নবম অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

এদিকে বরুণ ইস্কুলে ঢোকার পর থেকেই ওর বাড়িতে মেয়ের বাবারা আসছে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে। বরুণের বাবা-মা বারবার ওকে বলছে — বরুণ, এবারে তুই বিয়েটা করে ফ্যাল।

বরুণ অবশ্য কিছুতেই রাজি নয়। ও বলে— দাঁড়াও না, সবে তো চাকরিতে ঢুকেছি, এখন ওসব নিয়ে ভাবারও আমার সময় নেই।

—কেন, তোর এত ব্যস্ততা কীসের?

—কত কাজ বাকি আছে, সেগুলোকে আগে করতে হবে, তারপর তো নিজের জন্যে সময়।

—সে তুই যা ভালো বুঝিস কর।

বরুণ চলে গেলে শিবু মালাকে প্রশ্ন করে— আচ্ছা, বরুণ বিয়েতে রাজি হচ্ছে না কেন বলো তো?

—সে আমি কী করে জানব।

—তোমাকে কি কিছু বলেছে?

—কোন ব্যাপারে বলো তো?

—বলছি, এখনকার ছেলেমেয়েরা তো আবার নিজেরা দেখেশুনে বিয়ে করে, তা বরুণের এরকম কি কেউ আছে?

—না, সে ব্যাপারে ও তো আমাকে কিছু বলেনি।

—আমার কী মনে হয় জানো, ওর মনে হয় কারো সঙ্গে সবকিছু ঠিকঠাক করা আছে, তাই বিয়ের কথা বললে কিছুতেই রাজি হয় না।

—তাহলে আমাদের সঙ্গে সবকিছু খুলে বলে না কেন?

—আরে, ও যতই এখনকার ছেলে হোক, কীরকম লাজুক তা বুঝতে পারো না, আমার মনে হয় ও লজ্জাতেই এসব কথা আমাদের সঙ্গে কিছু বলতে পারছে না।

—তাহলে কী করা যায় বলো তো?

—আমার মনে হয় তুমি ওকে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করো।

—কিন্তু ও এ ব্যাপারে কিছু আমাদের জানাবে?

—হ্যাঁ-হ্যাঁ জানাবে, তুমি জিজ্ঞাসা করেই দেখো না।

সেদিন সন্ধেবেলায় মালা বরুণকে ধরল— আচ্ছা বরুণ, তুই এখন বিয়ে করতে রাজি নস কেন?

—এমনি।

—এমনি বলে কিছু হয় না, নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

—কী কারণ?

—তোর কি কারো সঙ্গে দেখাশুনো করা আছে, তাহলে তুই বল সেখানেই আমরা তোর বিয়ের ব্যবস্থা করব।

—না-না, সেরকম কোনো ব্যাপার নেই।

—তুই লজ্জা পাস না, সত্যি ব্যাপারটা তুই আগে জানা।

—ধুস, বলছি তো ওরকম কোনো ব্যাপার নেই, আমি এমনিই কোনো বিয়ে করব না।

এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু ইস্কুলের ঘটনাটা ঘটার পর থেকে ওর বাবা-মা দুজনেই খুব উতলা। এখন ছেলের কোনো পিছুটান নেই, তাই ও এখন এরকমভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারছে। কিন্তু যারা অন্যায় করে তারা তো আর ধোয়া তুলসীপাতা হয় না, যে ওদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তাকে যেভাবে হোক ওরা শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেরকম হতে দেওয়া যাবে না, বরুণকে যে করে হোক সম্পূর্ণ সংসারী করতে হবে, ঘরে ওর মন বসাতে হবে।

বরুণের বাবা-মা আবার ওকে ধরে—বরুণ, তুই চাকরি পেয়েছিস কয়েক বছর তো হল, এবার বিয়েটা করে নে। গাইঘাটার সুনীলবাবুর মেয়েটা দেখতে শুনতে ভালো, পড়াশুনো করছে। তুই বললে আমি ওদের কাছ থেকে একটা ছবি চেয়ে রাখতে পারি।

—না-না, তোমরা এখন ও ব্যাপারে একদম ভাববে না।

—তাই বললে হয়, আমাদের বাবা-মায়ের মন, তোকে ঘরে সুখে সংসার করতে না দেখলে কি আর মন ভরে?

—কেন, এখন আমি তোমাদের সঙ্গে ভালোভাবে সংসার করছি না, আমি কি এখন বিবাগী হয়েছি?

—ইস, ও-কথা বলছিস কেন, তুই কেন বিবাগী হবি?

—তাহলে তোমরাও আমার বিয়ে নিয়ে এত মাতামাতি করছ কেন? আমি তো বলেই দিয়েছি এখন আমি বিয়ে করব না। আচ্ছা, তোমরা হঠাৎ আমার বিয়ে নিয়ে এত মেতে উঠলে কেন? আমার তো মনে হচ্ছে স্কুলের ঘটনাটা জানতে পেরেই তোমরা আমার বিয়ের ব্যাপারে এত উতলা হচ্ছ!

ওরা দুজন একেবারে চুপ। ছেলের কাছে কি কিছু লুকোনো যায়? শিবুই কথা তোলে— তা তুই একরকম ঠিকই বলেছিস। তুই যেভাবে তোদের হেডমাস্টারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিস, আমার খুব ভয় হয়। সাপের লেজে কেউ পা দিলে সাপ তো ছোবল মারার চেষ্টা করবেই।

—কিন্তু বাবা, সাপের ছোবলের ভয়ে সবাই যদি বাড়িতে বসে থাকে তাহলে কী করে চলবে?

—কিন্তু তুই যে আমাদের আদরের ছোটোখোকা, আমাদের বুকের পাঁজর, তোর কিছু হয়ে গেলে আমরা কী নিয়ে থাকব?

—তোমাদের বড্ড বেশি ভয়, অত ভয় করলে চলবে না, মনে রাখবে অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।

সেদিনকে ক্লাসে বরুণ ওই ভাব সম্প্রসারণটা করাল। এতদিন ও এই ভাব সম্প্রসারণ ক্লাসে করাত, কিন্তু মনের থেকে কিছু বলতে পারত না। কিন্তু আজকে ও আত্মতুষ্ট। ও নিজে প্রতিবাদ করে হেডস্যারকে জেলে পুরে এটা পড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে বলে মনে করছে। ও ছাত্রদের প্রশ্ন করে— বল, তোরা এখন এইভাবে অন্যায় দেখলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারবি তো?

—হ্যাঁ স্যার, পারব।

সমস্ত ছাত্রদের সমস্বরে দেওয়া উত্তর যেন ওকে আরও আরও সমর্থন যোগায়। ওর মানসিক দৃঢ়তা আরও ঋজু হয়। ও আনমনা হয়ে পড়ে। ওর অবচেতন মনে ভেসে ওঠে এইসব ছেলেদের মুখ, তারা তাদের কচিহাত মুষ্টিবদ্ধ করে সমাজের নানা অনাচার, অবিচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। এই বাচ্চাগুলোর মুখগুলো ক্রমশ বদলে যাচ্ছে কখনও সেটা বিবেকানন্দের মুখ, কখনও বা যীশু খ্রিস্টের কখনও বা ভগত সিং-এর, কখনও বা সেটা নেতাজি সুভাষচন্দ্রের।

* * *

সুকুমার চ্যাঁচাচ্ছে— কী হল, আজকে ওপারে মাল পাঠানোর কথা, এখনও তোরা মাল তৈরি করিসনি?

সুকুমারের দলে রাজেন, বোঁচা, ভন্তু ওরা একটু ভড়কে যায়। ওদের সুকুমারদা এমনি ভালো, তবে রেগে গেলে কী যে করবে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। ওদের দলের মূল কাজ বাংলাদেশে মাল পাচার করা। কিন্তু এখন আবার বি এস এফের কড়াকড়ি বেশ বেড়েছে। ওদের নজর এড়িয়ে মাল পাঠানো বেশ সমস্যা। এই সময় ওদেরকেই ম্যানেজ করে নিতে হয়, নাহলে সুকুমারদার কানে গেলে হয়তো দেশি পিস্তল চালিয়ে দু-একটা বি এস এফের জওয়ানকেই ওপরে পাঠিয়ে দেবে, তখন ঝক্কি-ঝামেলা অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে সুকুমার দেখছে ওর কথার কেউ উত্তর দিচ্ছে না, ও আবার গর্জে ওঠে— কী হল, কানে কথা যাচ্ছে না, আমি প্রশ্ন করছি তোরা চুপ করে আছিস কেন এরকম বোবার মতো?

ওরা দেখল এরপরেও যদি ওরা উত্তর না দেয়, তাহলে সুকুমার রেগে আগুন হয়ে যাবে। বোঁচা তাই উত্তর দিল— এখন বি এস এফের নজরদারি খুব বেড়ে গিয়েছে, ওপারে মাল পাঠানো খুব রিস্ক, তাই আমরা আর মাল রেডি করিনি।

—ধুস, উর্দিপরারা একটু নড়াচড়া করেছে, আর তোরা ভয় পেয়ে এইভাবে ঘরে বসে আছিস! উলটে ওদের ভয় দেখাতে হবে। দাঁড়া, আজকে একটা-দুটো জওয়ানকে ওপরে পাঠিয়ে দেই, তারপর দেখবি সুটিয়ার বর্ডার একেবারে ফ-এ ফক্কা।

ওর চ্যালারা দেখে খুব বিপদ। সুকুমার যদি এটা ঘটিয়েই বসে, তাহলে সব ক-টাকে পালাতে হবে এলাকা ছেড়ে। আবার বি এস এফ মার্ডার করলে দেশের কোনো জায়গায় লুকোলে সেখান থেকে ঠিক খুঁজে বার করবেই, তখন পালাতে হবে ওপারে বাংলাদেশে। ওরা সুকুমারকে থামাতে চায়— না দাদা, ও ভুল কোরো না, তাহলে কিন্তু বি এস এফ আমাদের সবাইকে হন্যে কুকুরের মতো খুঁজবে, তখন লুকোনোর কোনো জায়গা থাকবে না।

—ধুস, তোরা সব কাপুরুষের দল, তোদের নিয়ে চললে আমার সব ধান্দা তুলে ওই খোল-কত্তাল নিয়ে কেত্তনই গাইতে হবে, আর কিছু হবে না। তা তোরা ভেবেছিস এখন আমাদের চলবে কী করে?

—বলছি দাদা, ক-দিন একটু ধান্দা বদলালে হয় না।

সুকুমারের কানে বোঁচার কথাটা ভালোই ঢোকে। এমনিতে বর্ডারে মাল এপার-ওপার করানোতে ভালোই ঝক্কি। বি এস এফকে প্রতি সপ্তায় টাকা দিলেও বিশ্বাস নেই, কোনদিন হয়তো দেবে গুলি চালিয়ে, সোজা ওপরে। তার চেয়ে বোঁচার কথা মতো ক-দিন একটু ধান্দা পালটে দেখা যেতে পারে। কিন্তু কী ধান্দা করবে? প্রথমে ভাবে একটা ডাকাতের দল গড়লে মন্দ হয় না। প্রথম জীবনে সুকুমার একটা ডাকাতদলে ছিল, কয়েক বাড়ি ডাকাতিও করেছিল, কিন্তু তারপর একবার ধরা পড়ে যাওয়ায় সেই ধান্দায় ইতি। তারপর ভাবে এই সুটিয়া আর তার আশেপাশে গাজনা, বিষ্ণুপুর, বলদেঘাটা, পাঁচপোতা এলাকায় বড়ো মালদার পার্টি আর ক-টাই বা আছে? যে ক-টা আছে খুব বেশি না, ও ধান্দায় নামলে পড়তায় পোষাবে না। একটা ডাকাতদল চালাতে অনেক খরচা আছে, সেসব চালিয়ে তারপর পুলিশের নজর এড়ানোর ঝামেলা আছে।

রাজেন দেখল ওদের গুরু বোম মেরে কী যেন একটা ভাবছে। ও ভাবছে গুরুকে একটু নাড়া দিয়েই দেখা যাক ও কী ভাবছে নতুন ধান্দার ব্যাপারে। ওর আওয়াজ— ও সুকুমারদা, কী ভাবলে?

—ভাবছি তো অনেক কিছু, কিন্তু কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। একবার ভাবছি একটা ডাকাতের দল খুলি, তারপর ভাবছি ওতে হ্যাপা অনেক, ও ধান্দায় নামা যাবে না।

—তাহলে অন্য কিছু ভাবো।

—তাই তো ভাবছি।

ভন্তুর আবার মাথাটা খেলে বেশি। ও বলে— সুকুমারদা, আমাদের এদিকে কিন্তু বেশ রাখি মালের ব্যবসা চলছে। অনেক পার্টি এই ব্যবসা করে রাতারাতি লাল হয়ে গিয়েছে। আমরাও রাখি মালের ব্যবসা শুরু করতে পারি।

এলাকায় অনেকে সত্যিই গুদামে শস্য মজুত রেখে মজুতদারির ব্যবসা চালায়। সেই ব্যবসাই এলাকায় রাখি মালের ব্যবসা বলে পরিচিত। তাতে ভালোই লাভ করছে ওই ব্যবসাদাররা। কিন্তু ভন্তুর কথা হচ্ছে রাখি মালের ব্যবসা করা। সুকুমার ভাবে না, সেটা করা যাবে না। ওর ধান্দা আবার অন্যরকম। ও ভাবে ওই মালদার পার্টিগুলোর কাছ থেকে যদি কিছু মাল হাতানো যায় তাহলে জমবে ভালো। সুকুমার এতক্ষণ বাদে কথা ধরে—ভন্তু, তুই আমার মাথায় একটা ভালো কথা ঢুকিয়েছিস, রাখি মালের ব্যবসা!

ভন্তু আরও উৎসাহ পায়— তাহলে গুরু, আমরা রাখি মালের ব্যবসাই করব।

—না, আমরা রাখি মালের ব্যবসা করব না।

—তাহলে তুমি বললে যে রাখি মালের ব্যবসা বেশ ভালো ব্যবসা?

—হ্যাঁ, সে ব্যবসা ভালোই চলে কিন্তু আমি সেই ব্যবসা করব না।

—তাহলে কী করবে?

—যারা রাখি মালের ব্যবসা করে তাদের কাছ থেকে মাল আদায় করতে হবে।

—বাঃ, বেশ হবে তাহলে, প্রথমে কাকে দিয়ে শুরু করবে?

—সুটিয়ার কার্তিক টিকাদারের কাছে প্রথমে যেতে হবে।

ওরা ঠিক করে নেয় কার্তিককে কখন ধরবে। কার্তিক রাতে গোবরডাঙা থেকে বাইক নিয়ে সুটিয়ায় আসে। মাঠের মধ্যে দিয়ে অনেকটা ফাঁকা জায়গার মধ্যে দিয়ে ওকে আসতে হয়। সেই সময়টা কাজে লাগাতে হবে।

* * *

অল্প অল্প শীত পড়েছে। রাস্তাঘাট সন্ধের পর থেকে বেশ ফাঁকা। রোজকার মতো কার্তিক বাইক নিয়ে ফিরছে। হঠাৎ দেখে রাস্তার মাঝে চার-পাঁচটা ছেলে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে ওকে গাড়ি থামাতেই হবে। ও গাড়ি থামিয়ে বেশ রাগের সঙ্গে ওদের দিকে এগিয়ে যায়— কী ব্যাপার, এই সন্ধেবেলায় হচ্ছেটা কী, তোমরা এভাবে রাস্তার মাঝমধ্যে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

সুকুমার ওর দিকে তাকিয়ে বলে— তোমার জন্যেই।

ওদের এরকম উত্তর শুনে কার্তিক প্রমাদ গোনে। এমনি ছেলেগুলো ওর মুখ চেনা। সুটিয়ার নাগবাড়ি অঞ্চলে ওদের বাড়ি। ছেলেগুলো এমনিতে ভালো না। বর্ডারে মাল পাচারের কাজে যুক্ত বলেও শুনেছিল, কিন্তু ওরা আজকে এইভাবে ওর পথ আটকে বলছে কেন ওর সঙ্গেই ওদের দরকার। মনে মনে একটু ও বিচলিত হলেও সামনে তা প্রকাশ করে না। বেশ রাশ নিয়েই ও উত্তর দেয়— কী যা-তা বকছ তোমরা, এখানে এই নির্জন রাস্তায় ভর সন্ধেয় আমার সঙ্গে তোমাদের কী দরকার থাকতে পারে?

—হ্যাঁ, দরকার আছে বলেই তো এতক্ষণ এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে।

—কী দরকার?

—আমাদের কিছু টাকা লাগবে।

—টাকা লাগবে মানে, এটা তোমরা কী পেয়েছ, যখন-তখন টাকা চাইলে টাকা দেব কেন, আর তোমরা কোন সাহসে আমার কাছে টাকা চাইছ?

—এই সাহসে।

সুকুমারের হাতে দেশি পিস্তল। ও বার করে সোজা কার্তিকের কপালে ঠেকিয়েছে। শীতের সন্ধেতেও কার্তিকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। ও গ্যাঁংড়াতে থাকে— কত টাকা চাও তোমরা, কত টাকা দেব বললে তোমরা আমাকে এখান থেকে যেতে দেবে?

—বেশি না, পঞ্চাশ হাজার।

—অসম্ভব, অত টাকা আমি পাব কোথা থেকে?

—পাবি না মানে আলবাত পাবি। রাখি মালের ব্যবসায় তুই ভালোই লাল হচ্ছিস এ খবর আমাদের কাছে অজানা নয়।

—আর যদি না দেই, তাহলে তোমরা কী করবে?

—কিছুই না, জাস্ট একটা গুলি খরচা করব। একটা গুলির আর কত খরচা, বেশি না। কিন্তু তোর সাধের জীবনটার দাম কত বল তো, সেটা কিন্তু তুই আর ফেরত পাবি না। এখন তুই ভেবে দ্যাখ আমাদের পঞ্চাশ হাজার দিবি, না তোর এই অমূল্য জীবনটাকে ভোগে দিবি পুরোটাই তোর ওপর।

কার্তিক উত্তর দেবে কী, ও তখন ঠকঠক করে কাঁপছে। সুকুমার দেখল পাখি এবার বশ মেনেছে। ও বলল— কালকে এই সময়ে এখানেই তুই টাকাটা নিয়ে আসিস। তবে মনে রাখিস কোনোরকম বেগড়বাই করলে তোর লাশেরও কোনো হদিশ হবে না, জাস্ট ভ্যানিস হয়ে যাবে।

কার্তিক বাড়ি পৌঁছোলে ওর মুখ-চোখের অবস্থা দেখে ওর বউ রমা জিজ্ঞাসা করল— কী হল তোমার, শরীর খারাপ করল না তো?

কার্তিক কোনো উত্তর দেয় না। কার্তিকের বউ আরও উদ্বিগ্ন — কী হল, উত্তর দিচ্ছ না কেন, জল খাবে?

কার্তিক এবার ভেঙে পড়ে—রাস্তায় আমায় ক-জন ধরেছিল।

—কেন, কারা ধরেছিল তোমায়, কী চায় ওরা?

—ওরা আমার কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার দাবি করেছে। না দিলে আমায় মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিয়েছে।

—সে কী কথা, এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! ওরা কারা, তুমি চেনো ওদের?

—সব ক-টাকেই চিনি। এই সুটিয়ারই ছেলে সব।

—ওদের হাতে কিছু ছিল?

—হ্যাঁ, পিস্তল ছিল?

—বাব্বা, তাহলে তো মারাত্মক কাণ্ড!

—হ্যাঁ, আমি ভাবছি কালকে গাইঘাটা থানায় গিয়ে জানিয়ে আসব।

কার্তিকের এই কথা শুনে ওর বউয়ের খুব আপত্তি—না, সেটা তুমি কোরো না, তোমার পায়ে পড়ি, তুমি ওদের দাবি মতো টাকাটা দিয়ে দাও।

—সে কী করে হয়, আমার কষ্ট করে উপার্জন করা টাকা, ওরা চাইল আর দিয়ে দেব, তা হতে পারে না।

স্বামীর এই উত্তর শুনে রমা খুব কান্নাকাটি শুরু করে। কার্তিকের পায়ে ধরে—তুমি ওরকম কোরো না। তুমি থানায় গেলে ওরা তোমাকে ছাড়বে না। তুমি ওদের টাকাটা দিয়ে দাও, তুমি ঠিক থাকলে এরকম অনেক টাকা আসবে, কিন্তু তোমার কিছু হয়ে গেলে কী হবে বলো তো, আমি কী নিয়ে বাঁচব? তুমি লক্ষ্মীটি আমার, টাকাটা ওদের দিয়ে দাও।

রমার এত কথার পরেও কার্তিক মনের থেকে কিছুতেই টাকাটা দেওয়ার কথা ভাবতে পারে না। কিন্তু রমা বারবার পীড়াপীড়ি করছে। সত্যি ও ছাড়া রমার কে বা আর আছে? আর এই দুনিয়ায় থাকলে টাকা-পয়সা ঠিক আসবে। তারপর ছেলেগুলোর চোখ-মুখ বেশ হিংস্র। টাকা না পেলে ওরা যদি কোনোকিছু করে ফেলে কার্তিক আর ভাবতে পারে না।

বাড়িতে কিছু টাকা ও রেখেছিল চাঁদপাড়া থেকে মাল তুলবে বলে। সেই টাকাটা ও নিয়ে নেয়। রমা বারবার ওকে বলছে— তুমি একা যাবে, অন্য কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাও।

—না দরকার হবে না, আমি একাই যাব।

এবারে কার্তিক আর রমার কথা শোনে না। ও একাই চলে যায় সন্ধেবেলায় বাইক নিয়ে। ও দূর থেকেই দেখতে পায় কালকের জায়গাতেই ক-জন দাঁড়িয়ে আছে। ও ওদের ওখানে বাইক থামায়।

ওকে দেখে সুকুমারের বেশ আনন্দই হয়েছে।

—যাক, তাহলে চলে এলে, টাকাটা ঠিকঠাক এনেছ তো?

—হ্যাঁ।

—কই দাও।

কার্তিক টাকার ব্যাগটা এগিয়ে দেয়। সুকুমার ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলে—যাক, এবারটা অন্তত মানুষ খুনের পাপের বোঝা মাথায় নেওয়ার থেকে তুমি আমাদের বাঁচালে।

—বলছি, এইভাবে টাকা চাইলে আর দিতে পারব না কিন্তু।

—তা বললে কী করে হয় কার্তিকবাবু। তুমি রাখি মালের ব্যবসা করবে, দু-হাতে পয়সা আয় করবে আর আমরা কিছু পাব না, তাই হয়?

—তার মানে?

—প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা আমাদের চাই।

—সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। আমি যা আয় করি তার থেকে প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা তোমাদের দিয়ে দিলে আমি সংসার চালাব কী করে?

—ফালতু বকিস না, তোর রাখি মালের ব্যবসায় মাসে মাসে কত টাকা ঘরে তুলিস সে খবর সব আমি রাখি। সব হিসেব কষেই আমি তোকে মাসে দশ হাজার টাকা দিতে বলেছি। আর না দিলে সেটাই তোর জীবনের ক্যালেন্ডারের শেষ মাস হবে।

এই বলে সুকুমার আর ওর দলবল ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। প্রথম শিকারেই পঞ্চাশ হাজার, তার উপর আবার প্রতি মাসে দশ হাজার করে আসবে। এই ধান্দাই বেশ ভালো। কোনো হ্যাপা নেই, বি এস এফের চোখরাঙানি নেই, শুধু পাবলিককে একটু ভড়কে দাও, তারপর কড়কড়ে নোট গোনা। রাজেন, বোঁচা, ভন্তু আজকে যেন সবাই আনন্দে উড়ছে। ওরা সব্বাই বলছে— গুরু, কী ধান্দা বার করেছ বলো, কোনো খরচা নেই, কোনো হ্যাপা নেই, শুধু ইনকাম আর ইনকাম, ভাবা যায়।

সুকুমার কিন্তু বেশ সতর্ক— দ্যাখ, অত লাফাস না, এটা প্রথম কেস বলে এত সহজে মাল পেয়ে গেলি। অনেক পাবলিক আবার হেব্বি কঞ্জুস হয়, তারা জান দিয়ে দেবে কিন্তু টাকা দেবে না। তখন কিন্তু অনেক হ্যাপা হবে।

—সেসব তুমি ঠিক বুঝে নিতে পারবে গুরু, আমরা জানি।

—সেটা ঠিক, আমার কথায় কেউ ট্যাঁ-ফোঁ করলে সোজা মেসিন চালিয়ে দেব,তারপর দেখা যাবে। একটা পাবলিক মরলে অত কেত্তন হবে না।

সেটা ওরাও বোঝে। ডিউটিতে থাকা অবস্থায় একটা বি এস এফ জওয়ানকে ওরা গুলি করে মারলে যে ঝক্কি হত, এখানকার একজন মরলে তার সিকি ভাগও হবে না। কিন্তু ইনকাম অনেক।

সেদিন রাতে ওরা মনভরে বাংলা খেল। বোঁচা বলল—গুরু, এবারে শিকার কে?

—ভাবছি এবার বলদেঘাটার কানাইরে ধরব। ও ব্যাটা ব্যাপক পয়সা কামিয়েছে।

—হ্যাঁ গুরু, সবসময় সাফারি পরে গায়ে দামি সেন্ট দিয়ে বাবু বাইক নিয়ে ঘোরে। আমাদেরকেও কিছু দাও, তারপর লাক্সারি করো।

—হ্যাঁ, সব কালো টাকার কারবার, সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয় না কিন্তু আমাদের ট্যাক্স না দিলে হবে কী করে?

ক-দিন পরে ওরা কানাইকে পাকড়াও করল। কানাই বেশ চ্যাঁচাচ্ছে — তোমরা ভেবেছ কী, আমার কাছ থেকে এইভাবে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করবে, হারগিস আমি তোমাদের কোনো টাকা দেব না।

—দ্যাখ কানাই, তুই ভুল করবি। টাকাটা দিয়ে দে, তোর ব্যবসায় তুই আরও টাকা পাবি।

—কেন, তোমাদের টাকা দেব কেন? এ কী হারামের টাকা যে তোমাদের দিতে হবে, এ আমার নিজের টাকা।

—হারামের টাকা নয়তো কী, সরকারকে তোর আয় করা টাকার কোনো হিসেব দিস তুই, না ট্যাক্স দিস? সব কালো টাকার মালিক তোদের মতো রাখি মালের ব্যবসাদাররা। সরকারকে ট্যাক্স দিস না, আমাদের দিতে হবে, এটা একদম সোজা কথা, কোনোরকম বাঁকাচুরো কিছু নেই।

কানাই অবাধ্য হল। পরেরদিন সোজা ও গাইঘাটা থানায়। ডিউটি অফিসারের সঙ্গে দেখা করে ও বলল— আমাকে ক-জন প্রাণে মেরে দেবার হুমকি দিচ্ছে।

—কেন?

—ওরা আমার কাছ থেকে টাকার দাবি করছে, আমি দিচ্ছি না, তাই ওরা বলছে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলবে।

—কারা তারা, আপনি চেনেন তাদের?

—হ্যাঁ চিনি, সবকটাই সুটিয়ার ছেলে। আপনি নামগুলো লিখে নিন।

কানাই নামগুলো এক এক করে বলে চলে, অফিসার লিখে নেয়। তারপর অফিসারের অভয়— আপনি বাড়ি যান, আমরা ব্যাপারটা দেখছি।

কানাই অফিসারের কথায় বেশ সাহস পেয়েছিল। ও সোজা বাড়িতে। পরের দিন থেকে ওকে আর পাওয়া গেল না। যে অফিসার কানাইকে অভয় দিয়েছিল তার বাড়িতে সুকুমার।

—এই যে সুকুমার, লাশ কোথায় গায়েব করেছিস?

—সে আপনার ভাবতে হবে না, খুব গোপন জায়গায় লাশ গুম করে দিয়েছি, এ দেশের কেউ আর ওই লাশের খবর পাবে না।

—সে কী রে, তুই লাশ গায়েবে এত এক্সপার্ট হলি কবে থেকে? কোথায় রেখেছিস তুই লাশটাকে আমি একটু শুনি।

—কানাই-এর লাশ এখন ইন্টারন্যাশনাল হয়ে গিয়েছে।

—মানে?

—ওর লাশ আমি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। এপারের কেউ আর ওই লাশের খবর পাবে না। শালার খুব সাহস হয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে থানায় গিয়েছিল। শিক্ষা তো ওকে দিতেই হত। তবে মালটা মরার আগে বারবার বলেছিল, 'আমি তোমাদের দাবি মতো সব টাকা দেব, চাইলে আরও দেব, আমায় তোমরা মেরো না।' আরে মারতে তো আমিও চাইনি, কিন্তু তুই শালা আমার বিরুদ্ধে সোজা থানায় ছুটবি, আর আমি বসে বসে সার্কাস দেখব তাই কখনও হয়?

—তুই আমার টাকাটা কবে দিবি তাই আগে বল, তোকে কিন্তু আমি এবারে খুব বাঁচিয়েছি, আমার টাকাটা এবারে ডবল করে দিস।

—ওহ, আপনাদের দাবিরও আবার শেষ নেই। যা পাই অর্ধেকই তো আপনাদের দিয়ে দিতে হয়, আমাদের আর কী থাকে?

—এই ধান্দাটাই যে এরকম সুকুমার।

—মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানেন, আমাদের চেয়েও বেশি গুণ্ডা, বেশি তোলাবাজ আপনারা পুলিশরা।

সুকুমারের এই কথা শুনে অফিসার হাসিতে ফেটে পড়েন— তুই একেবারে সত্যি বলেছিস সুকুমার, পুলিশের চেয়ে বড়ো তোলাবাজ আর গুন্ডা কেউ নেই। আবার ভাব আমরা সরকারি সিল-ছাপ্পা নিয়ে গুন্ডাগিরি করি, বলতে গেলে একেবারে সরকারি গুন্ডা আর কী।

* * *

কানাইয়ের নিখোঁজ হওয়ায় এলাকায় একটু হইচই হল। কিন্তু পুলিশ কিছুতেই কেস নিতে চাইল না। যখনই কানাইয়ের বাড়ি থেকে থানায় যায়, অফিসার বলেন— ও দেখুন, আপনাদের কানাই কোনো মেয়েছেলে নিয়ে ভেগেছে। সম্ভব হলে একটু সোনাগাছিতে খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনাদের ছেলে হয়তো কোনো রেন্ডির কোলে গিয়ে বসে আছে।

—কী যা-তা বলছেন আপনি, আমার ছেলের চরিত্র নিয়ে একটাও নোংরা কথা বলবেন না।

—দেখুন, এতদিন ধরে পুলিশে চাকরি করছি তো, সবকিছু বোঝা হয়ে গিয়েছে। এরকম কেসে কত ভালো ফ্যামিলির ছেলেকে হয় দিঘা, নয় সোনাগাছি থেকে পাওয়া গিয়েছে হিসেব নেবেন?

—ফালতু কথা না বলে আমাদের কেসটায় আপনি একটা ডায়েরি অন্তত করুন।

—আগে আপনারা সোনাগাছিটা ঘুরে এসে লিখে দিন আমাদের ছেলে সোনাগাছিতে কোনো রেন্ডির ঘরে নেই, তারপরে আমরা ডায়েরি নিয়ে নেব, কোনো সমস্যাই হবে না।

—নাহলে ডায়েরি নেবেন না?

—না, আপনারা ছেলের নিখোঁজ ডায়েরি লিখে বাড়িতে গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমোবেন, আর আমাদের ওইসব নোংরা জায়গায় যেতে হবে তা পারব না।

কানাইয়ের বাড়ির লোক বুঝতে পারে এইসব উলটোপালটা কথা বলে আসলে ওদেরকে উলটো বোঝানোর চেষ্টা করছে ওই অফিসার। কানাই যে বাড়িতে কিছু ছেলে ওকে হুমকি দিচ্ছিল তা জানিয়েছিল, এটাও উড়িয়ে দিচ্ছে ওই অফিসার।

ওরা সবাই হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। বিকেলবেলায় বরুণ ওদের বাড়িতে ঢোকে। সুটিয়ার বরুণ এমনিতে আশেপাশের গ্রামে বেশ পরিচিত মুখ। তবে কানাইয়ের বাড়ির লোক ওকে ঠিক চিনত না। কানাইয়ের বাবা ওকে জিজ্ঞাসা করল— তুমি কে বাবা, তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না?

—আমি সুটিয়ার বরুণ, মেসোমশাই।

—এসো বাবা এসো, তোমার নাম আগে আমরা শুনেছি, কিন্তু কোনোদিন সামনাসামনি দেখিনি বলে চিনতে পারিনি, তুমি কিছু মনে করোনি তো বাবা?

—না-না, মনে করব কেন, আপনারা আমার বাবা-মায়ের বয়সি, আপনাদের কথায় কিছু মনে করলে হয়? আচ্ছা, কানাইয়ের কোনো খবর পেলেন?

—না গো বাবা, অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েছি, কেউ ওর কোনো ঠিকানা বলতে পারল না।

—পুলিশে ডায়েরি করেছেন?

—না।

—কেন?

—পুলিশ ডায়েরি নিতে চাইছে না, উলটে আমাদের ছেলে সম্বন্ধে নোংরা-নোংরা কথা বলছে।

—পুলিশের হচ্ছে এই দোষ। সব ধান্দাবাজের দল। ওরা শুধু টাকা খাওয়ার সুযোগ খোঁজে। ঠিক আছে, কালকে আমি আপনাদের সঙ্গে যাব, দেখি ওরা কী বলে।

এই বলে ওর ঝোলা ব্যাগ কাঁধে ফেলে বরুণ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ওর আবার সন্ধেবেলায় আর এক জায়গায় যেতে হবে। সেটা সৌমেন্দ্রদের বাড়িতে। ছেলেটার খুব মেধা কিন্তু বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ। খাওয়াই ঠিকঠাক জোটে না, তার ওপর আবার পড়াশুনো?

ও সৌমেন্দ্রর ব্যাপারে জানতে পারে পাঁচপোতা ইস্কুল থেকে। ও মাঝে মাঝে ওখানে যায়। ওর অনেক স্যার রিটায়ার করলেও, এখনও অনেকেই আছেন। তাঁদের সঙ্গে ও মাঝে মাঝে গিয়ে আড্ডা দেয়। এইরকমই একদিন ও গিয়েছে ইস্কুলে। হরিশ স্যার ওকে বললেন— বরুণ, এই ছেলেটাকে চিনিস, সুটিয়ার ছেলে?

—না স্যার, ঠিক চিনতে পারলাম না তো।

—চিনে রাখ, খুব মেধাবী ছেলে ও। অনেক দূর যাবে। তবে দারিদ্র্যতা ওকে পিছিয়ে দিচ্ছে, খুব গরিব ওরা, দেখিস যদি ওর জন্যে কিছু করতে পারিস।

—হ্যাঁ স্যার, অবশ্যই আমি খেয়াল রাখব।

সেই শুরু। তারপর প্রতি মাসের মাঝেই বরুণ ছুটে যেত ওদের বাড়িতে। ওর মাইনের থেকে থোক কিছু টাকা সৌমেন্দ্রর মায়ের হাতে গুঁজে দেয়— দেখবেন দিদি, সৌমেন্দ্রর টিউশনির যেন কোনো অসুবিধা না হয়, আর বাড়িতে চাল আছে তো?

সৌমেন্দ্রর মা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। নিরুত্তর সৌমেন্দ্রর মা কিছু না বলেও বুঝিয়ে দেন হাঁড়িতে চাল বাড়ন্ত। বরুণ বলে— একটুখানি দাঁড়ান, আমি এক্ষুনি আসছি।

খানিকক্ষণ পরে বরুণ চলে আসে ওদের বাড়িতে। হাতে তখন নতুন কেনা নাইলনের ব্যাগে এক ব্যাগ ভর্তি চাল। সৌমেন্দ্রর মায়ের হাতে যখন ওই ব্যাগ তুলে দিচ্ছে ওর মায়ের দু-চোখে জল। এই স্বামীহারা নারীর মুখে তখন একটাই কথা— তুমি মানুষ নও ভগবান, নিজের লোকেরা সবাই সৌমেন্দ্রর বাবা মারা যাওয়ার পরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে পাছে আমাদের পাশে দাঁড়াতে হয়, আমাদের সাহায্য করতে হয়। আর তুমি আমাদের কেউ নও, অথচ কীভাবে তুমি আমাদের সাহায্য করছ। জানি না, তোমার ঋণ আমি সারাজীবনে শোধ করতে পারব কিনা। তুমি আমাদের পরম আত্মীয়। তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আর তোমাকে ছোটো করতে চাই না। তুমি দীর্ঘজীবী হও।

বরুণ সৌমেন্দ্রর মায়ের কথায় খুব লজ্জা পায়। ও বলে—না-না,আপনি আমার দিদির মতো, দিদির প্রতি ভাইয়ের কর্তব্য থাকে না, আমি শুধু সেই দায়িত্বইটাই পালন করছি।

—এইরকম ভাই যেন সব দিদিরাই পায়।

বরুণ সৌমেন্দ্রর খোঁজ করে— অ্যাই সৌমেন্দ্র, কোথায় তুই? একটু শুনে যা।

সৌমেন্দ্র বাধ্য ছেলের মতো বেরিয়ে আসে। বরুণ জিজ্ঞাসা করে —পড়াশুনো ঠিকঠাক চলছে তো?

—হ্যাঁ, মামা।

—কোনোরকম অসুবিধা হলে মাকে বলতে হবে না, আমাকে বলবি। আর শোন তোকে যে বিবেকানন্দের বইটা দিয়েছিলাম, সেটা পড়ছিস তো?

—হ্যাঁ-হ্যাঁ, সেটা অনেকটা পড়া হয়ে গিয়েছে।

—বেশ ভালো লাগছে না, বইটা পড়তে?

—হ্যাঁ মামা, বিবেকানন্দকে যেন আরও ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে পারছি বইটা পড়ে।

—তুই ভালো করে পড়াশুনো কর, এবারে মেডিক্যাল জয়েন্টে তোকে সফল হতেই হবে।

—হ্যাঁ মামা, আমি চেষ্টা করছি।

—ব্যস, আমার ভাগ্নে যখন বলেছে সে চেষ্টা করছে, তার মানে ভাগ্নে জয়েন্টে ঠিক সফল হবেই।

বরুণ নিজেও বিবেকানন্দের খুব ভক্ত। নিজে যেমন বিবেকানন্দের বিভিন্ন বই নিয়ে পড়াশুনো করে, তেমনি অন্যদেরকেও পড়ায়। আগেরবার সে সৌমেন্দ্রকে বিবেকানন্দের একটা বই পড়তে দিয়েছিল। শিয়ালদায় স্টল থেকে ও বইটা কেনে। প্রতিদিনই ও শিয়ালদায় রামকৃষ্ণ মিশনের ওই স্টলে খানিকক্ষণ দাঁড়ায়, বইপত্তর নাড়াচাড়া করে, কিছু না কিছু বই কেনে, একে ওকে দেয়।

সৌমেন্দ্রর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বরুণ আকাশের দিকে চায়। ও ভাবে আকাশটা কত বিরাট, কত তারাকে ওর বুকে ধারণ করে আছে। ও ভাবে যে ওর হৃদয় যদি এই আকাশের মতো বড়ো হত, তাহলে কাউকে ফেরাতে হত না। সবার বাস্তব তো ভিন্ন, ওর সাধ অনেক কিন্তু সাধ্য তো সীমিত। তবুও ও ভাবে ওর সীমিত সাধ্যতেই ও এগোবে, সবাইকে নিয়েই এগোবে। উন্নয়নের পথে ওকে এগোতে হবেই, আর সবাইকে নিয়েই। ও তাড়াতাড়ি সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। আরও অনেক জায়গায় ওকে যেতে হবে, আকাশের দিকে ফিরে শুধু আকাশকুসুম ভাবলে চলবে না।

সাইকেলটা যেন একটু ককিয়ে ওঠে। ইস, কতদিন সাইকেলটায় একটু তেল দেওয়া হয়ে ওঠেনি। কালকে সকালবেলাতেই এটা নিয়ে বসতে হবে।

* * *

বরুণ বাড়ি ঢোকে। তখন দশটা বাজে। আকাশ ভরে গিয়েছে চাঁদের আলোয়। ও মাকে বলে—মা, শিগগির খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে।

—এতক্ষণ বাদে ছেলের আমার মায়ের কথা মনে পড়ল।

—ও হ্যাঁ, কালকে একদম সকালে বেরিয়ে যাব।

—কেন, কোথায় যাবি, কালকে তো তোর আবার স্কুল, যাবি না?

—না, কালকে আর স্কুলে যাওয়া যাবে না।

—কেন, কোথায় যাবি কালকে?

—আর বোলো না, কালকে বলদেঘাটার কানাইদের বাড়ি যেতে হবে।

—কেন, ওর আবার কী হল?

—ওকে ক-দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।

—তা তুই কী করবি, ছেলে পাওয়া যাচ্ছে না, তুই কি ওকে খুঁজে দিবি?

—না, আমাকে ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার থানায় যেতে হবে। জানো মা, থানায় কিছুতেই কানাইয়ের নিখোঁজ ডায়েরি নিতে চাইছে না। ওর বাবা-মাকে আবার ছেলের সম্বন্ধে অনেক নোংরা নোংরা কথা বলেছে, সেইজন্যে আমি যাব, দেখি ওরা ডায়েরি না নিয়ে কী করে থাকে।

—দেখিস বাবা, তুই আবার থানায় গিয়ে বেশি ঝগড়াঝাটি করিস না।

—ধুস, ঝগড়া করা কেন, আমি শুধু বলব ডায়েরিটা নিয়ে যেতে।

এইসব কথার মধ্যে ওর মা ওর খাবার দিয়ে গিয়েছে। বরুণের বেশ খিদেও পেয়েছিল। ও চেটেপুটে খেল। মালা বলল—বরুণ, এইবার বিয়েটা তুই করে নে।

—ও মা, খুব ঘুম পেয়েছে, এখন আমি আর এই ব্যাপারে একটা কথাও বলতে পারব না। এক্ষুনি আমি ঘুমোতে যাব।

—না, বিয়ের কথা বললে কিছুতেই তুই শুনতে চাস না, তোকে নিয়ে আমার খুব মুশকিল।

—মুশকিল মানে খুব মুশকিল। এখন ঘুমিয়ে পড়ো নাহলে কাল সকালে উঠতে পারবে না।

* * *

সকাল হতে না হতে বরুণ বেরিয়ে পড়ে বলদেঘাটার দিকে। কানাইয়ের বাবা-মা ওর জন্যেই যেন অধীর আগ্রহে বসেছিল। বরুণ গিয়ে ওদেরকে তাড়া দেয়— নিন, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। সকাল সকাল থানায় যেতে হবে, নাহলে আবার ভিড় বেড়ে যাবে।

কানাইয়ের বাবা-মা বলল—আমরা তৈরি, এখনই বেরিয়ে পড়া যাক।

ওরা সবাই বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় বরুণ জিজ্ঞাসা করল— আচ্ছা, কানাই হঠাৎ করে এভাবে নিখোঁজ হল, ওর সঙ্গে কি কারো কোনো শত্রুতা ছিল?

কানাইয়ের মা বলল— না, ও খুব ভালো ছেলে, কারো সঙ্গে ওর শত্রুতা ছিল না বলেই আমরা জানি।

—ও কি আপনাদের কোনো ব্যাপারে কোনো সমস্যার কথা বলেছিল?

—হ্যাঁ, ও ক-দিন ধরেই বলেছিল ওর কাছে কারা যেন টাকা চাইত।

—কারা চাইত, তা বলেছিল?

—না, সেরকম কিছু বলেনি।

—আপনারা থানায় এই টাকা চাওয়ার কথা বলেছিলেন?

—হ্যাঁ বলেছিলাম, কিন্তু অফিসার আমাদের কথা কানেই তোলেননি।

—ঠিক আছে, চিন্তা করতে হবে না, আজকে দেখি অফিসার কী বলেন।

থানায় ঢুকেই বরুণ সোজা ডিউটি অফিসারের ঘরে ঢুকল। ডিউটি অফিসার ওকে দেখেই বললেন— কী চাই আপনার?

—আমি এসেছি একটা নিখোঁজ ডায়েরি করতে?

—কে নিখোঁজ, আপনার বোন না স্ত্রী? দেখুন কার সঙ্গে পালিয়েছে।

অফিসারের এই কথায় বরুণের মাথাটা চট করে গরম হয়ে যায়— কী বলছেন কী আপনি? থানায় পুলিশের উর্দি গায়ে বসে যতসব জঘন্য কথা বলছেন।

অফিসার বুঝতে পারেন এই ছেলেটা সহজ ছেলে নয়, যত সহজে কড়কে দেওয়া যাবে ভাবা গিয়েছিল, এ সে বান্দা নয়। অফিসার চট করে ভোল পালটে নেয়।

—হ্যাঁ, বলুন আপনার কে নিখোঁজ।

—আমার নয়, আমার পরিচিত একটা ছেলে নিখোঁজ।

এই বলে বরুণ ডাক দেয়— ও মাসি, মেসোমশাইকে নিয়ে ভিতরে এসো।

কানাইয়ের বাবা-মা বরুণের কথায় ডিউটি অফিসারের ঘরে ঢোকে। ওদেরকে দেখেই অফিসার তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন— কী হল, আবার আপনারা এখানে এসেছেন, আপনাদের না বলে দিয়েছি, আগে সোনাগাছি থেকে ঘুরে এসে থানায় আসতে।

বরুণ সঙ্গে সঙ্গে কথা ধরে—কী মশাই, কী পেয়েছেন আপনি, এই দুজনের ছেলে নিখোঁজ, থানায় এসেছে ডায়েরি করতে, আর আপনি এদের ছেলের সম্বন্ধে এইসব নোংরা নোংরা কথা বলছেন? আপনার সম্বন্ধে আমি কিন্তু ওপরে কমপ্লেন করব। আমি বলছি, আপনি এক্ষুনি এদের ছেলের মিসিং ডায়েরিটা নিয়ে নিন, নাহলে পস্তাবেন।

বরুণ এইভাবে কড়া গলায় রাশ ধরায় অফিসার আর বেশি বেগড়বাই করতে সাহস পান না। ডায়েরি নিতে উনি রাজি হন। খস-খস করে উনি ডায়েরি লিখে একটা রিসিভিং মেমো বরুণের হাতে ধরিয়ে দেন।

বরুণ ওদের দুজনকে নিয়ে বেরিয়ে আসে থানার থেকে। বরুণ ওদের দুজনকে অভয় দেয়— নিন, আর আপনাদের চিন্তা নেই, থানায় যখন একবার কেস ফাইল হয়েছে তখন কিছু না কিছু হবেই।

বরুণ ওদেরকে বলদেঘাটায় ছেড়ে দিয়ে আসে। ও জানে যতই ও কানাইয়ের বাবা-মাকে অভয় দিক যে পুলিশে ডায়েরি নিয়েছে, এবারে কানাইয়ের ঠিক খোঁজ পাওয়া যাবে, কিন্তু ও এই পুলিশদের হাড়ে হাড়ে চেনে। একটা ডায়েরি নিতে ওদের এত আপত্তি, ওরা আবার তদন্ত করে কানাইকে খুঁজে বার করবে, ভাবতেও হাসি পায়।

আবার কানাইয়ের বাবা-মায়ের কথা মনে আসে। ও যখন ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে, ওরা বারবার বলছে— বাবা, তুমি মাঝে মাঝে একটু থানায় গিয়ে আমাদের কানাইয়ের খোঁজ নিও, আমরা গেলে ওরা আমাদের কোনো কথাই শুনবে না, উলটে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেবে।

—না-না, সে আপনাদের ভাবতে হবে না। কানাই যেরকম আপনাদের ছেলে, ও তেমনি আমারও ভাই। ওকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে সবরকম চেষ্টা আমি চালাব।

বরুণের কথায় কানাইয়ের বৃদ্ধ বাবা-মা বুকে যেন একটু বল পায়। ওরা আর কোথায় যাবে, যে পুলিশের কাছে ওরা গিয়েছিল, তারা ওরকম ব্যবহার করল, এখন এই বরুণই ওদের ভরসা। পারলে ওই পারবে কানাইকে উদ্ধার করতে।

বরুণ তারপরেও বেশ কয়েকবার থানায় গিয়েছে কানাইয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিতে। ডিউটি অফিসারের সেই একই কথা—দেখুন মশাই, প্রতিদিন আমাদের কাছে হাজারো সমস্যা নিয়ে অনেক মানুষ আসে, শুধু আপনাদের কানাইকে খুঁজে বার করার জন্যে তো আর গাইঘাটার থানার পুলিশ নয়। আমরা খোঁজখবর চালাচ্ছি, কোনো খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। কিছু একটা খোঁজ-খবর জানতে পারলেই আমি খবর পাঠিয়ে দেব, আপনার এই প্রতিদিন থানায় আসতে অনেক অসুবিধা হয়, আর আমরাও ব্যস্ত থাকি, কোনো সময়ে কিছু খারাপ কথা বলে ফেলি, আপনারও খারাপ লাগে।

বরুণ দেখল এরপরে আর এখানে থাকা যায় না। ও ভাবছে কানাই কাদের কথা বলছিল যারা ওর কাছ থেকে টাকা চাইত। ও কানাঘুষো শুনেছে ওদের সুটিয়ার ওদিকে নতুন একটা দল তৈরি হয়েছে, যারা নিয়মিত তোলা তুলছে। সুটিয়ার পার্শ্ববর্তী সমস্ত অঞ্চলে যারা রাখি মালের ব্যবসা করে পয়সা করেছে, তাদের কাছে ওরা পয়সা দাবি করে বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে। কানাইও তো রাখি মালের ব্যবসা করত, তাহলে ওর কাছেও কি নতুন দল তোলা চেয়েছিল, আর কানাই সেটা দেয়নি বলে ওকে কি ওরা পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিল?

এইসব অনেক প্রশ্ন বরুণের মনে। কিন্তু উত্তর নেই। তাই বলে তো আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। ওকে খোঁজখবর যে করতেই হবে। এমনি ওর সঙ্গে এই ব্যাপারে সরাসরি কেউ কথা বলেনি, কিন্তু চায়ের দোকানে, বাজারে আলোচনায় ও এই তোলাবাজদের কথা শুনেছে। কিন্তু ওকে জানতে হবে এই তোলা তুলছে কারা। ও ভাবে সেটা জানতে গেলে সবচেয়ে ভালো হয় ওর এলাকায় যারা রাখি মালের ব্যবসা করে, তাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে।

ও জানে ওদের এলাকায় কার্তিকদা রাখি মালের একজন বড়ো ব্যবসাদার। অবশ্য ও কি আর ওর সঙ্গে বলবে যে ওকে কেউ বাধ্য করেছে কিনা টাকা দিতে বা ও নিজে কোনো টাকা দিয়েছে কি না?

ও সোজা কার্তিকদার বাড়ি গিয়েছে। বাড়ির দরজা খোলা, ও ঢুকে পড়ে। সুটিয়ার সব বাড়িতেই ওর অবাধ প্রবেশাধিকার। ও ডাকে— কার্তিকদা-ও কার্তিকদা, বাড়ি আছ?

—হ্যাঁ, কে?

—আমি বরুণ।

—ও বরুণ, ভেতরে আয়।

বরুণকে নিয়ে এলাকার সবারই বেশ গর্ব। মাস্টারি পেয়ে ও মনে হয় নিজের জন্য কিছু করেনি। যেখানেই যার বিপদ বরুণ সেখানে। কার্তিকেরও বেশ ভালো লাগল বরুণ ওর বাড়িতে আসায়।

—হ্যাঁ বরুণ, বল কী মনে করে?

—বলছি, তোমার কাছে কেউ কোনো টাকা চেয়েছে?

—কেন বল তো, হঠাৎ করে এ-কথা জিজ্ঞাসা করছিস কেন?

—না, শুনলাম আমাদের এখানে যারা ব্যবসা করছে তাদের কাছ থেকে কয়েকজন ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। তাই ভাবলাম কার্তিকদাও তো ভালো ব্যবসা করছে, দাদার কাছেই আগে জিজ্ঞাসা করা যাক এরকম কোনো ঘটনা ঘটছে কিনা।

কার্তিক কিছুসময় চুপ করে থাকে। সুকুমারের দলবল ওর কাছ থেকে টাকাও নিয়েছে আবার প্রতিমাসে টাকা চায়, তারপর আবার বলে রেখেছে কাউকে জানালে জানে মেরে দেব। কিন্তু বরুণের কাছে মিথ্যা কথা বলবে কী করে, বরুণ নিজে যে একজন সত্যের পূজারি, ওকে মিথ্যে কথা বললে যে নিজেকেই ছোটো করা হয়। তবুও কার্তিক ভাবতে থাকে ও কী করবে, সত্যি কথা বলে দেবে, নাকি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আপাতত সুকুমারদের আতঙ্ক থেকে বাঁচবে।

কার্তিকদার চুপ করে থাকা দেখে বরুণ যেন কিছু একটা বুঝে নেয়। ও বলে— কার্তিকদা, আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে তোমার কোনো অসুবিধা থাকলে, আমায় জানাতে হবে না, আমি কিছু মনে করব না। মানুষের এক এক সময় এক এক রকম অসুবিধা থাকতেই পারে।

—বুঝলি বরুণ, আমি তোকে তোর প্রশ্নের উত্তরে যা বলব, তুই সেটা আবার কারো সঙ্গে বলে ফেলিস না।

—না, আমি বলব না, সে বিশ্বাস তুমি আমার ওপর রাখতে পার। তুমি নির্ভয়ে আমার সঙ্গে সব কথা খুলে বলতে পার।

কার্তিকও যেন বরুণের কথায় একটু ভরসা পায়। বাড়িতে সব কথা ও রমার সঙ্গে খুলে বলতে পারে না। ও একেতে নার্ভাস, তারপর এসব শুনলে প্রচণ্ড টেনশন করে। ও বলতে লাগে— শোন বরুণ, কিছুদিন আগে গোবরডাঙা থেকে সুটিয়ায় আসার পথে কয়েকজন পথ আটকে টাকা দাবি করে।

—কত টাকা?

—পঞ্চাশ হাজার।

—তুমি কি সেই টাকা দিয়ে দিয়েছ?

—হ্যাঁ, দিয়ে দিয়েছি।

—ইস, সে তো অনেকটা টাকা, তুমি ওদের কথায় একসঙ্গে অত টাকা দিয়ে দিলে?

—কী করি বল, ওরা যে বন্দুক উঁচিয়ে ভয় দেখাল, টাকা না দিলে গুলি করে মারবে।

—কারা টাকা নিল তোমার কাছ থেকে?

—ওই তো সুকুমার, বোঁচা, রাজেন, ভন্তু ওরা।

—তোমার কী মনে হয়, টাকা না দিলে ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারত, না কি ওরা এমনি ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছিল?

—না রে বরুণ, ওদের চোখেমুখে হিংস্রতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। তাও আমি ঠিক করেছিলাম, টাকাটা দেব না, কিন্তু তোর বউদি এমন জোরাজুরি করল, আমি আর টাকাটা না দিয়ে পারলাম না।

—আচ্ছা কার্তিকদা, বলদেঘাটার কানাই তো তোমার মতোই রাখি মালের ব্যবসা করত, ওর সঙ্গে কি তোমার কোনো যোগাযোগ ছিল?

—হ্যাঁ, সে তো থাকবেই, একই বিজনেস, একই এলাকার লোক যোগাযোগ না থাকলে চলবে? তা তুই হঠাৎ কানাইয়ের কথা বলছিস কেন, কী হয়েছে ওর?

—ওকে ক-দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর কাছেও মনে হয় এই এরাই টাকা দাবি করেছিল।

—ও, তাহলে মনে হয় ও দেয়নি। কানাই প্রচণ্ড সাহসী ছেলে, কেউ জোর করে ভয় দেখিয়ে ওকে দিয়ে কোনো কিছু করাতে পারত না।

—তোমার সঙ্গে শেষ কবে ওর দেখা হয়?

কার্তিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মনে করার চেষ্টা করে ওর সঙ্গে কানাইয়ের শেষ কবে দেখা হয়েছিল। ওর মনে পড়ে। ক-দিন আগে ও চাঁদপাড়ায় যাচ্ছিল, সেইসময় গাইঘাটা থানার সামনে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বরুণকে সেটা ও বলে। বরুণ তাই শুনে প্রশ্ন করল— তখন তোমার সঙ্গে কানাইয়ের কোনো বিষয়ে কোনো কথা হয়নি?

—হ্যাঁ, হয়েছিল।

—কী নিয়ে তোমাদের কথা হয়েছিল, মনে আছে?

—এমনি কিছু না, আমি ওকে ওখানে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী ব্যাপার, তুই এখানে কী করছিস?

—ও কী উত্তর দিয়েছিল?

—ও বলেছিল থানায় ওর কী যেন একটা দরকার আছে।

—কী দরকার সেটা বলেনি?

—না, সেটা আমিও জিজ্ঞাসা করিনি, ও নিজেও কিছু বলেনি।

—ও, তাহলে মনে হচ্ছে কানাই ওর কাছে টাকা চাওয়ার কথা জানাতেই থানায় গিয়েছিল। আর পুলিশগুলো ওকে নিরাপত্তা তো দিলই না, উলটে ওর কী ক্ষতি করল কে জানে।

বরুণ ভাবে তাহলে কানাই যদি থানায় গিয়েই থাকে তাহলে অফিসার কেন ব্যাপারটা চেপে গেলেন, পুরো ব্যাপারটাই ওর কাছে ধোঁয়াশার মতো। ও ভাবে আবার ও থানায় যাবে। সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করবে— কানাই কীজন্যে থানায় গিয়েছিল।

* * *

যেমন ভাবা সেরকম কাজ। বরুণ সোজা গাইঘাটা থানায়। থানার অফিসার ওকে দেখেই ক্ষিপ্ত—কী হল, আপনি আবার এখানে এসেছেন কেন? আপনাকে তো বলা হল, কোনো খোঁজ পাওয়া গেলে বাড়িতে খবর দেওয়া হবে।

—না, আমি সেজন্যে আসিনি।

—তাহলে কীজন্যে এসেছেন?

—অন্য একটা দরকারে।

—কী দরকার?

—কানাই ওর নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে থানায় এসেছিল, সে খবর আমি পেয়েছি। আপনি এখন বলুন ও কীজন্যে সেইসময় থানায় এসেছিল?

—আপনি কী মনে করেছেন বলুন তো, যখন-তখন এসে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদবেন, আর আমরা সব কাজ বন্ধ করে সেইসব শুনব, এটা আপনি ভাবলেন কী করে?

—তার মানে কী বলতে চাইছেন আপনি, কানাই ক-দিন আগে থানায় ঢোকেনি?

—না, ঢোকেনি। আর এই নিয়ে বেশি কথা বলতে এলে কিন্তু আপনাকে সরকারি কাজে বিঘ্ন ঘটানোর অপরাধে অ্যারেস্ট করে লক-আপে পুরে দেব, তখন বুঝবেন মজা।

—আপনি কী বোঝাবেন, কানাই কী করে নিখোঁজ হল সেটা আপনারা ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে যেতে চাইছেন, নিশ্চয়ই আপনাদের কোনো স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত। আমি কিন্তু এর সবকিছু খুঁজে বার করব, তখন কে কাকে মজা দেখায় দেখব।

এই বলে বরুণ হন্তদন্ত হয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে। অফিসারও ভাবছেন গতিক সুবিধের নয়। তিনি সুকুমারের সঙ্গে দেখা করেন— সুকুমার, তোদের সুটিয়ার বরুণ মাস্টার কিন্তু কানাইয়ের ব্যাপারে খুব লাফাচ্ছে।

—কেন, ও কী করল?

—কানাই যে থানায় এসেছিল, সেটা ও জানতে পেরেছে। থানায় এসে তাই নিয়ে চার্জ করছিল।

—আপনি কী বললেন?

—আমি স্বীকার করিনি। তবে ওকে একটু কড়কেও দিয়েছি।

—আমিও একটু কড়কে দেব না কি?

—খবরদার না, কানাইয়ের ব্যাপারটা এখনও কেউ জানে না। এরমধ্যে কানাইয়ের ব্যাপার নিয়ে ও একটু ঘোরাঘুরি করছে, এখন তুই যদি ওকে কড়কে দিতে যাস, তাহলে কিন্তু আর একটা ফালতু ঝামেলায় জড়াবি। এখন তুই তোর তোলাবাজি ক-দিন বরং একটু বন্ধ রাখ। তারপর সব শান্ত হয়ে গেলে আবার ফিল্ডে নেমে পড়িস।

সুকুমার বেশ গাঁইগুই করলেও অফিসারের কড়া নির্দেশ উপেক্ষা করতে পারল না। অফিসার ওকে অনেক দিন থেকে শেল্টার দেয়, ওর নির্দেশ না শুনলে কোনো বড়ো বিপদে জড়ালে ও আর অফিসারের ছত্রছায়া পাবে না। আবার ও ভাবে শালা অফিসার তার টাকায়, এই সুকুমারের টাকায় ফুলে ফেঁপে উঠছে, আবার ওকেই পরামর্শ দিচ্ছে ক-দিন তোলাবাজি বন্ধ রাখতে। তা তোলাবাজি বন্ধ রাখলে অফিসারের মতো শয়তানের তোলা কোথা থেকে আসবে? ওর কাছে এই পুলিশ অফিসার স্রেফ একটা হারামখোর, আর কিছু নয়।

* * *

বরুণ তারপরেও এই কানাইয়ের ব্যাপার নিয়ে খুব ছোটাছুটি করে কিন্তু বন্যা ওকে থামিয়ে দিল। প্রতি বছরের বর্ষায় সুটিয়া বা তার আশেপাশের অঞ্চল জলমগ্ন হয়, প্লাবিত হয়, লোকজনও গৃহবন্দি হয়। কিন্তু এই দু-হাজার সালে এ কী প্রলয় এল! এবারে বৃষ্টির পরিমাণ বেশ বেশি। এক-একবার বৃষ্টি শুরু হলে অঝোরে হচ্ছে, আর থামতেই চায় না। সবসময় আকাশে কালো মেঘ আর সজোরে কান ফাটানো আওয়াজ সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলকানি। ব্যাঙগুলোও সামনে ঘ্যাঁঙর-ঘ্যাঁঙ করে ডেকে চলেছে।

হরিমোহনকাকা চ্যাঁচাচ্ছে—ওরে, কে কোথায় আছিস সবাই পালা, বানের জল আসছে। সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

এমনি কিছুদিন আগে থেকেই ওদের কাছে খবর ছিল বনগাঁ, বাগদা, চাঁদপাড়া সব ভেসে যাচ্ছে। লোকজন সব বড়ো বড়ো ইস্কুলে উঠে পড়েছে। সুটিয়ার লোকজনও মনে মনে তৈরি হচ্ছিল, এই বুঝি বানের জল সুটিয়ায় ঢুকবে। হরিমোহনকাকার কথায় সেই বানই এবার এল।

ইছামতি, যমুনা এই অঞ্চলের দুই নদীই মজে গিয়েছে। দুটোরই পেট পুরো থকথকে পলিতে ভর্তি। অতিবৃষ্টির জল মাঠঘাট ভর্তি করে নদীতে পড়তে চাইছে, কিন্তু অগভীর ইছামতি আর যমুনার যে সে সাধ্য আর নেই।

হু-হু করে জল ঢুকছে সুটিয়া, বাদেখাঁটুরা, ঠাকুরনগর, চাঁদপাড়া, ঝাউডাঙা, মানিকহীরাতে। অসংখ্য মানুষ গৃহহারা হচ্ছে। অনেকে আবার গৃহবন্দি। মানুষজনের প্রচণ্ড দুর্দশা। কোনো রাস্তা জেগে নেই। মানুষজনের পেটে খাবার জুটছে না, ট্রেন বন্ধ, সব গাড়ি বন্ধ। কে জোগাবে ইস্কুলবাড়িতে আটকে পড়া মানুষের মুখে অন্ন?

বরুণের দাদারা বারবার খবর পাঠিয়েছে— ভাই, তুই বাবা-মাকে নিয়ে কলকাতায় চলে আয়, এখান থেকে ক-দিন ইস্কুল করিস, তারপর সুটিয়ায় জল নেমে গেলে আবার ওখানে যাস।

বরুণ সেই প্রস্তাবে কিছুতেই রাজি হয়নি। ও বরং বাবা-মাকে কলকাতায় দাদার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে বন্যার ত্রাণের কাজে পুরোপুরি ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একটা বারমুডা পরে খালি গায়ে ও নিজেই নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ত্রাণসামগ্রী দিতে।

সেদিনকে চাঁদপাড়া থেকে কয়েকজন এসেছে ত্রাণ নিয়ে। বরুণ তাদের কয়েকজনকে নৌকায় তুলে চলল ত্রাণ নিয়ে। গামছাটা মাথায় পাগড়ি করে বেঁধে নিজেই দাঁড় চালাচ্ছে। হঠাৎ ও খেয়াল করে দেখে— আরে, নৌকায় যে তার নিজের স্যার আর ওঁনার স্ত্রী যাচ্ছেন।

বরুণ বলে— স্যার, চিনতে পারছেন?

স্যার নৌকার মাঝিকে ঠিকমতো চিনতে পারলেন না, বয়স হয়েছে, আর ছোটোবেলার মুখ বড়ো হয়ে পালটে যায়, তাই মনে রাখা বেশ দুঃসাধ্য। স্যারের মৌনতা বলে দেয় স্যার চিনতে পারেননি।

—স্যার, আমি বরুণ।

এইবার স্যারের মনে পড়ে। বরুণ তো তাঁর খুব প্রিয় ছাত্র ছিল। কতদিন বাড়িতে রেখে ওকে পড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু ও তো ছোটোবেলায় বেশ পড়াশোনায় ভালো ছিল, আজকে ও মাঝির কাজ করছে কেন, তাহলে কি ও আর পড়াশুনো করেনি কোনো কারণে? এমনিতে ওদের খুব অভাব ছিল। তাই মাঝির কাজ করে পেট চালায়। স্যার তবুও নিশ্চিত হতে পারেন না। উনি জিজ্ঞাসা করেন—তা বরুণ, তুমি এখন এইভাবে?

—হ্যাঁ স্যার, আমি এখন ক-দিন এই নৌকাই চালাচ্ছি।

—কেন, তুমি আর কিছু করো না?

—হ্যাঁ, আমি শিয়ালদার একটা স্কুলে শিক্ষকতা করি।

—বাঃ! তাহলে তুমি এখন এখানে এইভাবে কেন?

স্যারের গলায় বিস্ময়ের সুর। বরুণও বুঝতে পারে স্যার তাকে ওই মাঝির বেশে দেখে বেশ অবাক হয়েছেন। ও স্যারের ভুল ভাঙিয়ে দেয়— না স্যার, এখন এই বন্যার ক-দিন আমি স্কুলে যাচ্ছি না, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যে আমি এই নৌকায় করে ত্রাণ পৌঁছে দেই।

স্যার তাঁর নিজের ছাত্রের এই ভূমিকায় খুব খুশি হন। তিনি প্রাণভরে বরুণকে আশীর্বাদ করেন—এইভাবেই তুমি মানুষের দুঃখে কষ্টে পাশে দাঁড়াও।

তারপর নৌকায় স্যারের সঙ্গে বরুণের কত কথা হয়। স্যার বলেন—বরুণ, এখনও তুই ওইভাবে গাছে উঠে নারকেল পাড়িস?

—না স্যার, অত সময় হয়ে ওঠে না। তবে স্যার, মাঝে মাঝে মনে হয় আবার ছোট্টটি হয়ে যাই, আবার আপনার জন্যে টপ করে নারকেল গাছে উঠে নারকেল পেড়ে দিই।

* * *

এদিকে বৃষ্টি বেশ ক-দিন থেমে গিয়েছে। কিন্তু জল নামার কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। উলটে আবার অন্যদিকের জলের তোড় ওদেরকে আরও সমস্যায় ফেলছে। বরুণ বুঝতে পেরেছে এই জল বের করার কোনো পথ না বার করলে কিছুতেই এখানকার বন্যা সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফি-বছরই এইসব এলাকা ভাসবে।

বরুণ আরও কয়েকজনকে নিয়ে টিপির বাঁধ দেখতে যায়। চারঘাট অঞ্চলে এই টিপির বাঁধ। বরুণের মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে যায়— এই টিপির বাঁধের কিছু অংশ কেটে দিলেই তো সুটিয়া-গোবরডাঙা অঞ্চলের জমা জল বেরিয়ে যায়, এইসব অঞ্চলে যে হাজার-হাজার বিঘে জমি বন্যার জমা জলে প্রায় সারাবছর চাষের অযোগ্য হয়ে থাকে, সেখানেও নতুন করে চাষাবাদ সম্ভব হবে। বরুণের এই প্রস্তাব সবারই মনে ধরে। এলাকার সবাই খুব খুশি। সবাই ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে টিপির বাঁধ কাটতে। বরুণ সবার আগে।

বরুণের হাতেও একটা কোদাল। এদিকে টিপির বাঁধে এইপাশ থেকে জল খুব চাপ দিচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ওই বাঁধের মাটি কাটা বেশ কষ্টকর। যেকোনো সময় জলের তোড়ে ভেসে যে কোথায় যাবে, তার কোনো হদিশও নেই। অনেকেই প্রাণভয়ে পিছিয়ে আসছে। বরুণ বলছে— ও জগন্নাথ কাকা, কী হল কোদাল চালান, পিছিয়ে গেলে হবে কী করে?

—না বরুণ, আমার ভয় লাগছে জলের যা তোড় যেকোনো সময় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

বরুণ তবুও জোর রাখে— এই দেখুন, আমি তো কাটছি, আমার কিছু হচ্ছে? আপনিও কোদাল চালান, কিছু হবে না।

কিন্তু জগন্নাথ কাকা পিছোয়। নগেন, হারাধন, সমীর এক এক করে সবাই থমকে যায়। শুধু বরুণের কোদাল চলছে অবিরাম। কোনোদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সমীর চ্যাঁচাচ্ছে—ও বরুণদা সাবধান, দেখো যেন ভেসে যেও না।

প্রচণ্ড জোরে জল গর্জাচ্ছে। সমীরের কোনো কথা বরুণের কানে ঢুকছে না। ও বলে— তুই কী বলছিস সমীর, আমার কানে আসছে না, আর একটু জোরে বল।

সমীর গলাটা আরও উঁচুতে তুলে চ্যাঁচায়— সাবধান বরুণদা, জলের তোড় খুব বেশি এখন।

বরুণ কী বুঝল কে জানে, ও হাত তুলে সাড়া দেয়। ওর অন্যদিকে কোনো হুঁশ নেই। ও ভাবছে একটু কষ্ট হলেও আর কয়েক কোদাল মাটি কাটতে পারলেই কেল্লা ফতে। এপারের জমা জল হু-হু করে ওপারে বেরিয়ে যাবে। সুটিয়া-গোবরডাঙার সব অঞ্চল বন্যামুক্ত হবে। ও আরও জোরে কোদাল চালায়। সবাই ভয় পেয়ে গেলেও ওকে ভয় পেলে চলবে না। ও গায়ে আরও একটু জোর দিয়ে কোদাল চালাল। আর তখনই ঘটল ঘটনাটা। এপারের জমা জল গর্জন করে উঠে ওপারে যাওয়া শুরু করল বরুণের কোদাল চালানো পথ দিয়ে। কিন্তু সেই জলের তোড় বরুণকে রেহাই দিল না। ওকেও একসঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে চলল অজানার দেশে।

সবাই আনন্দ করবে কী, বরুণকে এইভাবে ভেসে যেতে দেখে সবাই কপাল চাপড়াচ্ছে। একটা তাজা ছেলে এইভাবে ভেসে গেল, ওরা কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না, সবাই টিপির বাঁধের ওপর বসে হা-হুতাশ করছে। শুধু সমীর ছুটল ওই জলের তোড় লক্ষ্য করে।

সমীর বলছে— না, বরুণদাকে এইভাবে জলের তোড় আমাদের থেকে কোনোভাবেই কেড়ে নিতে পারবে না। তোমরা দেখো বরুণদা ঠিক ফিরে আসবে।

ও টিপির বাঁধ ধরে এগিয়ে চলে। অনেক দূরেই ও হাঁটল। কিন্তু কোথায় বরুণদা? অনেক দূরই তো ও চলে এসেছে। শুধু চারপাশে বাঁধভাঙা জলরাশির উচ্ছ্বাস। ওই স্রোতে কি বরুণদা নিজেকে বাঁচাতে পারবে? ও তবুও আশা ছাড়ে না। পায়ে পায়ে ও এগিয়ে চলে। পিছন ফিরে দেখে ও একা নয়, এক এক করে সবাই একবুক আশা নিয়ে টিপির বাঁধ ধরে এগোচ্ছে। ও নিজেও যেন এই দৃশ্য দেখে বুকে বল পায়।

সমীর এগিয়ে চলে। হঠাৎ ওর নজর যায় ওই তো কে যেন একটা পাড়ের ধারের একটা গাছের ডাল ধরে ঝুলে আছে। ওর বুকে আশা বেড়ে যায়। ও আরও এগিয়ে যায়। ও ছুটতে থাকে। হ্যাঁ, ওই তো ওদের সবার বরুণদা। গাছের ডাল ধরে ঝুলে আছে। সমীর চ্যাঁচায় — ও বরুণদা, আর চিন্তা নেই, এই দেখো আমরা এসে গিয়েছি।

বরুণ তখন এক রণক্লান্ত সৈনিক। সমীরের পাশাপাশি আরও অনেকে জলে ঝাঁপ দেয়। তারা বরুণকে আস্তে আস্তে ধরে পাড়ে নিয়ে আসে। সবাই যেন বরুণকে দেখে বুকে বল পেয়েছে। বরুণ তখন এতটাই ক্লান্ত যে একদম কথা বলার অবস্থায় নেই কেবল বলে—আমার জন্যে তোমাদের আবার এতটা আসতে হল।

—থাক বাবা, তুমি যে বেঁচে ফিরেছ, তাই আমাদের কাছে অনেক, তুমি ঈশ্বরের বরপুত্র, তোমাকে আমরা কোনোভাবেই হারাতে চাই না।

সমীর কাঁদতে কাঁদতে বলে—বরুণদা, তুমি কী গো! একটু সাবধান হবে এবার থেকে, তোমার একটা কিছু হয়ে গেলে আমাদের কী হবে বলো তো।

বরুণ কোনো উত্তর দেয় না, ওর ক্লান্ত মুখে তখন এক স্মিত হাসি। ওর শরীর আর চলছে না, ও মাটি মায়ের কোলে শয্যা নেয়। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

* * *

টিপির বাঁধ এলাকায় অনেক মাছের ঘেরি আর ইটভাটা আছে। টিপির বাঁধ বরুণের নেতৃত্বে কেটে দেওয়ায় ওরাও খুব ক্ষুব্ধ। ওদের অনেক অনেক মাছ নষ্ট হয়েছে। লাখ লাখ টাকার বাগদা চিংড়ির কারবার ওদের সব বাঁধভাঙা জলে বেরিয়ে গিয়েছে।

সুখেন সামন্ত বড়ো এক ঘেরির মালিক, ও সমানে গজরাচ্ছে এই কাণ্ডে। কোথাকার কোন বরুণ মাস্টার সে কিনা ওদের এই লাখ লাখ টাকার মাছ নষ্ট করে দিল। ও আশেপাশের সব ঘেরি মালিক আর ইটভাটা মালিকদের খবর দিল। সবাই একদিন চারঘাটের পাশে কাঁচদহে ইসমাইল মোল্লার বাড়িতে দেখা করল।

সুখেন সামন্ত বলছে— না, এত ক্ষতি কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এর বিহিত করতে হবেই। আর এরপর থেকে টিপির বাঁধ এরকম কাটা থাকলে আমরা আর কোনোদিনও ঘেরি করতে পারব না। আমাদের লাখ লাখ টাকার বিজনেসে লালবাতি জ্বলবে।

হাফেজ শেখ বলল— আমাদের ইটভাটাগুলোও যে সব শেষ, এখন কীভাবে চলবে বলো।

ইসমাইল মোল্লা বলল— ওই টিপির বাঁধ আমরা কিছুতেই এইভাবে কাটতে দেব না। যে করে হোক সুটিয়ার ওদের আমরা আটকাবই।

অভিজ্ঞ সুখেন সামন্তর মন্তব্য— এক্ষুনি নয়, এখন বন্যার সময়, অনেক মানুষের সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে ওই বাঁধকাটা নিয়ে। এখন যদি আমরা ওই টিপির বাঁধ জুড়ে দেই, তাহলে ওরা সবাই মিলে ঝাঁপাবে, তখন কিন্তু আমাদের আর কিছু করার থাকবে না।

—তাহলে এখন আমরা কী করব?

—শুধু অপেক্ষা করা, বন্যার পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা টিপির বাঁধ আবার আটকে দেব। তখন ভালো করে ঘেরি করা যাবে।

—কিন্তু তখনও যদি ওরা বাধা দেয়?

—তার জন্যে আমাদেরও প্ল্যান কষতে হবে। তখন আমরা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলব।

সবাই সমস্বরে জানতে চায়— সেটা কীভাবে হবে?

—সুটিয়ার মানুষরা যেমন আমাদের ব্যবসা শেষ করে দিচ্ছে এই টিপির বাঁধ কেটে, আমরাও তেমনি সুটিয়ারই কয়েকজনকে ঠিক করব যারা ওদের এই টিপির বাঁধ কিছুতেই কাটতে দেবে না।

—এমন লোক কে আছে সুটিয়ায়?

—কেন সুকুমার। ওই এলাকার উঠতি মস্তান, ওকে কাজ বুঝিয়ে দিলেই ঠিক উদ্ধার করে দেবে।

সবাই এই পরিকল্পনাটা মেনে নিল। আর তো ক-টা দিন, বন্যার জল সরতে শুরু করেছে। আর কিছুদিন বাদেই সব পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাবে, তখন সুকুমারকে ফিল্ডে নামিয়ে দেওয়া যাবে।

* * *

বরুণ আশেপাশের গ্রামের সবাইকে নিয়ে বসেছে। এবারে বন্যার জল টিপির বাঁধ কেটে বার করে দেওয়া গিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে আবার বন্যা হলে কী হবে? এর তো একটা স্থায়ী সমাধান চাই। গাজনার মিহিরদা বলল—বরুণ, তুই কিছু ভেবেছিস এই ব্যাপারে?

—হ্যাঁ, একটা কথা আমার মনে আসছে।

—কী কথা?

—তোমরা লক্ষ করেছ কিনা জানি না, আমি ব্যাপারটা দেখেছি যে যমুনা আর ইছামতি সোজা দু-দিক থেকে এসে ১৮০ ডিগ্রিতে মিলেছে, যার ফলে দুটো নদীর জল দু-দিক থেকে চাপ দিয়ে বন্যা ডেকে আনছে।

অনেকেই ব্যাপারটা লক্ষ করেছে কিন্তু কেউ বরুণের মতো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবেনি। এখন বরুণ বলছে— ওই দুটো নদীকে যদি ওইভাবে মিশতে না দেওয়া যায়, বরং যমুনাকে টিপির ওখান দিয়ে সোজা ইছামতিতে মেশানো যায়, তাহলে বন্যার সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে।

বন্যা কমার কথা শোনায় সবাই এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব আগ্রহী। সবাই বলছে— তাহলে ওইভাবেই যমুনাকে সোজা টেনে নিয়ে গিয়ে ইছামতিকে মেশানো হোক। অনেক চাষের জমিও তাহলে বন্যার কবল থেকে বাঁচবে।

কিন্তু ওইভাবে যমুনাকে কে মেশাবে ইছামতিতে? এই প্রশ্ন যখন সবার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, তখন উত্তর বরুণ দিল— কেন সরকার করবে এই কাজ, আমাদের সরকারের কাছে যেতে হবে। সেচ দফতরে সবাই সই করে আবেদন করতে হবে।

সেইমতো সবাই সইসাবুদ করে আবেদনপত্র সেচ দফতরে জমা দিল। সেচ দফতর থেকে এনকোয়ারিতে আসবে খুব তাড়াতাড়ি। সুটিয়া থেকে শুরু করে আশপাশের সব গ্রামের লোকজন খুব আনন্দিত এ খবরে। বন্যার সমস্যা থেকে এবার সবার মুক্তি ঘটবে।

সেচ দফতর থেকে এনকোয়ারির লোকজন এসেছে। ওদের সঙ্গে আবার বরুণ এবং আরও অনেকে রয়েছে। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এবার ওরা টিপির বাঁধ দেখতে গিয়েছে। কিন্তু এখানে এত লোক কারা? সবাই এখানে কী করছে?

বরুণ দেখতে পায় অনেক পুরুষ এবং মহিলা ওখানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কী আশ্চর্য টিপির বাঁধের কাটা অংশটুকু ওরা ভরাট করে দিয়েছে। ওরা চিৎকার করছে— টিপির বাঁধ কেটে আমাদের পেটের ভাত কেড়ে নেওয়া চলবে না।

ওদের হাতে পোস্টার— অসংখ্য মানুষ যে ঘেরির ওপর নির্ভর করে আছে, তাদেরকে টিপির বাঁধ কেটে দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে না।

সেচ দফতরের লোকেরা বরুণদের সঙ্গে ওখানে পৌঁছোলে ওদের ঘিরে ধরে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। সেচ দফতরের লোকেদের ওরা ঘিরে ফেলেছে, ধাক্কাধাক্কিও শুরু হয়ে গিয়েছে। সেচ দফতরের লোকেরা বিপদ বুঝে অন্য সুর ধরেছে— আপনারা এইভাবে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট না করে শান্তিপূর্ণভাবে আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জানান।

ওপাশ থেকে একটা মিলিত চিৎকার শোনা গেল— আপনারা এখানে এসেছেন কেন, আপনারা এখান থেকে এক্ষুনি ফেরত চলে যান, নাহলে কিন্তু বিপদ হবে। টিপির বাঁধ আমরা কিছুতেই কাটতে দেব না। আপনারা জোর করে এই টিপির বাঁধ কাটতে এলে এলাকায় কিন্তু রক্তগঙ্গা বইবে।

—আপনারা কারা?

—আমরা এখানকার সব মাছের ঘেরি আর ইটভাটায় কাজ করি। এই বাঁধ কেটে দিলে এখানে সব ঘেরি আর ইটভাটা নষ্ট হয়ে যাবে।

—কিন্তু এই বাঁধ না কাটতে দিলে যে সুটিয়া, কুটিপাড়া, গাজনা, বিষ্ণুপুর পূর্ব ও মধ্য বারাসাতের মতো কত গ্রাম বন্যার জলে ডুবে থাকবে, তাদের কী হবে?

—সেসব আমরা জানি না, আপনারা এই বাঁধ না কেটে অন্য ব্যবস্থা করুন। এই বাঁধ কেটে দিলে যে আবার এপারের চারঘাট, কাঁচদহ, কপিলেশ্বরপুরের মতো অনেক গ্রামই যে বন্যার কবলে পড়বে, সেদিকে আপনারা কি কিছু ভেবেছেন?

সেচ দফতরের লোকেরা বলল— এখানে প্রচণ্ড ক্ষোভ-বিক্ষোভ রয়েছে, এখন এখানে এই বাঁধ কাটার কাজ কিছুতেই করা যাবে না, তাহলে এলাকায় অশান্তি ছড়াবে। আমরা বরং পরে অন্য আর একদিন আসব।

বরুণ বুঝতে পারে এই সেচ দফতরের দল যদি একবার চলে গিয়ে এই বিক্ষোভের কথা ওপর তলায় জানায়, তাহলে এই বাঁধ কেটে নতুন খাল কিছুতেই করা যাবে না, ফি-বছরই এইসব এলাকা বর্ষায় জলের তলায় চলে যাবে, বৃষ্টি একটু বেশি হলে বন্যা হবে, তা কিছুতেই রোখা যাবে না। বরুণ মরিয়া হয়ে সেচ দফতরের অফিসারদের পথ আটকায়— স্যার, আপনারা এইভাবে চলে যাবেন না।

—কিন্তু এখানে এত ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলে আমরা কাজ করব কী করে?

—এসব ক্ষোভ-বিক্ষোভ কারা করছে সেটা এবার দেখুন।

—কারা করছে এসব?

—কারা আবার, এখানকার সব মাছের ঘেরি আর ইটভাটার কাজ করা শ্রমিকরা, আবার কিছু কিছু বাইরের লোক, যাদের এখানে নিজস্ব স্বার্থ আছে।

—কিন্তু এদের এই বিপুল বিরুদ্ধ মতকে আমরা কী করে অস্বীকার করি বলুন তো, তারপর এতগুলো লোকের ভাতের থালায় টান মারা, সেটাও কি ঠিক হবে?

—এই জনমত তুলছে কারা, সেটা আগে দেখুন। এই যে মাছের ঘেরি, ইটভাটার কথা এরা বলছে, ওগুলো সব ক-টাই বেআইনি। আর এই বেআইনি মাছের ঘেরি আর ইটভাটাগুলোর জন্যে আমাদের মতো অসংখ্য গ্রামের বন্যা হবে, সেখানকার চাষের জমি জলের তলায় বুড়ে থাকবে। কৃষকরা চাষ না করতে পেরে না খেতে পেয়ে মরবে, সেটা আপনারা তাহলে মেনে নিচ্ছেন?

বরুণের যুক্তিপূর্ণ কথায় সেচ দফতরের অফিসাররা বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। সেচ দফতরের অফিসাররা আবার বরুণের সঙ্গে এইভাবে কথা বলছে দেখে ওপাশ থেকে কয়েকজন এগিয়ে আসে। ওরা সেচ দফতরের এনকোয়ারির লোকেদের বলে— কী হল, এখনও আপনারা এখানে গুজুর-গুজুর, ফুসুর-ফুসুর করছেন কেন, শিগগির এখান থেকে বেরিয়ে পড়ুন, নাহলে কিন্তু এই বিক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ ভাবে চলবে না।

ওদের কথায় হুমকির ছাপ স্পষ্ট। বরুণ দেখে ওদের মধ্যে সুটিয়ার সুকুমারও আছে। ও সুকুমারকে উদ্দেশ্য করে বলে— কী হল সুকুমার, তুই যে এখানে, তোর বাড়িতেও তো এখনও বন্যার জল রয়েছে, আর তুই সেই সুটিয়া থেকে এখানে এসে এদের হয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিস!

—এই ঘেরিতে আমি কাজ করি, তোরা সবাই মিলে টিপির বাঁধ কেটে এই ঘেরি বন্ধ করে দিতে চাচ্ছিস, তখন আমরা খাব কী?

বরুণ বুঝতে পারে সুকুমার হচ্ছে এখানকার ভাড়াটে গুন্ডা। ওর হাত যে এখন বেশ লম্বা ওর বুঝতে অসুবিধা হয় না। কানাইয়ের মতো লোককে যে বিলকুল হাপিস করে দিতে পারে তার পক্ষে যে অসম্ভব কিছু নয় তাও জানে।

তার কিছু সময়ের মধ্যেই সুকুমাররা ধাক্কাধাক্কি শুরু করল। সেচ দফতরের অফিসাররা ওখান থেকে চলে গেল।

বরুণ খুব আপশোশ করছে— যা, আমাদের এই প্রচেষ্টা এমনভাবে ওরা ভেঙে দিল। এটাকে নতুনভাবে শুরু করতে আরও অনেক সময় লেগে যাবে।

বরুণ ভেঙে পড়ার ছেলে নয়। ও এই টিপির বাঁধ কাটবার জন্যে সব গ্রাম থেকে গণস্বাক্ষর তোলা শুরু করল, হাজারে-হাজারে মানুষ এক-একদিনে নিজেরাই এগিয়ে এসে আবেদনপত্রে স্বাক্ষর দিচ্ছে। বরুণ আবার নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ও আবার এলাকার সবাইকে বুঝিয়ে সরকারি দফতরে আরও একটা আবেদন করতে চাইছে। সবাইকে আবারও ডেকেছে।

মানিকহীরার ঝন্টু বলল—বরুণদা, বলো আমাদের সবাইকে ডাকার উদ্দেশ্য?

—বলছি, আমাদের এলাকায় এবারে যে বন্যা হল, তাতে আমাদের খুব শিক্ষা হয়েছে। সবার বাড়িতে জল ঢুকেছে, আমরা কোথাও যেতে পারিনি।

—কিন্তু আমরা যে পাঁচপোতা ইস্কুলে গিসলাম।

—সে ক-জন গিসলে বলতে পারো, তারপর পাঁচপোতা ইস্কুলে শুধু পাঁচপোতার লোক থাকবে, না আশেপাশের দু-পাঁচটা গ্রামের লোক থাকবে বলো তো?

—হ্যাঁ, বরুণ ঠিকই বলেছে, ওই ক-টা দিন আমাদের খুব কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আমরা এ-ব্যাপারে কী করতে পারি?

—আমরা সরকারের কাছে ফ্লাড রিলিফ সেন্টার তৈরি করে দেওয়ার জন্যে অবশ্যই আবেদন করতে পারি।

—কোথায় হবে সেটা?

—কেন, প্রতি গ্রামে একটা করে। যখনই বন্যা হবে স্থানীয় মানুষ সেখানে চলে যায়। বাথরুম-পায়খানাও অনেকগুলো থাকবে। যাতে অনেক লোক একসঙ্গে থাকলেও কোনো অসুবিধা না হয়।

—কিন্তু গ্রামে কোথায় হবে সেইসব বন্যার ত্রাণ শিবির?

—সেটা সরকারি দফতর বিশেষত বিডিও অফিস থেকেই ঠিক করা হয়। তবে ইস্কুলেই এই সেন্টার বেশি হয়। সারাবছর ওই ঘরগুলোতে ইস্কুলের পড়াশুনো হয়, শুধু বন্যা হলে কয়েক মাস ওখানে গ্রামের সবাই থাকবে।

—কিন্তু আবার যদি ওই ইটভাটা-মাছের ঘেরির লোকেরা বাধা দেয়?

—না-না, সেটা পারবে না, এবারে তো বাড়িগুলো আমাদের সবার নিজেদের গ্রামেই হবে, ওরা বাধা দেবে কোথা থেকে।

আর অন্যরা এবার হল্লায় মাতে— আসুক না বাধা দিতে, বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল।

* * *

এবারের বন্যা ত্রাণ শিবিরের বাড়ি নির্মাণের আবেদনপত্র গ্রাম ভিত্তিক। তাতে মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। সব গ্রামেই মানুষ নিজেরাই এগিয়ে এসে সই করে দিচ্ছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সই সংগ্রহের পালা শেষ। এবারে জমা দিতে হবে। কে যাবে জমা দিতে? সবারই মত বরুণ অবশ্যই যাবে, আর তার সঙ্গে আরও কয়েকজন যাওয়া যাবে।

সব গ্রামের আবেদনপত্রগুলো একসঙ্গে নিয়ে বরুণ চলল। একটা ম্যাটাডোর ভাড়া করা হয়েছে। তাতে প্রতি গ্রাম থেকে কয়েকজন আছে। ওরা প্রথমে ঠিক করেছিল বারাসাতে জেলা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দফতরে গিয়ে ওই আবেদনপত্রগুলো জমা দেবে। কিন্তু বরুণই বলল— না, বারাসাতে দিলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

সবারই তাই শুনে প্রশ্ন— তাহলে কোথায় জমা দেবে ওই চিঠিগুলো?

—আমাদের কলকাতায় গিয়ে সোজা রাইটার্সে মন্ত্রীর হাতে আবদেনপত্রগুলো যেমন তুলে দিতে হবে, তেমনি আমাদের অবস্থাটাও ওনাকে বোঝাতে হবে, কীভাবে এই বন্যাতে আমরা কষ্ট পেয়েছি তা বোঝাতে হবে।

ওরা সবাই হইহই করে রাইটার্সে গেল। মন্ত্রী প্রথমে রাজি হননি গ্রান্ট দিতে, তবে ওদের সবার কথায় মন্ত্রী কথা দিলেন— ঠিক আছে, আমি ব্যাপারটা দেখছি, তবে আপনারা যেভাবে আবেদন করেছেন, তাতে তো আর একটা ফ্লাড সেন্টার করলে হবে না, একসঙ্গে অনেকগুলো করতে হবে, তাতে বেশ ভালোই খরচা।

বরুণই কথা ধরল— না স্যার, এটা আমাদের জন্যে আপনাকে করতে হবেই, খুব দরকার।

—ঠিক আছে, আমি বললাম তো ব্যাপারটা দেখছি।

—স্যার, যাতে ব্যাপারটা একটু তাড়াতাড়ি হয় দেখবেন।

—সে দেখব, কিন্তু বুঝতেই পারছেন, সরকারি ব্যাপার, একটু দেরি হতেই পারে।

—তবুও স্যার, আপনি চেষ্টা করবেন।

বরুণরা মন্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, ওরা জানে মন্ত্রী একবার যখন আশ্বাস দিয়েছেন, নিশ্চয়ই কিছু একটা হবে। পূর্ব বারাসাতের অজয়কাকু বরুণকে জিজ্ঞাসা করল— কী বরুণ, তোর কি মনে হচ্ছে ফ্লাড সেন্টারের বাড়ি হবে তো?

—মন্ত্রী তো আশ্বাস দিলেন, কিন্তু সরকারি কাজে আশ্বাস দেওয়া আর কাজ হওয়ার মধ্যে যে আবার অনেক ফাঁক থাকে, সেটা মনে রাখতে হবে।

—আমিও সেটাই ভাবছি। আচ্ছা বরুণ, সব গ্রামেই কি ফ্লাড সেন্টার হবে, না কি একটা-দুটো গ্রামেই শুধু হবে?

—কাকু, আমার স্থির বিশ্বাস সব ক-টা গ্রামেই ফ্লাড সেন্টার হবে।

—কিন্তু সে তো অনেক টাকার ব্যাপার, এত সরকারি টাকা কি একসঙ্গে খরচ করবে?

—কেন খরচ করবে না, প্রত্যেকটা আবেদনই তো সরকারি নিয়ম মেনে করা, আর যে ক-টা গ্রাম থেকে আবেদন জমা পড়েছে, সব ক-টা গ্রামেই এবার বন্যার জল ঢুকেছিল। সব গ্রামের বাসিন্দাদেরই অন্য জায়গায় গিয়ে বন্যার হাত থেকে বাঁচতে হয়। সেইজন্যেই মনে হয় আমাদের সবকটা গ্রামেই ফ্লাড সেন্টারের বাড়ির স্কিম অনুমোদন দেওয়া হবে।

—দেখা যাক, সেটা হলে খুব ভালো হয়।

—আমি আবার ভাবছি অন্য কথা।

—কী কথা?

—ওই যে টিপির বাঁধ কেটে বলদেঘাটা খালটা যদি ঠিকঠাক সংস্কার করা যেত তাহলে বন্যার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসত। কিন্তু সেটা তো ওই ঘেরির মালিকগুলো আর ইটভাটার মালিকগুলো করতে দিল না। দেখা যাক চেষ্টা ছাড়ব না, পরে আবার চেষ্টা করব, কতদিন আর আমাদের দাবি না মেনে চুপ করে থাকবে?

* * *

কিছুদিন বাদেই গাইঘাটা বিডিও অফিস থেকে লোকজন এল। সবকটা গ্রামেই এনকোয়ারি হল। গাইঘাটা বিডিও অফিসটা হচ্ছে চাঁদপাড়ায়। বিডিও অফিসের লোকজনের সঙ্গে আবার বরুণের ভালো চেনাশোনা। এবারে এনকোয়ারিতে এসেছে গোপালবাবু। বরুণ গোপালবাবুকে বলল— ও গোপালবাবু, ফ্লাড সেন্টারগুলো হবে তো, ঠিকঠাক রিপোর্ট পাঠাবেন যেন।

—তোমার এলাকায় ফ্লাড সেন্টার না হলে অন্য আর কোথায় হবে? সে তোমার চিন্তা করতে হবে না, আমি যেটা সত্যি সেটাই জানাব। ও বরুণ, আমি শুনলাম তুমি এবারের বন্যায় দু-বার নাকি জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছিলে, আমি শুনে তো একেবারে শিউরে উঠেছি। তোমাদের সুটিয়ার শক্তির কাছ থেকে আমি শুনেছি তুমি একবার কীরকমভাবে টিপির বাঁধ কাটতে গিয়ে জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছিলে। আরেকবার তুমি কী করে ভেসে গিয়েছিলে?

—সে আর বলবেন না গোপালবাবু, সেবার আমরা কয়েকজন বন্যার জলে আটকে থাকা মানুষকে একটা ডিঙিতে করে নিয়ে আসছিলাম, বলদেঘাটা ব্রিজটার ওখানে জলের তোড় খুব বেশি ছিল, আমি দাঁড় টানছিলাম, হঠাৎ করে এমন এক জলের তোড়ের ধাক্কা আমাদের ডিঙিনৌকায় লাগে যে ওটা একপাশে একটু হেলে যায়, আর আমি টাল সামলাতে না পেরে জলে পড়ে যাই।

—তা সেবারে বাঁচলে কী করে?

—সে কী আর বলব গোপালবাবু, জলের কী তোড়! আমি যত সাঁতার দিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করি, পাড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, জলের তোড় ততই আমাকে নাকানিচোবানি খাওয়ায়। আমার কিছুই করার ছিল না, আমি বলতে গেলে হাল একেবারে ছেড়ে দিয়েছি, তারপর আমি অনেক কষ্ট করে একটা গাছে গিয়ে উঠলাম, কিন্তু কী বলব গোপালবাবু, ওই গাছে গিয়ে দেখলাম একজোড়া পদ্মগোখরো আশ্রয় নিয়েছে। কী আর করে ওরা, প্রকৃতির রোষের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে ওদেরও তো একটা আশ্রয় দরকার।

—তা ওগুলো তোমায় দেখে ছোবল মারতে আসেনি?

—সে আর না এসে পারে, আমাকে ওই গাছে উঠতে দেখে ওদের কী রোখ, সামনে ফণা উঁচু করে হিস-হিস আওয়াজ করছে। আমি ভাবছি এত কষ্টে বানের জলের হাত থেকে বেঁচে শেষপর্যন্ত কিনা এই সাপের ছোবলে প্রাণ হারাতে হবে।

গোপালবাবু খুব উদ্বিগ্ন বরুণের এই বর্ণনা শুনে। ওঁনার উৎসাহী প্রশ্ন — তারপর কী হল, বরুণ?

—না, সাপগুলো মনে হয় আমাকে দেখে বুঝতে পারল আমিও ওদের মতোই প্রকৃতির রোষ— এই বন্যার জলের হাত থেকে বাঁচতে এই গাছে আশ্রয় নিয়েছি। যার ফলে সেইবার অন্তত সাপের ছোবল খাওয়ার হাত থেকে বাঁচলাম।

—সে না হয় বাঁচলে, কিন্তু বন্যার জলের হাত থেকে কীভাবে বাঁচলে?

—সে আর এক গল্প, সেই গাছ তো সমানে জলের তোড়ে ভেসে চলেছে, আমিও পাড়ে ওঠার কোনো সুযোগ খুঁজে পাচ্ছি না। তারপর স্বরূপনগরের কাছে গিয়ে দেখলাম পাড়ে অনেক লোক রয়েছে, এখানে জলের তোড় একটু কম। আমিও ওদের দিকে হাত উঁচু করে প্রাণপণে চিৎকার শুরু করলাম।

—পাড়ের লোকজন তোমাকে দেখতে পেল?

—দেখতে পেল বলেই তো সেইযাত্রায় বেঁচে গেলাম।

—ওরা কীভাবে তোমায় উদ্ধার করল?

—ওদের কয়েকজন আমাকে দেখেই চিৎকার করতে লাগল ওই দ্যাখ, একটা লোক গাছের ওপরে রয়েছে। হাত নেড়ে মনে হয় সাহায্য চাইছে, যে করে হোক ওকে উদ্ধার করতে হবে। ওরা কয়েকজন একটা নৌকা করে এগিয়ে এসে তারপর আমায় উদ্ধার করে।

—তাহলে তো তুমি এবারেও খুব বাঁচান বেঁচে গেলে।

—তা সেটা ঠিক, তবে শক্তিরও খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। সেটা আবার আপনার সঙ্গে বলেছে, আপনি ব্যস্ত মানুষ।

—তা বলবে না, আমাদের নিজেদের মধ্যে এমন একজন রয়েছে, যে অপরের বিপদে এইভাবে ঝাঁপায়, তার কোনো বিপদ হলে, কিছু করতে পারি বা না পারি ঈশ্বরের কাছে অন্তত প্রার্থনা করতে পারি যে তুমি সুস্থ থাকো, বিপদ থেকে বেরিয়ে এসো।

—গোপালবাবু, আপনি কিন্তু আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন, আমি আর কতটুকু মানুষের জন্যে করতে পারি বলুন তো।

—যেটুকু পারো তাই অনেক। আমরা তো নিজেরা অপরের জন্যে কিছু বলতে গেলে করতেই পারি না। তুমি সত্যিই ব্যতিক্রম বরুণ।

—তা গোপালবাবু, এই ফ্লাড সেন্টারের বাড়িগুলো হয়ে যাবে তো?

—মনে হয় এই প্রজেক্ট পাশ হয়ে যাবে। তোমাদের দাবি তো কোনোমতেই অন্যায় নয়। এইবারের বন্যায় এইসব এলাকায় মানুষরা একটা মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের অভাবে খুব ভুগেছে। আমরাও ইনস্পেকশন রিপোর্টে সেই সত্যিটাকেই তুলে ধরছি।

—ব্যস, তাহলেই হবে। তবে ব্যাপারটায় কতদিন লাগতে পারে বলুন তো?

—এ ব্যাপারটা যেহেতু এমারজেন্সি, মনে হয় না খুব একটা দেরি হবে। সামনের বর্ষার আগে মনে হয় প্রজেক্ট শুরু হয়ে যাবে।

গোপালবাবুর এই কথায় বরুণ অনেকটাই স্বস্তি পায়। গাইঘাটার বিডিও অফিস ওদের এলাকার বিডিও অফিস। বিভিন্ন কাজে ওখানে ওকে প্রায়ই যেতে হয়। তবে নিজের কাজে নয়, সবই বিভিন্ন মানুষের দরকারে। বিডিও অফিসের অনেক স্টাফ তাই বরুণের পরিচিত। ওরাও জানে এই ছেলেটা মানুষের জন্যে নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে। এর প্রতি সহানুভূতি সবারই আছে। গোপালবাবু ওকে আবার খুব স্নেহ করেন। মানুষের জন্যে যে এইভাবে কাজ করে, তার পাশে না থাকলে চলে।

গোপালবাবু ইনস্পেকশন টিমের সবাইকে বলে দিয়েছেন— রিপোর্টটা এমনভাবে লিখতে হবে যাতে তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হয়। এই ফ্লাড সেন্টারের বাড়ির প্রজেক্টটা শুরু না হলে সবার খুব অসুবিধা হচ্ছে।

বিডিও অফিস থেকে সেইভাবেই রিপোর্টটা জেলায় গেল। জেলার থেকে তাড়াতাড়ি ওই রিপোর্ট পাশ করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল।

টেন্ডার পেয়েছে বারাসাতের এক কনট্রাকটর। সব ক-টা গ্রামের ফ্লাড সেন্টার সেই কনট্রাকটর করবে। মালপত্র চলে এসেছে। প্রত্যেক এলাকায় স্থানীয় স্কুলের জমিতেই এই ফ্লাড সেন্টার তৈরি হবে। লরি লরি সিমেন্ট, বালি, পাথর, রড সব আসছে। মিস্ত্রি অবশ্য স্থানীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে। চারিদিকে যেন একটা যজ্ঞ শুরু হয়েছে।

বরুণ এখন খুব ব্যস্ত। সব গ্রামে ঘুরে ফিরে সে খোঁজ নিচ্ছে ফ্লাড সেন্টারের কাজ কীরকম এগোচ্ছে। গ্রামে গ্রামে সবাইকে বলে দিয়েছে— তোমরা খেয়াল রাখবে এই ফ্লাড সেন্টার তৈরির কাজে কোনোরকম অসুবিধা যেন না হয়।

বরুণের এখন চারধারে কড়া নজর। কোনো ফ্লাড সেন্টার তৈরিতে খারাপ মাল দেওয়া হচ্ছে কিনা সেটা ও ভালোভাবে খেয়াল রাখছে। এমনকি ওই ঠিকাদারকেও ও পরিষ্কার বলে দিয়েছে— দেখুন, এই যে ফ্লাড সেন্টারের বাড়ি তৈরি হচ্ছে এটা কিন্তু আমাদের সবার সম্পত্তি, সুতরাং আপনি এক নম্বর মাল-মশলা দিয়েই এসব তৈরি করবেন। কোনোরকম চালাকি করলে আমরা কিন্তু আপনাকে ছেড়ে দেব না।

না, এই ঠিকাদার খুব একটা খারাপ না। ভালো মাল-পত্তর দিয়েই ওরা বাড়িগুলো তৈরি করছে। সেটা অবশ্য বরুণের ভয়েও হতে পারে, যে এলাকায় ওরা কাজ করতে যায় সেই এলাকা সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজ নিয়েই ওরা কাজে নামে। আর এ অঞ্চলে বরুণের ভালো নাম থাকায় কাজ করতেও সুবিধা হচ্ছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%