ষষ্ঠ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

বরুণ এখন বেশ বড়ো হয়েছে। কলেজে ও ঠিক করেছে বাংলা নিয়েই পড়বে। বাংলা ওর খুব ভালো লাগে। জীবনানন্দের কবিতার লাইন ''আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়'' ওকে পাগল করে দেয়। ও জীবনানন্দের কবিতায় নিজেকে খুঁজে ফেরে। কলেজে পড়তে পড়তেই ও ভাবে কী হবে পড়াশুনা করে? চাকরি-বাকরি তো এই বাংলা পড়ে হবে না, তাহলে লাভ কি পড়াশুনা করে? কোনো ইস্কুলে চাকরি পেতে গেলে ম্যানেজিং কমিটিকে লাখ টাকা কম করে ঘুষ দিতে হবে। কোথায় পাবে ও সেই টাকা? ওর বাবা ওদের ভাই-বোনদের অনেক কষ্ট করে বড়ো করেছে, তারপর এইভাবে ওকে টাকা দিয়ে চাকরিতে ঢোকাবেই কী করে, ও ভেবে পায় না। পরমুহূর্তেই ভাবে ও ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢোকার কথা কেনই বা ভাববে। সোজাপথে ও চলতে চায় জীবনে, তাতে ওর কিছু হল তো হল, নাহলেও কিছু যায় আসে না, সোজাপথ ও ছাড়তে পারবে না। গীতার কর্মযোগের কথা ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলীতে পেয়েছে— কর্ম করিয়া যাও, ফলের আশা করিও না।

ও সেইটাকে মনে রেখেই পড়াশুনো করে যেতে লাগল। ফার্স্ট ইয়ার তারপর সেকেন্ড ইয়ার পার্ট-ওয়ান তারপর পার্ট-টু। অনার্সে ভালোই রেজাল্ট করল।

* * *

মেদিনীপুরের রামনগরের কুমারমোহন হাই স্কুল। ইংরাজিতে একটা পোস্ট খালি। ইন্টারভিউ চলছে। সঞ্চিতা খুব গরিবের মেয়ে। অনেক কষ্টে পড়াশুনা কমপ্লিট করেছে। ও ইন্টারভিউ দেবার কল পেয়েছে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে। ওর ডাক আসল। ইন্টারভিউ বোর্ডে যাঁরা আছেন, প্রত্যেকেই সঞ্চিতার মার্কশিটের জেরক্সগুলো উলটেপালটে দেখে খুব সন্তুষ্ট। তারপর একের পর এক প্রশ্ন। কোনোটা ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ড থেকে, কোনোটা বা আবার মেডিয়েভাল পিরিয়ড থেকে। সঞ্চিতাকে হার মানানো সকলেরই দুঃসাধ্য। আর গ্রামারে ও তো একেবারে দুর্দান্ত। যিনি এক্সপার্ট হিসাবে ওখানে উপস্থিত ছিলেন, উনি না বলে পারলেন না— তোমার এত ভালো রেজাল্ট, তুমি কলেজে ঢোকার পরীক্ষা না দিয়ে এই স্কুলে ঢুকতে চাইছ কেন, আমাদের মনে হয় এতে তোমার ভবিষ্যতের ক্ষতি হবে।

—না স্যার, এছাড়া আমার কোনো উপায় নেই।

—কেন?

—আমার বাবা নেই, অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, আমার পরে আরও দুটো বোন আছে।

এক্সপার্ট সঞ্চিতার অবস্থা শুনে আর কোনো মন্তব্য করলেন না। ইন্টারভিউ শেষ। সঞ্চিতা যেভাবে ইন্টারভিউ দিয়েছে আর এক্সপার্ট যেভাবে তাকে প্রশংসা করেছে, তাতে ও নিশ্চিত চাকরিটা পাবেই।

বাড়িতে ঢুকেই মায়ের প্রশ্ন— কী সঞ্চিতা, কী হল?

—মা, ইন্টারভিউ খুব ভালো হয়েছে, মনে হচ্ছে আমি চাকরিটা পেয়ে যাব।

—আমি জানি মা, তুই চাকরিটা পাবিই। এত বছর ধরে এত কষ্ট করে পড়াশুনা করলি, তুই চাকরি না পেলে আর কে পাবে? তুই চাকরি পেলে আমি শিবের মন্দিরে মানত করেছি, বড়ো করে পুজো দেব।

—সে হবে-খুনি, আগে চাকরিটা তো পাই।

বোন দুটো সমানে সঞ্চিতাকে ধরছে— অ্যাই দিদি, তুই চাকরি পেলে আমাদের কিন্তু অনেক কিছু কিনে দিতে হবে।

—কী নিবি তোরা?

ছোটোটা আস্কারা পেয়ে উৎসাহী হয়— দিদি, আমার একটা ভালো শালোয়ার কিনে দিস।

—আর তোর?

—আমি ভালো একটা শাড়ি নেবো।

—ও এইটুকু, আমি ভাবলাম তোরা হয়তো উড়োজাহাজ-টুরোজাহাজ কিছু চেয়ে বসবি।

ওদের পরিবার একটু সুখের গন্ধ পায়। সেই গন্ধ নিতে ওরা সবাই মশগুল। এখন শুধু অপেক্ষা কবে স্কুল থেকে জানায়। বেশ কিছুদিন পরে স্কুল থেকে সেক্রেটারি খবর পাঠিয়েছে দেখা করার জন্য। সঞ্চিতা ভাবল যাক একটা হিল্লে অন্তত হল।

ও সোজা সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে রামনগর চলে যায়। সেক্রেটারি ওকে দেখে বলেন— ও তুমি এসে গিয়েছ, বলো কেমন আছ?

—ভালো আছি স্যার, এদিকে কিছু খবর হল স্যার?

—হ্যাঁ, খবর তো আছেই, সেইজন্যেই যে তোমাকে ডেকে পাঠানো।

—কী খবর স্যার?

—শোনো সঞ্চিতা, তোমার ইন্টারভিউ বেশ ভালো হয়েছে। তুমিই আমাদের প্যানেলের প্রথমে আছ, তবে প্যানেলটা আমরা এখনও ঘোষণা করতে পারিনি।

—কেন স্যার?

—সেই জন্যেই তো তোমাকে ডাকা।

সঞ্চিতা বেশ অবাক হয়, ও ইন্টারভিউ প্যানেলের প্রথমে রয়েছে, তবুও সেই প্যানেল কেন এখনও ঘোষণা হয়নি, আর ওকেই বা কেন এখানে ডেকে আনা হল। সেক্রেটারিও যেন সঞ্চিতার মনের কথা বুঝতে পেরেছেন। তিনি বললেন— দেখো, ইন্টারভিউ দিয়ে যে সেকেন্ড হয়েছে, সে ইতিমধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে। সে বলেছে দু-লাখ টাকা দেবে এই চাকরিটার জন্যে। এখন আমরা চাই তোমাকেই নিতে, তুমি আমাদের দু-লাখ টাকা দিয়ে দাও, আমরা প্যানেলটা ঘোষণা করে দিচ্ছি।

সেক্রেটারির এই কথা শুনে সঞ্চিতার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। এ কী শুনছে ও? তাহলে ওর মেধার, এতদিনের অধ্যাবসায়ের কি কোনো মূল্য নেই? ও বলে— স্যার, আমরা খুব গরিব, আমার বাবা নেই, এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব?

—কিন্তু টাকাটা না পেলে তোমাকে আমরা কোনোভাবেই ঢোকাতে পারব না।

সঞ্চিতার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এই চাকরিটা নিয়ে ওর জীবনে অনেক আশা ছিল। বাড়ির সবাই ওর মুখ চেয়ে বসে আছে। কিন্তু দু-লাখ টাকা কেন, একসঙ্গে কুড়ি হাজার টাকা জোগাড় করার সামর্থ্যই ওর নেই। বাড়িতে গিয়ে ও মাকে কী খবর দেবে, বোনেদেরই বা কী বলবে। ও হতাশায় ভেঙে পড়ে।

—স্যার, তাহলে কি কোনো উপায় নেই?

সেক্রেটারি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন, তারপর ওর দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকেন যেন হাঁ করে ওকে গিলে খাচ্ছেন। সঞ্চিতার অস্বস্তি হয়। সেক্রেটারি এরপর বলেন— দেখো, তোমাকে আমি এই চাকরিতে ঢোকাতে পারি কোনো টাকা না নিয়েই, কিন্তু তার বিনিময়ে আমি তোমার কাছ থেকে কিছু চাই।

সঞ্চিতার মন অজানা আশঙ্কায় দুরুদুরু। ও বিপদের ছায়া দেখতে পায়। তবুও ওর জিজ্ঞাসা— আমি স্যার চাকরিটা চাই, বলুন আপনার কী চাই?

— একটা রাত তোমাকে আমার সঙ্গে কাটাতে হবে, তোমার শরীরটা ভেরি সেক্সি।

সঞ্চিতা এরকমই যেন কিছু একটা আশঙ্কা করছিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজে সরাসরি শরীর বিনিময়ের কথা শোনাও পাপ। ও ভয়ংকরভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়— এ আপনি কী বলছেন, এটা আপনার বলতে মুখে একটুকু বাঁধল না? আপনি মানুষ না পশু?

সেক্রেটারি সঞ্চিতার এই তীব্র প্রতিক্রিয়াতেও একেবারে ভাবলেশহীন। উনি কাটা-কাটা কথায় বলেন— সঞ্চিতা, মনে রেখো একটা রাত তুমি আমায় দিলে, আমি তোমাকে সারা জীবনের সুখ ওই চাকরিটা দিতে পারি। তোমার গরিব পরিবার তোমার মুখ চেয়ে বসে আছে। তুমি সময় নাও, আমি আরও একসপ্তা বাদে এই ইন্টারভিউ-এর প্যানেলটা আউট করব। তুমি বাড়িতে গিয়ে নিজে নিজে চিন্তাভাবনা করো, তারপর জানিও। তবে হ্যাঁ, তুমি যদি এই কথা বাইরে প্রকাশ করো, তাহলে মনে হয় তোমার সঙ্গে তোমার পরিবারের আর কারো দেখা হবে না, এটা মনে রেখো।

সঞ্চিতা আস্তে আস্তে সেক্রেটারির ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ও এবার কী করবে? ঘৃণায় ওর সারা শরীর নীল হয়ে যায়, ওর সামনে সেক্রেটারির মুখটা একটা হিংস্র পশুর মুখে বদলে যায়। আবার পরমুহূর্তেই বাড়ির কথা ভেসে আসে, মা-বোনদের মুখ। ওদের মনে অনেক আশা— দিদি হয়তো সুখবরটা নিয়েই আজকে বাড়িতে ঢুকবে। কিন্তু কী খবর দেবে ওদের? এই খবর, এই প্রস্তাবের খবর মা শুনলে তখনই হয়তো হার্ট ফেল করবে। খুব আদরের মেয়ে ও। সেই মেয়ের কোনো অসম্মান ওর মায়ের সহ্য হবে না। ওর জীবনেও একটা নিজস্ব স্বপ্ন আছে, নিজে একটা চাকরি পাবে, মা-বোনেদের দেখবে, তারপর কারো সঙ্গে ঘর বাঁধবে। কিন্তু এখন কী হবে?

ও বাড়িতে পৌঁছে যায়। ওরা সবাই যেন ওর অপেক্ষাতেই বসে আছে। সঞ্চিতা ওর মুখের দুখী-দুখী ভাবনা ঝেড়ে ফেলে। ওকে দেখেই ওর বোনেরা হই-হই করে ওঠে— কী হল দিদি, কী খবর?

—না, এখনও কোনো খবর হয়নি।

—যা বাবা, তাহলে তোকে ডাকল কেন?

—ওই আমার একটা সার্টিফিকেটের জেরক্স অ্যাটেস্টড করা নেই, সেটা ফেরত দিয়ে দিল।

মা বলল— বলছি, আর অন্য কিছু বলল না?

—কী ব্যাপারে?

—এই চাকরিটা তোরই হবে, বা এই ধরনের কিছু।

—না, সেরকম কিছু বলেনি।

—এই চাকরিটা হয়ে গেলে আমরা সবাই একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারব, আমিও অনেক মানত করে রেখেছি। দেখিস, তোর চাকরিটা ঠিক হবেই।

সঞ্চিতা আর কোনো কথা বলে না। দেবতারা ফুলে সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু তার তো বিধিবাম। ওর শরীর না দিলে যে সেক্রেটারি ঠাকুর সন্তুষ্ট হবেন না। ও ভাবে আচ্ছা, কোনো ঠাকুর কি তার মান-সম্মান বাঁচিয়ে চাকরিটা পাইয়ে দিতে পারে না? নারীর লজ্জা বাঁচানো, সম্ভ্রম বাঁচানো এগুলোও তো ঠাকুর-দেবতাদের কাজ। ওর মহাভারতের কথা মনে আসে। ভরা রাজসভায় দুঃশাসন যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে যায়, কৃষ্ণ হয়ে যান ত্রাণকর্তা। কোনো কৃষ্ণ কি তার জীবনে ত্রাণকর্তা হয়ে দেখা দেবে না? আবার পরেই ভাবে কোনো দেবতা-টেবতা নয়, তাকে যদি বাঁচতে হয় নিজেকেই বাঁচাতে হবে। ও এখন চরম দোটানায়। ও নিজেকে বাঁচাবে, না কি সংসারকে? সংসারের জন্যে নিজের শরীরকে কি ও এক পশুর কাছে বিক্রি করে দেবে? ও ডিসিশন নিতে পারে না, ওর দু-চোখ জলে ভরে ওঠে আর ও হাপুস নয়নে কাঁদে। সাক্ষী থাকে বিকেলের নীড়ে ফেরা পাখি, কোনো এক প্রলয়ের আশঙ্কায় নিশ্চুপ হয়ে থাকা বৃক্ষের সারি, আর উঠোনের তুলসি গাছ।

ও ঘুমোয়। ওর ক্লান্ত মন ঘুমের রাজ্যেও শান্তি পায় না, সেক্রেটারি যেন ওর ঘুমের মধ্যেও প্রস্তাব দেয়—সঞ্চিতা, কেন এত ভাবছ? স্রেফ একটা রাতের তো ব্যাপার, তারপর তুমি নিশ্চিন্ত থাকো চাকরিটা পেয়ে যাবে। ভাবো, তোমার বাড়ির লোকেরা কত সুখে থাকবে। আমি বুঝতে পারছি তারা এতদিন খুব কষ্ট করেছে, এবারে তাদের একটু শান্তি দাও সঞ্চিতা।

সঞ্চিতা স্বপ্নেও এই প্রস্তাবে রাজি হতে পারে না। ও সমানে না-না করে। ওর চিৎকারে ওর ছোটো বোনের ঘুম ভেঙে যায়— অ্যাই দিদি, কী হয়েছে রে, ঘুমের ঘোরে চিৎকার করছিস কেন?

— না, কিছু না, তুই ঘুমো।

ছোটো বোন আবার ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু ওর চোখে ঘুম আসে না। সারা রাত ও বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। ও যতই ভাবুক সিদ্ধান্ত ও নিয়ে নিয়েছে, তবুও মায়ের আর বোনেদের মুখ দুটো সমানে ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বোনেরা সমানে ওকে বলছে—দিদি, তোর চাকরিটা হয়ে গেলে আমায় একটা ভালো শাড়ি কিনে দিস।

—না দিদি, আগে আমার শালোয়ার।

দুই বোনে মিলে ঝগড়া বাঁধায়। সঞ্চিতা ওদের শান্ত করতে চায়। পরমুহূর্তেই ওর হুঁশ ফিরে আসে ও এসব কী ভাবছে, ও তো চাকরিটা ওই শর্তের বিনিময়ে কিছুতেই নিতে পারবে না। আবার কেউ যেন ওর ভিতর থেকেই বলে ওঠে— না সঞ্চিতা, চাকরিটা তোমায় পেতেই হবে, শুধু একটা রাত, তারপর তো তোমার হাতেই সুখের খনি, ওই চাকরিটা।

সকাল হতেই ও ঠিক করে নেয় কী করতে হবে। সোজা সেক্রেটারির বাড়িতে গিয়ে ওঠে ও। সেক্রেটারি যেন ওর অপেক্ষাতেই ছিলেন— এই যে সঞ্চিতা, তুমি এসে গিয়েছ, তোমার কথাই ভাবছিলাম।

—বলছি বাড়িতে বউদি নেই?

—কেন, বউদির কী দরকার?

—অনেক দরকার ছিল।

—অনেক দরকার থাকলেও এখন কিছু করার নেই, এখন তুমি বলো আমার এখানে হঠাৎ এলে কেন?

—আপনার প্রস্তাবে আমি রাজি কিন্তু ওসবের পর চাকরিটা যে আমি পাব তার কি নিশ্চয়তা আছে?

—ও সেইজন্যে তুমি বউদির খোঁজ করছিলে, তবে তুমি নিশ্চিত থেকো তোমার চাকরিটা হবেই আমার শর্তে রাজি হলে। আমি বলতে গেলে এককথার মানুষ।

—কিন্তু পরে ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে।

—সে ব্যাপারে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমারও সমাজে একটা মান-সম্মান আছে।

ঠিক হল পরেরদিন বিকেলে সঞ্চিতা দিঘায় যাবে, সেখানে হোটেলে একটা রাত। সঞ্চিতা এখন নিজেকে নিজেই ঘৃণার চোখে দেখছে। ও ভাবছে না, দিঘায় যাবে না। চাকরির জন্যে নিজের সবকিছু ও খোয়াতে কিছুতেই পারবে না।

* * *

এতকিছু ভেবেও সঞ্চিতা বিকেলে দিঘায় চলে গেল। সেক্রেটারি যেখানে বলেছিল সেখানেই গেল। সেক্রেটারির সঞ্চিতাকে দেখে সে কী হাসি! — ও তুমি এসে গিয়েছ, আমি আবার ভাবছিলাম তুমি না এলে আজকের সব আয়োজনই বৃথা।

সঞ্চিতা কোনো কথা বলে না, ও মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে যেন হাঁড়িকাঠে চাপাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

—চলো, আমরা হোটেলে যাই।

সঞ্চিতা ভাবছে কখন সবার চক্ষুর অন্তরালে যাওয়া যায়। ও বলল— তাই চলুন।

হোটেলের ঘরে ক্ষুধার্ত হায়নার মতো সেক্রেটারি সঞ্চিতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সঞ্চিতা দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বুজে সব অত্যাচার সহ্য করতে লাগল, রাতে আরও বার কয়েক তিনি সঞ্চিতার ওপর অত্যাচার চালালেন। রক্তাক্ত সঞ্চিতা বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল। শেষকালে ভোরবেলা আর একবার সেক্রেটারি সঞ্চিতাকে ধর্ষণ করলেন।

ও যখন সকালবেলা হোটেলের ঘর থেকে বেরোচ্ছে, তখন ওর বয়স বেড়ে গেছে অনেকটাই। ও এখন একজন ধর্ষিতা নারী। অবশ্য এটাকে কি ধর্ষণ বলা চলে, ও তো নিজের ইচ্ছেতেই কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নিজের শরীরটা দিয়েছে। ও তো নিজের শরীরটাকে বিক্রি করেছে ওই শয়তানটার কাছে। ও নিজের দিকে আর তাকাতে পারছে না। ও সোজা চলে যায় সমুদ্রের ধারে। একের পর এক ঢেউ এসে বোল্ডারে ধাক্কা মারছে। ওর মনের গভীরেও সেই একই ঢেউয়ের ক্রমাগত ধাক্কা, গতরাতের কথা যত ওর মনে আসে, ততই ও নিজেকে আরও আরও বেশি ঘৃণা করতে থাকে।

* * *

সঞ্চিতার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওর বাড়ির থেকে মা বারবার ওর বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিতে একে ওকে পাঠাচ্ছে। কিন্তু কেউ খোঁজ দিতে পারছে না। এদিকে মা বলছে— সঞ্চিতা যে বলে গেল ও ওর বন্ধুদের সঙ্গে দিঘায় যাচ্ছে, কোথায় গেল ও?

এদিকে যা হয়, এতদিন যে মেয়ের সম্বন্ধে কেউ একটা কথাও বলতে পারেনি, তারাই আজকে আঙুল তুলছে— ও দেখতে হবে না, কোনো ছেলের সঙ্গে নিশ্চয়ই প্রেম করে কোথাও না কোথাও পালিয়েছে। কতদিন আর এই বুড়ি মা আর ছোটো দুই বোনের দায় বহন করবে?

সঞ্চিতার ছোটো বোনের কানে এই কথা যায়। ও ছুটে এসে বাড়িতে বলে— জানো মা, ও-পাড়ার দেবী মাসি দিদির সম্বন্ধে কীসব বলছে।

—কী বলছে দেবী?

—সে-সব আমি বলতে পারব না, খুব বাজে বাজে কথা।

এই বলে ছোটো বোন কান্নায় ভেঙে পড়ে। ওর মেজদি ওকে সান্ত্বনা দেয়— ওসব কথায় একদম কান দিবি না, এখন দিদিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোথায় সবাই মিলে খুঁজবে, তা না উল্টোপাল্টা কথা! মা, তুমি এসব কথায় একদম পাত্তা দিও না।

দু-দিন হয়ে গেল সঞ্চিতার কোনো খোঁজখবর নেই, সঞ্চিতার মা গিয়েছে থানায়। থানার অফিসার শুনেই বললেন— ও দেখতে হবে না, আপনার মেয়ে নিশ্চয়ই কোনো ছেলের সঙ্গে পালিয়েছে, দু-দিন বাদে ঠিক দুজনে এসে আপনাকে নমস্কার করে যাবে।

—না দারোগাবাবু, আমার মেয়ে একেবারে ও-রকম নয়।

—সে সব মায়েরাই প্রথমে বলে, তারপর ঠিক ঝোলার থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ে।

—বিশ্বাস করুন দারোগাবাবু, সঞ্চিতা একেবারে ও-রকম মেয়ে নয়। আপনি ভালো করে ওর খোঁজ নিন।

—ঠিক আছে, আপনি অভিযোগ লিখিয়েছেন, আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

* * *

কয়েকদিন বাদে সঞ্চিতার মাকে আবার থানায় ডেকে পাঠাল। দিঘার একেবারে শেষপ্রান্তে সমুদ্রের ধারে একটা যুবতীর লাশ পাওয়া গিয়েছে, সেটা দেখতে হবে। মা লাশটা দেখতে মর্গে ঢোকে, তারপর বুকফাটা কান্না। ওর সামনে সঞ্চিতা শুয়ে আছে, তবে কোনো সাড়া নেই, চোখ দুটো বোজা, চুল এলোমেলো।

কথা হারিয়ে যায় মায়ের মুখ থেকে। ক্রমাগত প্রশ্ন ধেয়ে আসে— দিদি, এই লাশটি কি আপনার মেয়ে সঞ্চিতার?

কোনো উত্তর উঠে আসে না মায়ের গলা থেকে। কিন্তু বেরিয়ে আসা কান্নার তোড় হয়ে যায় সব প্রশ্নের উত্তর। তারপর আরও প্রশ্ন— আপনি কাকে সন্দেহ করছেন, কারো সঙ্গে ওর কি কিছু সম্পর্ক ছিল? আপনাদের কেউ কি শত্রু ছিল?

কোনো উত্তরই কেউ সঞ্চিতার মায়ের মুখ থেকে পেল না। হঠাৎ পাওয়া ব্যথায় সব কথা হারানো এক নারী সে। ওর নিজেরও প্রশ্ন সঞ্চিতাকে কি কেউ খুন করল, না কি নিজেই সে বেছে নিল এই পথ? যদি তাই হয় তাহলে কেন সে এই পথ বেছে নিল? তার কাছেও কোনো উত্তর নেই। একজন ডুবন্ত মানুষের ভেসে থাকার শেষ অবলম্বন খড়কুটোটা কেড়ে নিলে যে অবস্থা হয়, একই অবস্থা সঞ্চিতার মায়ের। ও শুধু ভাবে মেয়ে যে তাকে সুখের ঠিকানার খোঁজ দিয়েছিল, বলেছিল চাকরিটা পেয়ে গেলেই সেই ঠিকানায় নিশ্চিত পৌঁছে যাবে তাদের জীবনযাপন, কিন্তু এ কী হল, সব স্বপ্ন যে ভেঙে চুরমার। ও আর ভাবতে পারে না। পুলিশের লোকেরা নিয়মমাফিক কাজ করে যেতে থাকে। বিভিন্ন ফর্মে সইসাবুদ থেকে শুরু করে দেহ ময়না তদন্তে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জোগাড়-যন্তর।

জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিকের মতো সঞ্চিতার মা বাড়ি ফেরে অন্য দুই মেয়েকে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে। একটা চলে গেল, আরও দুটো রয়ে গেল, দুটোকে বড়ো করে তুলতে হবে।

* * *

বেশ কয়েকদিন পরে মহাকরণে একটা চিঠি আসে। ঠিকানা লেখা আছে— শিক্ষামন্ত্রী, মহাকরণ কলকাতা ৭০০০০১। প্রেরকের নাম রয়েছে সঞ্চিতা বক্সি। কিন্তু শিক্ষাদপ্তর তো এখন সল্টলেকে চলে গিয়েছে। যাই হোক, চিঠিটা রাইটার্সে রিসিভ করে সল্টলেকে শিক্ষা দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হল।

শিক্ষামন্ত্রীর সচিব চিঠিটা পড়ে একেবারে বাকরুদ্ধ। ক-দিন আগে কাগজের একটা রিপোর্টের কথা ওঁনার মনে পড়ে গেল— দিঘার সমুদ্রের ধারে এক অজ্ঞাত পরিচয় তরুণীর লাশ উদ্ধার হয়েছে।

সচিব চিঠিটা নিয়ে সোজা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে।

—স্যার, আপনার কাছে একটা চিঠি এসেছে।

—হ্যাঁ, কী আছে সেই চিঠিতে?

—আপনি নিজে একটু চিঠিটা পড়ে দেখুন।

শিক্ষামন্ত্রীর এবার অবাক হওয়ার পালা। সব চিঠি তো সচিব পড়ে উত্তর দেন অথবা গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে তাঁকে জানান। কিন্তু এই চিঠিটায় কী আছে? মন্ত্রী হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিলেন। তারপর এক নিঃশ্বাসে চিঠিটা পড়ে ফেললেন। চশমার কাচের তলায় ওঁনার দুই চোখের তলায় জলের ফোঁটা বুঝিয়ে দিল চিঠিটা ওঁনার মর্মে কোথায় বিঁধেছে। না, এটা চলতে দেওয়া যায় না। এতদিন ধরে বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ এসেছে স্কুলে মাস্টারি পেতে গেলে ম্যানেজিং কমিটি ঘুষ নেয়। কিন্তু এ যে আরেক লজ্জা! একটা গরিব মেধাবী মেয়ে সে টাকা দিতে পারবে না বলে, স্কুলের সেক্রেটারি তার শরীরটাকে ভোগ করে। মেয়েটা নিজের যন্ত্রণাকে আর সামলাতে পারল না। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের মতো সেও বিলীন হয়ে গেল সমুদ্রের জলে। মেয়েটা লিখেছে তার শরীর পাপবিদ্ধ। সেই পাপবিদ্ধ শরীরটাকে সে আর রাখবে না।

না, তার শরীরটা কোনো মতেই পাপবিদ্ধ নয়, তার শরীর সম্পূর্ণ অপাপবিদ্ধ। পাপবিদ্ধ হচ্ছি আমরা— এই সমাজ, এই সিস্টেম, আর আমাদের সবার পাপের ফলে যে বিষ উঠছে, সেই বিষ নিজের গলায় ধারণ করে নীলকণ্ঠা হয়ে সে যে অমৃতের সন্ধান সবাইকে দিয়ে গেল, সেই অমৃত অবশ্যই এই ব্যবস্থা থেকেই তুলে আনতে হবে।

সঞ্চিতার মৃত্যু যেন মন্ত্রীকে নতুন দিশা দেয়। পুরো ব্যাপারটাই শিক্ষামন্ত্রী মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে তুললেন। একটা মেয়ে ইস্কুলে চাকরি পাবার জন্যে কী করে সেই ইস্কুলের সেক্রেটারির দ্বারা বারবার ধর্ষিতা হয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নিল। আলোচনা হয় ওই মিটিঙে।

মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন— তাহলে আপনার কী প্রস্তাব?

—আমি চাই পুরোপুরি এই সিস্টেমটাকে চেঞ্জ করতে।

—কীরকম চেঞ্জ?

—ইস্কুলে টিচার নেওয়া আর ম্যানেজিং কমিটির হাতে রাখা যাবে না।

—তাহলে কীভাবে হবে টিচারদের নিয়োগ?

—আলাদা একটা সার্ভিস কমিশন গড়তে হবে। তারা পরীক্ষা নিয়ে ইস্কুলে টিচারদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেবে।

—হ্যাঁ, পাবলিক সার্ভিস কমিশন যেভাবে নিয়োগ করে সরকারি চাকরিতে, সেইভাবেই হোক না আর একটা সার্ভিস কমিশন। এটার নাম স্কুল সার্ভিস কমিশন অবশ্যই দেওয়া যায়।

একটি দ্বিমত শাসকদলের এক অংশ করেছিল। তারা আওয়াজ তুলতে চেয়েছিল— এটা হলে আমাদের দলের ছেলেরা কীভাবে ইস্কুলের চাকরিতে ঢুকবে?

কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী অনড়— কেন? পরীক্ষা দিয়ে। যার মেধা থাকবে সে অবশ্যই শিক্ষক হবে, এখানে মেধাই বিবেচ্য হবে, কোনোমতেই দলের আনুগত্য নয়।

মন্ত্রীসভার সবাই এই মতটাকে মেনে নেয়। অবশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও এরমধ্যে কিছুটা হলেও কাজ করেছিল— এই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হলে স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আসবে, অনেক ফ্রেশ ছেলে-মেয়ে চাকরিতে ঢুকবে। সাধারণ মানুষও বুঝবে এই সরকার স্বচ্ছতা চায়।

এইবারে সরকার থেকে এই ব্যবস্থা প্রচলনের অন্যতম কারণ হিসাবে সঞ্চিতার আত্মহত্যার ঘটনা দেখানো হল। সব কাগজেই এই খবর বড়ো করে বেরোচ্ছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%