দ্বিতীয় অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

এরপরেই শিবুর হুঁশ ফেরে। ও দুটো রাজাকারকে মেরেছে, রাজকাররাও ওকে ছাড়বে না। ওকে এক্ষুনি পালাতে হবে। কিন্তু পালাবে কোথায়, বাড়িও নিরাপদ নয়, সারা বাংলা জুড়েই রাজাকার আর খানসেনাদের অত্যাচার চলছে। তারপর ও নিজে পালালেও, ওর পরিবারকে ওরা শেষ করে দেবে। পালাতে হলে সবাই মিলেই পালাতে হবে। শিবু দৌড় লাগায় বাড়ির দিকে। খুব জোরে ছুটতে পারছে না ও। রাজাকারদের লাঠির ঘায়ে ও নিজেও বেশ জখম। ছুটতে গিয়ে ব্যথা ভালোই লাগছে।

শেষপর্যন্ত হাঁফাতে হাঁফাতে ও বাড়ি পৌঁছোয়। ওর কপালের চোট থেকে তখনও রক্তের ফোঁটা গড়াচ্ছে। মালা তাই দেখে আঁতকে ওঠে— এ কী হাল তোমার, কী করে হল এসব?

—সেসব অনেক কথা। তুই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।

—কেন, কোথায় যাবে?

—অত প্রশ্ন করিস না তো, যা বলছি তাই কর, তৈরি হয়ে নে, আমাদের বেরোতে হবে।

—কিন্তু কোথায় যাবে সেটা বলবে তো?

—যেতে হবে অনেক দূরে।

—কোথায়?

—ওপারে।

—ওপারে মানে?

—ওপারে ইছামতির ওপারে, পশ্চিমবাংলায়।

—সে কী গো, এ কী করে হয়? আমাদের বাড়ি রয়েছে এখানে, সেসব ফেলে রেখে ওপারে গেলে কিচ্ছু পাওয়া যাবে না যে, সব দখল হয়ে যাবে।

—কিন্তু এপারে থাকলে রাজাকাররা-খানসেনারা আমাদের কাউকে রেয়াত করবে না, সব্বাইকে মারবে, আর তোরে ওরা সীমার মতো ছিঁড়ে-খুঁটে খাবে।

—কিন্তু ওরা আমাদের মারবে কেন, তুমি কালকে ফরিদপুরে জয়বাংলার পালা গান গেয়েছ তাই?

—হ্যাঁ তাই, ওরা মহাদেবকেও মেরেছে। আমাকেও মারতে দুটো রাজাকার বিলের মাঠে আমার ওপর হামলা করেছিল, আমি ও দুটোরে মেরে এখানে আসছি। তুই শিগগির নে মালা, ওরা কিন্তু এক্ষুনি আমার খোঁজে এখানে চলে আসবে।

—উফ, কী যে হবে আমাদের! এক্ষুনি চলো এখান থেকে পালাই, নাহলে ওরা আমাদের কাউকেই ছাড়বে না। তুমি ওদের দুটো শয়তানরে মেরেছ, ওরা আমাদের সব্বাইকেই নিকেশ করে দেবে।

মালা তাড়াতাড়ি হাতের কাছে যা পায় সব একটা কাপড়ের পোঁটলায় বেঁধে ফেলল। পুঁইমাচায় তলায় শুয়ে থাকা ছাগলটা কী বুঝল কে জানে। ব্যাঁ-ব্যাঁ করে কীরকম যেন একটা করুণ স্বরে ডাক ছাড়ল। মালা বলল— হরেন, তুই ছাগলের দড়িটা খুলে দিয়ে আয়।

—মা-মা, আমাদের সঙ্গে ছাগলটা যাবে না?

—না রে, ওটাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

হরেন মনে মনে খুব দুঃখ পায়, ও ছাগলটাকে খুলে দিয়ে গলা জড়িয়ে খুব কাঁদল। মালা ওই দৃশ্য দেখে না কেঁদে পারল না। ও হরেনের পিঠে এক চাপড় দিয়ে বলল— নে, আর ছাগল নে আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়।

ওইভাবে সবকিছু ফেলে ওরা ছিন্নমূল হয়। ইছামতি পেরিয়ে ওরা চলে আসে এপারে। ছেড়ে আসার আগে মালা পিছন ফিরে শুধু চেয়ে থাকে। শিবু ওরে সান্ত্বনা দেয়— নে আর মায়া করিস নে, এ জীবন থাকলে আবার সব হবে, শুধু একটাই দুঃখ থেকে গেল মনে।

—কী দুঃখ?

—জয়বাংলা দেখে যাওয়া হল না।

—আর জয়বাংলা, নিজেদের প্রাণ বাঁচানো দায়, তখন আর দেশের কথা।

* * *

ওরা সবাই মিলে ওঠে বনগাঁর কাছে পাঁচপোতায়। ওখানে হরিচাঁদ ঠাকুরদের বাস। নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের অনেকেই এপার থেকে ওপারে এসে এখানেই নতুন ঘর বেঁধেছে। ছিন্নমূল মানুষের জীবনসংগ্রাম চলছে এখানে।

মালার খুব কষ্ট হয়েছে পোয়াতি অবস্থায় এতটা কষ্ট করে এপারে আসতে। তবে প্রাণটা বেঁচেছে সবার এই রক্ষে। পরে শিবু খবর পেয়েছিল ওদের বাড়িতে খানিকক্ষণ পরেই খানসেনারা আর রাজাকাররা চলে আসে। সারা বাড়ি লন্ডভন্ড করে আর বলে— কোথায় সেই শিবু? আমাদের দুজনকে মারা, ওদের সবাইকেই আজকে এখানেই মেরে পুঁতব! এত সাহস ওর, আমাদের লোককে মারে।

কোথাও কাউকে না পেয়ে ওরা পাশের ঘরগুলোতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে— কোথায় গেল ওরা, সব তোরা জানিস, বলে ফেল, নাহলে তোদেরকেই আজকে মারব।

সবাই বলে— ওরা খুব তাড়াহুড়ো করে চলে গেল, কিন্তু কোথায় গেল আমাদের কাউকেই কিছু বলে যায়নি।

— মিথ্যে কথা, মিথ্যে বলছিস তোরা! তোদের সবাইকেই আজকে আমরা মেরে ফেলব।

শিবুদের পাশের রমাকান্তর মেয়েকে ওরা তুলে নিয়ে গেল। শিবুর জন্যেই রমাকান্তর মেয়েটা গেল। আর যাওয়ার আগে ওই ছাগলটাকে দেখে বলল— এই ছাগলটা শয়তানটার বাড়ির চারপাশে ঘুরছে, এটা নিশ্চয়ই ওই শিবুর ছাগল। আজকে মালিকের ওপর রাগ ছাগলের ওপরেই যাক। এটাকেই আজকে এখানে টুকরো টুকরো করে কাট।

শিবুর ছাগলটাকে কেটে ওরা রমাকান্তের বউকে বলল— তুই ছাগলটাকে ভালো করে রেঁধে যদি আমাদের খাওয়াতে পারিস তাহলে তোর মেয়েকে আর নে যাব না ফেরত পাবি।

রমাকান্তর বউ একমনে শিবুর ছাগল রাঁধতে লাগল মেয়েকে পাবার আশায়। আর শিবুর ভাঙা ঘরে তখন রমাকান্তর মেয়ে রত্নার ওপরে এক এক জন পশু চড়াও হল। যতই রত্না চ্যাঁচায় — মা-মা, বাঁচাও।

ওর মা ততই কড়ায় ঝাল ফোড়ন দিতে লাগল, যাতে সেই কড়ার আওয়াজে ওর মেয়ের চিৎকার কানে না যায়।

সবার একদফা সম্পূর্ণ হওয়ার পরে, তারপরে খাওয়াদাওয়া। খাওয়াদাওয়া শেষ করে শয়তানগুলো রমাকান্তর বউয়ের রান্নার খুব তারিফ করে। রমাকান্তর বউ হাতজোড় করে বলে— এবারে আমার মেয়েটারে ফেরত দাও।

—ফেরত নিশ্চয় পাবি, দাঁড়া আর একবার করে হোক, তারপর ফেরত।

এ-কথা শুনে রমাকান্তর বউ আউরি-চাউরি দিয়ে ওঠে— এবার ওকে তোমরা ছেড়ে দাও, ও এত অত্যাচার সইতে পারবে না, ও মরে যাবে। তোমরা আমাকে নাও, এই দেখো আমার যৌবন।

এই বলে ও বুকের আঁচল সরিয়ে লোভ দেখায়। সেই লোভে কয়েকজন রমাকান্তর বউয়ের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাকিগুলো আবার রত্নার কাছে যায়। ওরা যখন চলে যায় রত্নার নাড়ী তখনও চলছিল। চোখ দুটো বোজা। কিন্তু খানিকক্ষণের মধ্যেই সব শেষ। রমাকান্তর বউ গলায় দড়ি দিল। ওই পাড়াটা একেবারে শ্মশান হয়ে গেল।

* * *

পাঁচপোতায় শিবুর কানে যখন এসব গেল শিবু অঝোরে চোখের জল ফেলল। রত্না আর রত্নার মা যেন ওর সামনে এসে সমানে বলতে লাগল— তোমার জন্যেই আজ আমাদের এইভাবে অত্যাচারিত হয়ে মরতে হল, শুধু তোমার জন্যেই, তোমার ওই জয়বাংলার পালাগানের জন্যেই! তুমিও ওপারে পালিয়ে গিয়ে কিছুতেই সুখ পাবে না, আমাদের দুঃখ তোমাকে কিছুতেই সুখ পেতে দেবে না।

শিবু আর সহ্য করতে পারে না। ও 'না-না' বলে চিৎকার করে ওঠে। মালা বলে— কী হল, ওরকম করছ কেন?

—মালা, তুমি জানো না আমার জন্যে কতজনকে মরতে হল।

মালা বুঝতে পারে ওপারে ওদের গাঁয়ে নিশ্চয়ই বড়ো কিছু অঘটন ঘটেছে। ও শিবুর কাছে জানতে চায় কী হয়েছে। কিন্তু শিবু ওকে সব কথা খুলে বলে না। ও জানে পোয়াতি মালা এসব শুনলে সহ্য করতে পারবে না, রত্নাকে ও একেবারে মেয়ের মতোই দেখত। আর রমাকান্তর বউ ছিল ওর সবচেয়ে কাছের সই। সেই দুজনকেই ওদের জন্যে এরকম নিষ্ঠুরভাবে মরতে হল, এটা জানলে ও নিজেই হয়তো কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে। সেই জন্যেই মালার হাজার অনুরোধেও শিবু এ-ব্যাপারে রা কাড়ল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%