প্রথম অধ্যায়

মনজিৎ গাইন

''সামনে সমুখ সমর, সামনে সমুখ সমর

খানসেনারা পালাবেই

রুখে দাঁড়াও ভাই সকল, রুখে দাঁড়াও ভাই সকল

জয়বাংলা গড়বই...''

—অ্যাই শিবু, সকাল থেকে গান নে বোস থাকলে হবে, বউটা পোয়াতি ওর দিকে একটু নজর দে।

মায়ের কথা শুনে শিবুর হুঁশ ফিরল। সকাল থেকেই এই গানটা ও শুরু করেছে। কাল রাত থেকেই ওর মনে গানের কথাগুলো ঘোরাফেরা করছিল, তাই সকাল হতেই ও বসে যায় এটা নিয়ে। সারা পূর্ববঙ্গ জুড়ে যেভাবে আন্দোলন শুরু হয়েছে, মনে হয় না খানসেনারা আর পাকিস্তানে বেশিদিন টিকতে পারবে।

এই তো গতকাল রাতেই জয়বাংলা রেডিওতে বলা হল— মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে আসছে, খানসেনারা ক্রমশ পিছোচ্ছে, জয়বাংলা হবেই।

—ওগো শুনছ, ঘরে একটু আসবে।

ঘর থেকে শিবুর বউ মালার গলা শোনা যায়। শিবু ধড়ফড় করে উঠে ঘরে যায়। মালা বলে— দেখো না, হরেন আর রমেন কোথায় গেল, সকাল থেকে ওদের পেটে কিচ্ছুটি পড়েনি।

শিবুর জিজ্ঞাসা—তোমার শরীর ভালো আছে তো?

—না।

—কেন, কী হল?

মালার কোনো উত্তর নেই। শিবু মালার কাছে গিয়ে পেটে একটু হাত বুলিয়ে দেয়—কী হল, উত্তর দাও না কেন?

—আমার এই অবস্থা, তুমি তো সকাল থেকে একবারও আমার খোঁজ নাওনি।

—ও, এবার বুঝেছি বউয়ের আমার অভিমান হয়েছে, কিন্তু কী করব বলো আজকে একটা পালাগান রয়েছে ফরিদপুর বাজারে, তারজন্যে তৈরি হচ্ছিলাম।

—তাই তুমি তৈরি হচ্ছিলে, তা নতুন গান কিছু বেঁধেছ?

—হ্যাঁ, একটা বেঁধেছি।

—কীসের গান?

—জয়বাংলার গান।

—তাই জয়বাংলার গান, আমায় একটু শোনাও।

শিবু মালার আরও কাছে চলে যায় তারপর গান শোনাতে লাগে। গান শুনতে শুনতে মালার সারা গায়ে যেন কাঁটা দেয়। মালা কোনো কথা বলতে পারে না।

—কী, চুপ করে আছ, গানটা ভালো হয়নি?

—না-না, খুব ভালো হয়েছে।

—আচ্ছা, বলো তো আমাদের এই সন্তান কি জয়বাংলায় হবে?

—হ্যাঁ গো হ্যাঁ, জয়বাংলাতেই আমাদের নতুন ছেলে হবে।

—কিন্তু খানসেনারা যে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর খুব অত্যাচার করছে।

—হ্যাঁ, সে একটু করছে কিন্তু জয়বাংলা রেডিওতে কাল রাতেই শুনলাম এই একাত্তরেই স্বাধীনতা আসবে।

—স্বাধীনতা এলে আবার দুই বাংলা এক হবে তো?

—এক না হয়ে যায় কোথায়!

এই বলে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে শিবু বেরিয়ে যায়। বাইরে গিয়ে শিবু হাঁক পাড়ে— অ্যাই হরেন-অ্যাই রমেন, তোরা কোথায় গেলি রে, সকালে কিছু খাসনি, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কিছু খেয়ে নে।

দূরে মাঠের থেকে বড়ো হরেনের গলা শোনা যায়— যাচ্ছি বাবা।

—তাড়াতাড়ি আয়, তোদের ঠাম্মার কাছে পান্তা রাখা আছে, সামনের ঝালের গাছ থেকে দুটো ঝাল পেড়ে আর দুটো পেঁয়াজ দে পান্তা খেয়ে নে, তোদের মা খুব চিন্তা করছে।

হরেন ছোটো রমেনকে তাড়া দেয়— বললাম আসিস নে আমার সঙ্গে তাও এলি, এখন মা কীরকম চিন্তা করছে বল তো, শিগগির বাড়ি চল।

রমেন টলোমলো পায়ে দাদার হাত ধরে ওদের বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়। বাড়ি অবশ্য বলতেই। এমনি ছোটো দুটো মাটির ঘর, ওপরে খড়ের ছাউনি। একটা ঘরে ঠাম্মার সঙ্গে বড়ো হরেন শোয়, আর একটা ঘরে শিবু, মালা আর ছোটো রমেন।

* * *

ওরা গরিব। শিবু লোকের বাড়িতে জন খাটে আর সন্ধের পরে পালাগান করে। তাতে যা পায় কোনোরকমে ওদের চলে। তবে অভাব থাকলেও সুখের অভাব নেই ওদের সংসারে। শিবু যখন পালাগান করে কোনো আসরে তখন হরেন অবাক হয়ে দেখে সব লোক কীভাবে হাঁ করে ওর বাবার গান শুনছে। ওর বাবাকে তখন ও নিজেই চিনতে পারে না। মনে হয় অন্য জগতের মানুষ। একবার বাজারের অনুষ্ঠানে বাবা রামায়ণের পালাগান শুরু করেছিল। জমাটি গলায় বাবা যখন গান ধরেছিল—

''রামের দুঃখে আঁখি ভরি যায় জলে

অযোধ্যাবাসী সবাই রামের কথা বলে

দশরথ দুঃখ করে বলে হায় হায়,

বুকের কলজে আমার বনে চলে যায়...''

তখন ফরিদপুর বাজারে যে কত চোখের জল পড়েছিল, তার কোনো শেষ নেই। সেই ফরিদপুর বাজারে আজকে আবার বাবা পালাগান করবে, নতুন গানও বেঁধেছে। সকালে ও যখন ভাইকে নিয়ে মাঠে যাচ্ছিল তখন বাবা গান ধরেছিল, সকালে শুনতেও বেশ লাগছিল।

হরেন দুটো ঝাল ছিঁড়ে নিয়ে ঠাম্মার কাছে গিয়ে বলে— ঠাম্মা, দাও পান্তা, খুব খিদে পেয়েছে।

ঠাম্মা পান্তা থালায় বাড়তে বাড়তে প্রশ্ন রাখে— তা সাতসকালে দুটোতে মিলে পেটে কিছু না দিয়ে কোথায় গিসলি?

—মাঠে গিসলাম।

—সাতসকালে মাঠে কী?

—ভাইকে একটা জিনিস দেখাতে নিয়ে গিসলাম।

—কী জিনিস?

—ধানের শিষের ডগায় শিশিরের ফোঁটা। তুমি বলো ঠাম্মা, সকালে না গেলে সেটা দেখা যায়, একটু রোদ উঠলে শিশিরের ফোঁটা কি আর থাকে?

ঠাম্মা ওদের কথা শুনতে শুনতে থালা এগিয়ে দেয়। দুই ভাইতে হাপুস-হাপুস আওয়াজ করে একেবারে চেটেপুটে খায়। খেতে খেতেই হরেন বলে— জানো ঠাম্মা, বাবা না নতুন গান বেঁধেছে, আজকে সাঁঝেরবেলা বাজারে গাইবে।

—হ্যাঁ, আমিও শুনছিলাম।

—কী গান গো ঠাম্মা?

—জয়বাংলার গান।

—বাঃ, তাহলে নিশ্চয়ই খুব ভালো হবে।

হরেন ছোটো ভাইকে নিয়ে মায়ের কাছে যায়। মা রান্নার তোড়জোড়ে ব্যস্ত।

—কী ব্যাপার, সকাল থেকে দেখা নেই, সারাক্ষণ থাকিস কোথায়?

—মাঠে ছিলাম।

—উফ, তোদের নিয়ে আর পারি না, তা তোরা পান্তা খেয়েছিস তো?

—হ্যাঁ, ঠাম্মা দিয়েছে। মা আমি কিন্তু বিকেলে বাবার সঙ্গে ফরিদপুর বাজারে যাব বাবার পালাগান শুনতে।

মালা আর না করতে পারে না। বাবার পালাগান শুনে কত লোক হাততালি দেবে আর তাই দেখে ছেলের বুক গর্বে ভরে উঠবে, সে কি আর ও আটকাতে পারে? তবুও মায়ের মন তো, ছেলেকে সাবধান করে দেয়— যাস, তবে সাবধানে থাকিস! অত লোকের মধ্যে যেন হারিয়ে যাস না, সোনামানিক আমার।

—তুমি কী যে বলো মা, আমি কি আর সেই ছোট্টটি আছি?

* * *

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর থেকেই শিবু সবকিছু গোছাতে লেগেছে। ও পালাগান গায় বিশেষ একটা পোশাক পরে, সেটা অনেকটা আলখাল্লার মতো, মাথায় একটা পাগড়িও বাঁধে। সবকিছু একটা পোটলাতে পোরে ও। হরেনের হাতে বাজনার কত্তাল আর হাতের ঝুমঝুমি, খোল আর পায়ের ঘুঙুর। ওর বাজনাদার মহাদেবের বাড়ি রাস্তার ওপরেই। মহাদেব আরও মরাগরিব। ও বাজনাদার, অথচ সব বাজনা শিবুরই কেনা। পালাগান করে যে যা দেয়, তার থেকে কিছু মহাদেবকে দিয়ে দেয়। মহাদেব তাতেই সন্তুষ্ট।

মহাদেবের বাড়ি এসে শিবুর হাঁক— মহাদেব-ও মহাদেব, তাড়াতাড়ি নে, এখনও যে অনেকটা পথ যেতে বাকি।

ভিতর থেকে মহাদেবের সাড়া— আসছি দাদা, আর একটুখানি।

খানিকক্ষণ পরে মহাদেব বেরিয়ে আসে। একটা ছাই রঙের ফতুয়া আর একটা নতুন ধুতি পরেছে ও। হাজার হোক শিবু বিশ্বাসের বাজনাদার ও। পোশাক-আশাক একটু ভালো না হলে চলে!

তিনজনে মিলে হাঁটছে। ফরিদপুর বাজার বেশ খানিকটা দূর আছে। যেতে যেতে মহাদেবের প্রশ্ন— দাদা, আজকের আসরে কী গাইবেন?

—একটা নতুন গান বেঁধেছি।

—তাই, নতুন গান! কীসের ওপর গান বেঁধেছেন, দাদা?

—জয়বাংলার ওপর।

—বাঃ, তাহলে লোকে খুব মন দিয়ে শুনবে, এখন চারিদিকে জয়বাংলার এক হাওয়া উঠেছে।

—মহাদেব, রেডিও শুনিস?

—হ্যাঁ, আমি প্রতিদিন সন্ধেবেলায় ও-পাড়ার বকুল মাস্টারের বাড়ি যাই রেডিও শুনতে।

—রেডিওতে জয়বাংলার খবর শুনিস?

—হ্যাঁ, আমরা সবাই জয়বাংলা রেডিওর খবরই শুনি। বকুল মাস্টার বলছিল ওপারের বসিরহাট থেকে নাকি ওই রেডিওর খবর পড়া হয়।

—হ্যাঁ রে, আমিও শুনেছি, আর যে খবর পড়ে তার কী জমাট গলা বলতো, কী একটা নাম যেন ওর, হ্যাঁ দেবদুলাল।

—সত্যি দাদা, শুনলে মনে হয় যেন কাঁটা দিচ্ছে।

ওরা যখন হাঁটতে হাঁটতে বাজারে পৌঁছোল তখনও বিকেলের সূর্যের আলো আশপাশের গাছপালাগুলোকে ছুঁয়ে রয়েছে। আর তার ফাঁক দিয়ে যতটুকু আলো ফরিদপুর বাজারের মাটি ছুঁচ্ছে সেটুকু যেন মাটিতে জাফরির আলপনা বুনছে।

ওদের দেখেই বাজারের লোকগুলো হইহই করে উঠল— ওই তো শিবু গায়ক এসে গিয়েছে।

সবাই মিলে ওদের ঘিরে ধরল। হাত-পা ধোয়ার জল দিল। খুব খাতির আজকে ওদের। আজকে তো শিবুর পালাগানের জন্যেই কাঠের তক্তা দিয়ে স্টেজ বানানো। আশেপাশের দশটা গাঁয়ের লোক আসবে ওর পালাগান শুনতে।

শিবু সবার সঙ্গে দু-একটা করে কথা বলে। অনেকেই জিজ্ঞাসা করছে— আজকে দাদা, কী গাইবে?

—সে এখন বললে আসরে আর মজা থাকে না।

এইরকম টুকটাক কথাবার্তা সবার মধ্যে চলছে। সন্ধে হতে না হতে একটা দুটো করে লোক ক্রমশ ভিড় জমাতে লাগল বাজারে। একটা হ্যাজাকে জোর পাম্প দিয়ে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। হ্যাজাকের আলোয় সন্ধের অন্ধকার একটু দূরে সরে গিয়েছে।

প্রথমে মহাদেব ওর কত্তাল বাজিয়ে শুরু করল। ওর কত্তাল বাজানোর মধ্যে ভিড়টা বেশ ঘন হয়ে উঠল। শিবু এসব ব্যাপার বুঝতে একেবারে ওস্তাদ। ঠিক কখন পালাগান শুরু করতে হবে এটা ওর হাতের তেলোর মতোই জানা। ও চোখের ইশারায় মহাদেবকে থামতে বলল। মহাদেব বেশ জোরে জোরে খোল বাজাতে লাগল। বাজারের ভিড় মহাদেবের এই খোল বাজানোয় বুঝতে পেরেছে এবারে পালাগান শুরু হবে। সবাই একটু নড়েচড়ে বসল।

শিবু কত্তাল হাতে নিয়ে একটু বাজিয়ে নিয়ে বলল— দাদারা-দিদিরা, মায়েরা-মাসিরা, কাকারা-জ্যাঠারা এতদিন আমার অনেক পালাগান শুনেছেন পৌরাণিক বিষয়ে। আজকে আমার পালাগান সামাজিক বিষয়ে, আমাদের সবার বিষয়ে। আমরা সবাই আজকে এই পালাগানের চরিত্র।

শিবুর এই ঘোষণায় সবারই বেশ অবাক হওয়ার পালা। এতদিন রামায়ণ, মহাভারত নাহলে অন্তত বেহুলা-লখিন্দরের পালাগান শুনতে তারা অভ্যস্ত, কিন্তু আজকে শিবু গোঁসাই বলে কী! এই অবাক করা পালাগান যে শুনতে হয় মন দিয়ে।

শিবু কত্তাল বাজিয়ে গান ধরে—

''সামনে সমুখ সমর, সামনে সমুখ সমর

এগিয়ে যেতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে

খানসেনাদের হারিয়ে

জয়বাংলা গড়তে হবে...''

শিবুর এই গান শুনে সারা ভিড় 'জয়বাংলা' বলে বারবার চ্যাঁচাল। সবাই অনেক পালাগান শুনেছে কিন্তু জয়বাংলার পালাগান শোনা এই প্রথম। শিবুর মনেও বেশ চিন্তা ছিল, জয়বাংলা দিয়ে গান বেঁধেছে, সেই গান মানুষ কীভাবে নেবে। কিন্তু মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা শিবুর ইতস্তততাকে ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলল। শিবুর গলা দিয়ে যে জয়বাংলার গান বেরোচ্ছে সেটা সে সকালে তো বাড়িতে রেওয়াজ করেনি, আপনা-আপনিই এই গানের ভাষা তার মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক গান করতে লাগল শিবু। একটার পর একটা! যখনই ও থামছে, লোকে হুড় দিচ্ছে— আর একটা হোক গোঁসাই, জয়বাংলার গান।

শিবুর ক্লান্তিহীন গলা জয়বাংলার গান গেয়ে যাচ্ছে। হরেনের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে, তবু ও চোখ টেনে জেগে থাকছে। আজকে বাবার জন্যে ওর খুব খুব গর্ব হচ্ছে। অনেকরাত পর্যন্ত চলল সেদিনের পালাগান।

গান শেষ হলে শিবুর পাওনা অনেক অনেক তারিফ। উপরি পাওনা ভালো পয়সাকড়ি। তবে বাজারের কাশেম ভাই বলল— গোঁসাই, আজকের গানগুলো আমাদের সবারই মনের মতো হয়েছে, তবে ভয় হয় তোমার জন্যে।

শিবু অবাক হল। ওর জন্যে ভয় হবার কী আছে। ও প্রশ্ন না করে পারল না— আমার জন্যে ভয় কেন কাশেমভাই, আমি তো শুধু পালাগান গেয়েছি।

—আরে, এতেই তো ভয়। খানসেনাদের কানে তোমার এই গানের কথা গেলে ওরা কি আর তোমায় ছাড়বে?

কাশেমের কথায় শিবুর মনে কু গায়। ও যে এই বিপদের কথা একেবারেই ভাবেনি। মনের আবেগে ও জয়বাংলার গান বেঁধেছে। আর আসরের তালি শুনে ও আরও মন খুলে গেয়েছে। তাহলে সেটাই কি শেষপর্যন্ত ওর কাল হয়ে দাঁড়াবে? সারা বাংলাতে তো আর রাজাকারদের অভাব নেই, এই আসরেও হয়তো কয়েকজন ছিল, ঠিক রাতে গিয়ে খানসেনাদের কাছে খবর পৌঁছে যাবে, তখন কী হবে?

* * *

শিবু আর মহাদেব মিলে তাড়াতাড়ি সবকিছু গুছিয়ে নিল। তারপর হাঁটা। তখন প্রায় শেষ রাত। চারিদিকে নিকশ কালো অন্ধকার। হাতে একটা ছোটো টেমি। দু-হাত দূরের জিনিসও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর শিবু আর মহাদেব দুজনের কাঁধেই দুটো বোঁচকা। শিবুর আবার উপরি পাওনা কাঁধে ছোটো ছেলে রমেন। সে আবার ঘুমিয়ে কাদা।

বেশ সাবধানেই এগোচ্ছে ওরা। কাশেমের কথায় শিবু বেশ ভয়ই পেয়েছে। দুটো ছোটো ছেলে আর পোয়াতি বউ নিয়ে খানসেনাদের ভয়ে কোথাও পালাতে হলে খুব সমস্যায় পড়তে হবে, তারপর বুড়ি মা আছে। মহাদেবই প্রথম কথা তুলল— দাদা, কাশেম ভাই যা বলল তাতে কিন্তু বেশ ভয় হয়।

—ওসব বেশি কান দিস না, আগে বাড়ি চল।

—না দাদা, এই জয়বাংলার গান তুমি না বাঁধলেই ভালো করতে।

একেতে মনে হাজারো চিন্তা রয়েছে, তার সঙ্গে মহাদেবের এই পাণ্ডিত্য ওকে অশান্ত করল। শিবুর উত্তর— তোকে বেশি জ্ঞান দিতে হবে না।

চুপচাপ ওরা হাঁটা লাগায়। বাড়িতে পৌঁছেই শিবু হাঁক পাড়ে— মালা ও মালা, দেখো দেখি আমরা কত জিনিস নে এসচি।

মালা এত রাতেও যেন এই ডাকের অপেক্ষাতেই নিশাচর পাখি। ও সাড়া দেয়— আসচি গো আসচি, এত রেতে আর গেরাম জাগাতে হবে না।

মালা এসে তাড়াতাড়ি রমেনকে শিবুর কাঁধ থেকে নামায়। শিবু যেন একটু স্বস্তির শ্বাস নেয়।

—ইস, দ্যাখো দিকিনি এইটুকু ছেলে, কী দরকার যাওয়ার!

—নাও, রাতদুপুরে আর কথা না বাড়িয়ে বোঁচকাটা নাও।

বোঁচকাটা ভর্তি চাল আর সবজিতে। সেটা তখন হরেনের হাতে। হরেন মায়ের হাতে বোঁচকা তুলে দেয়। বোঁচকাটা ছোটো হলেও বেশ ভার ওটাতে। ও ওর বাবার কাছ থেকে খুব একটা দূরে বোঁচকাটা নেয়নি কিন্তু এরমধ্যেই বেশ হাঁফিয়ে উঠেছে।

রাতে শোয়ার পরে মালাকে হরেন কাশেম ভাইয়ের সব কথা খুলে বলে। মালা শুনে আতঙ্কে জবুথবু। খানসেনাদের অত্যাচারের কথা পূর্ববঙ্গের সবার কাছেই শোনা। এইবার সেই খানসেনারা যদি ওদের ওপর হামলা করে, তাহলে এই পোয়াতি শরীর আর ছোটো ছোটো দুটো বাচ্চা নিয়ে পালাবে কোথায়? মালার চোখ কান্না ভেজা। ও শিবুকে নাড়ায়— এইবার খানসেনারা আসলে কী হবে বলো তো, পেটেরটা কি আর পেথেবির মুখ দেখতে পারবে?

—তুমি এত চিন্তা কোরো না, এই শরীর সারারাত জাগার ধকল নিতে পারবে না, তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও।

—বলছি, একটা কথা বলব?

—কী?

—তুমি ওই জয়বাংলার গান না গাইলেই পারতে।

—এটা তুমি ভুল বললে মালা, এখন যদি জয়বাংলার গান না গাই তাহলে কবে গাইব বলো তো?

—কিন্তু ওই গানের জ্বালাতেই তো আজকে এই বেপদ।

—তুমি ঘুমোও, কিস্যু হবে না।

মালা রমেনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু শিবুর সারারাত আর ঘুম আসে না। ভোরের পাখির ডাক ওর কানে বাজে। ও উশখুশ করে, এপাশ-ওপাশ করে। ওর মনে গভীর দুশ্চিন্তা।

আস্তে আস্তে পুবের আকাশ ফরসা হয়। শিবুর মন তবু ফরসা হয় না। চারপাশে যা শুনছে। এই তো খুলনাতে খানসেনারা নাকি কতজনকে গুলি করে মেরেছে। সবাই পালাচ্ছে খুলনা থেকে। যশোরেও অবস্থা খুব খারাপ। মেয়েদের ওপরে অত্যাচার তো চরম। মেয়ে ঘরে থাকলে দুশ্চিন্তা দ্বিগুণ।

ওর মাসির বাড়ি সাতক্ষীরায়। মাসির মেয়ে সীমার বয়স ওই পনেরো-ষোলো হবে। দেখতে শুনতে বেশ ভালোই। খানসেনাদের নজর পড়ল। একদিন রাতে বাড়িতে হানা ওদের। মাসি-মেসো অনেক পায়ে ধরল ওদের। ওরা শুনল তো না, উলটে মাসি আর মেসোকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে প্রচণ্ড মারধর দিল। সীমার আর কোনো খোঁজ কেউ পেল না। কেউ জানেও না সেই হতভাগী এখন বেঁচে আছে, না মরে বেঁচেছে। মেসো মেয়ের শোকে এখন পুরোপুরি পাগল। মেসো শুধু বলে— শিবু, আমার মেয়েডারে তুই খুঁজে এনে দে, ওরে যে আমি শ্বশুরবাড়ি পাঠাব। অ্যাই দ্যাখ, ওর বিয়ের জন্যে আমি কত গয়না করেছি। অ্যাই শিবু, কিছু বলছিস না কেন? শিবু আমার শিবু রে, শয়তানরা আমার মেয়েডারে নে গেল, ওরা কারো কথা শুনল না রে, কারো কথা!

মেসোর এই করুণ হাহাকার ওর মনে বাজে। খানসেনাদের একেবারে শকুনের চোখ। মালা পোয়াতি ও সব কী আর শুনবে, ও যে জয়বাংলার গান গেয়েছে। জয়বাংলার গান!

পরদিন সকালে মহাদেব ফরিদপুরে গিয়ে আর ফেরে না। পুরোপুরি বেপাত্তা। কোথায় গেল সে? এদিক ওদিক খোঁজ লাগানো চলছে। ফরিদপুরে কেউ বলতে পারছে না। শিবুর কাছে যখন খবর গেল, শিবুও চুপ করে থাকতে পারল না। ও নিজেও ছুটল ফরিদপুরের দিকে। ফরিদপুরে অনেককেই ও ভালো করে চেনে। সবাই বলল— দেখো শিবু, কালকে তুমি যে জয়বাংলার গান গেয়েছ, তার জন্যে মনে হয় এটা ঘটল।

—কিন্তু কারা ধরবে মহাদেবকে?

—কেন, খানসেনারা নাহলে ওদের চর রাজাকাররা। আর তুমিও এখানে একেবারেই নিরাপদ নও শিবু। পারলে এখনই ফরিদপুর ছেড়ে চলে যাও। তোমার ফরিদপুরে আসার খবর নিশ্চয়ই এতক্ষণে রাজাকারদের কানে চলে গিয়েছে।

শিবু বুঝতে পারে বিপদ একেবারে কাছেই। ও ফরিদপুর ছেড়ে বাড়ির দিকে এগোয়। মাঝে বিলের মাঠ পড়ে। জনমানবশূন্য ধূ-ধূ প্রান্তর। এখানে কাউকে মেরে পুঁতে ফেললেও কোনো খবর হবে না, কেউ জানবে না। মহাদেবকেও কি এখানে এরা মেরে পুঁতে ফেলেছে? খুব ভয় করে শিবুর। ও জোরে জোরে পা চালায়। বাড়ির সবার কথা ওর খুব মনে পড়ছে। ছোটো দুটো ছেলে, পোয়াতি মালা, বুড়ি মা।

হঠাৎ ও দেখতে পায় সামনে দুজন। হাতে লম্বা লাঠি। ও থমকে যায়। কে এরা, ডাকাত না রাজাকার? শিবু গলা চড়ায়— কে তোমরা, কী চাও?

—তোর গান শুনতে চাই, জয়বাংলার গান।

উত্তর শুনেই শিবুর কাছে এদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। ও দৌড় লাগায়। কিন্তু রাজাকাররাও দৌড়োচ্ছে, শিবু ওদের পায়ের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে খুব কাছে চলে এসেছে ওরা। ও বুঝতে পারে পিছন ফিরে এইভাবে দৌড়ে পালাতে গেলে ওদের লাঠির বাড়িতে মৃত্যু নিশ্চিত। শেষমুহূর্তে ও ঘুরে দাঁড়ায়, রুখে দাঁড়ায়। রাজাকার দুটোও প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি শিবু এইভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। আর ওদের এই বিভ্রান্তির সুযোগটা শিবু কাজে লাগায়। ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদের যেমন গায়ের জোর, শিবুরও তেমনি। লড়াই একেবারে সেয়ানে সেয়ানে। কেউ ছাড়ছে না। এখানে যে হারবে তার মৃত্যু কেউ আটকাতে পারবে না।

শিবু ওদের একজনের হাতের লাঠি কেড়ে নিয়েছে। তারপর সেই লাঠি দিয়ে রাজাকার দুটোকে বেধড়ক মার। রাজাকার দুটো শিবুর গায়ে প্রথমে খানকতক দিলেও এখন আর পারছে না। শিবুর গায়ে তখন বাঘের জোর। ওর গর্জন — তোদের এই মাঠেই আজকে মেরে পুঁতে ফেলব, তোরা মহাদেবকে মেরেছিস, সীমাকে খেয়েছিস তোদের এখানেই মেরে ফেলে রাখব, চিল-শকুনে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে।

তারপর পাগলের মতো লাঠি দিয়ে ওদের মারতে থাকে। ওদের রক্ত ফিনকি দিয়ে ছোটে। শিবু চিৎকার করে ওঠে— দ্যাখ মহাদেব, এরা তোকে মেরেছিল, আমি আজকে এদেরকেই মেরে ফেলেছি, জয় বাংলার জয়, জয় বাংলার জয়!

অধ্যায় ১ / ২৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%