ষোড়শ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

বরুণ ইস্কুল করে বাড়ি ফিরছে। ও গোবরডাঙা স্টেশন থেকে বাইকেই ফেরে। একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে ওদের সুটিয়া যাবার রাস্তা। সেখানেই অতনু দলবল নিয়ে পথ আটকাল— অ্যাই বরুণ, তোর খুব বাড় বেড়েছে, আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশে যাচ্ছিস, লোক খ্যাপাচ্ছিস, তোকে এখানেই মেরে ফেলতে পারি জানিস?

বরুণ কিন্তু অকুতোভয়। ও বলে— এইভাবে ভয় দেখিয়ে কিছু হবে না, তোমরা মেয়েদের ওপরে যেভাবে অত্যাচার করছ, তোমাদের বিরুদ্ধে আমি মুখ খুলবই, তাতে তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলতে চাও, তো মেরে ফেলো, কেউ কিছু জানতে পারবে না।

—তাই, তোর খুব সাহস হয়েছে দেখছি।

এই বলে অতনু লাঠির এক ঘায়ে বরুণের মাথা ফাটিয়ে দেয়। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। বরুণ জ্ঞান হারায়।

পরে ওকে রাস্তায় ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে সুটিয়ারই কয়েকজন বাড়িতে দিয়ে আসে। শিবু আর মালা বরুণের ওই অবস্থা দেখে কাঁদছে— ওরে, আমার বরুণের এ হাল কে করল রে, আমাদের ছেলেটাকে মেরে ফেলল রে!

শিবু আর মালা বাবা-মা হয়েও ছেলের প্রতিবাদী স্বভাব সম্বন্ধে এতটা জানত না। কিন্তু পাড়া-পড়শিরা যখন বলতে লাগল— এ দেখতে হবে না, বর্ডার পার্টিই বরুণের মাথা ফাটিয়েছে।

মালা অবাক হয়। বর্ডার পার্টি কারা, আর তারাই বা কেন বরুণের মাথা ফাটাবে? ও ওদের জিজ্ঞাসা করে— এসব তোমরা কী বলছ, বর্ডার পার্টি কেন আমার বরুণের মাথা ফাটাবে?

—বরুণ যে ওদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে, ওরা ওকে ছাড়ে?

শিবু আর মালা ভাবে আর নয়, এবারে যেভাবে হোক বরুণকে বিয়ে দিতেই হবে। তাহলে ও যদি একটু থিতু হয়। গজেন ডাক্তার এসেছে বরুণকে দেখতে। উনি বরুণের চোট ভালোভাবে দেখে বললেন— খুব বাঁচান বেঁচেছে এ! আর একটু আঘাত জোরে হলে ওর মাথার একেবারে ভিতরে চোট লাগত, তখন ওকে বাঁচানো খুব সমস্যা হয়ে যেত।

গজেন ডাক্তার বরুণের মাথায় ভালো করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বলেন— ক-দিন তোমায় খুব সাবধানে থাকতে হবে, বেশি নড়াচড়া করবে না।

গজেন ডাক্তার চলে যাওয়ার পরে শিবু আর মালা দুজনে ছেলের মাথার কাছে গিয়ে বলে— বরুণ, বাবা, তুই ওইসব বর্ডার গ্যাঙের পিছনে লাগিস না, দেখলি তো তোকে কীভাবে আক্রমণ করল, ওরা খুব সাংঘাতিক। তুই বরং একটা বিয়ে কর, সংসারী হ।

বরুণ বলে— না, আমি বিয়ে করব না।

—কেন, বিয়ে করবি না কেন?

—এই দেখো, তোমরা বলছ বর্ডার পার্টি খুব সাংঘাতিক, ওরা যেকোনো সময় আমাকে মেরে ফেলতে পারে, তাহলে পরের ঘরের মেয়ে এনে কেন তার জীবনটা নষ্ট করতে চাও তোমরা?

—কিন্তু তুই ওই বর্ডার পার্টির বিরুদ্ধে লড়াই করা ছেড়ে দিচ্ছিস না কেন?

—না, সে আমি পারব না। তাতে যদি আমার জীবন চলে যায়, তাও চলে যাক, কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে লড়াই আমি থামাতে পারব না।

—কেন, থামাতে পারবি না কেন?

—ওরা কত মেয়ের ওপরে অত্যাচার করছে। ওরা এক-একটা মানুষরূপী পশু। ওদের ভয়ে সবাই যদি ঘরে বসে থাকি, তাহলে হবে কী করে, ওদের বিরুদ্ধে কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে।

এবারে শিবু আর মালা দুজনেই চুপ করে যায়। সত্যিই তো সুটিয়ায় যেভাবে একের পর এক মেয়েদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, তা সহ্যও করা যায় না। এদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কাউকে না কাউকে তো মুখ খুলতেই হত, সে ওদের ছেলে খুলেছে খুলুক, ওদের মনটা গর্বে ভরে ওঠে।

* * *

গজেন ডাক্তার ওকে রেস্ট নিতে বলেছে। কিন্তু রেস্ট নিলে হবে না। হাতে সময় খুব কম। ও ঠিক করে নেয় কী কী করতে হবে।

ও সুটিয়ার বিভিন্ন জনের বাড়ি যায়। সবাইকে ও বোঝায়— আমরা সবাই মিলে মিলিত ভাবে যদি আওয়াজ না তুলি তাহলে সুকুমার, অতনুরা যা খুশি করবে মেয়েদের নিয়ে, আমাদের শুধু দর্শক হিসাবে দেখে যেতে হবে।

—কিন্তু তুমি কী করতে চাও বরুণ?

—আমি চাই একটা সংগঠন তৈরি করে ওইসব পশুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।

—কিন্তু তাহলে যদি আমাদের ওপরও আক্রমণ হয়?

—হয় হবে, সে ভয় আমি করি না। আমাদের সুটিয়ার মেয়েরা, আমাদের মা-বোনেরা প্রতিদিন ওইসব পশুদের হাতে ধর্ষিতা হবে তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি একা এগোচ্ছি, আপনারা আসতে হয় আসুন।

সুটিয়ার অনেকেই চেয়েছিল এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারেনি। আজকে এই অকুতোভয় বরুণ এদের মনে সাহস যোগাল। রবি মল্লিক, তপন দালাল, অখিল দাস সবাই বলল— না, আমরা তোমার সঙ্গে এই প্রতিবাদে সামিল হব।

তৈরি হল সুটিয়া প্রতিবাদী সংস্থা। রবি মল্লিক সভাপতি আর বরুণ বিশ্বাস সম্পাদক। বরুণ সবাইকে বোঝাল— এখন আমাদের প্রথম কাজ হবে এই প্রতিবাদী সংস্থায় আরও বেশি মানুষকে নিয়ে আসতে। বেশি মানুষকে নিয়ে আসতে পারলে আমাদের জোর বাড়বে, আর তখনই নির্যাতিতা মহিলারা থানায় অভিযোগ জানাতে বুকে বল পাবে, তখনই অপরাধীগুলো ধরা পড়বে।

ঠিক হল ওরা মিটিং করে সবাইকে সংগঠিত করবে। সুটিয়া বাজারে মিটিং হবে। একটা মাইক্রোফোন খাটানো। সামনে কোনো লোক নেই। সবাই বর্ডার পার্টির ভয়ে এদের থেকে একটু দূরত্ব রেখে চলতে চাইছে।

বরুণ বলা শুরু করে— আমরা কী মানুষ, আমাদের মায়েদের-বোনেদের প্রতিদিন শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাচ্ছে, আমরা চুপ করে বসে আছি। আপনারা ভাববেন না চুপ করে বসে থাকলেই ওরা আপনাদের বাড়ির মেয়েদের ছেড়ে দেবে, ওরা কিন্তু আপনাদের বাড়ির মেয়েদেরও ছাড়বে না। ওদের হাত থেকে সুটিয়ার মেয়েদের বাঁচাতে গেলে একমাত্র পথ আমাদের সবার একসঙ্গে রুখে দাঁড়ানো, তারপর দেখা যাবে ওরা কীভাবে আমাদের মেয়েদের ওপর অত্যাচার করে, কিন্তু ভয় পেলে চলবে না, তাহলে ওরা আরও পেয়ে বসে আরও অত্যাচার চালাবে। সুতরাং ভয় না পেয়ে আপনারা এগিয়ে আসুন, আমরা সবাই মিলে ওদেরকে রুখে দিই, সুটিয়ার মেয়েদের আমরা বাঁচাই...

বরুণের কথায় আস্তে আস্তে কাজ হতে শুরু করে। এক এক করে লোক বাড়তে থাকে। বেশ ভিড় হয় বরুণের বক্তৃতা করার জায়গায়। ভিড়ের মধ্যে থেকে প্রথমে গুন-গুন আওয়াজ ওঠে— ওদেরকে রুখতে হবেই। সুটিয়ার মেয়েদের যারা সর্বনাশ করছে তাদের আমরা শাস্তি দেবই।

কয়েকজনের মনে আবার কু গায়— আমরা এই প্রতিবাদী সংস্থায় যোগ দিলে বর্ডার পার্টি যদি আমাদের ওপর আক্রমণ করে?

—করে করুক, ওই বরুণ যদি বর্ডার পার্টির ভয়ে পিছিয়ে না গিয়ে এইভাবে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে পারে, তাহলে আমরা পারব না কেন?

আস্তে আস্তে সবার মনের দ্বিধা দূর হয়। আতঙ্ক মানুষের বিবেককে চুপ করিয়ে রেখেছিল, মানুষ হয়ে পড়েছিল মনুষত্ব্যহীন। আজকে আবার সেই আতঙ্কই মানুষের বিবেককে জাগিয়ে দিল। অনেক লোকই নাম লেখাল সুটিয়া প্রতিবাদী সংস্থায়।

ওই বাজারেই ওরা দরকারি একটা মিটিং সেরে নিল। বরুণ বলছে— সুটিয়ায় যে নারী নির্যাতন শুরু হয়েছে তাকে আটকাতে গেলে আমাদের পুলিশের ওপর ভরসা করতে হবে।

সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা হা-হা করে উঠল— না-না, পুলিশের ওপর ভরসা করে কোনো লাভ নেই। সুকুমার-অতনু এরা পুলিশকে টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে।

বরুণ বলে— হ্যাঁ, সেটা ঠিক, কিন্তু পুলিশের কাছে যারা গণধর্ষিতা হয়েছে, তাদের কয়েকজন যদি অভিযোগ জানায়, আর তারপর পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নিলে আমরা প্রতিবাদী সংস্থা চাপ দেব, ওপরমহলে যাব। তখন পুলিশ ব্যবস্থা না নিয়ে পারবে না।

—কিন্তু পুলিশে অভিযোগ জানানোর সাহস যে ওই মেয়েদের বা তাদের বাড়ির লোকেদের হবে না, পুলিশে অভিযোগ জানালে বর্ডার পার্টি আবার যদি ডেলি ডেলি এসে গ্যাংরেপ করে, তখন কে বাঁচাবে?

—আমরা যে সমস্ত মহিলারা ধর্ষিতা হয়েছে তাদের বোঝাব আমরা আপনাদের পাশে আছি, তাহলে তারা যদি একটু সাহস পায়, ঠিক পুলিশে অভিযোগ জানাবে। তারপর দেখি পুলিশ ব্যবস্থা না নিয়ে কী করে পারে।

বরুণের প্রস্তাবই সেদিনকে ওরা সিদ্ধান্ত হিসাবে মেনে নিল যে নির্যাতিতা মেয়েদের কাছে যেতে হবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাদের দিয়ে পুলিশে অভিযোগ জানাতে হবে, তারপর পরের পদক্ষেপ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%