তৃতীয় অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

জয়বাংলা ঘোষণা হয়েছে। খানসেনারা সবাই ধরা দিয়েছে। রেডিওতে সেই খবরই বারবার শোনানো হচ্ছে। এত দুঃখেও শিবুর মনে খুব আনন্দ হচ্ছে। ও সারা পাঁচপোতায় চেঁচিয়ে বেড়াচ্ছে — জয়বাংলা-জয়বাংলা। এখন আমি ওপারে যাব, ফরিদপুরে যাব, জয়বাংলার গান গাইব। দেখি আমাকে কে আটকায়!

এদিকে ওর নতুন প্রতিবেশী স্বপন ওকে খবর দিতে ছুটেছে—শিবু-শিবু, তোর বউয়ের প্রসব-বেদনা উঠেছে, শিগগির কমলা দাইকে খবর দে।

শিবু এই খবরে খুব আনন্দিত হয়ে ছোটে কমলা দাইকে খবর দিতে। কাছেই ওর বাড়ি। এমনিতে কমলা দাই মালাকে আগে বেশ কয়েকবার দেখে গিয়েছে। ও নিজেই বলেছিল— এই যে শিবুদা, শুধু গান গেয়ে বেড়ালে হবে, যেকোনো সময় তোমার বউয়ের প্রসব-বেদনা উঠবে, একটু খেয়াল রেখো।

স্বপনের এই খবরে শিবু আনন্দে ছুটল বাড়ির দিকে। পাড়ার বউরা সব শিবুর ঘরে ভিড় করেছে। শিবুকে দেখে সবাই হইচই তুলল— এই যে আবার ছেলের বাপ হয়েছে, আমাদের মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।

শিবু বলে— হ্যাঁ-হ্যাঁ, সবাইকেই খাওয়াব, আগে ছেলের মুখটা দেখি।

কমলার হাতে ছেলে। দেখে দু-চোখ জুড়িয়ে গেল।

—ছেলের মা কেমন আছে?

—ভালোই।

ছেলেটাকে দেখে আবার রত্নার কথা মনে পড়ে গেল, রমাকান্তর বউয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ওর নিজের বাড়িতে আজকে নতুনের আগমনের আনন্দ, আর ওপারে ওদের গাঁয়ে এখন শ্মশানের হাহাকার। ওর দু-চোখ জলে ভরে যায়। কমলা বলে— কী ব্যাপার শিবুদা, ছেলে হাতে নিয়ে কাঁদছ কেন, ওপারের কথা মনে পড়ছে?

শিবু কোনো উত্তর দিতে পারে না। ছেলেটাকে কমলার হাতে দিয়ে ও বেরিয়ে পড়ে। ওর চোখে পুরোনো দিনগুলো ভেসে ওঠে। ও ভেবেছিল ওর ছেলে জয়বাংলায় জন্মাবে, স্বাধীন বাংলায় বড়ো হবে। কিন্তু জয়বাংলার আগেই ওকে চলে আসতে হল। ছোটো ছেলেটা জয়বাংলা দেখতে পেল না, রত্নাকে দেখতে পেল না, রমাকান্তের বউকে দেখতে পেল না। খানসেনাদের কথা মনে হতেই ওর দু-চোখে ছুটন্ত হায়নার দলের ছবি ভেসে ওঠে, যারা ওদের ধারালো নখ-দাঁত দিয়ে এক নিরীহ বাছুর আর গাইকে ফালাফালা করে ফেলছে। ও সত্যি আর সহ্য করতে পারে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%