ত্রয়োদশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

ওরা দল বেঁধে হই-হই করতে করতে বেরিয়ে যায়। সঞ্জয় আর গীতা থরথর করে কাঁপছে ভয়তে! এ কী সাংঘাতিক বিপদ এল ওদের জীবনে! যদি টাকা না দেয়, তাহলে গীতাকে ওরা ছাড়বে না। দলবেঁধে ওরা ওকে গ্যাংরেপ করবে। ওরা আর ভাবতেই পারে না। সঞ্জয় বলে— কী হবে এবার আমাদের?

—তুমি আমার গয়নাগুলো বিক্রি করে টাকাটা ওদের হাতে দিয়ে দাও। নাহলে ওরা আমাদের সবাইকে শেষ করে দেবে। আমরা কেউ বাঁচব না।

এই বলতে বলতে গীতা কান্নায় ভেঙে পড়ে। সঞ্জয় ওকে সান্ত্বনা দেয়— ভেঙে পোড়ো না গীতা, ঈশ্বর আছেন উনি ঠিক আমাদের রক্ষা করবেন।

—সেই প্রার্থনাই আমাদের করতে হবে। কাউকে জানালে হয় না?

—মনে হয়, সেটা ভুল হবে। ওরা খুব নৃশংস। ওই যে বলে গেল শুনলে না, থানা-পুলিশ করা যাবে না। তাহলে অন্য বিপদ হবে।

—না-না, তাহলে কাউকে জানিও না। তুমি আমার গয়নাগুলো নিয়ে সোজা হাবড়াতে চলে যাও। সেখানে ওগুলোকে বিক্রি করে মনে হয় লাখ দেড়েক পাবে। ওগুলো তুমি এখনই নিয়ে যাও।

—কিন্তু ওগুলো যে আমাদের বিয়ের গয়না?

—বিয়ের গয়নার মায়া একেবারে কোরো না। যদি আমাদের ওরা একেবারে শেষ করে দেয়, তাহলে কি আর গয়না নিয়ে ধুয়ে খাব?

—না, আমার আর একদম ভালো লাগছে না।

—ওরকমভাবে ভেঙে পোড়ো না। যেভাবে হোক আমরা আবার সব সমস্যা কাটিয়ে উঠব।

পরের দিন সকালেই গীতা সঞ্জয়ের হাতে বিয়ের গয়নার বাক্সটা তুলে দেয়। সঞ্জয়ের মনটা বেশ খারাপ। বিয়ের গয়না বলে কথা। গীতা বুঝতে পারে সঞ্জয়ের অবস্থা— কী হল, কী ভাবছ? তুমি সোজা চলে যাও, আর কিচ্ছু ভেবো না।

গীতার কথা শুনে সঞ্জয় বেরিয়ে পড়ে। হাবড়ায় স্টেশনের কাছে যশোর রোডের ওপরেই বড়ো সোনার দোকান। সেই দোকানদার একসঙ্গে এত গয়না দেখে যেন একটু অবাক হয়— কী ব্যাপার, এত গয়না একসঙ্গে, চুরির মাল নয় তো?

—না-না, চুরির হবে কেন, এগুলো সব আমার বউয়ের বিয়ের গয়না।

—এগুলো সব একসঙ্গে বিক্রি করতে চাইছেন কেন?

—আমাদের খুব টাকার দরকার পড়েছে, গয়নাগুলো বিক্রি না করলে কিছুতেই চলবে না।

দোকানদার আর কথা বাড়ায় না। সোনাগুলোকে ওজন করে হিসেব মতো দাম মিটিয়ে দেয়। দোকানদার যখন সব গয়নাগুলোকে ওর সিন্দুকে পুরছে, সঞ্জয় জুলজুল চোখে সেই দিকে তাকিয়ে থাকে। শেষবারের মতো ও গয়নাগুলোকে দেখছে। আর কোনোদিন দেখা হবে না। গীতার খুব প্রিয় ছিল গয়নাগুলো। প্রায়ই ওগুলো বার করে নাড়াচাড়া করত, গায়ে পরে সাজত, এখন সব গয়নাগুলোই অপরের হয়ে গেল। আর মায়া করে কী হবে, ও টাকাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

বাড়িতে পৌঁছেই গীতার সঙ্গে দেখা। গীতা মনে হয় সারাক্ষণ দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। যেই সঞ্জয়কেও দেখেছে— কী ব্যাপার, সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে তো?

—হ্যাঁ, সে হয়েছে।

—মোট কত হল?

—এক লাখ চল্লিশের মতো।

—তাহলে এখনও যে অনেকটা বাকি, কী করে জোগাড় হবে?

—সে তোমার ভাবতে হবে না, দেখি কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে।

—কাদের সঙ্গে কথা বলবে?

—বন্ধুদের সঙ্গে।

—দেখো, আবার সবকিছু বলে ফেলো না।

—না-না, সে বলে কখনও।

সঞ্জয় গীতার জিম্মায় টাকার ব্যাগের দায়িত্ব দিয়ে দেয়। তারপর বেরিয়ে পড়ে। দু-চারজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ও টাকার ব্যবস্থাটা ঠিক করেই ফেলল। অবশ্য সব বন্ধুরাই জানতে চাইল— কী ব্যাপার, হঠাৎ করে একসঙ্গে এত টাকার দরকার, কী হয়েছে। বাড়িতে কোনো অসুবিধা?

—না-না, সেরকম কিছু নয়, আসলে বাড়ি তৈরি করছি তো, একসঙ্গে অনেকটা পেমেন্ট আটতে গিয়েছে। সেই পেমেন্টগুলো ক্লিয়ার করে ফেলতে চাই।

সঞ্জয়ের এমনি খুব ভালো ছেলে হিসেবে এলাকায় পরিচয়। টাকাপয়সায় ওর কোনো বদনামও নেই। সব বন্ধুরাই ওকে বলতে গেলে বিনা বাক্যব্যয়েই টাকা দিয়ে দিল। ও সব টাকা আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে নিচ্ছে।

গীতার হাতে একসঙ্গে অত টাকা। অথচ মনে কোনো সুখ নেই। এ সব টাকাই অসুখের টাকা। হাতে যতক্ষণ থাকবে, ততই যেন মনটা আরও খারাপ হয়ে যাবে। ও নিয়ে গিয়ে টাকাটা গয়নার টাকার সঙ্গে আলমারির লকারে তুলে রাখে।

এরপরে ওদের প্রতীক্ষার শুরু, কবে ওরা আসবে এই টাকাটা নিতে। ঠিক এক সপ্তা বাদেই ওরা এল। এসেই হাঁক— সঞ্জয় অ্যাই সঞ্জয়, দরজা খোল।

সঞ্জয় গলার স্বর শুনেই বুঝতে পেরেছে ওরা এসেছে। ও কোনো প্রশ্ন না করেই দরজা খুলে দেয়। অতনু প্রশ্ন করে— কী ব্যাপার, জিজ্ঞাসা না করেই যে দরজাটা খুলে দিলি, আমরা না হয়ে অন্য কেউও তো হতে পারত। ভবিষ্যতে এইভাবে জিজ্ঞাসা না করে দরজা খুলিস না যেন।

—আমি বুঝতে পেরেছিলাম তোমরাই এসেছ। আর তোমাদের চেয়ে বেশি বিপদ কি আর আমাদের আছে?

—সে তুই বলতে গেলে একেবারেই ঠিক বলেছিস। তা টাকাটা রেডি রেখেছিস তো?

—হ্যাঁ।

—কই, নিয়ে আয় দেখি টাকাটা।

—একটুখানি তোমরা এখানে দাঁড়াও।

সঞ্জয় ওদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখে ভেতরে যায়। তারপর টাকার ব্যাগটা ভিতর থেকে এনে ওদের হাতে তুলে দেয়।

—অ্যাই, এতে কত আছে রে?

—পুরো দু-লাখ আছে, তোমরা গুনে নাও।

—বাঃ, ভালো ছেলে, আর গোনার দরকার নেই, তুই নিশ্চয়ই গুনেই রেখেছিস। তোর ওপর আমাদের পুরো বিশ্বাস আছে তবে আরও একটা জিনিস যে আমাদের লাগবে, সেটা না পেলে যে আমরা তোর বাড়ি থেকে যাচ্ছি না।

ওদের এই কথা শুনে সঞ্জয়ের বুকের ধুকপুকুনি বেশ বেড়ে যায়। ওদের কথা মতো পুরো দু-লাখ টাকাই ও যেভাবে হোক তুলে ওদের হাতে দিয়ে দিল, আবার ওরা কী বলছে! শেষপর্যন্ত কি গীতাকে ওরা ছাড়বে না, ওরা ওকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে? প্রচণ্ড আতঙ্কে ও বাক্যহারা। অতনুরা মনে হয় সঞ্জয়ের অবস্থা বুঝতে পেরেছে। অতনু আবার বলে— টাকাটা পেয়েছি, ওটার ব্যবস্থা করো, এই সময়ে আমাদের আবার ওটা না হলে যে একেবারে চলে না।

—কী বলেছিলে বলো তো, আমার ঠিক খেয়াল নেই।

—ওই যে তোর বউয়ের হাতে ভালো চা খাওয়ার কথা ছিল।

সঞ্জয় যেন এই কথা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ও বলল— ও, চায়ের কথা, আমি একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। তোমরা দাঁড়াও, আমি ভিতরে বলছি।

সঞ্জয় ভিতরে গিয়ে হাঁক পাড়ে— গীতা, ক-কাপ চা চাপাও, এরা একটু চা খাবে।

—ক-কাপ বসাব?

—ওই সাত কাপ মতো।

গীতা চা করছে। ওর হাত-পা সব কাঁপছে। এই বুঝি প্লেট-কাপ সব হাত ফস্কে পড়ে যায়। ও নিশ্চিত হতে পারছে না যে এরা ওর কোনো ক্ষতি করবে না। শুধু চা খেতে চেয়েছে, ভালোয় ভালোয় চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লে বাঁচা যায়। ও যতটা পারে ভালো করে চা করল। সঞ্জয় এসে নিয়ে যায় চায়ের ট্রে। চায়ের কাপে চুমুক লাগাতে লাগাতে অতনু বলে— বাঃ, বউদি যে ভালোই চা করে। খুব ভালো চা খেলাম। কী সঞ্জয়, বলেছিলাম না, আমাদের কথা শুনলে, আমরা খুব ভালো, নাহলে আমাদের হাত থেকে কারো নিস্তার নেই। আর এই যে তোমার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হল, মাঝে মাঝেই আমাদের আসা-যাওয়া চলবে, কি কিছু মনে করবে না তো?

—না-না, তোমরা আসবে, তাতে কিছু মনে করা যায়?

—ঠিক আছে, আমরা আজকে চলি।

সুকুমার, অতনু ওরা সব হই-হই করতে করতে বেরিয়ে পড়ে। সঞ্জয়ের বাড়ির পাশেই মুকুলবাবুদের বাড়ি। উনি ভাবছেন সঞ্জয়দের বাড়িতে এত রাতে এরা কারা, সঞ্জয় তো কখনও এত রাতে বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি আসতে বলবে না। এরা কারা? এখন আবার দিনকাল ভালো নয়। এই তো ক-দিন আগে পাশের সুটিয়ায় কী মারাত্মক কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। ভাবলেও হাড় হিম হয়ে যায়। মুকুলবাবু পায়ে পায়ে সঞ্জয়দের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

—সঞ্জয়, ও সঞ্জয়।

পরিচিত গলা। সঞ্জয় ভেতর থেকে উত্তর দেয়— কে, মুকুলবাবু?

—হ্যাঁ, তোমার বাড়িতে ওসব কারা এসেছিল?

—ও, আমার বন্ধুরা।

—কিন্তু আমি ভাবলাম তুমি তো এত রাতে কোনোদিন বন্ধুদের ডাকোনি, আর দিনকাল ভালো নয়, তাই ভাবলাম একটু খোঁজ নিয়ে আসি।

—আর বলবেন না, ওরা খুব করে আমায় ধরেছিল একদিন বাড়িতে এসে চা খাবে, তাই এসেছিল।

—তাই বলে এত রাতে চা!

মুকুলবাবুর মনে অবিশ্বাসের চিহ্ন স্পষ্ট। সঞ্জয়ও সেটা বুঝতে পারে। ও মুকুলবাবুকে বোঝানোর চেষ্টা করে— আর বলবেন না, রাত না হলে সবকটাকে একসঙ্গে পাওয়া যায় না, সব কাজে-কর্মে বিভিন্ন জায়গায় থাকে, ওইজন্যেই ওদের আসতে এত রাত।

—ও তাই, আমি তাহলে আসি, তবে তুমি একটু সাবধানে থেকো। কোনো অসুবিধা হলে অবশ্যই আমাদের জানিও।

—হ্যাঁ-হ্যাঁ, অবশ্যই জানাব।

মুকুলবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পরে সঞ্জয় আর গীতা দুজনে হাউ-হাউ করে কাঁদতে থাকে। কী সাংঘাতিক বিপদের হাত থেকে যে ওরা বাঁচল, তা ওরা নিজেরা ছাড়া কেউ বুঝতে পারছে না। শুধু টাকাটা জোগাড় করতে পেরেছিল বলে ওরা বাঁচল, নাহলে ওদের ওরা ছাড়ত না। গীতার মন থেকে এখনও আশঙ্কার মেঘ দূর হয়নি। ও সঞ্জয়কে প্রশ্ন করে— ওরা যে বলল আবার আসবে।

—না-না, ওরা আসবে না।

—তাহলে বলল কেন?

—মনে হয় আমাদের ভয় দেখাতেই ওরা এই কথা বলল।

—কী জানি, আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।

—না-না, ভয় পেয়ো না। আমি তো আছি।

ওদের দুটো ছোটো ছোটো বাচ্চা কিছুতেই বুঝতে পারছে না ওদের বাবা-মা এরকম ভাবে কাঁদছে কেন। যে একটু বড়ো, সেই শানু জিজ্ঞাসা করল—ও বাবা-ও মা, তোমরা কাঁদছ কেন?

ওরা কোনো উত্তর দিতে পারে না। ওরা ওদের বাচ্চা দুটোকে জড়িয়ে আরও আরও কাঁদতে থাকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%