মনজিৎ গাইন
সুকুমারের দল অনেকদিন ধরেই বসে আছে। কানাইয়ের কেসটার পরে ওরা একটু ঢিলে দিয়েছে। কিন্তু বেশিদিন বসে থাকলেও যে হাত-পা নিশপিশ করছে। রাজেন কথাটা তুলল— গুরু, আর কতদিন এইভাবে চুপচাপ বসে থাকতে হবে বলো তো? কিছু না করতে পারলে ইনকামও কিছু হয় না, আবার ভালোও লাগে না।
সুকুমারও একমত— হ্যাঁ, আমিও ভাবছি আবার কিছু একটা ধান্দা শুরু করতে হবে। কানাইয়ের ব্যাপারটাও অনেকটা চেপে গিয়েছে, এখন হচ্ছে একেবারে ঠিকসময় কোনো কিছু করার।
—তা গুরু, কী ধান্দা করবে সেই পুরোনোটা, রাখি মালের পাখিগুলোকে ধরা?
—না, এবারে অন্য একটা ধান্দা ভেবেছি।
সুকুমারের চ্যালাগুলো একসঙ্গে জানতে চায়— কী ধান্দা গুরু?
—চমকে দিয়ে মাল কামানোর ধান্দা।
—সে তো আমরা আগেই করতাম।
—না, এবারের চমকানোটা একটু আলাদা।
—কীরকম আলাদা, গুরু?
—গ্রামে গ্রামে এখন সব ফ্লাড সেন্টারের বাড়িগুলো হচ্ছে খেয়াল করেছিস?
—হ্যাঁ, সে খেয়াল করব না, সরকারি টাকার বলতে গেলে একেবারে ওড়ানোর ফোয়ারা চলছে, গাড়ি গাড়ি সিমেন্ট-বালি আসছে। এর চাইতে কিছু টাকা সরকার আমাদের দিলে তো পারত, আমরা ক-দিন মন খুলে মোচ্ছব করতাম। কবে আবার বন্যা হবে, তার জন্যে এইরকম সব এক-একটা প্রাসাদ বানানো, যত্তসব ফালতু ব্যাপার।
—না-না, ফালতু ব্যাপার নয়, এই সরকারি বাড়ি তৈরি করাটাই আমাদের একটা ভালো ইনকামের জায়গা হতে পারে।
—কী রকম?
—যে ঠিকাদার এইসব বাড়িগুলো তৈরির কনট্রাক্ট পেয়েছে, তাকে চমকে ভয় দেখিয়ে ভালো মাল কামানো যেতে পারে।
—কিন্তু গুরু, এটা যে সরকারি প্রজেক্ট, আমরা ঠিকাদারকে ভয় দেখিয়ে টাকা চাইলে কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ব না তো?
—অত ভয় পেলে এই লাইনে থাকা যাবে না। আমরা কোথায় সবাইকে ভয় দেখিয়ে চমকাব, তা না আমার টিমের সবাই নিজেরাই ভয় পেয়ে গত্তে ঢুকে যাচ্ছে।
গুরুর এই কথায় সব চ্যালাগুলোর পুরুষত্বে যেন আঘাত লাগে। ওরা হাই-হাই করে ওঠে— না-না সুকুমারদা, এরকম বলবে না। তুমি যা বলবে আমরা তাই করতে রাজি। তুমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বললে আমরা তাই করতে রাজি। পাহাড়ের ওপর থেকে লাফ মারতে বললে তাও করতে আমরা রাজি।
—নাও, অত গ্যাস দিতে হবে না, কালকে সকালে চলে আসবি, আমরা বেরিয়ে পড়ব।
ওরা সবাই খুব উৎসাহ পেয়েছে। সকালবেলাতেই খানিকটা করে বাংলা চড়িয়ে চোখ লাল করে, মুখে বাংলার বদ গন্ধ নিয়ে সুটিয়ার ফ্লাড সেন্টারের ওখানে হাজির।
—অ্যাই, এখানে এসব তোরা করছিস কেন, করা যাবে না।
ঠিকাদারের লোক এসে বলে— কেন, করা যাবে না কেন, সরকারি কাজে তোমরা বাধা দিচ্ছ কেন?
—বেশ করেছি বাধা দিচ্ছি। হাজার বার দেব। আমাদের আগে লাখ খানেক ছাড়ো, তারপর কাজে হাত দিতে দেব, না হলে নয়।
শুধু সুটিয়া নয়, আশেপাশের সবকটা গ্রামেই এইভাবে সুকুমার আর তার দলবল ভয় দেখাতে লাগল। ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হল। সুকুমার এতদিন যা তোলাবাজি করত তা চোখের অগোচরে, গোপনে করত। কিন্তু এখন ও খুল্লমখুল্লা, কোনো রাখঢাক নেই।
ঠিকাদার পুলিশের কাছে গেল। কিন্তু গাইঘাটা থানার পুলিশ তাকে হতাশ করল— দেখুন, এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই, কে কোথায় আপনাদের কী বলল, আর তাতে আপনারা কাজ বন্ধ করে থানায় চলে এলেন অভিযোগ জানাতে, এরকম করলে হবে না।
—তাহলে আমরা কী করব?
—আপনারা অবশ্যই ওই ফ্লাড সেন্টারের বাড়ি তৈরির কাজ চালিয়ে যান, তারপর কোনো অসুবিধা হলে থানায় আসবেন। কিছুই ঘটল না, ফালতু ফালতু এখানে এসে আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।
—কিন্তু ওই মস্তান যদি আমাদের কাজ শুরু করা দেখে সত্যি সত্যি আমাদের কারো লাশ ফেলে দেয়, তখন কী হবে?
—তখন অবশ্যই থানায় আসবেন। কে খুন করেছে জানা থাকলে অবশ্যই প্রমাণ নিয়ে থানায় আসবেন। আমরা অবশ্যই তখন তাকে গ্রেফতার করব। আর ওইসব হল ফুটো মস্তান, গর্জায় বেশি, বর্ষায় কম। আপনি আবার ফিরে গিয়ে নির্দ্বিধায় কাজ শুরু করে দিন। আরে মশাই, ঠিকাদারির কাজ করছেন, মস্তান-তোলাবাজদের ভয় করলে এ কাজ একেবারেই করতে পারবেন না।
ঠিকাদার পড়ে যায় মহা সমস্যায়। সে আশেপাশে খোঁজ নিয়েছে। এখন সুটিয়া এলাকায় সুকুমার যে একজন বড়ো মাসলম্যান, তা তার অজানা নয়। কিন্তু এখন থানার কথায় সে যদি কাজ শুরু করে, আর অঘটন কিছু ঘটে তার দায় কে নেবে?
ঠিকাদার ঝুঁকি নেয় না। ও সুকুমারের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে চায়। লোক মারফত ও সুকুমারের কাছে দেখা করবার জন্যে খবর পাঠায়। সুকুমার যেন এই অপেক্ষাতেই ছিল। ও আর দেরি করে না, মানিকহীরাতে ঠিকাদারের সঙ্গে সে দেখা করে। ঠিকাদার সুকুমারকে খুব যত্ন করে বসায়।
—বলুন সুকুমারবাবু, কী খাবেন হুইস্কি, না রাম?
—সেসব পরে হবে, আগে কাজের কথায় আসুন।
—কাজের কথা তো আপনি বলবেন, আমরা কাজ করতে চাই, আপনার লোকজন তো সেই কাজে বারবার বাধা দিচ্ছে।
—আপনি আমাদের টাকাটা দিয়ে দিন, আপনার কাজ মাখমের মতো মোয়াম এগোবে, নাহলে এই গেরোতেই আপনার কাজ আটকে পড়ে থাকবে। কেউ ছাড়াতে পারবে না।
—কিন্তু অত টাকা দিলে আমার লাভ কী থাকবে এই প্রজেক্টে?
—সে আপনি বুঝে নিন কীভাবে লাভ করবেন। আমার কিন্তু ওই টাকাই চাই, নাহলে আমি যা বলেছিলাম তাই করব, আপনাদের দু-চারটে লোকের লাশ ফেলে দেব।
—কিন্তু টাকাটা বড্ড বেশি, অত টাকা সত্যি দেওয়া যায় না।
—ও হ্যাঁ, আপনি তো শুনলাম পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন, কী বলল পুলিশ, আপনাকে নিশ্চয়ই কোনো আশ্বাস দেয়নি, তাই আমার সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে চাইছেন। আমার এক রেট কোনো নড়চড় নেই।
—তবুও যদি একটু কমান রেটটা।
—ঠিক আছে, আপনি যখন অত করে বলছেন না হয় দশ হাজার টাকা করে কম দেবেন। পুরো নব্বই কিন্তু আমার ফ্লাড সেন্টার পিছু চাই। আর হ্যাঁ, টাকা দেবেন পুরো গোপনে। কোনো পাবলিক যেন জানতে না পারে, জানতে পারলে আপনি নিজেই বিপদে পড়বেন।
—এই টাকাটা দেওয়ার পর আবার অন্য কোনো ঝামেলা হবে না তো?
—না, সেরকম আর কোনো ঝামেলা হবে না কারণ আমি শেষ কথা। আমার ওপরে দ্বিতীয় কেউ কথা বলতে পারে না। আর হ্যাঁ, টাকাটা কিন্তু আপনাকে এক সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে।
—সে দিয়ে দেব, কিন্তু এখন কি আমরা কাজ আবার শুরু করতে পারি?
—সে পারেন কিন্তু মনে রাখবেন এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা যদি সব টাকা না পাই, তাহলে শুধু বাধা দেব না, আপনার কিছু ক্ষতিও করব।
—না-না, এক সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই টাকাটা পেয়ে যাবেন।
—ঠিক আছে, কথাটা মনে রাখবেন। আর হ্যাঁ, এই ক-দিন যে আপনার কাজ বন্ধ ছিল, সে ব্যাপারে বাইরে অত বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই। আমি নিশ্চয়ই আপনাকে পরিষ্কার বোঝাতে পেরেছি আমি ঠিক কী বলতে চাইছি।
—হ্যাঁ, সে বুঝতে কী আর কোনো সমস্যা হয়, কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলে দেব সরকারি একটা ছাড়পত্র নেওয়ার জন্যে আমাদের কাজটা এতদিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
—একদম এই কথাটাই বলবেন।
সুকুমার আর ওর চ্যালাদের খুব আনন্দ একটা বড়ো দাঁও মারা গিয়েছে। কিন্তু সুকুমারকে জিজ্ঞাসা করে— গুরু, আমাদের টাকাটা শেষপর্যন্ত ওই ঠিকাদার ব্যাটা দেবে তো?
—না দিয়ে যাবে কোথায়, ওকে এমন চমকিয়েছি, যে বাপ-বাপ বলে সব টাকা দিয়ে যাবে। তোরা ফালতু ফালতু টেনশন করিস না তো, এখন একটু নাক ডেকে ঘুমিয়ে নে।
—হ্যাঁ গুরু, এটা বেশ বড়ো একটা দাঁও। তুমি ঠিক ফন্দিটাই এঁটেছিলে। সরকারি টাকা ঠিকাদারেরও দিতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। ও ব্যাটা ঠিক অন্যদিক থেকে এই টাকাটা তুলে নেবে।
—যেদিক থেকে পারে ও টাকাটা তুলুক, আমাদের দিলেই হল, আমরা ওই টাকায় খানা-পিনা করব, বেশ মজা হবে।
ঠিকাদার পরের দিন থেকে কাজ শুরু করে দিয়েছে। বরুণ গিয়ে জিজ্ঞাসা করল— কী ব্যাপার, ক-দিন কাজ বন্ধ ছিল কেন?
ঠিকাদারের লোকের মুখে শেখানো বুলি— ওই সরকারি একটা পারমিশনের কাগজ আসার কথা ছিল, তার জন্যেই আমাদের কাজ কয়েকদিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
—সেই কাগজ পেয়েছ?
—হ্যাঁ, বাবু পাঠিয়ে দিয়েছেন।
বরুণ আবার শুনেছিল অন্য কথা। সুকুমার নাকি এখানেও টাকা দাবি করেছিল, তাই এরা ভয়েতে কাজ বন্ধ রেখেছিল। সুকুমারের ক্রমশ সাহস বাড়ছে। মনে হয় ঠিকাদার সুকুমারের সঙ্গে টাকা-পয়সার একটা রফায় এসেছে। সুকুমার ভালো টাকাই মনে হয় এদের কাছ থেকে পেয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার আর ঠিকাদারের লোক কিছুতেই এই কথা স্বীকার করতে চাইল না। ওরা প্রত্যেকেই বলছে— না-না, এসব সত্যি কথা নয়, সুকুমার এখানে টাকা চাইতে আসেনি।
—কিন্তু আমার কাছে যে পাকা খবর আছে সুকুমার টাকা চাইতে এসেছিল এখানে।
—না-না, সে খবর সত্যি নয়।
বরুণ বুঝল এই কথা ওরা কিছুতেই স্বীকার করবে না। তাহলে ওরও কিছু করার নেই। ওকে এখন শুধু নজর রাখতে হবে সুকুমারকে যে টাকা এই ঠিকাদার দিয়েছে, নিম্নমানের মাল সরবরাহ করে সেই টাকা তুলে নিচ্ছে কিনা।
বরুণ নিজে এবং আরও কয়েকজনকে এই নজর রাখার কথা বলে দেয়।
ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পূর্ব বারাসাতের একটা জায়গায় সুকুমারের হাতে টাকাটা তুলে দেয়। সুকুমার হাতে টাকা পেয়ে নিজেকে আরও বড়ো কিছু মনে করতে শুরু করল। খুব সহজে যখন এই টাকাটা পাওয়া গিয়েছে, তখন আরও টাকার ধান্দা করতে হবে। ও ওর ফন্দিটা ওর চ্যালাদের বলে— বলছি, এবারে টাকা যখন আসা শুরু হয়েছে, তখন এই সময়েই আরও বেশি টাকা তুলে নিতে হবে। বলতে গেলে এখনই আমাদের সুসময় যাচ্ছে। এখনই যতটা পারা যায় টাকাটা তুলে ফেলো, তারপর আবার ওই কানাইয়ের ফ্যাকড়ার মতো কোনো ফ্যাকড়া হাজির হবে, তখন হাত-পা ধুয়ে একেবারে ঘরে উঠে বসে থাকতে হবে।
সুকুমারের চ্যালাগুলো আবার অতটা আগ্রাসী নয়। ওদের গলায় ভিন্নসুর— সবে এত টাকা আমরা একসঙ্গে পেলাম, এখন ক-দিন একটু জিরিয়ে নিলে হত না?
এটা শুনে সুকুমার এক ধমক লাগায়— না, জিরিয়ে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি কেউ জিরিয়ে নিতে চাও, তাহলে একেবারে আমার দল থেকে বিদেয় নিয়ে যত পারো জিরেন নাও। আমার কিছু বলার থাকবে না। কিন্তু আমার দলে থাকতে গেলে আমি যা বলব, তা অবশ্যই করতে হবে।
তখন এদের আর কিছু করার নেই। সুকুমার যা বলে দিয়েছে সেটাই ওরা বেদবাক্য বলে মেনে নেয়—তাহলে গুরু, বলো আমরা এখন কী করব?
—এখন আমাদের ক-টা জায়গায় টার্গেট করতে হবে।
—আমরা কাদের টার্গেট করব?
—সেটাই ক-দিন ধরে ভাবছি। রাখি মালের ব্যবসা যারা করে, তাদের কাছ থেকে ভালো মালকড়ি ইতিমধ্যে খাওয়া হয়ে গিয়েছে। তাই এখন আমি অন্য টার্গেট খুঁজছি।
—কিছু খুঁজে পেলে গুরু?
—হ্যাঁ, মোটামুটি ভেবে রেখেছি এবারে আমরা কাদের টার্গেট করব।
—কাদের টার্গেট বলে ভেবে রেখেছ গুরু?
—চারপাশে অনেকেই নতুন নতুন ভালো ভালো বাড়ি করছে, ওদের ভয় দেখিয়ে টাকা চাইতে হবে।
—কিন্তু তাতে যে খুব হ্যাপা হবে।
—সে সব কাজেই হ্যাপা, আমরা টাকা চাইতে গিয়ে এমন চমকে দেব যে বাপ-বাপ বলে আমাদের হাতে নোটের তোড়া গুঁজে দেবে। আমি সব প্ল্যান প্রোগ্রাম ভেবে রেখেছি।
* * *
সুকুমার প্রথমে টার্গেট করে ওদের সুটিয়ার একজনকে। কমল সবে মাত্র চাকরি পেয়েছে একটা স্কুলে। প্রথম অবস্থায় খুব গরিব থাকলেও, এখন বেশ পয়সাকড়ি হয়েছে ওদের। ওর বাবা ওকে প্রায়ই বলে— কমল, এতদিন তো মাটির ঘরে বাস করলি, এবারে একটা পাকাবাড়ি তোল। আমরা সবাই মিলে একটু আরামে থাকি।
—হ্যাঁ বাবা, এই মাটির বাড়িতে আমরা আর থাকব না, নতুন একটা বাড়ি করব। ব্যাঙ্কে কথা বলে রেখেছি, ব্যাঙ্ক লোনটা হয়ে গেলেই বাড়িটা শুরু করব।
—দ্যাখ বাবা, যখন হোক শুরু কর বাড়িটা, আমারও বয়স হচ্ছে, আর তোর বোনও সেয়ানা হচ্ছে, একটা পাকা বাড়ি হলে খুব ভালো হয়।
—না বাবা, তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আর কণিকার জন্যে তুমি একদম ভেবো না। বোনের জন্যে আমি আছি।
কণিকা ওর মায়ের সঙ্গে ঘরের ভিতরে ছিল। ও দাদার কথা শুনে বেরিয়ে আসে— দাদা-দাদা, তাই আমাদের পাকা বাড়ি হবে, খুব আনন্দ হবে রে।
—হ্যাঁ রে, পাকাবাড়ি হবে, সানাই বাজবে, তোর জন্যে একজন রাজপুত্তুর আসবে।
কণিকা দাদার কথায় লজ্জা পায়। ও মাকে বলে—দেখো না, দাদা কীসব বলছে। ওকে এসব বলতে বারণ করো, নাহলে আমি কিন্তু চেঁচামেচি বাঁধাব।
মা কমলকে তাড়া দেয়— এই কমল, বোনের পিছনে লাগিস না তো, কত আর বয়স হল সবে ক্লাস নাইন। বিয়ের অনেক দেরি আছে।
—ও সবসময় মেয়েরা মায়ের কাছে ছুঁড়ি। কখনই বয়স বাড়বে না, আমি কিন্তু কণিকার জন্যে রাজপুত্তুর খোঁজা শুরু করে দিয়েছি।
কণিকা ওর দাদার এইসব কথায় আরও রেগে যায় আর চ্যাঁচায়— দাদা, তুই থামবি কিনা বল, নাহলে আমিও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলব তুই আমার জন্যে রাজকন্যের মতো সুন্দর একটা বউদি এনে দে। তারপর আমার বিয়ের কথা ভাবিস। নিজে এত বড় হয়েছে, নিজে বিয়ে করছে না, আবার আমার জন্যে ওনার ছেলে দেখার শখ। খুব দাদাগিরি করার ইচ্ছে হয়েছে, আমি তোকে বোঝাচ্ছি ঠ্যালা।
—আরে, আমি বিয়ে করব কী করে, যে বাড়ি থেকে সম্বন্ধ আসছে, তারাই বাড়িতে এরকম একজন ঝগড়ুটে ননদ আছে শুনে তো আর এ-বাড়িতে মেয়েই দিতে চাইছে না। তাইতো আমি তোর বিয়ে নিয়ে এইরকম ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, নাহলে তোর বিয়ে হল কিনা, আমার বয়েই যেত।
কণিকা আর সহ্য করতে পারে না। ও ঘরের থেকে একটা লাঠি নিয়ে দাদার দিকে তেড়ে গেল। কমল চ্যাঁচাচ্ছে— অ্যায়, এইজন্যেই কোনো মেয়ের বাবা মেয়ে দিতে চাইছে না। আমি বাড়ির ছেলে আমাকেই এইভাবে লাঠি নিয়ে তাড়া করেছে, আর পরের মেয়ে হলে কী যে করবে, তার কোনো হিসেব নেই।
দাদা আর বোনের মধ্যে এইভাবে খুনসুটি চলতে থাকে। আগে ওদের খুব অভাব ছিল। এখন কমল চাকরি পাওয়ায় ওরা একটু স্বচ্ছলতার ঠিকানা পেয়েছে। আগে দু-বেলা খাওয়াই ওদের ঠিকঠাক জুটত না। এখন সেই দিক দিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই। এবারে একটা ভালো বাড়ি করতে পারলে অনেকটাই নিশ্চিত।
কমল পরের দিনই সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখা করে। ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে ও বলল— স্যার, একটু ভিতরে আসতে পারি।
—হ্যাঁ, আসুন।
কমল ম্যানেজারের ঘরে ঢোকে। ম্যানেজার জিজ্ঞাসা করে— বলুন, কী দরকার?
—আমি বাড়ি করার জন্যে একটা হোম লোন নিতে চাই।
—আপনি কী করেন?
—আমি একটা ইস্কুলের শিক্ষক।
—ও, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই তবে জমিটা আপনার নিজের নামে হতে হবে। আর বাড়ি করার খরচা পুরোটা আপনি ব্যাঙ্ক থেকে লোন হিসাবে পাবেন না, একটা অংশ আপনাকে দিতে হবে, বাকিটা ব্যাঙ্ক লোন পেয়ে যাবেন।
কমল ম্যানেজারের কাছ থেকে ইন্টারেস্ট রেট, প্রতি মাসে কত শোধ দিতে হবে সব জেনে নেয়। তারপর বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
বাড়িতে বাবা-মা দুজনেই জানত ছেলে ব্যাঙ্কে গিয়েছে বাড়ি তৈরির জন্যে হোমলোনের খোঁজ নিতে। বাবার প্রশ্ন— কী কমল, ব্যাঙ্কে কী বলল?
—জমিটা আমার নামে করতে হবে, আর পুরো বাড়ি তৈরির খরচা ওরা লোন দেবে না।
—তাহলে বাকি টাকাটা কীভাবে আসবে?
—বাকি টাকাটা আমাকে যেভাবে হোক জোগাড় করতে হবে।
—কিন্তু এত টাকা কি এখন তোর কাছে আছে?
—না, এখনই নেই।
—তাহলে কী হবে, আমাদের পাকা বাড়ি হবে না?
—না-না, হবে না কেন, শিগগির হবে। আমি আর কিছু টাকা জমিয়ে নেই, তারপর ভালো করে বাড়ি তৈরি করা যাবে। আর তোমার এ ব্যাপারে বেশি ভাবতে হবে না। আমাদের বাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।
মা অতশত বোঝে না। মায়ের ক্ষোভ— ব্যাঙ্ক কী ভাবে কী আমার ছেলেকে, ওরা জানে না আমার ছেলে চাকরি করে, ওদের টাকা কি আমার ছেলে দেবে না?
কমল একটু বিরক্ত হয়— উফ মা, তুমি একটু চুপ করো তো, কিছু বুঝবে না, ফালতু মন্তব্য কোরো না।
কমল ভাবছে ও এখন যা মাইনে পায়, তাতে সংসারের সব খরচা মিটিয়ে যা থাকে, তা খুব একটা বেশি না, এই টাকা জমতে থাকলে ওর বাড়ি তৈরি করতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ওকে এখন আরও কিছু টাকা তাড়াতাড়ি জোগাড় করতে হবে। ও ভাবে টিউশন পড়ালে কেমন হয়। প্রতি মাসে ভালো একটা টাকা পাওয়া যাবে।
কমল টিউশন শুরু করে দেয়। অঙ্ক করায় ও। এখানে অঙ্কের ভালো মাস্টার নেই। কমল ব্যাচ শুরু করা মাত্র ছেলেমেয়ের ভিড় উপচে পড়তে লাগল। ও আবার অনেককেই ব্যাচে জায়গা দিতে পারে না। এই সেদিন তো বলদেঘাটা থেকে একজন এসেছিল— কমলদা, আমার ছেলেটাকে আপনাকে একটু পড়াতে হবে।
—আপনার ছেলেকে পড়াতে পারলে আমারও খুব ভালো লাগে, তবে আমার ব্যাচে আর জায়গা নেই, কোথায় ওকে বসাব বলুন তো?
—মাস্টারমশাই, আপনি ওকে একটু দেখুন। ওর রেজাল্ট খুব ভালো, আপনি দেখলে ওর রেজাল্ট আরও ভালো হবে।
—না, আমি পারব না, আমায় ক্ষমা করবেন।
কাউকে ফেরাতে কমলের খুব খারাপ লাগে। তবু ওকে অনেককেই ফেরাতে হয়। যেভাবে চারিদিকে ওর সুনাম ছড়িয়েছে, ওর কাছে সবসময় চাপ আরও আরও ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর জন্যে। কিন্তু ও পারে না, তারপর ও সবাইকে নিয়ে একেবারে হরি ঘোষের গোয়াল করতে পারবে না, ও সবাইকে ভালো ভাবে পড়াতে চায়।
মাস গেলে এখন ওর ভালো একটা থোক টাকা আসছে, কমল হিসেব করে দেখল মোটামুটি মাস কতক পড়াতে পারলেই ওর কাছে যে টাকা আসবে, সেই টাকা দিয়ে বাড়িটা শুরু করে দিতে পারবে।
কয়েক মাস বাদে ও ব্যাঙ্কে গিয়ে লোনের ব্যাপারটা ফাইনাল করে এল। এইবার প্ল্যানটা করে নিতে হবে। ভালো করেই বাড়িটা ওর করার ইচ্ছা। ব্যাঙ্কের লোনের অ্যামাউন্টটাও ও বেশিই নিয়েছে। ও জানে টিউশন থেকে এখন যেভাবে টাকা আসছে, লোনের টাকা শোধ দিতে ওর কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
* * *
কমলের বাড়ি শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশ বড়ো করেই ভিত করা হয়েছে। অনেক লোক খাটছে। কমল সবদিন থাকতে পারে না। ওর বাবা মিস্ত্রিদের দেখভাল করে। আর ওর মা টাইমে-টাইমে ওদের চা-টিফিন জোগান দিচ্ছে।
ভিতের পিলার উঠে গিয়েছে। দেওয়াল গাঁথাও শুরু হয়েছে। সুকুমারের নজর ঠিক ওইদিকে পড়েছে। ও ওর চ্যালাদের বলে— বুঝলি ওই যে আমাদের সুটিয়ার একটা ছেলে সুন্দর বাড়ি করছে না, ওটাকে ভালোমতো চমকে মাল আদায় করতে হবে।
—হ্যাঁ গুরু, ভালো পয়সা করেছে কমল, কী বড়ো বাড়ি হাঁকাচ্ছে, ওখান থেকে অবশ্যই কিছু আদায় করতে হবে।
—শোন, তাহলে আজকে রাতের দিকে একবার ওদের বাড়িতে ঢুঁ মারা যাক।
রাতে ওরা ক-জন কমলের বাড়িতে গিয়েছে। তখন রাত দশটার মতো হবে। রাজেন হাঁক দেয়—অ্যাই কমল, বাড়ি আছিস, দরজা খোল।
—কে, বাইরে কে ডাকে?
—আমরা, তুই একটু দরজা খোল।
কমল এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলে। দেখে ক-জন দাঁড়িয়ে আছে। কমলের জিজ্ঞাসা— কী ব্যাপার, এত রাতে?
—তোর সঙ্গে আমাদের একটু দরকার ছিল।
ছেলেগুলোকে কমল চেনে। সুটিয়ারই ছেলে। তবে ছেলেগুলো ঠিক সুবিধের নয়। নানা বদনাম আছে ওদের, তা এরা আবার তার সঙ্গে কী দরকারে এসেছে?
কমল প্রশ্ন করে— কী দরকার?
—ভালোই তো বাড়ি করছিস, তাই নিয়েই কথা বলতে এলাম।
কমল ওদের ভাবগতিক কিছুই বুঝতে পারছে না। ও বাড়ি করছে, তা ওদের কী? ও মনে মনে বিরক্ত হলেও, চেপে রেখেই বলে— বলো, কী কথা বলবে?
—বুঝলি, তোর বাড়িটা খুব ভালো লাগছে, তাই তোকে একটু জানাতে এলাম।
—এই অনেকদিন ধরে আমরা তো মাটির বাড়িতে থেকেছি, এবারে চাকরি পাওয়ার পরে বাড়ির সবারই একটু ইচ্ছে আমাদের একটা পাকাবাড়ি হোক, তাই একটু কষ্ট হয়ে গেলেও বাড়ি তৈরিতে হাত লাগালাম।
—না-না, মাটির বাড়িতে থাকবি কেন, বাড়ি করছিস তো ভালোই হচ্ছে। তোদেরও ভালো লাগছে, আমাদেরও।
—ধন্যবাদ।
—শুধু ধন্যবাদে হবে না।
—দাঁড়ান, একটু মিষ্টি নিয়ে আসি।
—সে একটু আনতে পারিস, তবে তার সঙ্গে আমাদের জন্যে কিছু টাকাও আনিস।
কমল অবাক হয়— কেন, টাকা কেন?
—আমাদের লাগবে তাই।
—আপনাদের লাগবে, তা আমি দিতে যাব কেন?
—যাক বাবা, বাড়ি করছিস, আর টাকা দিবি না, তাই হয় না কি?
—আমি কোনো টাকা দিতে পারব না।
—তা বললে হবে কী করে, আমরা এইসব কিনি, এসবের একটা খরচা আছে না, সেগুলো উঠবে কী করে?
এই বলে সুকুমার জামার ভিতর থেকে পিস্তলটা বার করে কমলের সামনে নাচায়, তারপর হিসহিস শব্দে বলে— শোন, আমাদের হাজার পঞ্চাশ লাগবে।
—বললাম তো, আমি দিতে পারব না।
—তাহলে এই পিস্তলটাকে আবার একটা গুলি খরচা করতে হবে, তখন কিন্তু কিছু বলতে পারবি না।
—আমি ওসব ভয় পাই না, আমি একটা কথা বলে দিয়েছি সেটাই ফাইনাল।
সুকুমার এইবার পিস্তলটা সোজা ওর কপালে ঠেকিয়ে বলে— তোর মৃত্যু কিন্তু আমাদের হাতেই হবে জেনে রাখ, ভালো চাস তো টাকাটা দিয়ে দিস। নাহলে তোকে কেউ আমাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।
এই বলে ওরা ক-জন ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। কমলের বাড়ির লোকজন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ওর মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে—বাবা, কুনজর পড়ল আমাদের ওপর। তুই বাবা, টাকাটা দিয়ে দে।
—না, আমি দেব না। ওরা জোর করে ভয় দেখাবে আর তাতে আমাকে টাকা দিতে হবে কেন?
কমলের বাবা বারবার ছেলেকে বোঝায়— না কমল, তুই বরং টাকাটা ওদের দিয়ে দে, নাহলে যে কী বিপদ হবে, তা বলা যায় না।
—না বাবা, ওদের ভয়ে আমি কিছুতেই টাকা দেব না। তারপর অত টাকা আমি এখন কোথায় পাব? ব্যাঙ্ক লোন নিয়েই তো বাড়িটা করছি।
মা ওকে বলে— আমার কিছু গয়না আছে। সেগুলো বেচে যা টাকা হয়, তা নয় ওদের দিয়ে দে।
—না, তোমার গয়না বেচতে হবে না, আমি দেখছি কী করা যায়।
কমল ভাবে কী করবে। ওই মস্তানগুলোর কথায় কি ও টাকাটা দিয়ে দেবে? ওর বাবা-মায়ের কথা মনে আসে। ওদের একমাত্র অবলম্বন ও। তারপর বোনটাও রয়েছে। ও কী করবে, টাকাটা যেখান থেকে হোক জোগাড় করে দিয়ে দেবে, নাকি দেখবে ওরা কী করে।
ও টাকাটা দেয় না, জোগাড় করারও কোনো চেষ্টা করে না। ওর মা-বাবা কয়েকবার ওকে ওই ব্যাপারে বললেও ও দেখছি বলে কাটিয়ে দেয়। ও ভেবে নিয়েছে ওই মস্তানগুলো আর যাই হোক ওকে গুলি করে মারবে না। তাহলে ওরাও খুব বিপদে পড়বে। ক-টা দিন ওয়েট করে দেখাই যাক না।
* * *
কয়েকদিন পরে সেই একই সময়ে ওরা আবার এল। এসেই সপাটে দরজায় বাড়ি— কে আছে, দরজা খোল।
—কে তোমরা?
—দরজা খুলে দেখ আমরা কারা।
কমল নিজেই এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। সেই ওরাই। সুকুমার প্রশ্ন করে— কী হল, টাকাটা দে।
—টাকাটা কোথায় পাব?
—কেন, এত বড়ো বাড়ি হাঁকাচ্ছিস, আর বলছিস টাকা কোথায় পাব! সত্যি মাষ্টাররা যে এত ধড়িবাজ হয় জানতাম না, তোকে দেখে জানলাম।
—আমি সত্যি বলছি। আমার কাছে এখন কোনো টাকা নেই।
কমলের এই উত্তরে সুকুমারের মেজাজ চড়ে যায়— আবার মিথ্যে কথা বলছিস, এত বড়ো বাড়ি হাঁকানোর টাকা রয়েছে, আর আমাদের টাকা দেওয়ার কথা বললে ভাঁড়ে মা ভবানী।
—আমি সত্যি বলছি, ব্যাঙ্ক লোন নিয়েই আমি বাড়িটা করছি।
—শোন আর ফাউ বকিস না, তোর ফালতু কথা আমি আর একটুও শুনতে চাই না। আমার দরকার টাকা, পুরো পঞ্চাশ হাজার টাকা। আর তার জন্যে তোকে পাক্কা এক সপ্তাহ সময় দিলাম, নাহলে এসে সোজা খালাস করে দেব।
আর ওরা দাঁড়ায় না। ওদের ডেরায় এসে সুকুমার সমানে গর্জাচ্ছে— আমার কোনো মূল্যই নেই ওর কাছে। পিস্তল ঠেকিয়ে আগের বারে বলে এলাম টাকাটা রেডি করে রাখিস, কোথায় কী, আবার আমাদের সঙ্গে গল্প দিচ্ছে টাকা নেই, ব্যাঙ্ক লোন করে বাড়িটা করছে। দেখিস বোঁচা, এক সপ্তা বাদে যদি টাকাটা ভালোয় ভালোয় না দেয়, তাহলে আমি সোজা ওকে ওপরে পাঠিয়ে দেব।
—সে কী, ও টাকা না দিলে তুমি আর একটা মার্ডার করবে, একে তো কানাইয়ের ব্যাপারে এত কিছু ঘটল, তারপরে আবার একটা?
—হ্যাঁ, একটা কেন দশটা মার্ডার করব, দু-চারটে লাশ না ফেললে আমাদের কেউ দাম দেবে না কি?
—সুকুমারদা, আমার কিন্তু বেশ ভয় করছে, একসঙ্গে এতগুলো মার্ডার হলে পুলিশের ঝক্কি খুব বেড়ে যাবে।
—তুই আমার কেমন শাগরেদ রে? কোথায় পাবলিককে চমকাবি তা না আমাকে চমকাচ্ছিস, তোদের এবার বাদ দেব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।