মনজিৎ গাইন
সুকুমারদের সন্ত্রাস। এখন সুটিয়ায় না থেকেও আছে। মাঝে মাঝেই চোরাগোপ্তা আক্রমণ হচ্ছে বরুণের ওপর। সুটিয়ার সবাই বলছে— না বরুণ, তোমার এইভাবে একা একা চলাফেরা করা যাবে না।
—না-না, অত ভয় করলে চলবে? আমার কিছু হবে না।
—না, ওসব আমরা শুনব না, সবসময় আমাদের কিছু ছেলে তোমার সঙ্গে থাকবে। ওই বর্ডার পার্টির লোকেদের সত্যি কোনো বিশ্বাস নেই। জেলে থাকলেও ওরা সমান ভয়ানক। তারপর অতনু আর বেশ কিছুজন তো এখনও পুলিশের নাগালের বাইরে। সুতরাং আমাদের সাবধান থাকাই ভালো।
বরুণের হাজার বারণ সত্ত্বেও সুটিয়ার বেশ কিছু ছেলে ওর ছায়াসঙ্গী হয়। ওদের ভগবানকে ওরা সবসময় চোখের সামনে রাখতে চায়। ওদের ভগবানের কোনো ক্ষতি হোক, সে সুযোগ ওরা দেবে না। নিজেদের জীবন দেবে, তবুও বরুণের গায়ে কোনোরকম আঁচ পড়তে দেবে না।
সুকুমাররা জেলে গিয়েছে, বরুণের কোনো কাজ নেই তা নয়, বরং তরুণের এখন আরও অনেক কাজ। ও ক-দিন ধরেই যাবে ঠিক করেছে জয়িতাদের বাড়িতে।
আজকে ও সময় করে ঠিক ওখানে পৌঁছে গেল। জয়িতার বাড়ির বাইরে গিয়ে ডাকতে লাগল—ও দাদা, বাড়ি আছেন?
—কে?
—আমি বরুণ।
—ও বরুণ, এসো এসো।
বরুণ বাড়ির ভেতরে যায়— কই, জয়িতা কোথায়? এই জয়িতা বাইরে আয়।
জয়িতা বাইরে আসে। মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। মুখ দেখেই বোঝা যায় বিশাল এক ঝড় ওর ওপর দিয়ে গিয়েছে। কত আর বয়স হবে ওর আঠেরো কী উনিশ, কিন্তু বয়সসুলভ কোনো কিছুই ওর মুখে বা ব্যবহারে নেই। সবসময় যেন এক ভারী কিছু ওর ওপর চেপে বসে আছে। বরুণ ওকে বলে— কী জয়িতা, এত মনমরা থাকলে হবে, শয়তানগুলোর সব জেল হয়েছে শুনেছিস তো?
জয়িতা তাও কোনো কথা বলে না। গুম মেরে থাকে। বরুণ ওকে আবার খোঁচায়— কী হল, কথা বলছিস না কেন, সবসময় পুরোনো স্মৃতিভার নিয়ে থাকলে হবে?
জয়িতা এবার আস্তে আস্তে কথা বলে— কাকু, আমার না কিছুই ভালো লাগে না।
—কেন, তোর কিছু ভালো লাগে না কেন? তোর অল্পবয়স, কোথায় আনন্দ করবি, তা না সবসময় গুম মেরে থাকিস।
—কী করব কাকু, আমি যে সেদিন রাতের কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না। ও কী যন্ত্রণা! ওরা পশুর মতো আমাকে ছিঁড়ে খেল, সেইসব ছবি তুলে রাখল, আমি ভাবতেই পারছি না। কাকু, ওই দিনটাকে আমি যদি আমার জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারতাম।
—দ্যাখ জয়িতা, তোর ওপর যারা অত্যাচার করেছিল তাদের অনেকেই এখন জেলের ভিতরে, বাকিদের ধরা না গেলেও তারা নিশ্চিতভাবেই সুটিয়াতে আর নেই। আর ওরা ছিল পশু, পশুরা পশুর কাজ করেছে, তোর ওপর অত্যাচার করেছে, কিন্তু আমরা মানুষরা মানুষের মতো কাজ করেছি। পশুদের অত্যাচারের জন্যে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস সেটা ঠিক হচ্ছে না। তারপর ভাব, তোর বাবা-মা তোর ওপর এইভাবে অত্যাচার হতে দেখেছে, তাদের মনের কী অবস্থা। আর তারপর তুই এখন সবসময় মনমরা থাকিস, ওরা কী ভালো আছে বল তো?
জয়িতার বাবা কথা ধরে— দ্যাখ জয়িতা, বরুণকাকু নিজে এগিয়ে গিয়ে প্রতিবাদী সংস্থা গঠন করে ওইসব পশুদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জেলে পুরল কাদের জন্যে? তোদের মতো যে সমস্ত মেয়েদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, তাদের জন্যেই। আর তারাই যদি সুটিয়ার এই সুদিনে মনমরা হয়ে থাকে তাহলে তার কীরকম লাগে বল তো।
জয়িতা বাবার কথায় ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।
ও বলে— আমি এখন কী করব কাকু?
—শোন, আমার মনে হয় তোর এখন একটা বিয়ে দেওয়া দরকার। নতুন সংসার হলে, নতুন জীবন হলে তুই মনে হয় আগের কথা পুরোটা ভুলে যেতে পারবি।
বিয়ের কথা শুনে জয়িতা যেন আরও ভেঙে পড়ে, ওর কথা— এ কী বলছ তুমি কাকু, আমার ওপরে অতজন মিলে অত্যাচার করল, আমাকে ধর্ষণ করল, তারপর আমাকে কে বিয়ে করবে?
—হ্যাঁ-হ্যাঁ করবে, ওটা তোর জীবনে একটা দুর্ঘটনা, আর জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটলেও জীবন থেমে যায় না, জীবন তার নিজের গতিতে এগিয়ে চলে, তোর জীবনও ওই দুর্ঘটনাকে পেছনে ফেলে অবশ্যই সামনে এগিয়ে যাবে।
বরুণ জয়িতার বাবাকে বলে— দাদা, এবারে তাহলে জয়িতার জন্যে পাত্র খোঁজা শুরু করে দিন।
জয়িতার বাবা একটু কিন্তু কিন্তু করে। তার বক্তব্য মেয়ের ওপর এইরকম ধর্ষণের মতো নোংরা অত্যাচার হয়েছে, তারপরে তার মেয়েকে কে বিয়ে করতে চাইবে, কোন ছেলে এগিয়ে আসবে?
তখন বরুণ বলে— আপনাদের চিন্তা করতে হবে না, আমি নিজেই আমার স্নেহের জয়িতার জন্যে এক রাজপুত্তুর পাত্র খুঁজে আনব। তারপর সে জয়িতাকে পক্ষীরাজ ঘোড়ায় করে নিয়ে যাবে। তখন দেখব জয়িতা আনন্দ না করে কী করে। কী জয়িতা, তখন আনন্দ করবি তো?
বরুণের এই কথায় জয়িতার চোখে খুশির আভাস। সেটা আবার বরুণের চোখ এড়ায় না। ও ঠিকই ধরেছে জয়িতার মনের অবস্থা। ওর অবশ্যই বিয়ের দরকার। নতুন জীবন পেলে পুরোনো জীবনের যন্ত্রণা ও কিছুটা হলেও ভুলতে পারবে।
বরুণ বলল— তাহলে আমি চলি, জয়িতার জন্যে ছেলে দেখার কাজ আমি আজকে থেকেই শুরু করে দিতে চাই।
বরুণ জয়িতার জন্যে ছেলের খোঁজ করা শুরু করে দেয়। এমনিতে জয়িতাকে দেখতে শুনতে বেশ ভালোই, ছেলে পেতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ওর ওই মারাত্মক অতীত বিয়ের পথের কাঁটা। বরুণ ওদের পাড়ারই সুবলকে ধরে— এই সুবল, শুনলাম তোর জন্যে তো মেয়ে দেখা চলছে, আমার কাছে একটা ভালো মেয়ের সন্ধান আছে, বিয়ে করবি?
—কে বরুণদা?
—ওই যে বাজারের কাছে বাড়ি। মেয়েটার নাম জয়িতা।
—জয়িতা, মানে সেই মেয়েটা?
—হ্যাঁ, ওই তো দেখতে শুনতে বেশ ভালো। তোর সঙ্গে বেশ ভালোই মানাবে।
কিন্তু সুবলের কথায় ইতস্তততা। ও বলে— না মানে বরুণদা, ওর সঙ্গে বিয়েতে একটু অসুবিধা আছে।
—কী অসুবিধা?
—না মানে, ওর সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটেছিল না।
—সেটা তো একটা দুর্ঘটনা।
—কিন্তু আমার বাড়িতে কিছুতেই ওকে বউ হিসাবে মেনে নেবে না।
বরুণ হতাশ হয়। তারপরেও আরও কয়েকটা ছেলেকে ও জয়িতার জন্যে দেখে। কিন্তু সবাই ওই একটাই কারণে জয়িতাকে বিয়ে করতে রাজি নয়।
বরুণ খুব হতাশ হয়। তাহলে পশুরাও জিতে যাবে, জয়িতাকে কোথাও বিয়ে দিতে পারবে না? ও তবুও চেষ্টা চালায়। শেষপর্যন্ত একজন জয়িতাকে বিয়ে করতে রাজি হয় ওর জীবনের সব ঘটনা জেনেই। বরুণের তাই খুব আনন্দ। ও জয়িতার বাড়িতে যায়— জয়িতা-এই জয়িতা, তোর জন্যে বলেছিলাম না রাজপুত্র ধরে আনব, ঠিক ধরে এনেছি।
জয়িতার বাবা-মা সব শুনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওরা ভেবেছিল শেয়াল-কুকুরে ছোঁয়া মেয়েকে কেউ হয়তো আর ঘরের বউ করতে রাজি হবে না, কিন্তু বরুণ যে একেবারে অসাধ্য সাধন করেছে।
সব দেখাদেখিও হয়ে যায়। ছেলেটাকে জয়িতারও বেশ পছন্দ হয়েছে। ওর বাবা-মাও এখন অনেক আনন্দে আছে। এবারে বিয়ের কার্ড করতে হবে, কী লেখা হবে? বরুণ বলল— জয়িতার বিয়ের কার্ডে কী লেখা হবে, তা কিন্তু আমি লিখব।
—বাঃ, তাহলে তো খুব ভালো হয়। জয়িতার বিয়ের কার্ড তুমি লিখে দেবে, এর চাইতে আনন্দের কিছু হয়।
বরুণ কাগজ-পেন নিয়ে বসে যায়। ও আপন মনে লিখতে থাকে জয়িতার বিয়ের কার্ডের ভাষা। এ ভাষা তো হবে যন্ত্রণাকে জয় করার ভাষা, কয়েকটা মানুষরূপী পশুদের পরাজিত করার ভাষা, জীবনের জয়গানের ভাষা, শুভবোধের ভাষা।
বরুণ জয়িতার বাবাকে বলে— জয়িতার বিয়েতে খরচাপাতির কোনো চিন্তা করবেন না। যা খরচা হবে সব আমি দেব।
জয়িতার বাবা-মা বলে— বরুণ, তুমি আমাদের কাছে সাক্ষাৎ ভগবান, তোমার এই ঋণ আমরা এই জন্ম কেন, সাত জন্মেও শোধ দিতে পারব না।
—না-না, এ-কথা একদম বলবেন না। ভাইঝির বিয়েতে কাকু পাশে থাকবে, এ তো কাকুর কর্তব্য। এর মধ্যে অন্য কিছু আপনারা বলবেন না।
জয়িতার বিয়ে খুব ধুমধাম করেই হয়ে যায়। বরুণ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওর বিয়ের সব কিছু দেখভাল করে। জয়িতা বাড়ি ছেড়ে বরের সঙ্গে চলে যাওয়ার সময় হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে ফেলল— কাকু, তোমার জন্যেই আমি নতুন জীবন পেলাম। তুমি আমার কাছে একজন দেবতা।
বরুণ বলে— না-না, ওরকম বলিস না, দেখিস সুনন্দ তোকে ঠিক আনন্দে রাখবে। সুনন্দ, এতদিন জয়িতা মনে খুব যন্ত্রণা পেয়েছে, তুমি এবার থেকে ওকে শুধু আনন্দে রাখবে।
—হ্যাঁ কাকু, আপনি চিন্তা করবেন না, জয়িতার কোনো কষ্টই যাতে না হয়, আমি সবসময় সেদিকে নজর রাখব।
বরুণ আশ্বস্ত হয়। ও জানে সত্যিই জয়িতা হতাশার একেবারে গভীরে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে ওকে বার করে আনতে না পারলে হয়তো ও কোনো অঘটনও ঘটিয়ে ফেলতে পারত। ও মনে মনে বলে জয়িতার বিবাহিত জীবন যেন সুখের হয়, বিয়ের আগে ও যত যন্ত্রণা পেয়েছে, সব যেন বিয়ের পরে ওর জীবনে খুশি হয়ে ফিরে আসে।
বরুণ খেয়াল করে ওর চোখেও জলের ফোঁটা। তবে ও জানে এই জলের ফোঁটা আনন্দের। ও রুমাল দিয়ে সেই আনন্দাশ্রু মুছে ফেলে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।