চতুর্বিংশ অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

পরের দিন সকালে তুহিন তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠল। তারপর স্নান, খাওয়া-দাওয়া করে ও বেরিয়ে পড়ল ট্রেনে সোজা কলকাতা।

তারপর কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ও ঘুরে সময় কাটাতে লাগল। দুপুরের মধ্যেই তুহিন বরুণের ইস্কুলের সামনে। কখন ও ইস্কুল থেকে বেরোয়। আবার আগে আগে ছুটি হয়ে গেলে বরুণ যদি বেরিয়ে পড়ে, সে খেয়ালও ওকে রাখতে হচ্ছে।

বিকেলবেলায় ইস্কুল ছুটির ঠিক পরে বরুণ ইস্কুল থেকে বেরিয়েছে। অবশ্য ও একা নয়, ওর সঙ্গে আরও কয়েকজন টিচার রয়েছে। তুহিন অবশ্য জানত এখন বরুণকে কিছুতেই একা পাওয়া যাবে না। ওর সঙ্গে বেশ কয়েকজন ওই ইস্কুলেরই টিচার থাকে।

বরুণের ইস্কুল থেকে শিয়ালদা স্টেশন বেশি দূর নয়। কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। বরুণরা সবাই হাঁটছে। ওরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে।

তুহিন ওদেরকে অনুসরণ করছে, তবে একটু দূরত্ব রেখেই। কোনোভাবে কেউ যেন ওকে সন্দেহ না করে সে কথাটা ওর মাথায় ভালোই আছে।

ওরা স্টেশনে ঢুকে পড়ল। ওদের পেছন পেছন তুহিনও চলে এল। তুহিন জানে বরুণ প্রতিদিন কোন ট্রেনে ফেরে। বিকেলবেলার গোবরডাঙা লোকাল। ট্রেনটা অ্যানাউন্সও করে দিয়েছে। পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে।

বরুণরা ট্রেনের দিকে যাচ্ছে। এই তো পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্ম। ট্রেনটাও দাঁড়িয়ে আছে। বরুণরা উঠে পড়ল, পিছন পিছন তুহিনও।

সবাই সিট পেয়ে গিয়েছে। তুহিন সিট পেল একেবারে বরুণের ঠিক পাশে। প্রথমে ও একটু ইতস্তত করছিল ওখানে বসবে কিনা তাই ভেবে। কিন্তু ও পরে ভাবল সামনে একটা সিট খালি, তবুও ওই সিটে না বসে ও যদি দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে লোকে ওকে সন্দেহ করতে পারে। ও গিয়ে বরুণের পাশের সিটেই বসল।

যাকে আর কিছুক্ষণ পরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে তার পাশে বসে ওর নিজেরই কেমন যেন হতে লাগল। এক একটা করে স্টেশন যাচ্ছে, আর তুহিন নিজেকে আরও শক্ত করছে। একটু দুর্বল হয়ে গেলেই ও কাজটা আর করতে পারবে না।

বরুণ অন্য সবার সঙ্গে বিভিন্ন কথায় ব্যস্ত, ও কী আর জানে আর কয়েক ঘণ্টা বাদে ওর জীবনে কী ঘটতে চলেছে। যে ওকে গুলি করে মারবে, সে কিনা ওর পাশের সিটে বসেই যাচ্ছে।

বারাসাত এসে গিয়েছে। তুহিন পকেটের পিস্তলটায় হাত দিয়ে নিজেকে যেন একটু চার্জ দিয়ে নিল।

হাবড়ায় গিয়ে ট্রেনের ভিড় পাতলা হয়ে গিয়েছে। তুহিন বরুণের দিকে একবার দেখে নিল। মছলন্দপুরে ট্রেন বলতে গেলে একেবারে ফাঁকা। আর খানিকক্ষণের মধ্যেই গোবরডাঙা এসে যাবে।

ট্রেনটা গোবরডাঙায় থামল। এটাই শেষ। বরুণ নেমে পড়েছে। তার পিছন পিছন তুহিন। গোবরডাঙা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের সামনেই বরুণ প্রতিদিন মোটরবাইকটা কোনোরকমে স্ট্যান্ড দিয়ে রেখে ট্রেন ধরে। বরুণের মোটরবাইক সবারই চেনা। বরুণও জানে ওর বাইক এখানে সম্পূর্ণ নিরাপদ, কেউ হাত দেবে না।

বরুণ প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে বাইকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছন পিছন তুহিনও। বরুণ পকেটে হাতড়ে বাইকের চাবি খুঁজছে। এই তো ও চাবি পেয়েছে। এবারে ও চাবিটা বাইকে লাগাচ্ছে।

তুহিন ওর খুব কাছে চলে গিয়েছে। ও পকেট থেকে পিস্তলটা বার করল। এইটাই সুবর্ণ সুযোগ। তুহিন গুলি চালাল। শুধু একটা আওয়াজ গুড়ুম! বরুণের পিঠে গুলি লাগে। ও একটা আঁক শব্দ করে পিছন ফিরে তুহিনের মুখোমুখি হয়। আরে, এই ছেলেটাই তো শিয়ালদা থেকে ট্রেনে ওর পাশে বসেই গোবরডাঙা পর্যন্ত এল আর ওই কিনা ওকে গুলি করল! বরুণের ভাবনাচিন্তায় ক্রমশ অন্ধকার নেমে আসে। তুহিন আর একটা গুলি চালায়। এবারে নিশানা বরুণের বুকের বাঁদিক। ঠিক যেদিকে হৃৎপিণ্ডটা থাকে। আর একবার গুড়ুম। এবারেও নিশানা অব্যর্থ।

বরুণ আর টাল সামলাতে পারে না। ও কোনোরকমে পাশের প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ি ধরে বসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে এমনভাবে দুটো গুলি চলল কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না।

তুহিন ছুটে গিয়ে ওর জন্যে রাখা বাইকে উঠে পড়ল। বাইক স্টার্ট দেওয়াই ছিল। ওরা ওখান থেকে ধাঁ।

বরুণ প্ল্যাটফর্মে পড়ে রয়েছে। গুলির শব্দে মানুষজন ভয় পেয়ে ছোটাছুটি শুরু করেছে। যে বরুণ মানুষের দুঃখে-কষ্টে আগুপিছু কিছু না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ত, আজকে তার এই অবস্থায় কেউ এগিয়ে এল না।

ও নিজেই পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে প্রতিবাদী সংস্থার সভাপতি রবিবাবুকে ফোন করে। সামান্য কয়েকটি কথা— হ্যাঁ রবিদা, আমায় ওরা গুলি করেছে গোবরডাঙা স্টেশনে। আমার ডান পাশে বসে যে ছেলেটা শিয়ালদা থেকে গোবরডাঙা পর্যন্ত এসেছে, সেই আমায় গুলি করল।

রবিবাবুর এই কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এ কী শুনছে ও! সঙ্গে সঙ্গে গোবরডাঙার কয়েক জায়গায় রবি মল্লিক ফোন লাগায়— শিগগির তোরা গিয়ে বরুণকে বাঁচা।

সুটিয়া থেকে সবাই দল বেঁধে গোবরডাঙায় ছোটে, গোবরডাঙার ক-জন ততক্ষণে বরুণকে গাড়িতে তুলে ফেলেছে। ওকে সোজা হাবড়া হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। একমাত্র ওখানেই কাছাকাছির মধ্যে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়।

বরুণ ওদেরকে বলল— তোরা চিন্তা করিস না, আমার কিছু হবে না।

সবাই বরুণকে অভয় দিচ্ছে— হ্যাঁ-হ্যাঁ বরুণদা, তোমার কিছুই হবে না। হসপিটালে পৌঁছোলেই তোমার চিকিৎসা শুরু হয়ে যাবে। আমরা হাবড়া হসপিটালে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের বরুণদার গুলি লেগেছে। ওকে নিয়ে আমরা হসপিটালে যাচ্ছি।

বরুণের মুখে স্মিত হাসি— তোরা আমার জন্যে কত ভাবিস বল।

—না ভাবলে হবে, তোমার জন্যেই তো আমরা এখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারছি।

বরুণের দু-চোখ বুজে আসতে থাকে। ওর যেন খুব ঘুম পায়। ও বিড়বিড় করে বলতে থাকে— এখনও অনেক কাজ বাকি থেকে গেল, অনেক কাজ। বাংলাদেশে একবার যাব ভাবলাম, ওখানে আমার আরেক মা-বাবা আছে, ওখানেও যাওয়া হল না। অনেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেল।

একসময় বরুণের বিড়বিড় থেমে গেল। বরুণ পুরো নেতিয়ে পড়ছে। ও জ্ঞান হারাচ্ছে। গাড়িতে সবাই ওর জ্ঞান ফেরানোর জন্যে চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই অবস্থায় ওরা হাবড়া হসপিটালে পৌঁছোল। ডাক্তাররা বরুণকে দেখে বলল— খুব বাজে অবস্থা, তবে আমরা চেষ্টা করছি ওঁনাকে বাঁচানোর।

—তাই করুন ডাক্তারবাবু, বরুণদা না বাঁচলে আমরা কেউ বাঁচব না।

ডাক্তাররা সত্যি চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিধির বিধান। বরুণ চলে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%