মামাদের ময়না

দুলেন্দ্র ভৌমিক

এই সংসারে এক একজন লোক এক একরকম ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। কেউ লটারি জিতে লাখপতি হয়, কেউ বা একটু পড়াশোনা করেই স্কুলের সেরা ছাত্র হয়ে যায়, কারও ভাগ্যে ইন্টারভিউ দেওয়ার সাত দিনের মধ্যেই চাকরি জুটে যায়। আমার অবশ্য তেমন ভাগ্য নেই, কিন্তু আমার মাতুল-ভাগ্যটি বিলক্ষণ খাসা। জন্মাবার পর থেকেই আমি এমন তিনজন দুর্লভ মামা পেয়েছিলাম, যা সহজে কেউ পায় না। আমি যখন নিতান্ত শিশু, তখন আমার মাতুল-ভাগ্য সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিবহাল ছিলাম না। বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, আমি কত বড় ভাগ্যবান। হাজার বছর তপস্যা করেও এমন তিনজন মামা পাওয়া মুশকিল।

আমার তিন মামার তিনটি নাম ছিল। সব মানুষেরই যেমন থাকে। কিন্তু আমরা, অর্থাৎ ভাগ্নেরা কখনও সেই নামে তাঁদের পরিচয় দিতাম না। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে খুব সহজে শনাক্ত করার জন্য আমরাই এমন তিনটে নাম বেছে নিয়েছিলাম, যা তাঁদের স্বভাব ও আচরণের সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে যায়। বড়মামা ছিলেন সওদাগরি অফিসের একজন ডাকসাইটে অফিসার। রীতিমতো ভারিক্কি চেহারা এবং গম্ভীর কণ্ঠস্বর। সর্বদাই খুব পরিপাটি থাকতে ভালবাসতেন, আর সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন নিজেকে ব্যস্ত রাখতে। কোনও কাজ নেই, তবু বড়মামা ব্যস্ত হয়ে আছেন। তাঁর কীভাবে যেন ধারণা জন্মেছিল, সংসারে, আত্মীয়-বন্ধুদের পরিবারে এবং তাঁর চেনাজানা সব জায়গাতেই প্রতি মুহূর্তে নানা সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, এবং তার সমাধানের জন্য দলে দলে সবাই তাঁকে ডাকছে। তাঁরই পরামর্শ চাইছে। তিনি পরামর্শ না দিলে সব রসাতলে যাবে। হয়তো আমরা সবাই বসে টিভি দেখছি। বড়মামাও বসে আছেন সোফার ওপর। হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়াবেন এবং গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করবেন, ‘আরে! কেউ ডাকল নাকি রে?’

আমরা হয়তো বলতাম, ‘কই না তো!’

কিন্তু তাতে তিনি ক্ষান্ত হবার পাত্র ছিলেন না। মেজোমাসির মেয়ে, সে বেচারি দাঁড়িয়ে ছিল দরজার কাছে। তাকেই হুকুম করতেন, ‘অণিমা, দ্যাখ তো, কেউ ডাকে নাকি!’

এই ডাকাডাকির ব্যাপারটা চরমে উঠত কোনও বিয়ে, অন্নপ্রাশন বা শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানবাড়িতে গিয়ে। আমি অন্তত পঁচিশটা বিয়েবাড়িতে গিয়ে একই ব্যাপার দেখেছি। বড়মামা গিলে-করা পাঞ্জাবি, তাতে সোনার বোতাম, কাঁধের ওপর ভাঁজ করা কাশ্মিরী শাল চাপিয়ে মুখে চুরুট ধরিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর থেকে থেকে যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই বলছেন, ‘এই, কেউ ডাকল নাকি রে?’

প্যান্ডেলের ভেতর থেকে এক চক্কর ঘুরে এসে চোখের চশমাটা একটানে খুলে নিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে প্রায় প্রতিটি কাজের বাড়িতেই বড়মামা বলতেন, ‘সব ক'টা ওয়ার্থলেস! যে দিকটা দেখব না, সেইদিকেই গণ্ডগোল।

কিন্তু বড়মামা যে ঠিক কোন দিকটা দেখতেন, সে কথা আমরা কেউ জানতাম না, কোনও দিন জানতেও পারিনি। অথচ চেয়ারে দু'মিনিটও স্থির হয়ে বসতেন না। পরক্ষণেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে জানতে চাইতেন, ‘আবার কে ডাকে! কে রে, কে ডাকল রে।' বড়মামা অদৃশ্য হয়ে যেতেন। কেউ কখনও কোথাও বড়মামাকে ডাকত না, অথচ তিনি ভাবতেন, সবাই তাঁকে ডাকছে। বড়মাসিমা মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে বলতেন, ‘কুটো-গাছটি ভেঙে আধখানা করবে না, কেবল কেঁাঁচা দুলিয়ে ‘কে ডাকে, কে ডাকে’ করে ঘুরে বেড়াবে।' আমরা এই বড়মামার নাম দিয়েছিলাম ‘ডাকামামা’

মেজোমামা ছিলেন অন্যরকম মানুষ। কলেজে পড়বার সময় কী এক অজ্ঞাত কারণে তার চুলে মড়ক লাগে। দিদিমা, তাঁর ছেলের চুলে মড়ক থামাবার জন্য তারকেশ্বরে মানত করেছিলেন এবং বেলেঘাটায় গিয়ে কোনও এক সাধুবাবার কাছ থেকে দৈব ওষুধ এনে ছেলের মাথায় মাখিয়েছিলেন। সেই বাবার মহিমা এতই তীব্র ছিল যে, মাথার অবশিষ্ট চুল দেড় মাসের মধ্যেই লোপাট হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, সেই সময় চুলের শোকে মেজোমামা বিবাগী হয়ে সন্ন্যাস পর্যন্ত নিতে চেয়েছিলেন। তখন বড়মামার চেষ্টায় সিংভূম থেকে এক বলশালী কবিরাজকে আনা হয়েছিল। সে সময় মামার বাড়ির পিছনে এক মস্ত বাগান ছিল। সেই বাগান তোলপাড় করে হনুমানের গন্ধমাদন পর্বত থেকে বিশল্যকরণী জোগাড় করার মতো কবিরাজমশাই নানান গাছগাছড়া এনে ওষুধ বানাতেন এবং মামার মাথায় তার পরীক্ষা চলত।

দিদিমা হঠাৎ একদিন বাগানে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তাঁর সাধের আনারসের বাগান সাফ হয়ে গেছে। দাদুর হাতে লাগানো বেলফুলের বাগানও শূন্য। কলমের আমগাছের ডালগুলো ন্যাড়া, তার গায়ে একটাও পাতা নেই। দিদিমা রেগে গেলে ভয়ংকরী হয়ে উঠতেন। তাঁর মারমুখী মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে কবিরাজমশাই কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিলেন, তিনি সবেমাত্র কবিরাজি শিখছেন। তাঁর গবেষণার বিষয় টাক। এই গবেষণার জন্য একটি উপযুক্ত টাক তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বড়মামা নাকি তাঁকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। দিদিমা মুখে বেশি কিছু বললেন না ঠিকই, কিন্তু সিংভূমের কবিরাজকে সেদিনই বিদায় নিতে হল। বড়মামা কলেজ থেকে ফিরে সব শুনে খুব দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘সিম্পল একটা টাকের জন্য একজন বাঙালি গবেষকের কাজটা আটকে গেল। দেশের কথা ভেবে মধু কি ওর টাকটা ডেডিকেট করতে পারল না?’

এতসব কাণ্ডের পর আপনা আপনিই মেজোমামার মাথায় একদিন চুল গজাল। সে বড় বিচিত্র কেশরাজি। সব ক'টা চুল তীব্র ভাবে খাড়া এবং কোনওটা কোনওটার সঙ্গে লেগে নেই। কদমফুলের রোঁয়ার মতো বললে ঠিক বোঝানো যায় না, বরং বলা উচিত টুথব্রাশের মতো। এই চুল পেয়েই মেজোমামা খুশি। মাথার সব চুল খাড়া বলে আমরা তাঁর নাম দিয়েছিলাম ‘খাড়ামামা’।

ছোটমামার অবিশ্যি এত সব ঝামেলা ছিল না। তিনি ছিলেন একটু ভাবুক প্রকৃতির মানুষ। খুব কম কথা বলতেন। সব সময় তিনি নানা বিষয়ে চিন্তা করতেন। বাড়িতে, অফিসে, খাবার টেবিলে, ট্রেনে-বাসে—সর্বত্র। চিন্তা করতে করতে তিনি বহুবার নিজের স্টেশনে না নেমে তিন-চারটে স্টেশন এগিয়ে গিয়ে অন্য স্টেশনে নেমে পড়েছেন। একবার বোধহয় খুব জটিল বিষয় নিয়ে তাঁকে চিন্তা করতে হয়েছিল। তাই চিন্তা করতে করতে তিনি রানাঘাটে চলে গিয়েছিলেন। তখন আর ফেরার ট্রেন নেই। সারারাত প্ল্যাটফর্মে বসে চিন্তা করেই কাটাতেন, কিন্তু সেটা আর হয়নি। স্টেশনের একটা পাগলমতো লোক ছোটমামাকে আঁচড়ে দিয়েছিল। সুতরাং বাকি রাতটুকু মামা ছিলেন হাসপাতালে। মাঝে-মধ্যে ছোটমামিমা বিরক্ত হয়ে এসে বলতেন, ‘এখন আবার কী নিয়ে চিন্তা করছ?’

চিন্তিত মুখেই ছোটমামা জবাব দিতেন, ‘এখন কী নিয়ে চিন্তা করা যায় সেটাই চিন্তা করছি অনু!'

ছোটমামিমার নাম অনুপমা। ছোটমামা ডাকতেন অনু বলে। চিন্তার কী কী বিষয় বাকি আছে, তা নিয়েও ছোটমামার চিন্তার অবধি ছিল না। আমরা তাই ছোটমামার নাম দিয়েছিলাম, ‘চিন্তামামা।

সেবার পুজোর ছুটির সময় আমার এই তিন মামা ঠিক করলেন, তাঁরা শিকারে যাবেন। বিহারের কাছে এমন একটা জঙ্গলের সন্ধান ডাকামামা এনেছেন, যেখানে কলকাতার মশাদের মতো বাঘ, হরিণ, বুনোশুয়োর আর বাঘরোল ভনভন করে ঘুরে বেড়ায়। ডাকামামার অফিসের দরোয়ান নাকি সেই জঙ্গলে গণ্ডারও দেখেছে। সেই দরোয়ানের সঙ্গে এবার বিহারের জঙ্গলে শিকারে যাবেন আমার তিন মামা। এই পর্যন্ত ব্যাপারটা ভালই ছিল। হঠাৎ একদিন ডাকামামা আমায় ডাকলেন। চশমাটা কপালের ওপর তুলে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন নিরীক্ষণ করছেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, ‘বন্দুক চালাতে জানিস?’

আমার দাদু কোন গুণে রায়বাহাদুর হয়েছিলেন জানি না। কিন্তু রায়বাহাদুর হওয়ার সুবাদে তিনি একটা বন্দুক রাখবার অনুমতি পেয়েছিলেন। মামার বাড়িতে খাকি রঙের কাপড়ের খাপে ঢাকা সেই বন্দুকটা আমি দীর্ঘকাল দিদিমার আলমারির পেছনে ঝুলতে দেখেছি। ওটা খুবই অহিংস বন্দুক। দাদু কখনও-সখনও ওই বন্দুকে সিসের গুলি পুরে উঁচু গাছের নারকোল আর তাল পাড়তেন। মামাদের কখনও বন্দুক চালাতে দেখিনি। অতএব বন্দুক চালাতে জানি কি না এই প্রশ্নের জবাবে বলতেই হল, ‘না, জানি না।'

আমার উত্তর শুনে বড়মামা, অর্থাৎ আমার ডাকামামা চোখ কোঁচকালেন, খাড়ামামা বললেন, ‘স্টুপিড!’ এবং চিন্তামামা যথারীতি চিন্তা করতে আরম্ভ করে দিলেন। খানিক বাদে হঠাৎ খাড়ামামা প্রশ্ন করলেন, ‘তুই সাঁতার জানিস?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, খুব জানি।'

ডাকামামা আমার জবাব শোনার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব রকম গাছে উঠতে পারিস?’

আমি সত্যি গেছো ছিলাম। তাই বললাম, ‘পারি!’ ডাকামামা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন, ‘ঠিক হ্যায়’

এই ‘ঠিক হ্যায়’ ব্যাপারটা বোঝা গেল সেদিন রাত্রে। আমার তিন মামা শিকারে যাবেন এবং এই শিকার-অভিযানে আমাকে সঙ্গে যেতে হবে। প্রস্তাব শুনে দিদিমা আপত্তি তুলেছিলেন, কিন্তু আমার বেজায় উৎসাহ ছিল বলে সে-আপত্তি টিকল না। খাড়ামামা দিদিমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘মামা-ভাগ্নে যেখানে, বিপদ নেই সেখানে।'

ডাকামামা অবশ্য এরই মধ্যে বার-দুই ‘কে ডাকল রে’ বলে উঠে গিয়ে বারান্দায় চক্কর খেয়ে ফিরে এসেছেন। আমার মা'কে অভয় দিয়ে ডাকামামা বললেন, ‘ছেলেকে সব সময় আঁচলের আড়ালে রাখিস না। তা ছাড়া তোর ভয় কি সুমি, বন্দুক থাকবে আমার হাতে। তুই নির্ভয়ে থাক, ভয় পাবে বাঘ-বাঘিনীরা।’

বিস্তর সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে সন্ধের ট্রেনে আমরা রওনা দিলাম। ডাকামামার অফিসের দরোয়ান হরি সিং হাওড়া স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তিন মামা, এক ভাগ্নে আর এক দরোয়ান এই পাঁচজনে ভোরবেলায় গিয়ে স্টেশনে নামলাম। সেখান থেকে ভাড়াকরা গাড়িতে আরও অনেকটা দূরে গিয়ে আমাদের নামতে হল। চারপাশে ছাড়া ছাড়া হালকা জঙ্গল। গোটা জঙ্গলটাকে ঘিরে আছে সবুজ পাহাড়। আমি চারদিকের জঙ্গলে তাকিয়ে হতাশভাবে বললাম, ‘এমন ন্যাড়া জঙ্গলে বাঘ আর গণ্ডার থাকে!’

খাড়ামামা বললেন, ‘স্টুপিড!’

বলাই বাহুল্য, এটা আমার উদ্দেশে বর্ষিত হল। বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে এখানে আসা পর্যন্ত আমাকে মোট নিরানব্বুইবার ওই একই গালাগাল শুনতে হয়েছে শুধু খাড়ামামার মুখ থেকে। আমি চাইছিলাম, খাড়ামামার সেঞ্চুরিটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাক। তাই বললাম, ‘হরিণ কই?’

খাড়ামামা যথারীতি ‘স্টুপিড’ বলে উঠলেন এবং আমাদের সকলকে বিষম চমকে দিয়ে ডাকামামা বলে উঠলেন, ‘মধু, কেউ ডাকল নাকি রে?’

বনবিভাগের কাঠের দোতলা বাড়িতে আমাদের রাত্রে থাকবার ব্যবস্থা হল। ঠিক হল, পরের দিন বিকেলে আমরা জঙ্গলে ঢুকব। আজই হরি সিং তার দলবল নিয়ে মাচা বেঁধে আসবে। মাচা বাঁধার তদারকি করতে আমাদেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুরগির মাংস আর ভাত খেয়ে আমার তিন মামা একটু গড়িয়ে নেবার নাম করে সেই যে ঘরে ঢুকলেন, আর তাঁদের ঘরের বাইরে আনা গেল না। বিকেলবেলা মাচা বাঁধা শেষ করে বাংলোয় ফিরে দেখি, বাংলোর দরোয়ান ভীম সিং একতলার বারান্দায় জড়োসড়ো হয়ে বসে কাঁপছে। আমাদের দেখে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। হরি সিং জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যায়া হুয়া?’

ভীম সিং শুকনো গলায় বলল, ‘উপরমে জরুর কোই জানওয়ার ঘুসা। বহুত আওয়াজ আতা হ্যায়।'

আমাদের মুখ শুকিয়ে গেল। বলা যায় না, হঠাৎ কোনও দুষ্টু জানোয়ার হয়তো দোতলায় লাফিয়ে পড়ে আমার মামাদের ঘরে অতর্কিতে আক্রমণ করেছে। আমার বুক কেঁপে উঠল। হরি সিং দেড়ফুট লম্বা এক তলোয়ার নিয়ে আমাদের আগে আগে উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে। সিঁড়ির মাথায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর থেকে আসা শব্দটা সে বোঝবার চেষ্টা করছিল। আমি ঠিক হরি সিংয়ের পাশেই ছিলাম একটা বাঁশ-কাটা কাটারি হাতে নিয়ে।

আমার বুঝতে হরি সিংয়ের মতো দেরি হল না। আমি সরাসরি ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলাম। ঘরের মধ্যে চারটে খাটের তিনটিতে তিন মামা অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। আমি জানতাম, আমার মামারা ঘুমোলেই অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে, তিনজনের নাক থেকে বিচিত্র শব্দ বেরোয়। ডাকামামার শব্দটা শুনলে মনে হবে কোনও বড় সার্কাসের তাঁবুতে গ্লোবের মধ্যে মোটর সাইকেল চলছে। খাড়ামামার শব্দের দাপট এতই তীব্র যে, মনে হবে, একটা মালভর্তি বিশাল লরি জি. টি. রোডের সিগনালে দাঁড়িয়ে গজরাচ্ছে। সে তুলনায় চিন্তামামার ডাকটা অনেক নিরীহ। যেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসরে সওয়াল-জবাবের মতো। চিন্তামামা নিজেই শব্দ তুলছেন, ঘোঁ-ঘোঁ, আবার নিজেই উত্তর দিচ্ছেন, হোঁ-হোঁ। মামাদের এই শব্দব্রহ্মের সঙ্গে আমার আগেও পরিচয় ছিল। বড়মামিমা তো একবার শব্দদূষণের অভিযোগ এনে বড়মামার বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা রুজু করতে চেয়েছিলেন।

পরের দিন আমাদের তৈরি হয়ে থাকবার কথা ছিল। আমরা তৈরি হয়েই ছিলাম। বনবিভাগের জিপগাড়িতে চেপে খানিকটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে বাকিটা পায়ে হেঁটে মাচার সামনে পৌঁছলাম। বেশ চওড়া মাচা তৈরি হয়েছে। হরি সিংরা বসল অন্য মাচায়। তিন মামার পিছনে আমি। চিন্তামামা মাচায় উঠেই ফোলানো বালিশ বার করে ফুঁ দিতে লাগলেন। বড় ও মেজোও তাঁদের বালিশ ফুলিয়ে নিয়ে আয়েস করে বসলেন। আমাদের সামনে জঙ্গলে ভরা একটা পাহাড়। আর ঠিক মাচার তিন-চার হাত দূর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদী। হরি সিং বলেছে, হরিণ এবং বাঘ ওই নদীতেই জল খেতে আসবে। চিন্তামামা মাচায় উঠে আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। হঠাৎ বললেন, ‘বড়দা, তৃষ্ণার্ত বাঘ কিংবা হরিণকে কখন শ্যুট করা উচিত, জল খাওয়ার আগে না পরে?’

প্রশ্নটা ডাকামামা ও খাড়ামামা দু’জনের কাছেই খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। ভাবতেই যথারীতি খাড়ামামা কারও উদ্দেশে বলে উঠলেন, ‘স্টুপিড!’

ডাকামামাও মাচায় উঠে হঠাৎ আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কেউ ডাকল নাকি রে?’

এই জঙ্গলে আমাকে কে ডাকতে যাবে তা শুধু আমার মামাই জানেন। পিঠে বালিশ দিয়ে খাড়ামামা যখন একটু শরীর ঢিলে করে বসলেন, ঠিক তখন সামনের জঙ্গলে একটা খরখর আওয়াজ উঠল। ডাকামামার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। চিন্তামামা ফিসফিস করে বলে উঠলেন, ‘বড়দা, আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে।'

খাড়ামামা ‘বড়দা রে, এসে গেছে’ বলে মাচার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে লাফাতে লাগলেন। ডাকামামা বন্দুক তুলে ধরতে গিয়ে নিজেই মাচা থেকে পড়ে যাবার জোগাড়। পাশের মাচা থেকে হরি সিং চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ক্যায়া হুয়া, ক্যায়া হুয়া?’

আসলে খাড়ামামা বাঘ দেখতে পাবার উত্তেজনায় ফোলানো বালিশে এমন জোরে ঘুসি চালিয়েছিলেন যে, সেই চাপে বালিশের মুখের ছিপি খুলে গিয়ে হিস্ শব্দে হাওয়া বেরিয়ে গিয়েছিল। ওই শব্দেই খাড়ামামার মনে হয়েছে ময়াল সাপ মাচায় উঠে নিশ্বাস ফেলছে।

কাণ্ড দেখে হরি সিং তার সঙ্গীকে নিয়ে ওই রাত্রেই আমাদের মাচায় চলে এল। ওরা দু’জন যখন মাচায় উঠে এল, মাচা তখন মড়মড় শব্দে কাঁপছে। রাত্রিতে আর বিশেষ কোনও ঘটনা ঘটেনি। চিন্তামামা মাচার ওপর থেকে বার-দুই বমি করেছেন। জঙ্গলের অন্ধকার যখন ফরসা হতে শুরু করেছে, তখন খাড়ামামার নাকের ভেতর থেকে লরির গর্জন। হরি সিং মামাকে মৃদু মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে, আর কাতর কণ্ঠে বলছে, ‘বাবুসাব, শিকার ছুট যায়ে গা, বাবু সাব...’

মাচা থেকে নেমে এসে ভোরের আলোয় আমরা যখন হাঁটছি, তখন ডাকামামা হরি সিংকে বোঝাচ্ছেন, 'দেখো হরিভাই, হামলোগ সেন্ট পার্সেন্ট বৈষ্ণব হ্যায়। হিংসামে আমাদের বিন্দুমাত্র লালচ নেই। তাই শ্যুট করিনি। নইলে জঙ্গলে একজোড়া শের আমি দেখেছিলাম।'

বেচারি হরি সিং কী বুঝল কে জানে। আমরা বাংলোয় ফিরে আসতেই চিন্তামামা লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে নিজেদের ঘরের দিকে দৌড়লেন। বারান্দায় বসে বন্যপ্রাণীর উপকারিতা এবং শিকারের অর্থহীনতা বিষয়ে ডাকামামা প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে বক্তৃতা দিয়ে বেতের ইজিচেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়লেন।

ফেরবার সময় ডাকামামা বললেন, ‘শিকারে এসে খালি হাতে বাড়ি ফেরাটা ঠিক নয়। তোর মামিরা তো আমাদের এই ননভায়োলেন্স অ্যাটিচ্যুডটা বুঝতে পারবে না। কিছু একটা নিয়ে যাওয়া দরকার।'

অবশেষে অনেক আলোচনা এবং চিন্তামামার নিরন্তর চিন্তার শেষে ঠিক হল হরি সিংয়ের কথামতো চণ্ডুলার হাট থেকে পাখি কিনে নেওয়া হোক।

হাটে গিয়ে সমস্ত পাখিওলাকে প্রায় পাগল করে দিল আমার তিন মামা। নিতান্ত পেটের দায় না থাকলে ওরা নির্ঘাত খাঁচা ছেড়ে পালাত। মামাদের পছন্দমতো চণ্ডুলার হাটে যখন কোনও বিদেশি পাখিই পাওয়া গেল না, তখন ওঁরা তিনটি ময়না কিনলেন তিনজনের জন্যে। কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকামামা পাখিওলাকে বললেন, ‘আই ওয়ান্ট এ টকিং বার্ড। আই মিন ময়না।'

লোকটা খুব বেশি অবাক হল না। এরকম মহাপুরুষদের সঙ্গে এই পাখিওলার এই প্রথম সাক্ষাৎ নয়। দরদস্তুর করে একশো কুড়ি টাকা দিয়ে তিনটি প্রৌঢ় ময়না কেনা হল। পাখিওলা বলল, ‘এ সব বলতে পারে। বলো তো সিয়ারাম।'

ময়না যথারীতি বলে উঠল ‘সিয়ারাম’।’

ডাকামামা বললেন, ‘নো সিয়ারাম অ্যাণ্ড রাধাকৃষ্ণ বিজনেস। আমি ওকে অন্য জিনিস শেখাব। বলো তো—'

বলেই ডাকামামা ময়নার খাঁচার সামনে মুখ নিয়ে বলে উঠলেন, 'বলো তো, শেকসপিয়র। প্লিজ সে ইট, শেকসপিয়র।'

ময়না চোখ পিটপিট করে, কিন্তু কথা বলে না। পাখিওলারও কথা বন্ধ হয়ে গেছে। সে জীবনে কখনও শেকসপিয়রের নাম শোনেনি। সে মামাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, ‘একদিনেই কি হবে, একটু সময় লাগবে। শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে কয়েকটা দিন সময় দিন।'

ট্রেনের মধ্যে আমরা চারজন আর তিনটি খাঁচা-বন্দি ময়না। ডাকামামা তাকে বুলি শেখাচ্ছেন, ‘বলো, শেকসপিয়র, শেলি, বায়রন! বলো, ত্রুফো, গদার ফেলিনি।'

খাড়ামামা তাঁর ময়নাকে বুলি ফোটানোর মহড়া দিচ্ছেন, ‘বলো, ভবভূতি, বরাহমিহির, কালিদাস।’

বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন—সভার সব রত্নদের নাম বলছেন আর ময়না সেটা বলছে না দেখে পরক্ষণেই বলে উঠছেন ‘স্টুপিড!’

চিন্তামামা বোধহয় বুলি শেখাচ্ছেন না। খাঁচার কাছে দাঁড়িয়ে ময়নার দিকে তাকিয়ে তাকে চিন্তা করার শিক্ষা দিচ্ছেন। গোটা পথ এই করতে করতে স্টেশনে আসামাত্র আমি একটা অজুহাত দেখিয়ে নিজের বাড়ি কেটে পড়লাম। কেটে পড়ে বাঁচলাম আর কি! কিন্তু বাঁচা কি অত সহজ। দিনসাতেকের মধ্যেই স্বয়ং দিদিমা ডেকে পাঠালেন। আশি বছরের বৃদ্ধার সেই ডাক উপেক্ষা করার হিম্মত আমার নেই। আর এবার মামার বাড়িতে পা দিয়েই আমি চমকে গেলাম। মামাদের কারও সাড়াশব্দ নেই। দিদিমা ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘খুব তো শিকারে গিয়ে জঙ্গল থেকে তিনটে বুনো ময়না ধরে এনেছিস। এবার দ্যাখ, সেই ময়নার মুখে কেমন বুলি ফুটেছে।'

দিদিমা আমাকে নিয়ে দোতলায় বড়মামার ঘরের সামনে এলেন। ময়নাটা আশ্চর্য বুলি শিখেছে। লোক দেখলেই মোটা গলায় বলে, ‘ডাকল নাকি রে?’ বড়মামাকে দেখলে গলা আরও মোটা করে জিজ্ঞেস করে, “সিধু, ডাকল নাকি রে?’

মেজ়োমামা, অর্থাৎ খাড়ামামার ময়না ভবভূতি, বরাহমিহির কিছুই শেখেনি। তার একটাই বুলি, ‘স্টুপিড!’ খাড়ামামার শ্বশুর ও শাশুড়ি জামাইয়ের ময়নার বুলি শুনে গরমলুচি আর মোহনভোগ ফেলে রেখে সেই যে চলে গেছেন, আর মেয়ে-জামাইয়ের খোঁজ নেননি। চিন্তামামার ময়নার মুখে একটাও বুলি ফোটেনি। সে পেট পুরে খায়, দাঁড়ে বসে চোখ কুঁচকে ভাবে।

আপাতত আমার তিনমামি খুব খুশি। তিন বউ যা পারেননি, তিনটে বুনো ময়না তাই পেরেছে। ডাকামামা চুপ। খাড়ামামা মুখ ফসকে আর ‘স্টুপিড’ বলেন না। চিন্তামামা নাকি এখন চিন্তা না করে কীভাবে থাকা যায়, শুধু এই একটা বিষয়েই অনবরত চিন্তা করে চলেছেন।

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৩৯২

অধ্যায় ১ / ৩২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%