ব্ল্যাক হোল

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : ‘ব্ল্যাক হোল’ কি কালো গর্ত? মহাকাশে গর্ত থাকে?

মা : গর্তের মধ্যে জিনিস পড়লে যেমন হারিয়ে যায়—ব্ল্যাক হোল তেমনি সবকিছু নিজের মধ্যে টেনে নেয়—কিছুই আর বেরিয়ে আসে না—তাই তার নাম গর্ত।

প্রশ্ন : কী ভাবে টেনে নেয়?

মা : ফোর্স অভ গ্র্যাভিটেশন দিয়ে—বাংলায় অভিকর্ষণ শক্তি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই এ-ওকে টানছে।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোল তাহলে কি?

মা : আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হেঁয়ালি। অতিকায় নক্ষত্র যখন ভেঙেচুরে ধসে পড়ে, তখন যা পড়ে থাকে—তাই। এরই নাম ব্ল্যাক হোল বা অন্ধকূপ। সব বস্তুর কবরখানা।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোল বলছ কেন? অন্য রঙের নয় কেন?

মা : তারকার ধ্বংসাবশেষ এত জমাট বেঁধে যায় যে, অভিকর্ষণ শক্তি বেড়ে যায় অকল্পনীয়ভাবে—তখন তার মারাত্মক টান এড়িয়ে আলো পর্যন্ত পালাতে পারে না। আলোকে টেনে নিয়ে নিজেও অন্ধকার হয়ে থাকে। তাই তা কালো। আকাশের অন্য জ্যোতিষ্কদের মত চেকনাই তার নেই।

প্রশ্ন : এই টান কতখানি, মা?

মা : এক কেজি ওজনের তোর ওই ডিক্সনারিটা ব্ল্যাক হোলের বিশ ফুট দূরে আনলেই তার ওজন হবে মিলিয়ন টন। এক মিলিয়ন মানে দশ লক্ষ, তা তো জানিস?

প্রশ্ন : এই টান-কে কাজে লাগানো যায় না?

মা : তার আগে কাজে লাগাতে হবে উর্বর কল্পনাশক্তিকে। পাক খেয়ে খেয়ে বস্তুগুলো যখন ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ঢুকতে থাকে, তখন ব্ল্যাক হোলের বিপুল অভিকর্ষ ক্ষেত্র থেকে প্রচণ্ড গতিশক্তি অর্জন করে বস্তুরা। এই শক্তির কিছুটা তীব্র বিকিরণে রূপান্তরিত হয়। ব্ল্যাক হোলের বাইরে ঘাঁটি গেড়ে বসে হয়ত একদিন আমরা এই বিপুল শক্তিধারাকে কাজে লাগাতে পারি।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোলের উনুন বানাতে চাও?

মা : উনুনে কয়লা বা কাঠ পোড়ালে পুরো এনার্জি পাওয়া যায় না। নিউক্লিয়র রিঅ্যাকশনের ফলেও পুরোটা পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনও বস্তু ব্ল্যাক হোলের দিকে ঘুরপাক খেয়ে ছুটে গিয়ে, ভেতরে না ঢুকেও উগরে দেবে অনেক বেশি শক্তি। যে কোনও জিনিস থেকেই ব্ল্যাক হোল শক্তির যোগান দিয়ে যাবে—জুতো, বই, কাঠ—সব কিছু থেকেই। ব্ল্যাক হোল তাই ব্রহ্মাণ্ডের উনুন।

প্রশ্ন : কিন্তু ব্ল্যাক হোল তো কিছুই উগরে দেয় না?

মা : ব্ল্যাক হোলের অন্য একটা দিক নিশ্চয় আছে। অর্থাৎ পেছনদিক। শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটছে সেখানে।

প্রশ্ন : তার মানে?

মা : কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলেন, কোনও জিনিসই সত্যি-সত্যি হারিয়ে যায় না ব্ল্যাক হোলের মধ্যে। বেরিয়ে যাচ্ছে অন্য দিক দিয়ে—ব্রহ্মাণ্ডের অন্য এক জায়গায়।

প্রশ্ন : টুথপেস্টের মত?

মা : হ্যাঁ। বেরোনোর মুখে ছড়িয়ে পড়ছে, এনার্জির জন্য জ্বলে উঠছে—সাদা গর্ত হয়ে যাচ্ছে। যতখানি পজিটিভ গ্র্যাভিটির চাপে ভেতরে চেপেচুপে ঢুকছে, ঠিক ততখানি নেগেটিভ গ্র্যাভিটির চাপে প্রতিটি কণা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন : কালো গর্তর পেছনে সাদা গর্ত!

মা : হাসছিস? পণ্ডিতরাই তো সন্দেহ করছেন, মহাশূন্যের কোয়াসারগুলো এক-একটা সাদা গর্ত।

প্রশ্ন : কোয়াসার আবার কি?

মা : মহাশূন্যের দূরে দূরে শ-খানেক গ্যালাক্সির প্রভা নিয়ে যে বস্তুগুলো দীপ্যমান—তাদের নাম কোয়াসার। তারা যে কী, সেটাও একটা রহস্য।

প্রশ্ন : এবার আমার কল্পনা খাটাই। ব্ল্যাক হোলের মধ্যে দিয়ে বেড়ানো যায়?

মা : কার্ল সাগান অবশ্য তোর মতই কল্পনা করেছেন। ব্ল্যাক হোলের মধ্যে দিয়ে যে কোনও বস্তু বহু দূরে চলে যেতে পারে খুব অল্প সময়ের মধ্যে—সাধারণ ব্রহ্মাণ্ডের গতির সীমা পেরিয়ে যায়। একদিন হয়ত ব্ল্যাক হোলের মধ্যে মানুষ নিজেদের টিকিয়ে রাখার মন্ত্রগুপ্তি মুঠোয় এনে ফেলবে, হয়ত স্পেশ্যাল অভিকর্ষ-প্রতিরোধক মহাকাশপোত নির্মাণ করবে—এমন সব বৈজ্ঞানিক রীতিনীতি মেনে চলবে, আজ তা কল্পনাও করা যায় না। মানুষ এবং মালপত্র বহুদূরে চলে যাবে চক্ষের নিমেষে।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোলের মধ্য দিয়ে তাহলে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে টহল দেওয়া যাবে?

মা : অগুন্তি ব্ল্যাক হোল রয়েছে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে—এক-একটা গ্যাল্যাক্সিতে এক-এক বিলিয়ন—আন্দাজি হিসেবে। একটা থেকে আর একটার দূরত্ব চল্লিশ আলোকবর্ষ—এক আলোকবর্ষ মানে এক বছরে আলো যতটা পথ যায়। সাগান সাহেব বলেছেন, এক ব্ল্যাক হোল থেকে আর এক ব্ল্যাক হোলে টুকটাক লাফ মেরেই গোটা ব্রহ্মাণ্ডকে টহল মেরে একদিন কসমিক এম্পায়ার গড়ে তোলা যাবে। এ রকম সাম্রাজ্য এর মধ্যেই হয়ে রয়েছে কী না, তাই বা কে জানে!

প্রশ্ন : কল্পবিজ্ঞান পড়ছ বুঝি আজকাল?

মা : সবই তো সম্ভাবনার কথা। এমনও তো হতে পারে, ব্ল্যাক হোল বস্তুর গোরস্থান শুধু নয়—গোরস্থান এবং আঁতুরঘরও বটে। একদিকে মৃত্যু—আর এক দিকে নতুন জন্ম। তাই যদি হয়, তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের মৃত্যু হবে না কোনওদিনই।

প্রশ্ন: ব্ল্যাক হোলকে দেখা যায়?

মা : না। কিন্তু তার অস্তিত্বে সন্দেহ করা যায় না।

প্রশ্ন :কীভাবে?

মা : ব্ল্যাক হোলের কিনারায় বস্তুদের মৃত্যু-যন্ত্রণা থেকে ঠিকরে আসে এক্স-রে। তা থেকে আন্দাজ করা যায়। আর বোঝা যায় গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সের দৌলতে।

প্রশ্ন : গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স!

মা : গ্র্যাভিটির মূলে যে কণিকা, তার নাম গ্র্যাভিটন। ব্ল্যাক হোলের চারপাশে এই গ্র্যাভিটন দিয়ে তৈরি গ্র্যাভিটি আলোকে নিজের দিকে টেনে নেয়। লেন্সের মধ্যে দিয়ে আলো যেন একদিকে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। বৈজ্ঞানিকরা তখন বোঝেন, এই লেন্স আর আমাদের মাঝে রয়েছে একটা ব্ল্যাক হোল। আমাদের এই গ্যালাক্সির ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটা ব্ল্যাক হোল—এক্স-রে থেকে আঁচ করা গেছে। এখান থেকে তিরিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। সিগনাস তারকামণ্ডলীর এক জায়গায় এক্স-রে’র উৎস খুঁজতে গিয়ে জানা গেল সেখানে রয়েছে একটা ব্ল্যাক হোল। অনেক পণ্ডিত অবশ্য মানেন না। মিনি ব্ল্যাক হোলও আছে।

প্রশ্ন : মিনি ব্ল্যাক হোল!

মা : যে-বিস্ফোরণ থেকে এই ব্রহ্মাণ্ড গড়ে উঠেছে, সেই বিস্ফোরণের ভয়াবহ চাপেই হয়ত অজস্র মিনি ব্ল্যাক হোলও তৈরি হয়ে গেছে। এই গ্যালাক্সিতেই আছে শ-দুয়েক।

প্রশ্ন : যদি ধাক্কা লাগে পৃথিবীর সঙ্গে?

মা : পৃথিবী ফুঁড়ে বেড়িয়ে যাবে। এরকম নাকি ঘটেছিল ১৯০৮ সালের ৩০শে জুন। সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস্‌কা অঞ্চল ফুঁড়ে ঢুকে গিয়ে নর্থ আটলান্টিক দিয়ে বেরিয়ে গেছিল তুমুল জলস্তম্ভ বানিয়ে। অবশ্য তা কেউ দেখেনি। অদ্ভুত চিহ্ন রয়ে গেছে শুধু সাইবেরিয়ায়। সবই অবশ্য জল্পনাকল্পনা।

প্রশ্ন : পৃথিবী কি ব্ল্যাক হোল হতে পারে?

মা : মুঠোয় চেপে পৃথিবীকে যদি ০·৮৭ সেন্টিমিটার অর্থাৎ একটা বড় মুক্তোর সাইজে আনতে পারিস, তাহলে হবে।

প্রশ্ন : মিনি ব্ল্যাক হোলকে পোষ মানানো যায় না?

মা : গেলে পৃথিবী থেকে এনার্জির সমস্যা চলে যাবে। ধরা যাক, সৌরজগৎ দিয়ে যাচ্ছে একটা মিনি ব্ল্যাক হোল। তাকে টেনে এনে সূর্যর চারদিকে ঘুরপাক খাওয়ানোর ব্যবস্থা হল। তারপর তার মধ্যে হাইড্রোজেন গুলি ছুঁড়ে দিলেই তুমুল ধারায় উল্টো দিক দিয়ে বেরিয়ে আসবে হিলিয়াম। সহজতম এবং অতীব দক্ষ পারমাণবিক চুল্লি হয়ে যাবে মিনি ব্ল্যাক হোল। সেই এনার্জিকে স্টোর করে পৃথিবীতে পাঠালেই ল্যাঠা চুকে যাবে।

প্রশ্ন : সূর্য যদি ব্ল্যাক হোল হয়ে যায়?

মা : সোনালী সূর্যর এখনকার ব্যাস দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার। জাদুকাঠি বুলিয়ে তাকে দশ কিলোমিটার ব্যাসের সূর্য বানিয়ে দিলে বেচারা অদৃশ্য হয়ে যাবে। সমস্ত উপাদান নিয়েই এত ঘন হয়ে যাবে যে আলো আর বেরোবে না। সে থাকবে, কিন্তু তাকে আর দেখা যাবে না।

প্রশ্ন : সৌরজগতের কী হবে?

মা : কিস্সু না। পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে থেকে তখনও পৃথিবী চক্কর মারবে ব্ল্যাক হোল ঘিরে। তবে হ্যাঁ, নারকীয় অন্ধকারে ডুবে যাবে গোটা সৌরজগৎ।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোল কি স্থির গর্ত?

মা : না। কুমোরের চাকার মত ঘুরছে। অঙ্ক কষে দেখা গেছে, তিরিশটা সূর্যর সমান একটা অতিকায় তারকা যদি ব্ল্যাক হোল হয়ে যায়, তাহলে সে ঘুরবে সেকেণ্ডে পাঁচ হাজার বার!

প্রশ্ন : ঘুরন্ত লাটুর মত গোঁ-গোঁ করবে?

মা : মোটেই না। ব্ল্যাক হোল কথা বলে না—বোবা। বস্তু, আলো, রেডিও তরঙ্গ, ম্যাগনেটিক ফিল্ড—কিছুই তো বেরোতে পারছে না! আওয়াজ হবে কী করে? ব্ল্যাক হোল তাই শুধু অন্ধকূপ নয়—বোবা গহ্বর।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোল কি গোল?

মা : ঘুরছে বলে বাইরের দিকটা গ্রামোফোনের রেকর্ডের মত চ্যাপ্টা। টানের চোটে বহু জিনিস এখানেই এসে ঘুরতে থাকে—গর্তে আর পড়ে না।

প্রশ্ন : দুটো ব্ল্যাক হোল যদি একে অপরকে টেনে নেয়?

মা : ১+১=২ হবে না—হবে ৩! গ্রামোফোনের রেকর্ডের মত চাকতির পরিসর যাবে বেড়ে। এটাও ব্ল্যাক হোলের একটা হেঁয়ালি।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোল কি গরম না ঠাণ্ডা?

মা : সেখানেও রয়েছে প্রহেলিকা। ব্ল্যাক হোল যদি সূর্যর সাইজের হয়, তাহলে তা হবে হিমশীতল। আর যদি হয় একটা প্রোটন সাইজের—তাহলে তা হবে ভয়ানক গরম। মানে, বড় ব্ল্যাক হোলরা বরফ ঠাণ্ডা, ক্ষুদেরা তেতে আগুন। সিগনাস X-I-কে বলা হয় আকাশে বরফের বাক্স।

প্রশ্ন : ব্ল্যাক হোলরা কি অমর?

মা : না। হকিং সাহেবের নিয়ম অনুসারে ছোটদের আয়ু কম—ফেটে যায়। বড়রা প্রায় অনন্তকাল টিকে থাকে।

প্রশ্ন : গোটা ব্ৰহ্মাণ্ডটা কি ব্ল্যাক হোল হয়ে যেতে পারে?

মা : কিছু পণ্ডিত মনে করেন, ব্ৰহ্মাণ্ড জুড়ে রাশি রাশি ব্ল্যাক হোল যখন আবির্ভূত হবে—গায়ে গায়ে লেগে তারা আরও বড়, আরও ঠাণ্ডা হতে থাকবে। গোটা ব্রহ্মাণ্ড হয়ে যাবে একটা ব্ল্যাক হোল। আবার অনেকের মতে ব্ল্যাক হোল থাকলেই হোয়াইট হোল-ও আছে। এদিক দিয়ে যা ঢুকছে, ওদিক দিয়ে তা অণুপরমাণুতে ভেঙে গিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টি তাই চলছে। কিন্তু কীভাবে? নতুন সৃষ্টি হচ্ছে হোয়াইট হোলে—সেটা নিয়েই তো গালগল্প। একজন লেখক বলেছেন, স্বর্গ নাকি সেখানেই—জন্মান্তরও ঘটছে সেখানে। মৃত্যুর পর আত্মা নাকি অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে চলে যায় আলোর জগতে! হোয়াইট হোলে!

অধ্যায় ১ / ২৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%