ষড়বিংশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

সুটিয়ার মানুষ কিন্তু চুপ করে বসে নেই। বরুণ গুলি খাওয়া অবস্থায় যখন মৃত্যুর মুখোমুখি তখনও বলছিল— অনেক কাজ বাকি থেকে গেল।

সুটিয়াবাসীরা এখন একজোট— বরুণের বাকি থাকা কাজ ওরা নিজেরাই শেষ করবে। যে সমস্ত গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের বরুণ পড়াশুনোর খরচ জোগাত, তাদের সবাইকেই ওরা সাহায্য করবে। বরুণ যেভাবে রক্তদান শিবির চালাত, কম্বল বিতরণ করত সবকিছুই তারা করবে। দুঃস্থ মানুষদের সেবা করবে।

তার জন্যে দরকার ফান্ডের। দরকার অনেক অনেক টাকার। টাকা তুলতে হবে। বরুণের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, বরুণের প্রতিবাদকে মর্যাদা দিতে হবে।

বরুণ বিশ্বাস স্মৃতিরক্ষা ফান্ডের জন্যে টাকা তোলা শুরু হয়েছে। বরুণের নামে মানুষ টাকা দেওয়ার আগে দু-বার ভাবছেও না। সবাই সাধ্যের বাইরে গিয়েও এই তহবিলে টাকা দান করছে। বরুণ ওদের ঘরের ছেলে, ওদের গর্ব, তার নামে টাকা তোলা হচ্ছে, মানুষ না দিয়ে পারে?

ফান্ডের টাকা দিয়ে বরুণের বাকি থাকা কাজ শেষ করতে সুটিয়ার মানুষ পথে নেমে পড়েছে।

অবশ্য শুধু সুটিয়া নয়, কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবারই মুখে শুধু একটাই কথা— অমর শহিদ বরুণ বিশ্বাস, তোমায় আমরা ভুলছি না, ভুলব না। শহিদ বরুণ বিশ্বাস অমর রহে!

* * *

চারঘাটের ঠাকুরবাড়িতে পরের রোববার কেমন যেন একটা বিষণ্ণতার ছাপ। অন্যদিন সবাই যেমন মনের আনন্দে সনাতন ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে যায়, আজকে সেসব যেন কিছুই নেই। পুরো পরিবেশই বিষাদমাখা।

গত রোববারেও বরুণ এখানে এসেছিল। বরুণকে এখানে সবাই মাস্টারদা বলে। ও ওর সুটিয়ার দলবল নিয়ে সনাতন ঠাকুরের কাছে যেত।

সনাতন ঠাকুর বরুণের কাছে ছিল রামকৃষ্ণের মতো। বরুণ যা কিছু করত সবকিছু এই সনাতন ঠাকুরের আজ্ঞা নিয়ে। সনাতন ঠাকুর তাঁর অন্য ভক্তদের মতো বরুণকেও বলতেন— আমার জন্যে কিছু করতে হবে না, মানুষের জন্যে কাজ কর, তাহলেই আমাকে সেবা করা হবে। কত মানুষ অসহায়, তাদের পাশে দাঁড়া, তাদের মধ্যেই আমি আছি।

রামকৃষ্ণ যেভাবে বিবেকানন্দকে উদ্বুদ্ধ করতেন, সনাতন ঠাকুরও সেইভাবে বরুণকে বিভিন্ন জনহিতকর কাজে উৎসাহিত করতেন।

বরুণের তো আবার এই জনহিতকর কাজে আলাদা উৎসাহ। প্রতি রোববার বরুণ ওখানে গিয়ে মানুষের জন্যে বিভিন্ন কাজে আরও নিজেকে নিয়োজিত করত।

সনাতন ঠাকুর অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে ভক্তদের বিশ্বাস। অনেক অসাধ্য কাজ তিনি তুড়ি মেরে করে দিতে পারেন। বড়ো বড়ো ডাক্তারদের জবাব দিয়ে দেওয়া দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষকে তিনি তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে সুস্থ করে তুলতে পারেন। ভবিষ্যতে কার কখন কী বিপদ আসছে, তা তিনি বলে দিয়ে মানুষকে সাবধান করে দিতে পারেন। অথচ বরুণের বেলায় তিনি কিছু বললেন না এটা অনেকেরই অদ্ভুত লেগেছে। তাহলে সনাতন ঠাকুর কী বরুণের ব্যাপারে কিছু বুঝে উঠতে পারেননি, না কি অন্য কিছু হল?

সুটিয়ার অমল সনাতন ঠাকুরকে সরাসরি প্রশ্ন করল— ঠাকুর, বরুণ যে চলে গেল।

—কী করবি বল, যে যাওয়ার সে তো যাবেই।

—কিন্তু আপনি বুঝতে পারেননি ও হঠাৎ করে এইভাবে চলে যাবে?

সনাতন ঠাকুর কোনো উত্তর দেন না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই প্রশ্নের উত্তর উনি কী দেবেন, উনি কী বলবেন যে উনি জানতেন যে বরুণ এইভাবে চলে যাবে। এইভাবে চলে গিয়েই সে অমর হবে। সনাতন ঠাকুর দ্বিধাগ্রস্ত। অমলের সঙ্গে আরও অনেকেরও যেন একই জিজ্ঞাসা— ঠাকুর, আপনি কি জানতেন বরুণের চলে যাওয়া?

সনাতন ঠাকুর এবার মুখ খোলেন— হ্যাঁ, আমি জানতাম বরুণ চলে যাবে।

—তাহলে আপনি ওকে জানাননি কেন ঠাকুর, ও সাবধান হতে পারত।

—তা হয় না, মানুষ কখনও অমর হয় না। তাকে একদিন না একদিন চলে যেতেই হয়। আর বরুণ যে সাধারণ ছেলে ছিল না, তা তোরা প্রত্যেকেই জানিস। ওকে বললে ও হয়তো জীবনে বাঁচত, কিন্তু এইভাবে সুটিয়ার মানুষকে বাঁচিয়ে নিজে অমর হতে পারত না।

ভক্তরা ঠাকুরের কথা ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। এ ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সবারই কথা— আপনার এ-কথা যে আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম না।

দ্যাখ, সুকুমাররা তো ক-দিন বাদে মুক্তি পেত জেল থেকে। তারপর আবার তারা মেয়েদের ধর্ষণ করা শুরু করত। বরুণ একা ওদের কিছুতেই আটকাতে পারত না কারণ বেঁচে থাকলে বরুণ হয়ে থাকত সাধারণ এক মানুষ, কিন্তু আজ ও মারা যাওয়ার পরে সবার চোখে মহামানুষ, তাই ও মারা যাওয়াতে শুধু সুটিয়া নয় সারা দেশের মানুষ আজকে ওর কথা বলছে। সুকুমারের মতো নারী ধর্ষণকারীদের ফাঁসি চাইছে। আজকে সুটিয়ার আর কোনো ক্ষতি ওই ওরা করতে পারবে না। আমি কী করে বল বরুণকে অমর হওয়া থেকে আটকে সুটিয়ার মানুষকে আবার বিপদের মুখে ঠেলে দিতাম!

সবাই এখন ঠাকুরের কথার অর্থ বুঝতে পারে। বরুণের স্মৃতিতে এখন সবার চোখেই জল। এই তো গত রোববারেও বরুণ হাসি হাসি মুখ করে সবার সঙ্গে দেখা করেছে। সবার খোঁজখবর নিয়েছে। গরিব ছেলেমেয়েদের ইস্কুলে পড়িয়েছে, আর আজকে সে কোথায়?

ঠাকুর ভক্তদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছেন। উনি বললেন— সবসময় মনে রাখবি মানুষ অমর হয় না, অমর হয় তার কীর্তি, তার কাজ। এই পৃথিবীর এটাই বিধান। এর থেকে কোনো নড়চড় হওয়ার নেই। কেউ আজ যাবে, তো কেউ কাল। সবাইকে একদিন না একদিন যেতেই হবে, কেউ কাউকে কোনোদিন আটকাতে পারবে না, কেউ না....

এই কথা বলতে বলতে ঠাকুর আস্তে আস্তে ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। ওঁনার মনে কী কম দুঃখ বরুণ এইভাবে চলে যাওয়াতে। আজকে সংসারের সব মোহ ত্যাগ করে উনি এইভাবে সনাতন ঠাকুর হয়েছেন। সংসারের কোনো আনন্দ-দুঃখ ওঁনাকে স্পর্শ করার কথা নয়। তবুও উনিও তো রক্তমাংসের মানুষ। ধ্যানমগ্ন অবস্থাতে উনি ঈশ্বরের কথা স্মরণ করতে গিয়ে বারবার বরুণের মুখ দেখছেন। তাহলে উনি নিজে কি সংসারের মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন, না কি বরুণ ঈশ্বর হয়ে গিয়েছে? উনি আর ভাবতে পারেন না, ভক্তরা দেখে ঠাকুরের ধ্যানমগ্ন অবস্থাতে দু-চোখের কষ বেয়ে জল গড়াচ্ছে, চোখের জল!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%