মনজিৎ গাইন
বরুণের চোখ জলে ভিজে যায় সঞ্চিতার খবরে। একটা মেয়ে চাকরির জন্যে কীভাবে এই শয়তানটার শিকার হল। এদিকে বরুণের মতো অসংখ্য নিঃসহায় ছেলের সামনে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার খবর। বারবার সরকারি বিজ্ঞাপনটার দিকে ওর নজর চলে যায়— চাকরি হবে মেধায়। ও জানে ওর মধ্যে সামান্য হলেও মেধা আছে, তার সঙ্গে একটু খাটলে ও নিশ্চয়ই স্কুল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে।
বরুণ মন দিয়ে পড়াশুনো করে। ও একেবারে পাখির চোখ করে ফেলেছে এসএসসি পরীক্ষা। যে করে হোক ওকে ওতে পাশ করতে হবেই। আবার পড়তে পড়তে ওর মনে ওই মেয়েটার কথা মনে আসে, যে একটা চাকরি পেতে গিয়ে স্কুলের সেক্রেটারির দ্বারা বারবার ধর্ষিতা হয়ে শেষপর্যন্ত মৃত্যুর পথ বেছে নেয়। তার এই আত্মহনন বরুণদের মতো হাজার ছেলের মনে এক সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।
কিছুদিনের মধ্যেই স্কুল সার্ভিসের বিজ্ঞাপন বেরোল। বরুণ লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যাঙ্ক থেকে ফর্ম তুলে মনোযোগ দিয়ে ফর্ম ফিল-আপ করল। এইবার বরুণকে আরও মনোযোগী হতে হবে। ও সবসময় বই হাতে। ওর মা চ্যাঁচায়— অ্যাই বরুণ, খেয়ে নে, কত বেলা হল বল তো?
—দাঁড়াও মা, আর একটুখানি, এই পাতাটা পড়ে নেই।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায় বরুণ তবুও পড়া ছেড়ে উঠতে চায় না। ওর ছোটো বোন সুলতা পর্যন্ত ওকে তাড়া দেয়— অ্যাই দাদা, চান করে আয়, মা তোর জন্যে এখনও পর্যন্ত কিছু খায়নি।
বরুণ জিভ কাটে। ওর মা এখনও পর্যন্ত যে ওর জন্যেই অভুক্ত রয়েছে, এটা মনে হতে ও মনে খুব ব্যথা পায়। ও ছুটে গিয়ে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে এসে হাঁক মারে— কই মা, খাবার কই, তাড়াতাড়ি খেতে দাও, আমার খুব খিদে পেয়েছে।
—দ্যাখ দিকিনি, তোকে আমি কতক্ষণ ধরে বলছি, এত বেলা করলে চলে?
—তুমি এখনও খাওনি কেন?
—পেটের ছেলে খায়নি, আমি কী করে খাব বল?
—ধুস, আমি তো পড়ছিলাম, আর তোমার বয়স হচ্ছে, এত অবেলায় খেলে দেখো তোমার যেন অগুণ না হয়।
—না-না, আমার অগুণ হবে না। কত চিন্তা আমার জন্যে! তুই ঠিক সময়ে খেয়ে নিস না কেন, তোর জন্যেই তো এত দেরি।
বরুণকে যতই বলা হোক, ও কোনোদিকে কান দেয় না, যেমন দিনের বেলা তেমনি রাতের বেলা, একটা টেমি জ্বালিয়ে অনেকক্ষণ পর্যন্ত পড়ে। মা চ্যাঁচায়— ওরে বরুণ, ঘুমিয়ে পড়, এত অল্প আলোয় এতক্ষণ ধরে পড়িস না।
—আর একটুখানি মা।
অনেক রাতে বরুণ ঘুমোতে যায়। প্রতিদিন ওর এই অভ্যাস চলে। পরীক্ষার দিনও কাছে চলে এসেছে। ওর পরীক্ষাটা ভালোই হয়। এবারে অপেক্ষা কবে রেজাল্ট বেরোবে।
এরমধ্যে ও আবার ডব্লু বি সি এস পরীক্ষাটাও দিল। তবে ওর একান্ত ইচ্ছা এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে ও শিক্ষক হবে। অন্য চাকরির পরীক্ষাগুলো শুধু দিতে হয় তাই।
কাগজে দিয়েছে— স্কুল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে আগামীকাল। বরুণ বাড়িতে সবাইকে বলে— কালকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের রেজাল্ট বেরোবে।
ওর বাবা শিবু ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে— তা বাপ, তুই পারবি তো এই পরীক্ষায় পাশ করতে?
—হ্যাঁ বাবা, আমি অবশ্যই পারব।
বরুণের কথাই সত্যি হল। স্কুল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষায় ও পাশ করে গেল। ওর খুব আনন্দ। বাড়িতেও সবাই খুব খুশি। বরুণ তবুও সাবধান— এখনও ইন্টারভিউ বাকি, ওটাতে দেখি কী হয়।
সবাই বলল— ওতে তুই নিশ্চয়ই পাশ করবি। তোকে ইন্টারভিউতে আটকাবে এমন সাধ্য কারো আছে?
বরুণ চাকরিটা পেয়েই যায়। তবে ও চাকরিটা পেল কলকাতার একটা ইস্কুলে। ইস্কুলটা শিয়ালদার একটা বড়ো ইস্কুল। বরুণ মনেপ্রাণে চেয়েছিল ওর চাকরিটা হোক গ্রামের কোনো ইস্কুলে। গ্রাম ওর মায়ের মতো। গ্রামের মেঠো জমির গন্ধ মাখা ছেলে ও। সেই তাকে যেতে হবে কলকাতার বুকে চাকরি করতে। তবুও প্রথম চাকরি বলে কথা। ওর মনের দ্বিধা ও ঝেড়ে ফেলে।
বরুণ এখন গোবরডাঙা স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে প্রতিদিন শিয়ালদায় যায়। স্টেশন থেকে হাঁটা দূরত্বে ইস্কুল। বরুণের অন্য দুই দাদাও চাকরি পেয়ে গিয়েছে। এক দাদা চলে গিয়েছে কলকাতায়, আর এক দাদা বসিরহাটে।
বড়ো দাদা হরেন নিজে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনেছে, ও ভাইকে জোর দেয়—বরুণ, তুই এখানে একটা ফ্ল্যাট এই সময়ে নিয়ে রাখ। ক্রমশ দাম বাড়ছে। আর কিছুদিন বাদে কিন্তু তুই নাগাল পাবি না। তারপর চাকরিতে তোর এখন প্রথম দিক, সংসারে চাপও নেই, এখন একটা ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে ফ্ল্যাট নিয়ে নে।
বরুণ দাদার কথার কোনো উত্তর দেয় না। একেবারে চুপ সে। হরেন আবার ভাইকে তাগাদা দেয়— কী হল, কিছু বলছিস না কেন, তোর কি অন্য কোনো চিন্তাভাবনা আছে?
—হ্যাঁ দাদা, আমি গ্রামেই থাকতে চাই, গ্রাম আমার খুব ভালো লাগে। তারপর চাকরি পেয়ে সবাই সুটিয়া ছাড়লে হবে কী করে?
—কিন্তু তোর প্রতিদিন এতটা যাতায়াত করতে ভালো কষ্ট হবে। এখন বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারবি।
—না দাদা, কোনো কষ্ট হবে না। এই দ্যাখ, আমি গোবরডাঙা থেকে শিয়ালদা একটা মান্থলি কেটে নিয়েছি। আর আসার সময়ে ট্রেনে উঠে পড়তে পারলেই হল, কত লোক, সবার সঙ্গে গল্প করতে করতে দিব্যি চলাফেরা করা যায়।
হরেন বুঝতে পারে ভাই অবুঝ। ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ হবে না। এমনিতেই ছোটোবেলা থেকে বেশ গোঁয়ার ও। একবার যেটার জেদ ধরবে সেটার থেকে নড়ানো একেবারে দুঃসাধ্য। কিন্তু ও বুঝল না কলকাতা ও তার আশেপাশে কী হারে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে। এখন যাও বা নেওয়া যায়, কয়েক বছর বাদে এই দামে ফ্ল্যাট নেওয়া একেবার স্বপ্ন মনে হবে।
হরেন ওর বাবা-মাকে জানিয়ে দেয়— বরুণ গ্রামেই থাকতে চায়, ও কলকাতায় আলাদা কোনো ব্যবস্থা করবে না।
এটা শুনে মালা বেশ হতাশ— কী বলে কী বরুণ, ও কবে জানবে গ্রামে থাকতে কত অসুবিধা। তারপর এই সুটিয়ায় সবসময় বিপদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের বর্ডার এত কাছে, এখানে কেউ থাকে?
যতই মালা হতাশ হোক, শিবুর বেশ আনন্দ হচ্ছে বরুণের এই কথায়। একবার ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রণা ও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। কিন্তু সেবার ছিন্নমূল হতে হয়েছিল এক ভয়ংকর অত্যাচারের শিকার হয়ে। কিন্তু এখন তো সুটিয়ায় সেই সমস্যা নেই। বরং এখানে যেন নতুন এক শেকড় নামাতে পেরেছে সে। তারপর বৃক্ষ হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে। সুটিয়ায় শিবু এখন এক পরিপূর্ণ বৃক্ষ, তবু তার হতাশা অন্য দুই ছেলে হরেন আর রমেন চাকরি পেয়েই শেকড় ছেঁড়া। কিন্তু ছোটো ছেলে তরুণ শেকড় ছেঁড়া হতে কিছুতেই চাইবে না।
বরুণ মায়ের ডাক শুনে হন্তদন্ত হয়ে হাজির। মা ওকে কাছে ডেকে মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে— তুই এত অবাধ্য কেন, বরুণ?
—কই, আমি কী অবাধ্যতা করলাম?
—ওই যে কলকাতায় ফ্ল্যাট নেওয়ার কথা।
—না, আমি কলকাতায় ফ্ল্যাট নেব না।
—কেন, শুধু ওইসব তোর বন্ধুদের নিয়ে হুল্লোড় করবি তাই?
—না মা, এই গ্রাম আমার খুব ভালো লাগে। তুমি জানো না আমি স্বপ্ন দেখি আমার আগেও আরেকটা বাড়ি ছিল, সেই বাড়ি ছেড়ে আমাকে চলে আসতে হয়, আমি আর বাড়িছাড়া হতে চাই না।
শিবুও ছোটোছেলের মতকে সমর্থন জানায়— আর কী হবে বলো তো কলকাতায় গিয়ে, ওখানে ওইসব বাক্স-বাক্স বাড়ি, অত যানবাহন, গ্রামের লোকেদের কী ওসব ভালো লাগে! তারচেয়ে দেখো আমাদের এই সুটিয়ায় কী নেই বলো তো, চারিদিক জোড়া ধানখেত, দূরে কত গাছের সারি, পাখিরা কী সুন্দর ডাকছে!
যাবার কথায় বরুণও বলছে— এখানে থাকলে অনেক কিছু পাই, আমি প্রতিদিন কলকাতায় যাই, ওখান থেকে পালাতে পারলে বেঁচে যাই। আর দাদা বলছে কিনা ওখানে ফ্ল্যাট কিনতে, অসম্ভব ব্যাপার। ওই বাক্স বাড়িতে আমি কোনোমতেই থাকতে পারব না। আমি এইরকম ভাবে মুক্ত থাকতে চাই।
ছেলের ওপর মা আর চাপ বাড়ায় না। ছেলে যেরকম ভাবে থাকতে চায় থাকুক। এই সুটিয়ার মানুষদের নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন যেভাবে হোক ও তা পূর্ণ করবেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।