনু বলে— না, কাজকর্ম গুটোতে হবে না। ওদের একটা বড়ো শিক্ষা দিতে হবে, তাহলেই চুপ মেরে যাবে।
—কী শিক্ষা দেবে?
—ওদের একটাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেব।
—ব্যস, তাহলেই কেল্লা ফতে, একটা পাখি মারতে পারলে অন্য পাখিগুলো ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটে কোথায় যে চলে যাবে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাবে না। তাহলে ওই পালের গোদা বরুণকে কবে মারবে?
—না, বরুণকে মারব না।
—কী যে বলো দাদা, বরুণটাই সব। ওই সবাইকে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে খ্যাপাচ্ছে, ওটাকে সরালেই ওদের মেরুদণ্ডই একদম ভেঙে যাবে। ওদের সংস্থা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে।
—হ্যাঁ, তুই যেটা বলছিস সেটা আমিও ভেবেছিলাম, কিন্তু সুকুমারদা আমায় বোঝাল ওকে সরালে মারাত্মক হইচই হবে, তখন আমাদের কাজকর্ম করা আরও অসুবিধের হবে।
—তাহলে কাকে সরাবে?
—ওই যে সভাপতি হয়েছে বুড়ো রবি মল্লিক। ওটাকে মেরে দিলে অন্য সবাই ভয় পেয়ে পালাবে। বরুণ একা হয়ে যাবে। কোনো মেয়েই আর তখন আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে পুলিশে অভিযোগ জানাবে না।
—আর আমরা তখন সুটিয়ায় আবার কাজ করব, কেউ আমাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস করবে না। তাহলে কবে সরাবে বুড়োটাকে?
—এখন ওটার ওপরে ক-দিন নজর রাখ, তারপর সুযোগ বুঝে ওকে সরিয়ে দিতে হবে।
সেইমতো রবিবাবুর ওপরে বর্ডার গ্যাং নজর রাখা শুরু করল। মন্টু ওর পিছনে ছায়ার মতো লেগে আছে। বুড়ো এমনিতে বাড়ির থেকে বেরোয় না। সকালে বাজার করতে বেরোয় তখন একা থাকে, আর কোনো সময় ওকে একা দেখা যায় না। সন্ধেতে বরুণ আর সংস্থার অন্যান্যদের সঙ্গে থাকে রবিবাবু। সারাদিন প্রায় ও আর বেরোয়ই না। মন্টু রিপোর্টটা অতনু আর সুকুমারকে করল। সুকুমার শুনেই বলে— ওই বুড়োটারে বাজারে সবার সামনেই টেঁসে দিতে হবে, সবারই একটু শিক্ষা হবে তাহলে।
—কিন্তু সকালে বাজারে অনেক লোক থাকে, তাদের মধ্যে গুলি চালালে আমরা যদি ধরা পড়ে যাই।
—অত ভয় করলে হবে না। আমরা নিজেরাই যদি অত ভয় পাই, তাহলে লোককে ভয় দেখাব কী করে, ওই বাজারেই রবিবুড়োটাকে শেষ করতে হবে।
পরের দিন সকালে রবিবাবু বাজার করতে গিয়েছে। মাছ বাজার থেকে সবে বেরিয়েছে, গুড়ুম করে একটা আওয়াজ। রিভলভারের গুলিতে রবিবাবু লুটিয়ে পড়ল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আততায়ীরা গা ঢাকা দিল। মুহূর্তের মধ্যে সুটিয়া বাজার ফাঁকা। রবিবাবু পড়ে আছে মাটিতে। ওকে সাহায্য করার মতো লোক নেই। সবারই মনে ভয় রবিবাবুকে সাহায্য করতে গেলে হয়তো তাদেরও গুলি খেতে হতে পারে।
যে সুটিয়া বাজারে প্রতিবাদী সংস্থার মিটিংয়ে অনেক লোক জড়ো হয়েছিল বর্ডার গ্যাঙের বিরুদ্ধে লড়বে বলে, সেই সুটিয়া বাজারেই গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে প্রতিবাদী সংস্থার সভাপতি রবি মল্লিক।
চন্দ্র দৌড়োতে দৌড়োতে বরুণের কাছে গিয়েছে। বরুণ ওকে ওইভাবে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করল— কী ব্যাপার রে চন্দ্র, এইভাবে ছুটে আসছিস কেন?
—বরুণদা, রবিবাবুকে ওরা মেরে ফেলল।
—এ কী বলছিস তুই! কোথায় ঘটল এসব?
—সুটিয়া বাজারে রবিবাবুকে গুলি করেছে।
—ওকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে?
—না, ওখানে সেইভাবেই পড়ে আছে। কেউ প্রাণের ভয়ে রবিবাবুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না।
—ইস, ওরকমভাবে পড়ে থাকলে রবিবাবু যে মরে যাবে! চল, শিগগির চল।
বরুণ তাড়াতাড়ি বাইক বার করে স্টার্ট দিয়ে চন্দ্রকে তুলে নিয়ে বাজারের দিকে চলল। রবিবাবু তখনও সেইভাবে পড়ে আছে। বরুণ তাড়াতাড়ি রবিবাবুর নাড়ী দেখে বলল— এখনও বেঁচে আছে, তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। চন্দ্র, তুই একটা ভ্যান জোগাড় কর।
চন্দ্র এগিয়ে যায় ভ্যানওয়ালাদের বলতে। কিন্তু কেউ রাজি হচ্ছে না রবিবাবুকে হসপিটালে নিয়ে যেতে। চন্দ্র ছুটে গিয়ে বরুণকে বলল— বরুণদা, কোনো ভ্যানে রবিবাবুকে তোলা যাবে না।
—কেন, তোলা যাবে না কেন?
—কোনো ভ্যানওয়ালা রবিবাবুকে ভ্যানে করে হসপিটালে নিয়ে যেতে রাজি নয়।
—সে কী, তাহলে যে রবিবাবুকে কিছুতেই বাঁচানো যাবে না!
বরুণ নিজে ভ্যানওয়ালাদের কাছে ছুটে গেল— দাদারা, আপনারা কেউ যদি এনাকে ভ্যানে করে হসপিটালে নিয়ে না যান, এ কিন্তু বাঁচবে না।
ভ্যানওয়ালারা কিছুতেই রাজি নয়। ওদের ভয় রবিবাবুকে ভ্যানে তুললে বর্ডার গ্যাং বদলা নেবে, তখন কী হবে?
বরুণ বলতে বাধ্য হল— দেখুন, রবিবাবু কিন্তু নিজের জন্যে লড়াই করছিল না, আপনাদের সবার জন্যেই আমাদের এই লড়াই। আমাদের সুটিয়ার মা-বোনেদের ওই পশুদের হাত থেকে বাঁচাতেই আমাদের এই লড়াই। আর এই লড়াই বন্ধ করার জন্যেই ওরা রবিবাবুকে এইভাবে গুলি করল।
বরুণের এইসব কথায় ভ্যানওয়ালাদের সম্বিত ফিরল। তখন বেশ কয়েকজন ভ্যানওয়ালা রবিবাবুকে ভ্যানে করে হসপিটালে নিয়ে যেতে রাজি হল। বরুণ আর চন্দ্র মিলে তাড়াতাড়ি রবিবাবুকে ভ্যানে তুলে হসপিটালে নিয়ে গেল।
বরুণ ভাবছে রবিবাবু যদি মারা যায় তাহলে ওদের আন্দোলনে ভাটা পড়বে। মানুষজন ভয় পেয়ে আবার ঘরে ঢুকে যাবে। সেদিনকে সুটিয়া বাজারের মিটিঙে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে, তার সবটাই নষ্ট হবে। বর্ডার গ্যাং অবশ্য সেটাই চায়। মানুষকে ভয় দেখিয়ে ওরা এই আন্দোলনকে ভোঁতা করতে চায়। কিন্তু যেভাবে হোক রবিবাবুকে বাঁচাতে হবে।
গোবরডাঙা হসপিটালে ওরা পৌঁছে গিয়েছে। প্রথমে হসপিটাল বুলেট খাওয়া কেসে কিছুতেই রোগীকে ভরতি নিচ্ছিল না। কিন্তু বরুণ বলতে গেলে জোর করেই রোগীকে ভরতি করল। ডাক্তার কয়াল রবিবাবুকে দেখেই বললেন— খুব ক্রিটিকাল অবস্থায় আপনারা এনাকে এনেছেন, এক্ষুনি এনাকে নিয়ে আপনারা পিজি হসপিটালে চলে যান, আমি এখান থেকে রেফার করে দিচ্ছি।
—কিন্তু এতটা রাস্তা, জার্নির ধকল নিতে পারবে তো?
—এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই। খুব তাড়াতাড়ি একটা অপারেশন করে বুলেটটা শরীর থেকে বার করতে হবে, নাহলে ওনাকে বাঁচানো যাবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশনটা করে ফেলতে হবে। আর এই অপারেশন শুধু গোবরডাঙা কেন, বারাসাতের কোথাও হয় না। কলকাতার খুব কম জায়গাতেই সেই অপারেশন হয়, যার মধ্যে পিজি হসপিটাল আছে।
বরুণ বুঝতে পারল রবিবাবুকে বাঁচাতে গেলে এখন ডাক্তারের কথা মতো রবিবাবুকে কলকাতায় পিজিতে নিয়ে যেতে হবে। বরুণ চুপচাপ শুয়ে থাকা রবিবাবুকে দেখে। ক-দিন ধরে এই লোকটার মধ্যেই কী উৎসাহ ও দেখেছে। সবসময় রবিবাবু বলত— বরুণ, যেভাবে হোক আমাদের প্রতিবাদী সংস্থাকে জোর করে গড়ে তুলতে হবে। মেয়েদের ওপরে যারা অত্যাচার করে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
বরুণকে বারবার রবিবাবু বলত— আমার বয়স হয়েছে, বিপদের সব জায়গায় আমি যাব। আমার এমনিতে দিন ফুরিয়ে এসেছে। ওরা যদি আক্রমণ করে আমাকেই করুক। তোমাকে আরও বেশিদিন থাকতে হবে সুটিয়াতে। সুটিয়ার মায়েদের-বোনেদের তোমাকে রক্ষা করতে হবে।
এইসব কথা বরুণের যত মনে আসে, ততই ওর মনটা ভারী হয়ে যায়। দু-চোখে জলের ধারা নামে।
ও তাড়াতাড়ি ওর বন্ধু সুমিতকে ফোন করে— হ্যালো সুমিত, তোর গাড়িটা কি এখন ভাড়ায় গেছে?
—না, বাড়িতেই আছে।
—তুই তাহলে শিগগির গাড়িটা নিয়ে চলে আয়, কলকাতায় পিজি হসপিটালে যেতে হবে।
—সে কী, পিজি হসপিটালে কেন, কার কী হল?
—আর বলিস না, আমাদের প্রতিবাদী সংস্থার সভাপতি রবিবাবুকে কারা গুলি করেছে।
—তাহলে তো মারাত্মক ব্যাপার, এখন তোরা কোথায় আছিস?
—আমরা গোবরডাঙা হসপিটালে আছি। তুই গাড়ি নিয়ে সোজা এখানে চলে আয়।
সুমিত তাড়াতাড়ি গাড়ি বার করে গোবরডাঙায় চলে যায়। সুমিতের গাড়িতে বরুণের দলের আরও দুজনকে তুলে নিয়েছে— সঞ্জিত আর মানিক। এইবার গোবরডাঙা থেকে রবিবাবুকে তুলে নিয়ে বরুণরা রওনা দিল পিজির উদ্দেশ্যে।
সঞ্জিত বলল— বরুণ, আমরা কিন্তু সাপের লেজে পা দিয়েছি, তাই ছোবল খেলাম।
—ধুস, বাদ দে তো, ওইসব বর্ডার গ্যাং না কী, ওরা শুধু আমাদের মিটিং দেখে ভয় পেয়ে এই কাণ্ড করল। ওরা নিজেরা ভয় পেয়ে এখন আমাদের ভয় দেখাতে চায়। কিন্তু ওদের এই কান্ডে আমি অন্তত ভয় পাই না। কিন্তু আমি একটা অন্য কথা ভাবছি।
— কী কথা?
—ওরা আমাকে টার্গেট না করে রবিবাবুর মতো একটা বৃদ্ধ লোককে কেন টার্গেট করল, নিশ্চয়ই এর মধ্যে ওদের আলাদা কোনো উদ্দেশ্য আছে।
—কী উদ্দেশ্য, তুই কিছু বুঝতে পারছিস?
—না, এখনও পর্যন্ত তো পাইনি।
—তবে আমার মনে হয় বরুণ, তুই নিজেও একটু সাবধানে থাকিস। তোর ওপরেও যেকোনো সময় ওরা অ্যাটাক করতে পারে।
—সেসব পরে হবে, আগে রবিবাবুকে তো বাঁচাই। এই লোকটা মরে গেলে ওদের একটা বড়ো উদ্দেশ্য সফল হবে।
—কী উদ্দেশ্য?
—সুটিয়ার সবাইকে ভয় দেখানো। ওদের বিরুদ্ধে যারা লড়তে চাইবে, তাদের হাল ওরা এরকম করবে। সবাই যাতে আমাদের প্রতিবাদী সংস্থা থেকে দূরে থাকে, তাই এই গুলি চালানো। কিন্তু ওদের উদ্দেশ্য সফল হবে না, যে করে হোক রবিবাবুকে আমরা বাঁচাবই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।