ত্রয়োবিংশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

সুকুমার জেলে বসে গর্জাচ্ছে— বরুণ, তোকে আমি ছাড়ব না, তুই আমাদের সব কাজকর্ম বন্ধ করে জেলে পাঠিয়েছিস। এর বদলা আমি নেবই। তুই ভেবেছিস জেলে বসে তোর দেওয়া রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের বই পড়ে আমি পালটে যাব, কখনই নয়। তোকে আমি বোঝাব সুকুমার কী জিনিস।

সুকুমার জেলের রক্ষীদের টাকাপয়সা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে হাত করে। ও নিজে একটা মোবাইল জোগাড় করেছে। সেই মোবাইল থেকে ও ওর বাদুড়িয়ার দোস্ত পাঁচুকে খবর পাঠায়। পাঁচু এসে বলে— কী হল বলো তো সুকুমারদা, তোমার সাজানো সংসার একেবারে ছারখার করে দিল এই বরুণ বলে ছেলেটা।

—পাঁচু, এর বদলা আমি নেবই।

—তুমি বদলা কীভাবে নিতে চাও?

—আমি চাই ওই বরুণকে একেবারে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে। তাতে যেমন বদলা নেওয়াও যাবে, তেমনি আর একটা কাজও এগিয়ে থাকবে।

—কী কাজ এগিয়ে থাকবে?

—জেলে বসে আমাদের তো বেশ কয়েক বছর কেটে গেল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে তো আর সারাজীবন জেলের ভিতরে থাকা না, বেশ কয়েক বছর পরে তো আবার আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। তখন তো আবার আমাদের এলাকায় গিয়ে রাজ করতে হবে, তার আগে বরুণকে সরাতে পারলে বেশ একটা আতঙ্কের পরিবেশও তৈরি করা যাবে।

—হ্যাঁ, ঠিক বলেছ সুকুমারদা, কিন্তু তুমি এখন জেলের ভিতরে, এই অপারেশন করবে কে?

—কেন, তুই করবি।

—আমি, আমি ও কাজ পারব? তারপর বরুণের মতো লোককে মারা, খুব মুশকিল হয়ে যাবে।

—আরে, তুই নিজে হাতে কাজ করবি কেন, আর তুই এমনিতেই বেশ মার্কামারা, তোকে দিয়ে কাজ করালে সমস্যা হতে পারে। বাই চান্স তুই যদি ধরা পড়ে যাস, তাহলে তুইও ফাঁসবি, আর তোর সঙ্গে যেহেতু আমাদের যোগ আছে, আমরাও ফাঁসব।

—তাহলে কাকে দিয়ে তুমি কাজ করাতে চাও?

—কোনো ফ্রেশ ছেলেকে দিয়ে। তার গায়ে আগে থাকতে অপরাধীর কোনো মার্কা মারা থাকবে না। তাহলে তার কাজ করতেও যেমন সুবিধা হবে, তেমনি আমাদের তরফ থেকেও ঝুঁকিটা অনেকটা কম থাকবে।

—কিন্তু টাকাপয়সা?

—সে তোকে ভাবতে হবে না। যত টাকা লাগে সব তুই পেয়ে যাবি। আর তোর নিজের জন্যেও একটা টাকা থাকবে। তুই পাঁচু, এই কাজটা একটু ঠিকঠাক করে দে। তোর প্রতি আমি খুব কৃতজ্ঞ থাকব। জেল থেকে বেরোলে তোর কথা আমরা খুব মনে রাখব।

—সে তোমায় চিন্তা করতে হবে না। তুমি যখন এই কাজে আমাকে ভরসা করেছ, আমি তোমার এই কাজ উদ্ধার করে দেবই। তাহলে আমি এখন আসি, কাজকর্ম কতদূর এগোল, তা আমি তোমায় ফোনেই জানাব।

—হ্যাঁ চলে যা, বেশিক্ষণ থাকলে আবার অন্য অসুবিধা আছে।

—কী অসুবিধা, জেলের রক্ষীরা সন্দেহ করবে?

—না-না, জেলের রক্ষীদের আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। তবে বেশিক্ষণ কারো সঙ্গে একজন কয়েদি কথা বললে ওদেরও আবার অন্য অসুবিধা থাকতে পারে তো।

—ও, তাহলে তুমি জেলের রক্ষীদের ম্যানেজ করে ফেলেছ?

—তা ফেলব না, এত বছর জেলে রয়েছি, এটুকু না করতে পারলে, আমার কি আর নাম থাকবে? তারপর তোর সঙ্গে মোবাইলে কথা বললাম, সেটাও তো এদের ম্যানেজ করেই হাতে পেয়েছি। পাঁচু সুকুমারের দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকে।

* * *

পাঁচু বেরিয়ে এসে কাজ শুরু করে দেয়। ও নিজেও বেশ সেয়ানা। ও জানে নিজের এলাকা থেকে ছেলে তুলে কাজ করলে, পরে ধরা পড়লে ওর নিজের বিপদ হতে পারে। তাছাড়া বরুণ এমনি খুব জনপ্রিয় ছেলে। সবসময় মানুষজন ওকে ঘিরে রেখেছে। ওকে খতম করা অতটা সহজ হবে না।

সুটিয়া গণধর্ষণকাণ্ডে বরুণই উদ্যোগ নিয়ে সুকুমারদের গ্রেফতার করেছিল। সেই সময়ে কাগজে, টিভিতে ওর খুব ছবিও বেরিয়েছিল। এলাকায় খুব পরিচিত মুখ ও। তাই ওকে সরানোর কাজটায় খুব সাবধানে পা ফেলে এগোতে হবে। একটু পা এদিক ওদিক হলে বরুণকে তো আর সরানো যাবে না, উলটে ও নিজেই বিপাকে পড়বে।

পাঁচু ভাবে অনেক দূরের কাউকে একটা ঠিক করতে হবে। ও একদিন বনগাঁয় চলে যায়। ওখানে ওর পরিচিত ছেলে নীরজ। ওকে ধরল ও— অ্যাই নীরজ, আমাকে একটা টাটকা ছেলে দিতে পারবি, ভালো কাজ আছে।

—কী কাজ?

—একটা মার্ডার।

—উরিব্বাস মার্ডার, তার মানে তো বিশাল ঝক্কির ব্যাপার।

—দ্যাখ, ভালো পেমেন্ট পাবি। ছেলেটাকে আমার পার্টি যেমন পেমেন্ট দেবে, তেমনি তুই জোগাড় করে দিলে তোরও একটা ভালো পাওনা থাকবে।

—কত পেমেন্ট দেবে খোলসা করে বলো, তাহলে আমি দেখি দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে।

—শোন, যে কাজটা করবে তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেব, আর তুই পাবি পঞ্চাশ।

—না, ওতে হবে না, তুমি আমারটা পুরোপুরি করে দাও।

—পুরোপুরি কত?

—এক লাখ।

—ঠিক আছে তোকে পুরোপুরি এক লাখই দেওয়া হবে, কিন্তু ভালো ছেলে চাই।

—ভালো ছেলেই দেব। মার্ডার করতে হবে কোথায়?

—সুটিয়ার লোক। তবে সুটিয়াতে তাকে মারা যাবে না, ধরা পড়ে যাবার চান্স থাকবে।

—তাহলে কোথায় মারবে?

—ও যেখানে যেখানে যায়, তার একটা লিস্ট আমরা দিয়ে দেব, তারপর জায়গাটা যাকে আনবি তার পছন্দমতো হবে। সেখানেই অপারেশনটা করতে হবে।

—অপারেশনের পরে ছেলেটার পালানোর ব্যবস্থা কে করবে?

—সে দায়িত্ব আমাদের। কাজ হয়ে গেলে ওর শেল্টারের দায়িত্ব পুরোপুরি আমরা নেব।

—পেমেন্ট কীভাবে দেবে?

—হাফ পেমেন্ট কাজের আগে, হাফ পেমেন্ট কাজের পরে। তবে হাফ পেমেন্ট নিয়ে কেউ যেন ডুব না দেয় সে দায়িত্ব তোকে নিতে হবে।

—না-না, আমি যাকে আনব সে অন্তত টাকা নিয়ে কাজ না করে ডুব দেবে না। আর টাকা নিয়ে কাজ না করতে পারলে সে অবশ্যই টাকা ফেরত দিয়ে দেবে।

—দ্যাখ, তুই তাহলে তাড়াতাড়ি ছেলে খোঁজা শুরু করে দে, কাজটা কিন্তু পার্টি তাড়াতাড়ি করতে চাইছে।

—যাকে মারতে হবে, সে কে?

—ওটা এখন জানানো যাবে না, পার্টির বারণ আছে, ছেলেটাকে নিয়ে আয়, তারপর ডিটেলসে কথা বলা যাবে। তবে হ্যাঁ, পুরো ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে।

—সে তোমায় আর বলে দিতে হবে না পাঁচুদা, আমাদের লাইনে এসব কথা গোপনই থাকে, কেউ আউট করে না।

—তবুও এটা খেয়াল রাখিস।

নীরজ কাজ শুরু করে দেয়। বনগাঁ কলেজের ইলেকশনে ও ক-বার একটা পার্টির হয়ে খেটেছিল। ওখানে কয়েকজনের সঙ্গে ওর বেশ চেনাশোনা হয়েছে। ও সোজা বনগাঁ কলেজে যায়। একটা ছেলে তুহিন বেশ ডাকাবুকো। ও মাঝেমাঝেই নীরজকে বলে— নীরজদা, দেখো তো কোনো কাজকর্ম থাকলে আমাকে বোলো। আমার টাকার খুব দরকার এখন।

—কেন, কলেজে পড়িস তোর এখন এত টাকার দরকার কেন, বাড়িতে কি তোদের অবস্থা খারাপ?

—না-না, অবস্থা খারাপ হবে কেন?

—তাহলে?

—আসলে আমার একটু হাত-খরচা লাগে। বাড়িতে চাইলে দেয় না। আর বাড়িতে কতই বা চাওয়া যায়?

—ঠিক আছে, মনে থাকল, কাজ হলে তোকে খবর দেব।

নীরজ কলেজে ঢুকে সোজা তুহিনের কাছে যায়। তুহিন ওকে দেখে বেশ উচ্ছ্বসিত— বাব্বা নীরজদা, এতদিন পরে আমাদের মনে পড়ল, বলো কেমন আছ?

—আমি ভালো আছি, তোরা ভালো তো?

—হ্যাঁ, তা বলো কী দরকার?

—বলছি, তুই বলেছিলিস কোনো কাজ থাকলে জানাতে, তা একটা কাজ আছে করবি, ভালো টাকা পাবি।

—কী কাজ?

—সব কথা এখানে বলা যাবে না। তুই যদি কাজ করতে আগ্রহী হোস, তাহলে অন্য কোথাও একটা বসে কথা বলতে হবে।

—ঠিক আছে, চলো কোথায় যাবে।

ওরা ওদের কলেজের মাঠের এক ধারে গিয়ে বসল। সেখানে ওদের কথাবার্তা শুরু হল।

তুহিনই বলল— বলো নীরজদা, কী কাজ?

—কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন। তুই পারবি তো?

—তুমি বলেই দেখো না। এই তুহিন পারবে না, এমন কাজ সারা দুনিয়াতেই আর নেই। তারপর তুমি বলছ কাজটা করলে ভালো টাকা পাওয়া যাবে। কাজটা না করার তাই কোনো কারণই নেই। আমার এখন সত্যিই টাকার খুব দরকার। বলেই ফেলো কাজটা কী।

—একজনকে মার্ডার করতে হবে।

নীরজের এই কথা শুনে তুহিন খুব চমকে ওঠে। ও ভেবেছিল কঠিন কাজ, তাই বলে এইভাবে খুন-খারাবি! ও ভয় পায়। অভিজ্ঞ নীরজের চোখ মুহূর্তের মধ্যে সেটা ধরে ফেলে। ও বলে— কী হল, ভয় পাচ্ছিস? তোর কোনো চিন্তা নেই, তুই শুধু রিভলভার থেকে গুলিটা ছুড়বি। বাকি দায়িত্ব আমাদের।

—না নীরজদা, আমি এই কাজ করতে পারব না।

—ভেবে দেখ, অনেক টাকা পাবি একসঙ্গে। পুরো পাঁচ লাখ টাকা। তুই না বলছিলিস তোর টাকার খুব দরকার। কাজ হওয়ার আগে আড়াই লাখ পাবি, তারপর কাজ হয়ে গেলে বাকিটা পাবি।

—কিন্তু যদি ধরা পড়ে যাই, তাহলে কী হবে?

—তুই পাগল নাকি, তুই ধরা পড়লে তো আমরাও ধরা পড়ে যাব। তোর সঙ্গে আমরা থাকব। তোকে লুকিয়ে ফেলতে পারলে তবেই আমরা নিশ্চিত।

তবুও তুহিন রাজি হতে চায় না। তখন নীরজই বলল— ঠিক আছে, তোকে একদিন সময় দিলাম, তুই বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাব, তারপর জানা। তবে হ্যাঁ, কথাটা তুই অন্য কাউকে জানাতে পারবি না, তাহলে তোর বিপদ হবে।

এই বলে নীরজ ওখান থেকে চলে আসে। তুহিন ভেবে দেখুক ও কী করবে। তবে নীরজ নিশ্চিত ও রাজি হয়ে যাবে এই কাজ করতে। ওর এখন হাতে কাঁচা টাকা দরকার। ও টাকা ওড়াবে। সেই টাকা ও কোথায় পাবে? সুতরাং তুহিনের রাজি না হয়ে কোনো উপায় নেই।

তুহিন বাড়ি যায়। ওর সত্যিই টাকার খুব দরকার। ওর লাভার কাকলি যে আবার ভালো কিছু গিফট না পেলে দেখা করতেই চায় না। সেদিনকে ভ্যালেনটাইনস ডে-তে তুহিন কাকলির জন্যে একটা লাল গোলাপ আর একটা মুক্তোর সেট দিয়েছে। কিন্তু উপহার দেখে কাকলির মুখ ব্যাজার।

তুহিন জিজ্ঞাসা করে— কী হল, আমার উপহার তোমার পছন্দ হয়নি?

কাকলি কোনো উত্তর দেয় না। তুহিন বুঝে নেয় ওর উপহার কাকলির অপছন্দ। ও জানতে চায়— তুমি কী উপহার পেলে খুশি হবে?

—আমার অন্য বন্ধুদের লাভাররা তাদেরকে কী সুন্দর সুন্দর সোনার জিনিস উপহার দিয়েছে। আর আমার ভাগ্যটাই খারাপ। আমার বেলায় শুধু বিধবা সাদা সাদা মুক্তোর ছড়া। আমার না এসব একদম ভালো লাগে না। রজত কতদিন ধরে আমার পিছনে ঘুরঘুর করছে, ওর সঙ্গে প্রেম করলে কত সোনা যে পেতাম, তার কোনো শেষ নেই। রজত কত বড়োলোকের ছেলে। শুধু তোমার সঙ্গে ঘুরি বলেই আমার লবডঙ্কা। মনে হয় এইসব সস্তার জিনিসগুলোকে ছুড়ে ফেলে দেই।

তুহিন মনে মনে খুব অপমানিত হয়। কাকলিকে ও কম জিনিস দেয় না। এই তো ক-দিন আগেই ওকে একটা সোনার আংটি দিয়েছে। আবার আজকেও ওর সোনা চাই। কোথায় পাবে এত টাকা ও? এখন সোনার যা দাম তাতে ওই সোনা জোগাড় করা খুব মুশকিল।

তারপর ও অনেকদিন ধরেই তুহিনের পেছনে ঘ্যান-ঘ্যান করছে ওর একটা নতুন হার চাই বলে। একটা সোনার হারের দাম তো প্রায় হাজার পঞ্চাশ কী তারও বেশি হবে, হয়তো লাখ খানেকের ওপরে। ওর নিজের কোনো আইডিয়াই এ-ব্যাপারে নেই।

মাঝে মাঝে মনে হয় দূর ছাই, এইভাবে এত খরচা করে কাকলির সঙ্গে প্রেম করার দরকার নেই। কিন্তু কাকলির শরীরের আকর্ষণ ও এড়াতে পারে না। যদিও কাকলির শরীরের সব গলি-ঘুঁজি এখনও ওর চেনা হয়নি, তবুও ওর শরীরের টানে ও কাকলির সব আবদার মেনে নেয়।

তারপর এটাও সত্যি কাকলির পেছনে রজতের মতো কয়েকটা বড়োলোকের ছেলেও ঘুরে বেড়ায়। ওদের থেকে কাকলিকে দূরে রাখার জন্যে মাঝে মাঝে কাকলিকে কিছু না কিছু দিতেই হয়।

কাকলি সেদিনই তো বলছিল— তুহিন, তুমি আমাকে একটা সোনার হার দাও, আমি তোমাকে তুমি যা চাও তাই দেব।

—সত্যি বলছ, তুমি তোমাকে আমার হাতে পুরোপুরি তুলে দেবে?

—হ্যাঁ গো হ্যাঁ, তবে হার যেন পাঁচভরির হয়, তবেই তোমার প্রেমিকাকে তুমি পুরোপুরি পাবে। গলায় হার পরিয়ে দিয়ে তুমি আমাকে নিজের করে নিও।

তুহিনের মনে একবার করে নীরজের কথা আর একবার করে কাকলির কথা আসে। পাঁচভরির সোনার হার দিলে কাকলিকে ও পুরোপুরি পাবে, আর একটা মার্ডার করতে পারলেই ও পাঁচ লাখ টাকার মালিক।

তুহিন ঠিক করে নেয় নীরজের প্রস্তাবে ও রাজি হয়ে যাবে। প্রথমে একটু ভয়ে বুকটা দুরুদুরু করলেও কাকলির মুখ চেয়ে কাজটা করতে রাজি হয়ে যায়।

ও নীরজকে মোবাইলে ধরে— হ্যালো, নীরজদা বলছ তো?

—হ্যাঁ বলছি, কে তুহিন?

—হ্যাঁ, আমি বলছি।

—বল, কী ভাবলি।

—আমি কাজটা করব।

—এই তো ভালো ছেলের মতো কথা।

—বলছি, কোনো বিপদ হবে না তো?

—না রে, তুই আমার ভাইয়ের মতো, সেরকম বিপদের কাজ হলে দাদা হয়ে কি আর তোকে এইভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিতাম? তুই পুরো নিশ্চিত থাক, তোর কোনো অসুবিধা হবে না।

* * *

পর পর খবর চলে যায়। নীরজ ফোন করে জানায় পাঁচুকে। পাঁচু ফোন করে সুকুমারকে। সুকুমার ফোনে পাঁচুকে বলে— পাঁচু, যে কাজটা করবে তার সঙ্গে তোর সরাসরি কথা হয়েছে তো?

—না, এখনও সরাসরি কথা হয়নি।

—তাহলে তুই ওই ছেলেটা সম্বন্ধে এত নিশ্চিত হচ্ছিস কী করে?

—আসলে প্রথমেই ঠিক করে নিয়েছিলাম আমার নিজের এলাকা বা তোমার এলাকা থেকে কাউকে দায়িত্ব দেব না। দায়িত্ব দেব দূরের কাউকে। তাই বনগাঁয় আমার খুব কাছের ছেলে নীরজকে দায়িত্ব দেই, সে পুরো ব্যাপারটা ঠিক করেই কমপ্লিট করবে।

—তাহলে বরুণকে মার্ডার করা যাচ্ছে। শুনেও মনে একটু শান্তি পেলাম। খুব অশান্তিতে ভুগছি আমি।

—একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট ওকে মার্ডার করে দেবে আমাদের ছেলে। তুমি শুধু টাকাটা পাঠানোর ব্যবস্থা করো।

—তোকে আমি কালকেই টাকা দিয়ে দেব।

—কোথায় দাঁড়াব বলো তো?

—মছলন্দপুরে দাঁড়াস, আমার লোক তোর হাতে ঠিক টাকা তুলে দিয়ে আসবে।

—তোমার লোক আমায় চিনবে কী করে?

—সে তোর ভাবতে হবে না, সে দায়িত্ব আমার।

পাঁচুর হাতে টাকা নির্দিষ্ট সময়েই পৌঁছে যায়। পাঁচু নীরজের সঙ্গে গিয়ে তুহিনের সঙ্গে দেখা করে। তুহিন জিজ্ঞাসা করে— আমি যাকে মারব সে কে?

—সে একটা অ্যান্টিসোশ্যাল, আমাদের খুব জ্বালিয়েছে, তাই সরিয়ে দিতে চাই।

—ও তাও বাঁচা গেল, একটা অ্যান্টিসোশ্যালকে মেরে পাপ খুব একটা বেশি হবে না।

—ধুস, পাপ কেন হবে, দেখিস তোর পুণ্যই হবে।

—যাকে মারতে হবে তার বাড়ি কোথায়?

—ওই তো গোবরডাঙার ওদিকে।

—তাকে আমি চিনব কী করে?

—সে তোকে আমরাই চিনিয়ে দেব। তবে তার আগে তোকে তো আর একটা জিনিস শিখতে হবে?

—কী শিখতে হবে আমাকে?

—বন্দুক চালানো। তুই জানিস না কি ওটা?

—না, ওটা আমি পারি না।

—ঠিক আছে, তোকে পিস্তল চালানো শেখানোর দায়িত্ব আমাদের।

—আমার টাকাটা?

পাঁচু তুহিনের হাতে আড়াই লাখ টাকা তুলে দেয়, তারপরে কোথায় ওকে পিস্তল চালানো শেখানো হবে সেটা বলে দেয়।

তুহিনের এখন খুব আনন্দ। সেদিনই ও হাবড়ায় চলে যায়। ওখানকার বড়ো গয়নার দোকান থেকে একটা পাঁচ ভরির সোনার হার কেনে, তারপর কাকলিকে ফোন করে—এখন তুমি কোথায়?

—কেন?

—তোমার জন্যে পাঁচ ভরির সোনার হার কিনেছি তো, তাই তোমাকে পরাব বলে খোঁজ করছি।

—সবসময় ইয়ার্কি কোরো না তো, ভালো লাগে না।

—না-না, ইয়ার্কি না, আমি সত্যি বলছি। এক্ষুনি হাবড়া থেকে কিনলাম।

—সে কী, অত টাকা পেলে কোথায়, কোথাও চুরি-ডাকাতি করোনি তো?

—না-না, আমার এক বন্ধু টাকাটা দিল।

—এখনকার দিনে এরকম বন্ধুও সত্যি হয়।

—তুমি যা কথা দিয়েছিলে, মনে আছে তো?

—সে ভুলি কেমন করে, কিন্তু এখন ওসব হবে না।

—না, আমি কোনো কথা শুনতে চাই না, তুমি হাবড়াতে সোজা চলে এসো, আমি স্টেশনে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।

—তারপর কোথায় যাবে?

—সেটা পরে ভাবব, আগে তুমি হাবড়ায় এসো।

কাকলি হাবড়ায় চলে আসে, তারপর দুজনে মিলে একটা হোটেলে ঢোকে। কাকলি তুহিনকে তার সবকিছু দেয়। গলায় হারটা পরে ও খুব খুশি। ও তুহিনকে বলে— তুমি এইভাবে আমাকে খুশি করো, আমিও তোমাকে খুশি করব, আমার সবকিছু দেব।

* * *

তুহিনের পিস্তল চালানো শেখা হয়ে গিয়েছে। খুব কম সময়েই ও বন্দুক চালানো ভালো শিখেছে। পাঁচু পর্যন্ত ওর প্রশংসা করছে। এবারে নীরজের সঙ্গে ও বরুণকে ফলো করা শুরু করে। সুটিয়ায় বরুণের ওপর হামলা করা যাবে না। ওখানে সবসময় ওর চারপাশে লোকজন থাকে। কলকাতায় ওর পিছনে ধাওয়া করেও লাভ হয়নি। ওখানে ভিড়ের মধ্যে গুলি চালানো মুশকিল।

পাঁচু বলল— দ্যাখ নীরজ, ওই লোকটাকে গুলি করতে গেলে ও যখন কলকাতায় কাজের থেকে ফেরে তখন গোবরডাঙা স্টেশন থেকে বাইক নিয়ে ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে সুটিয়ায় যায়, তখন ওকে খতম করা যেতে পারে।

কিন্তু নীরজই পাঁচুর এই প্ল্যানে রাজি নয়। ও বলছে— অচেনা রাস্তায় তুহিন গন্ডগোল করে ফেলতে পারে, ওকে তুহিনের চেনাশোনা জায়গাতেই খতম করতে হবে।

পাঁচু বলছে— তাহলে বরুণকে কোথায় খতম করা যাবে বলবি তো?

—সেটা আর একটু ভাবনাচিন্তা করে তারপর ঠিক করতে হবে। হুটপাট কাজ করতে গেলে কিন্তু আমাদের সমস্যায় পড়তে হবে।

তুহিন এদের সবার কথা শুনছিল। ও বলল— আমি একটা প্ল্যান ভেবেছি, বলব?

—হ্যাঁ, বলবি না কেন, অবশ্যই বল।

তুহিন ওর প্ল্যানের কথা পাঁচু আর নীরজকে বলে। ওরা শুনে বলে— তুই পারবি তো এইভাবে কাজটা করতে?

—হ্যাঁ, আমি ঠিক পারব। তবে আমাকে তোমরা কাজ হয়ে গেলে ঠিক তুলে নিতে পারবে তো?

—সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই শুধু ঠান্ডা মাথায় কাজটা করে ফেল। দ্যাখ, আবার ঘাবড়ে যাবি না তো?

—কখনই নয়। আমি ঠান্ডা মাথাতেই কাজটা করব, কোনো সমস্যাই হবে না। কাজ শেষ করার পরে বাকি টাকাটা দিয়ে দেবে তো?

—ওটা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা তোকে কাজ মিটে গেলেই বাকি টাকাটা দিয়ে দেব। কিন্তু তুই বরুণকে মারবি কবে, সেটা ঠিক করেছিস?

—ভাবছি, কালকেই কাজটা সেরে ফেলি। ফালতু কাজ ফেলে রেখে টেনশন বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই।

—সেটা তুই ঠিকই বলেছিস, কথায় আছে না শুভ কাজে দেরি করতে নেই।

—তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে?

—কী প্রশ্ন?

—তোমরা বলেছিলে যাকে মারতে হবে সে একটা অ্যান্টিসোশ্যাল, কিন্তু সে তো একটা ইস্কুলের মাস্টার!

—হ্যাঁ মাস্টার ঠিক, কিন্তু ও খুব বড়ো একজন অ্যান্টিসোশ্যাল। আমাদের বিরুদ্ধে ওর লড়াই। তাই আমরা ওকে ফিনিস করতে চাই।

—তোমরা আমায় ঠিকঠাক সবকিছু বলছ তো?

—তোকে মিথ্যা বলে আমাদের কী লাভ বল তো?

—কে জানে, আমার না মনে হচ্ছে লোকটাকে এইভাবে মারা ঠিক হচ্ছে না।

—এই তুহিন, কী হল কী? মনে হচ্ছে তুই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিস, এরকমভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে তুই কিন্তু কাজটাই করতে পারবি না, তুই মনটাকে শক্ত কর।

পাঁচু আর নীরজ তুহিনকে অনেক করে বোঝায়। ও যাতে কোনোভাবেই গুলি চালাতে গিয়ে দুর্বল না হয়ে পড়ে তার জন্যে সমানে ওকে নানা কথা বলে চাঙ্গা করে। তুহিনও বারবার বলে— তোমরা ভয় পেয়ো না, টাকা যখন নিয়েছি, তখন কাজটা আমি করবই। তবে এখন আমার মনে হচ্ছে লোকটা তোমাদের কথামতো অতটা খারাপ নয়।

তুহিন আর কথা বাড়ায় না। ও বাড়ির দিকে রওনা দেয়। আজকে রাতে বাড়িতে ওর একটা ভালো ঘুম দরকার। ওর মনটা আজকে যে বড়ো অশান্ত, একটা লম্বা ঘুম ওর মনকে কিছুটা হলেও শান্ত করতে পারবে। আর মন শান্ত না হলে, এত বড় একটা কাজ ও কিছুতেই করে উঠতে পারবে না।

মাঝে মাঝেই ওর মুখের সামনে যে লোকটাকে মারতে হবে, তার মুখটা ভেসে ওঠে। ইস, কী নিরীহ মুখ লোকটার, দেখে মনেই হয় না এটা লোকটা কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে। অথচ এই লোকটাকেই কালকে ও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে। ওর নিজের ওপর রাগ হয়। রাগ হয় কাকলির ওপর। আজকে ওই মেয়েটার আবদার মেটাতে গিয়েই ও টাকার লোভে এইভাবে একজনকে মারতে চলেছে। ওর মনে একটু একটু ভয়ও করতে থাকে। যদি ও ধরা পড়ে যায়, যদি ও কিছু গন্ডগোল করে ফেলে?

একসময় ও ভেবেই নেয় এইরকম খুন ও কিছুতেই করবে না। তারপরেই পাঁচুদার শাসানির কথা মনে আসে— দ্যাখ তুহিন, তুই কিন্তু আমাদের টাকা নিয়েছিস, এইবারে যদি কাজটা না করে আমাদের সঙ্গে বেইমানি করিস, আমরাও কিন্তু তোকে ছাড়ব না। তোকে আমরা পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেব। আর কাজটা করে ফেলতে পারলে তোকে আমরা পুরো শেল্টার দেব, পুরো নিরাপত্তা দেব।

তুহিন পিছোনোর চিন্তা করার আর সাহস পায় না। ও পাঁচুদার কথাবার্তা শুনেই বুঝে নিয়েছে ওরা কতটা নির্মম, যেকোনো কাজ করতে ওদের হাত একদম কাঁপে না, মনে ভয় হয় না। ওকে সরাতে ওদের দু-মিনিটও লাগবে না।

ও আর অন্য চিন্তা মাথায় আনে না। পিস্তলটা বার করে একবার হাত বুলোয়। ও জানে ওই সময়ে এই জিনিসটাই হচ্ছে ওর একমাত্র ভরসা, একমাত্র বন্ধু। এ যদি ওই সময়ে পাশে না থাকে, কোনো গন্ডগোল করে, তাহলে ওকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, কেউ না।

ও বন্দুকটাকে বালিশের তলায় রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ রাতটা ও নিশ্চিতভাবে ঘুমোতে চায়, কালকে যে কী হবে, সেটা ও নিজেও জানে না। অনিশ্চিত কালের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে ও ঘুমিয়ে পড়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%