মনজিৎ গাইন
শিবুর সংসার চালাতে এখন বেশ কষ্ট। ও নিজে দিনমজুরের কাজ করে। তাতে যেটুকু পয়সা পায় তা দিয়ে সংসার চালিয়ে আবার তিন ছেলের পড়াশুনোর খরচ চালানো প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। ওরা এখন সুটিয়ায় চলে এসেছে। পাশেই বাংলাদেশ, শিবুর জয়বাংলা। একটু এগোলেই ওপারের নাগাল। কিন্তু দুই দেশ— এপারে এদেশের বিএসএফ, ওপারে বিডিআর। ইচ্ছেমতো যাওয়ার ইচ্ছায় দাঁড়ি।
তবুও শিবু মাঝে মাঝে বর্ডারের কাছে চলে যায়। ও দেখে বন্দুক নিয়ে সব লম্বা লম্বা বিএসএফের জওয়ানরা পাহারা দিচ্ছে। বাঙালি নেই, সবাই নন-বেঙ্গলি। আর এরাই বাঙালিদের এপার-ওপার হতে বাধা দিচ্ছে। বাংলার মাঝে আজকে বিভেদের বর্ডার, হায় অদৃষ্ট!
ও দেখে পাখিগুলো কী সুন্দর এপার-ওপার করছে, ওদের কোনো সীমানা নেই, বিএসএফের-বিডিআরের কড়া চাউনি নেই। ইস, ও যদি পাখি হত, একবার ওর সাধের জয়বাংলায় ঘুরে চলে আসত, কেউ বাধা দিতে পারত না।
সারাদিন পরে এইরকম ঘুরেফিরে যখন বাড়ি ফিরত তখন সন্ধে হব হব। এদিকে শীতকাল, মাটির বাড়িতে লেপ-কাঁথা নেই, ঠান্ডায় সব জল। বাচ্চাগুলো শোবে কী করে?
ও এসেই বেরিয়ে যায়। মালা চ্যাঁচায়— কী হল, সাঁঝের আগে আবার বেরোও কোথা?
—দাঁড়াও আসছি, বলছি দা কোথায় বলতে পার?
—কেন, দা কী হবে?
—অত বোকো না, দাটা আমায় দাও।
মালা গজগজ করতে করতে দা এনে শিবুর হাতে দেয়। শিবু কোনো কথা বলে না, ও দা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ভেতর থেকে মালা চ্যাঁচায়— তাড়াতাড়ি চলে এসো, শীতের বেলা, বর্ডারের ধারে হরেক ঝামেলা।
শিবু গিয়ে ক-টা কলাগাছ দায়ের কোপে ফেলে দেয়, তারপর থোড়ের ছালগুলোকে নিয়ে বাড়ি আসে। তারপর হাঁক পাড়ে— হরেন, রমেন, বরুণ তোরা কোথায়? এই দ্যাখ, তোদের জন্যে কী এনেছি।
তিনজনেই বেরিয়ে আসে। হরেন এখন বেশ বড়ো। কিন্তু পরের দুটো বেশ ছোটো। ওদের আগ্রহটাই বেশি। ছোটো দুটো বাবার কাছে ছুটে যায়— কই, কী এনেছ দেখি?
শিবু ওদের ওই থোড়ের ছালগুলোকে দিয়ে বলে— নে, রাতে তোরা এগুলো গায়ে দিয়ে শুস, দেখবি কীরকম গরম লাগে।
ওরা খুব আনন্দ করে ছালগুলো নিল। সেইরাতে অনেকদিন বাদে ওরা একটা শান্তির ঘুম দিল। এতদিন ঠান্ডায় ওরা ঘুমোতেই পারেনি। ছোটো বরুণ শুধু বলতো— কী ঠান্ডা, সকালে রোদ কখন উঠবে, শরীর খুব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!
সেই রাতে সবাই প্রাণ ভরে ঘুমোল, কিন্তু শিবুর ঘুম ভেঙে গেল বরুণের আওয়াজে। বরুণ ঘুমের ঘোরে কীসব যেন বলছে। ও প্রথমে ঘুম থেকে উঠে ঠিক বুঝতে পারছে না বরুণ কী বলছে। বিড়বিড় করে ভেসে আসছে ওর কথাগুলো। শিবু প্রথমে ভাবে বরুণ হয়তো স্বপ্ন দেখে ভয়-টয় পেয়ে ভুল বকছে। ও বরুণকে জাগিয়ে দিতে যায়। তখনই বরুণের কথাগুলো ওর কানে যায়—আমাকে বাঁচাও, ওদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলল।
শিবু ডাকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। এ কী শুনছে ও? এটা কি বরুণের শুধু স্বপ্ন, না কি অন্য কিছু, ওর আগের জন্মের কথা? ও বরুণকে নাড়া দেয়—অ্যাই বরুণ, কী হয়েছে উঠে পড়, স্বপ্ন দেখছিস?
বরুণ হুঁ-হুঁ করে সাড়া দেয়। তারপর ঘুম থেকে উঠে কী কান্না! ওর বাবা ওকে যত থামাতে চায়, ও তত কাঁদে আর বলে— বাবা-বাবা, আমার আগের মাকে ওরা মেরে ফেলল।
— না-না, কেউ মারেনি, ওই দ্যাখ তোর মা ওখানে।
ততক্ষণে ওদের কথাবার্তায় মালাও উঠে পড়েছে। মালা বলে— কী হল বরুণ, এত কাঁদিস কেন?
এই বলে বরুণকে বুকে জাপটে ধরে ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করে। বরুণও মালার বুকে মুখ গুঁজে সমানে ফোঁপাতে থাকে।
শিবু ভাবে বরুণ এসব কী বলছে। ওকে কাদের হাত থেকে বাঁচানোর কথা ও বলছে, ওর আগের মা কে, আর কে বা তাকে মারল? প্রশ্নগুলোই শুধু ভেসে আসে শিবুর মনে, উত্তরের কোনো হদিশ পায় না।
* * *
যা হোক করে রাত কেটে যায়। সকাল হতেই বরুণ বলে— মা, গোবর্ধনকাকার কাছ ফুল নে তাহলে স্টেশনে চলে যাই।
—হ্যাঁ চলে যা, তবে দেরি করিস না, আবার তোর স্কুল আছে তো।
—না-না, দেরি করব না। আমি ঠিক সময়ে এসেই স্কুলে যাব। তুমি ভাতের সঙ্গে আলুভাতে দিও।
বরুণ ছোটে গোবর্ধনকাকার বাড়িতে। গোবর্ধনকাকার অনেক জমি। সেখানে ফুলের চাষ হয়। গাঁদা, রজনীগন্ধা বেশি হয়, তবে তার সঙ্গে গোলাপ এবং চন্দ্রমল্লিকাও হয়। বরুণ সেই ফুল নিয়ে ঠাকুরনগর স্টেশনে যায়। সেখান থেকে অনেকে ফুল কিনে কলকাতায় নিয়ে যায় ট্রেনে করে বিক্রি করার জন্যে। ও গোবর্ধনকাকার বাড়ি গিয়ে হাঁক পাড়ে— ও কাকা, তাড়াতাড়ি ফুল দাও, কাল কিন্তু অনেক দেরি করে ফেলেছিলে, খদ্দেররা সব চলে গেসল।
গোবর্ধনকাকাও এই ছোটো ছেলেটাকে খুব স্নেহ করেন। খুব ভদ্র ছেলেটা। পড়াশুনোতেও এ বেশ ভালো। ওর বাবা একার খরচায় পুরো সংসার টেনে উঠতে পারে না বলে সব ছেলেই কিছু না কিছু করে। গোবর্ধনকাকাও বরুণকে সবসময় কিছু না কিছু দিয়ে সাহায্য করেন। উনি জিজ্ঞাসা করলেন— বরুণ, সকালে কিছু খেয়েছিস?
বরুণ চুপচাপ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। গোবর্ধনকাকাও জানেন ছেলেটার স্বভাব। খিদেতে পেটের নাড়ী ছিঁড়ে যাবে, তবুও কিছু বলবে না।
—কী হল, উত্তর দিচ্ছিস না কেন?
—না, খাইনি।
—গীতা, দেখো তো বরুণ কিছু খায়নি, ওকে মৌঝলা গুড় দিয়ে দুটো গরম রুটি দাও।
গীতা কাকিমাও খুব ভালো। উনি তাড়াতাড়ি দুটো রুটি সেঁকে দিলেন। শীতকালের সকালে মৌঝলা গুড় দিয়ে গরম রুটি খেতে দারুণ লাগে। বরুণও তাড়াতাড়ি রুটি দুটো মুখে দিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটল। একটু দেরি হয়ে গেলেই খদ্দেররা সব অন্যদের কাছ থেকে ফুল কিনে নেবে। ওর ফুল পড়ে থাকবে। এই ঠাকুরনগর অঞ্চলে খুব ফুলের চাষ হয়। বলতে গেলে ঘরে ঘরেই ফুলের চাষ। আর ফুল বিক্রি না হয়ে পড়ে থাকলে পুরোটাই নষ্ট। ফেলে দিতে হবে। আর গোবর্ধনকাকা ওর এত খেয়াল রাখেন, ওঁনার ফুল নষ্ট হতে দিলে চলে? বরুণ জোরে জোরে হাঁটা লাগায় রাস্তার দিকে। ভ্যান-টেম্পো যাই পাক না কেন, তাতে চড়েই ঠাকুরনগর স্টেশন চত্বরে পৌঁছোতে হবে।
ওখানে পৌঁছে দেখল অনেকে চলে এসেছে ফুল নিয়ে। সীতারামকাকা, সমীরদা, সীমামাসি সবাই। ওকে দেখেই সবার হইচই — অ্যায়, এবারে বরুণ এসে গিয়েছে, আমাদের সবার ফুল পড়ে থাকবে।
বরুণ শুনে বলে— না-না, তোমরা কী যে বলো! দেখো তোমাদের সবার ফুলই বিক্রি হবে।
বরুণের এই যে সবার কথা ভাবা, এর জন্যেই ঠাকুরনগর ফুলবাজারের সবার ও চোখের মণি, সবাই বাড়ি থেকে কিছু না কিছু আনে। বরুণ আনতে পারে না। সবাই তাই বরুণকে তাদের টিফিনের খাবার থেকে কিছু না কিছু দেবেই। এই তো সীমামাসি সেদিন বাড়ির থেকে সুন্দর সরুচাকলি করে এনেছে। বরুণের দিকে দুটো সরুচাকলি বাড়িয়ে দিয়ে বলল— নে, খেয়ে নে।
বরুণ নিতে চায় না। ও বলে— মাসি, আমার পেট একদম ভরা আমি কিছুতেই খেতে পারব না।
— একদম পাকামি করবি না, এইটুকু ছেলে আবার তার পাকা-পাকা কথা, নে তাড়াতাড়ি এগুলোকে খা।
সীমামাসি এমন জোরাজুরি করল যে বরুণ ওগুলো না নিয়ে আর পারল না। ও জানে ও যদি এগুলো না নেয় তাহলে সীমামাসি খুব দুঃখ পাবে। আর কেউ দুঃখ পেলে ওর মনেও খুব দুঃখ হয়। ওর চোখ ফেটে জল আসে। আর ওর জন্যে কেউ যদি দুঃখ পায়, সে যত সামান্যই হোক না কেন সেটা ওর কাছে একেবারে অসহ্য।
এইতো সেদিন ফুল বেচে ফেরার পথে দেখল একটা বুড়ি রাস্তার ধারে বসে আছে। ওর মনে হল বুড়িটার খুব খিদে পেয়েছে। ও জিজ্ঞাসা করল— ও ঠাকমা, কিছু খেয়েছ?
বুড়িটা একটা ছোট্ট ছেলের এই প্রশ্ন শুনে চোখে জল ধরে রাখতে পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। বুড়ির কান্না শুনেই বরুণ বুঝে নিয়েছে ঘটনাটা। ও ওর ফুল বিক্রির টাকা থেকে একটা দশ টাকার নোট বুড়িটাকে দিয়ে বলে— ঠাকমা, এই টাকাটায় কিছু কিনে খেও।
বুড়িটা বরুণকে মাথায় হাত দিয়ে খুব আশীর্বাদ করল— তুমি দীর্ঘজীবী হও বাছা, আর এরকম করে সবার জন্যে সেবা করো।
সেদিন বরুণ গোবর্ধনকাকার কাছে গিয়ে মুখটা কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়েছে। গোবর্ধনকাকা ওর মুখ দেখেই বুঝে নিয়েছেন কিছু একটা অসুবিধা হয়েছে। ওঁনার প্রশ্ন— কী বরুণ, কী হল তোর, এরকম মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
—কাকা, আজকে তোমার টাকার থেকে দশ টাকা কম রয়েছে।
—কেন, হারিয়ে ফেলেছিস?
—না কাকা, রাস্তায় এক ঠাকমার সঙ্গে দেখা হল, তার খাওয়া হয়নি, তাই তাকে দশ টাকা দিলাম। তুমি আমার পাওনা টাকা থেকে ওই টাকাটা কেটে নিও।
গোবর্ধনকাকা ওকে কাছে টেনে বললেন— এ-কথা বলতে নেই বরুণ, তুই এই বয়সে এইরকম বড়ো মনের অধিকারী ভাবতেও আমার গর্ব হয়। তুই অনেক অনেক বড়ো হবি।
বরুণ ফুল বেচে হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়ি ফেরে— মা-মা, শিগগির ভাত দাও।
—আগে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে আয়।
—আমি এক্ষুনি আসছি।
এই বলে গামছাটা নিয়ে ও ছুট লাগাল। ওকে প্রতিদিন তাড়াতাড়ি ইস্কুলে যেতে হবেই। ফার্স্ট বেঞ্চে প্রতিদিন ওর বসা চাই।
নিরাপদ স্যার ওদের বাংলা পড়ান। স্যার যা লিখতে দেন, বরুণ সবার আগে তাই করে দেখায়। তবুও স্যারের মন বরুণ কিছুতেই পায় না। সবসময় স্যার ওকে যেন একটা তির্যক নজরে দেখেন। সেদিনকে স্যার রচনা লিখতে দিয়েছেন— ছাত্রসমাজের কর্তব্য।
সবার সঙ্গে বরুণও লেখা জমা দিয়েছে। স্যার লেখাগুলো পড়ছেন। সবগুলো পড়া হয়ে গেলে বললেন— বরুণ, তোর রচনাটা একদম হয়নি।
বরুণ অবাক হয়, ও তো ভালো করেই লিখেছিল, তবু স্যার এরকম বললেন কেন? ও উঠে দাঁড়ায়— স্যার, আমার কী কী ভুল হয়েছে যদি একটু বলে দিতেন, তাহলে ঠিক করে নিতে পারতাম।
বরুণের এই কথা শুনে স্যারের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি— ধুস, তোর তো কিছুই হয়নি, তুই আর কোনটা ঠিক করবি।
বরুণ কিন্তু দৃঢ়চেতা, ও আবার বলে— তাও স্যার, বলুন।
স্যার পড়তে থাকেন— বরুণ লিখেছে ছাত্রসমাজের কর্তব্য নাকি মানুষের পাশে থাকা, মঙ্গল করা, সমাজের কাজ করা এইসব। বরুণ, তাহলে ছাত্ররা আর পড়াশুনা করবে না, এই তোর মত?
—না স্যার, আপনি ভুল বলছেন। আমি লিখেছি পড়াশুনোর পাশাপাশি ছাত্রসমাজকে সামাজিক দায়িত্বও পালন করতে হবে, দুঃস্থ মানুষের সেবা করতে হবে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
কিন্তু বরুণের উত্তর শুনে নিরাপদ স্যার একেবারে তেলে-বেগুনে — কী, তুই বললি আমি ভুল বলছি, তোর এত সাহস! এক্ষুনি তোকে হেডস্যারের কাছে নিয়ে যাব, তারপর দ্যাখ তোর কী হয়।
বরুণ চুপ করে থাকে। কোনো রা কাড়ে না। হেডস্যারের কাছে নিরাপদ স্যার বরুণের নামে যা ইচ্ছা তাই বললেন। কিন্তু হেডস্যার জানেন বরুণ কীরকম ছেলে। ও তো এরকম করবে না। ওঁনার মনে খটকা লাগল। উনি বরুণকে ডেকে পাঠালেন। বরুণ এসে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হেডস্যারের প্রশ্ন—বরুণ, তোমার নামে নিরাপদ স্যার যা বলে গেলেন, তা কি সত্যি?
বরুণ কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। হেডস্যার আবার গর্জে ওঠেন— কী হল, চুপ করে আছ কেন? উত্তর দাও।
বরুণ আস্তে আস্তে মাথা উঁচু করে হেডস্যারের চোখে চোখ রেখে বলল— না স্যার, সত্যি না, উনি আমার সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছেন আপনার কাছে।
—তুমি স্যারের দেওয়া রচনা লেখায় ভুল করেছ, অথচ স্যার সেটা বলায় তুমি স্যারকে অপমান করেছ।
— না স্যার, আমি নিরাপদস্যারকে কোনো অপমান করিনি, কিন্তু স্যার, উনি বলছিলেন আমার রচনা ভুল। আমি তো স্যার লিখেছিলাম পড়াশুনা করার পাশাপাশি ছাত্রসমাজের সামাজিক দায়িত্বও আছে, দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থকে সেবা করা অবশ্যই ছাত্রসমাজের দায়িত্ব।
বরুণ তার বক্তব্যে অবিচল। হেডস্যার এই দৃঢ়চেতা ছেলেকে যত দেখছেন, তত অবাক হচ্ছেন। বরুণ গড়গড় করে সব কথা বলে যেতে থাকে— স্যার, যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয়, আপনি আমার খাতাটা দেখুন, আমি কী লিখেছি তাতেই আপনি বুঝতে পারবেন।
—ঠিক আছে, তুমি যাও আমি দেখছি।
হেডস্যার নিরাপদবাবুকে আবার ডেকে পাঠালেন।
—কই, বরুণের খাতাটা দেখি।
নিরাপদবাবু খাতাটা হেডস্যারের দিকে এগিয়ে দিলেন। হেডস্যার একবার চোখ বুলিয়েই ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। ওঁনার মন্তব্য— আচ্ছা নিরাপদবাবু, একটা ছেলে এত সুন্দর একটা রচনা লিখেছে আর আপনি সমানে ওটাকে ভুল বলে চালাতে চাইছেন, ওই ছেলে তো রেগে যাবেই। আর ভাবুন এখনকার দিনের অনেক ছেলে সামাজিক দায়িত্ব কী তা জানে না। নিজের বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখতে চায় না, আর এই বয়সের একটা ছেলে ছাত্রদের সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে এত সুন্দর লিখল, অথচ আপনি তাকে বলছেন এসব লেখা ভুল হয়েছে। নিরাপদবাবু, ভুলে যাবেন না আমরা শিক্ষক সমাজ, আর আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রদের মন তৈরি করা, ভেঙে দেওয়া নয়।
হেডস্যার আরও অনেক কথা নিরাপদবাবুকে বললেন। নিরাপদবাবুর মুখে আর কোনো উত্তর নেই। একদম থম মেরে গেছেন উনি। আস্তে আস্তে হেডস্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এদিকে ইস্কুল ছুটি হয়েছে। বরুণ ছুট লাগাল বাড়ির দিকে। বাড়িতে তার অনেক কাজ। বাড়িতে ফিরে ও হাঁক দিল— মা-মা, শিগগির দুটো মুড়ি দাও।
—দাঁড়া, দিচ্ছি।
মা ওর হাতে একবাটি মুড়ি ধরিয়ে দিল। বরুণ তাড়াতাড়ি মুড়ি খেয়ে নিয়ে নগেনজ্যেঠুর বাড়ির দিকে দৌড়োয়। ওখানে ওর বিচালি কাটতে হবে। বড়ো বঁটিতে ঘষ-ঘষ করে ও বিচালি কাটে। জেঠিমা হাঁকে— হ্যা রে বরুণ, এসেই একেবারে বিচালি কাটতে বসে গেলি যে, একটু সাড়াশব্দ দিবি তো।
—এই তো জেঠিমা, সাড়া দিলাম।
—দেখো দিকিনি, সাড়া দেওয়ার কী ছিরি! বলছি, তোর জন্যে যে একবাটি রসবড়া রাখলাম, সেটা তোকে কখন দেব?
—এক্ষুনি দাও, আমার বিচালি কাটা হয়ে এল।
সত্যিই বরুণ এত তাড়াতাড়ি বিচালি কাটে, যে বেশিক্ষণ ওর লাগেই না। তারপর গোরুদুটোকে জাবনা দেয়। গোরুগুলো আবার জাবনায় খোল কম থাকলে মুখ দিতে চায় না। বরুণকে তাই ভালো করে খোল দিয়ে বিচালি মাখতে হয়। এদিকে জেঠিমা তাড়া দেয়— কী হল বরুণ, বললাম না রসবড়াগুলো খেয়ে যা।
—যাচ্ছি জেঠিমা, এই হয়ে এল বলে।
—তুই তাড়াতাড়ি আয় তো দেখি।
—একটুখানি দাঁড়াও, জাবনাটা নিয়েই আসছি।
—ও, তুই আবার গোরুগুলোকে জাবনা দিতে গেলি কেন, আমিই দিয়ে দিতাম।
— তা বললে হয় জেঠিমা, দেখো তোমাদের গোরুগুলো কীরকম হা-পিত্যেস করে থাকে, ওদের জাবনা না দিলে হয়।
—তোর আবার সবকিছুতে বাড়াবাড়ি।
—বাড়াবাড়ি না জেঠিমা, ইস্কুলে শিখিয়েছে বিবেকানন্দের বাণী— জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।
—ওফ, তোকে নিয়ে আর পারা যায় না, তুই তাড়াতাড়ি গোরুগুলোকে জাবনা দিয়ে রসবড়াগুলো নিয়ে যা।
— যাচ্ছি গো যাচ্ছি, এক্ষুনি এই এলাম বলে। তুমি রসবড়াগুলো বাটিতে তোলো।
বরুণ জাবনা দিয়ে হাত-টাত ধুয়ে জেঠিমার কাছে রসবড়া খেতে আসে। জেঠিমাও ওকে খুব যত্ন করে রসবড়া খাওয়ায়। বরুণও খেতে খেতে বলে— খুব ভালো হয়েছে রসবড়াগুলো!
—আর দুটো নে।
—না-না, আর দিও না, এই দেখো আমার গলা পর্যন্ত ভর্তি হয়ে গিয়েছে। তোমার রসবড়াগুলো একেবারে যেন রসগোল্লার মতো বড়ো।
তবুও জেঠিমা নাছোড়। আর দুটো রসবড়া বরুণের বাটিতে দেয়। বরুণ খুব তৃপ্তি করে রসবড়াগুলো খায়। জেঠিমা বরুণকে সত্যি খুব স্নেহ করে। জেঠিমা জানে বরুণ ছোটো হলেও ওর মনটা খুব বড়ো।
* * *
বরুণ ইস্কুলে ভালো রেজাল্ট করায় রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের দুটো বই পেয়েছে। গোগ্রাসে ও বইগুলো পড়ে। বিকেলের আলো পড়ে যাওয়ার আগেই ওর পড়ে নিতে হয়। সুটিয়ায় তখনও সেভাবে বিদ্যুতের আলো আসেনি। আর কেরোসিন কিনে হ্যারিকেন জ্বেলে পড়ার মতো পারিবারিক অবস্থা ওদের কোনোমতেই নেই। বরুণ তাই ওদের বাণী পড়ে— জাতপাতে দীর্ণ, অসহায়, দরিদ্র মানুষরাই সভ্যতার স্রষ্টা। সেই গরিব মানুষদের খেতে দিতে হবে। অপুষ্টি, রোগ থেকে তাদের শরীরটা বাঁচাতে হবে। কুসংস্কার থেকে বের করে এনে তাদের মনে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। জাগাতে হবে তাদের আত্মবিশ্বাস।
বরুণের মনটা উদাস হয়ে যায়। তার সামনে যেন স্বয়ং বিবেকানন্দ এসে দাঁড়িয়েছেন। উনি যেন বলছেন— বরুণ, তুই পারবি সুটিয়ার এই মানুষদের অবস্থার উন্নতি করতে, তুই পারবি, তোকে পারতে হবেই। তুই শুধু গরিব মানুষদের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার কাজটা কর, দেখবি তারপর আর তোকে কিছু করতে হবে না, ওরা নিজেরা নিজেদের ব্যবস্থা তখন ঠিক করে নেবে।
বরুণ তখনও বেশ বিব্রত। ও যেন নিজেই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে না। বিবেকানন্দ যেন বরুণের মনের কথা বুঝতে পেরেছেন। বিবেকানন্দ বরুণকে অভয় দেন— তুই পারবি বরুণ, তোরই ক্ষমতা আছে। তুই ঠাকুরনগর বাজার থেকে ফুল বিক্রি করে ফেরার পথে এক বৃদ্ধা ঠাকমাকে খাবার টাকা দিসনি?
—হ্যাঁ সে দিয়েছি, কিন্তু তাই বলে সমস্ত সুটিয়ার মানুষকে দেখতে পারব কী করে?
—হ্যাঁ, তুই পারবি বরুণ, দুঃস্থ মানুষের জন্যে যেমন তোর মন কাঁদে, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তুই রুখে দাঁড়াস। তুই বাংলার এক নির্ভীক সৈনিক।
—আমি কী করে নির্ভীক হলাম, আমি প্রতিবাদ করলাম কোথায়?
—কেন, তোর বাংলা ক্লাসে তুই তোর স্যারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াসনি, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তুই প্রতিবাদ জানাসনি?
—হ্যাঁ, জানিয়েছি।
—তাহলে তুই এগিয়ে যা, একসময় দেখবি শুধু সুটিয়া নয়, সারা বাংলার মানুষ তোকে চাইবে, তাদের উদ্ধারকর্তা হিসাবে তোকে চাইবে। তুই তৈরি হ বরুণ, তোর অনেক দায়িত্ব।
বরুণ আপনমনে এইসব ভাবছিল। মা হঠাৎ তাড়া দেয়— অ্যাই বরুণ, তোর বোন রইল আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, দেখিস।
মায়ের কথায় বরুণের হুঁশ ফিরল। ও কীসব যে স্বপ্ন দেখে তার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। বিবেকানন্দ এসব কী বললেন, ওর মাথা যেন ভারী হয়ে আসে। ওকে আরও বিবেকানন্দের বই পড়তে হবে। আরও অনেক অনেক বই।
* * *
শিবুর আবার এদিকে পালাগানে ভালো নাম হয়েছে। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মূলত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস এখানে। এই সমস্ত লোকেরা আবার পালাগান শুনতে খুব ভালোবাসে। অনেক দূর দূর থেকে ডাক পায় ও। গাইঘাটা, গোবরডাঙা, মছলন্দপুর, চারঘাট এমনকি বনগাঁ থেকেও ডাক পায় ও। সেদিনকে পাঁচপোতা বাজারে গাইতে গিয়ে খুব হাততালি শুনল। পাঁচপোতা বাজারের গণেশ ময়রা খুব প্রশংসা করল তারপর বলল— এই যে শিবুদা, শুনছি তোমার ছোটো ছেলে বরুণ নাকি খুব ভালো হয়েছে।
—তুমি কোথায় শুনলে এ-কথা?
—আরে, তোমার ছেলে পাঁচপোতা ইস্কুলে পড়ে না, আর ওই ইস্কুলের মাস্টাররা সবাই আমার দোকান থেকে মিষ্টি কেনে, তারাই তোমার ছেলের খুব সুনাম করছিল সেদিন।
এটা শুনে শিবুর মনে আনন্দ গুনগুন করে উঠল। কী দিতে পেরেছে ও ছেলেদের, বলতে গেলে কিছুই না। অভাবের সংসারে এইভাবে ওরা বড়ো হচ্ছে, ওদের সত্যিই প্রশংসা করতে হয়। আর ছোটো ছেলে বরুণ তো সুটিয়ার সবার নয়নের মণি। সবার ও মন জয় করে নিয়েছে। সবাই ওকে খুব ভালোবাসে।
ও বাড়ি গিয়ে বউরে সব কথা বলে— জানো, আমাদের বরুণের সবাই খুব প্রশংসা করছিল।
—তাই, কোথায় শুনলে আমাদের ছোটোর প্রশংসা?
—পাঁচপোতা বাজারে।
—তাই, কী বলল সবাই?
শিবু মালাকে সব খুলে বলে। গর্বে মালারও বুক ভরে ওঠে। শিবু জিজ্ঞাসা করে— আচ্ছা, বরুণ কি আর ওর আর এক বাবা-মায়ের কথা বলে?
—না, সেটা একটু কমেছে, তবে ও এখন সাধু-সন্ন্যাসীদের বই খুব পড়ে।
—সে কী, তাহলে ও আবার বড়ো হয়ে সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাবে না তো? কোন সাধু-সন্ন্যাসীর বই ও পড়ে বলো তো?
—রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের বই সবসময় ও পড়ে।
শিবু রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের উদ্দেশ্যে এক প্রণাম নিবেদন করে বলে— দেখো ঠাকুর, আমার ছেলে যেন ঘর না ছাড়ে, আমাদের সবাইকে দেখে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।