ইন্দ্রাণী তুলি
ঘোমটায় মুখ ঢাকা শীর্ণকায় মহিলা, বছর পনেরোর এক মেয়ের হাত ধরে, কোলে নবজাত শিশু নিয়ে এসে দাঁড়ালো সোলানের সেন্ট পিটার্স গীর্জা ঘরের সামনে… সে শুনেছে, এখানে অবাঞ্ছিত শিশুদের আশ্রয় দেওয়া হয়। কোমল হৃদয়ের মাদার সেবাস্টিয়ান আছেন মাথার উপরে, মাতা মেরীর মতো।
অরফ্যানেজ-এর সদর দরজা পেরিয়ে, দুটো সিঁড়ি চড়ে দালানে পৌঁছতেই দেখা দিলো শূন্য বাস্কেট। শিশুকে সেখানে শুইয়ে দিয়ে, চোখের জল মুছে ফিরে দাঁড়ালো মহিলা।
যাত্রা শুরু হলো অজানার উদ্দেশ্যে।
ভোরবেলায় ঝাড়ু হাতে, দরজা খুলে বেরিয়েই মার্গারেটের চোখ পড়লো বাস্কেটে রাখা শিশুর দিকে।
এ তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, অবাক হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু তার মনোযোগ কাড়লো শিশুটার নিঃশব্দতা... চুপ করে শুয়ে আছে সে, কান্নাকাটির বালাই নেই। সাধারণত পরিত্যক্ত শিশুদের কান্নাতেই ঘুম ভাঙে মার্গারেটের।
শিশুটা যেন বুঝতে পেরেছে, তার কান্নার দাম দেওয়ার কেউ নেই এই কঠিন পৃথিবীতে।
এক্কেবারে ছোট্ট, দেবশিশু যেন… তুলে নিতে ভয় পাচ্ছিল মার্গারেট। বুকে আশ্রয় দেওয়ার সময়ে, এক টুকরো কাগজ ঝরে পড়ল… উর্মিল গৌতম।
ব্যাপ্টাইজেশনের পরে তার নাম হলো― উর্মিল ভেরোনিকা গৌতম।
রাতের আঁধারে কৌশল্যা গৌতম গিয়ে দাঁড়ালো এক মহিলা আশ্রমের দরজায়। সোলান ছেড়ে সিমলার দিকে যেতে, এই শীতের রাতে অনেক পথ হাঁটতে হয়েছে তাকে। সঙ্গের ছোটো মেয়েটার শরীর আর দিচ্ছিল না… সদ্য প্রসূতি সে। তার ঈগল মা তাকে আগলে আগলে নিয়ে গিয়ে সঁপে দিতে চাইছিল এক নিরাপদ আশ্রয়ে― তার নিজের বাবার কামনার আগুনে ঝলসে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে।
কিছুদিন ধরেই মাকে কিছু জানাবার জন্যে ব্যাকুল ছিল সোনম।
বড়ো শান্ত মেয়ে― বুক ফাটে, তবু মুখ ফোটে না… মনে পড়ে, বছরদুয়েক আগেই তার রজোদর্শনের ঘটনা। ভয়ঙ্কর ভয়ে ভীত মেয়েটা গোসলখানার এক কোণে বসে কাঁদছিল… মা গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে ভেঙে পড়েছিল সে।
“আমি মরে যাবো…”
“কেন রে, কী হয়েছে?”
মায়ের মন! বুঝে নিয়েছিল এক লহমাতেই। কন্যার পা বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের ধার মুছে দিয়ে, এক নারী হয়ে ওঠার আনন্দ সংবাদ দিয়ে খুশি করে তুলতে চেয়েছিল তাকে… মেয়েটার কান্না বন্ধ হয়নি।
তার ক'দিন পরেই ধূমকেতুর মতো এসে দাঁড়িয়েছিল সোনমের বাবা, রমেশ গৌতম… বছর বারো আগে উধাও হয়ে গিয়েছিল যে শিশুকন্যা সোনম আর স্ত্রী কৌশল্যাকে ভবিতব্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে।
পাহাড়ী রমনী! পাহাড়ের অসহ্য শীত-বর্ষা সামলিয়ে, জল পড়া, হাওয়া ঢোকা, ফুটো-ফাটা ঘরে সেই মেয়েকে বড়ো করে তুলেছিল পরম যত্নে... অক্লান্ত পরিশ্রমে, নিজে অভুক্ত থেকে। পাঠিয়েছিল পাশের অঙ্গনওয়াড়িতেও, একটু পড়াশোনা শিখুক!
“স্বভাব যায় না ম'লে, ইল্লত যায় না ধুলে” ― আবার শুরু হয়েছিল স্ত্রীয়ের ওপরে অকথ্য অত্যাচার, এবারে উপরি পাওনা ছিল কিশোরী মেয়েটা।
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে, বিছানায় পড়লেই সাধারণত বেহুঁশ হয়ে ঘুমোয় কৌশল্যা।
ক'দিন ধরে মনটা বড়ো উচাটন হয়ে আছে। কী যে হয়েছে সোনমের… সারাদিন কাঁদে। কৌশল্যা অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে, কিছুই বলে না সে।
ঘুম আসছিল না… মেয়েটাকে কি রোগে ধরলো? একবার ডাক্তারবাবুর কাছে নিয়ে যেতে হবে।
রমেশ বাড়ি আসার পর থেকে কোথায় কোথায় ঘুরতে থাকে… রাতেও শুতে আসে না বেশিরভাগ দিনই।
মেয়ের ঘর থেকে খুটখাট আওয়াজ আসাতে বিছানা ছাড়লো কৌশল্যা। মেয়েটার খুব ইঁদুরের ভয়। ঘর সারানো হয় না কতদিন, ইঁদুরের গর্তে ভরে আছে ঘর-দালান, মাটি তুলে তুলে একাকার করে তারা। সেই মাটি পরিষ্কার করা রোজকার কাজ।
ধীরপায়ে হেঁটে মেয়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
ভেজানো দরজা, হাত দিতেই ফাঁক হলো। অন্ধকার ঘরে পালঙ্কের ওপরে দুটো নিরাবরণ শরীর… চিনতে ভুল হলো না কৌশল্যার, ক্ষোভে-বিস্ময়ে-দুঃখে পাথর হয়ে গেল সে।
হুঁশ ফিরতেই কৃশকায় দেহে হাতির বল এসেছিল। বাগান থেকে গাছের মোটা ডাল ভেঙে এনে যথাশক্তি আঘাত করেছিল সে তার স্বামীর অনাবৃত শরীরে।
দু’জন-দু’জনকে জাপটে ধরে সারাটা রাত বসেই কাটিয়েছিল মা আর মেয়ে। মেয়ের কান্না বন্ধই হলো না, আর মা'র চোখ আগুন ঝরালো।
কিছুদিন পরেই কন্যার শরীরের পরিবর্তন নজরে এসেছিল কৌশল্যার। তার উপরে হওয়া অত্যাচারের সাক্ষী তো স্বয়ং তার মা!
নিজের কামনা চরিতার্থ করে আবার উধাও হয়ে গিয়েছিল কৌশল্যার স্বামী, সোনমের জন্মদাতা পিতা রমেশ।
কী করবে বুঝতে না পেরে সমব্যথী-সই নির্মাল্যর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলো কৌশল্যা। বারোগ গ্রামে তার পড়ে থাকা বাড়িতে মা কৌশল্যা আর তার সন্তানসম্ভবা মেয়ে সোনমকে পাঠিয়ে দিলো নির্মাল্য।
অপরিণত সোনমের শারীরিক অবস্থার জন্যে সেই বাচ্চা নষ্ট করা সম্ভব হয়নি… পনেরো বছর বয়েসে সে জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিল তার বাবার ধর্ষণের ফসল, এক অবাঞ্ছিত-অনাহুত কন্যা সন্তানকে।
সেন্ট পিটার্স গীর্জায় একদিনের সন্তানকে সঁপে দিয়ে, মেয়ের হাত ধরে সিমলার কাছে এক মহিলা আশ্রমে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কৌশল্যা, আশ্রয়ের খোঁজে।
রাতটুকুর মতো মাথার ওপরে ছাদ জুটেছিল… আশ্রমে আশ্রয় দিয়ে সুপার বলেছিলেন, “কাল বাস যাবে মানালি। তোমাদের নিয়ে যাবে… ওখানে একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে।”
মা আর মেয়ে এসে পৌঁছেছিল *হাডিম্বা মন্দিরের কাছে।
মন্দিরের পেছনে এক টুকরো জঙ্গল পার করলেই দেখা দেয় এক সারি চালাঘর… চেহারা হাডিম্বা মন্দিরের ধাঁচের… সেখানেই আশ্রয় পেয়েছিল তারা। ভীমের রাক্ষসী স্ত্রী হিড়িম্বার দরজা থেকে কাউকেই ফিরে যেতে হয় না খালি হাতে… হিমাচলে দেবী রূপে পূজিত তিনি, আর্তের মনস্কামনা পুরো করেন মা।
* ভীমের স্ত্রী হিড়িম্বা, হিমাচল প্রদেশে হাডিম্বা নামে পূজিত হন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন