জয়ন্ত দে

আমার এই কাহিনির শুরু অনেক আগে। কত আগে যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তবে বলব, যখন আমি একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, যে স্বপ্ন সবাই দেখে, ঠিক তখনই এই কাহিনির শুরু।
আমি অমিত্রসূদন দাশগুপ্ত, একজন নাট্যকর্মী। আমার একটা ছোট্ট নাটকের দল আছে। না, সরকারি গ্রান্ট পাই না। গ্রান্ট পেতে গেলে যা করতে হয়—আমার সেই এলেম নেই। নাট্যকর্মী—এটাই আমার প্রথম পরিচয়। অন্তত আমি তাই দিতে ভালোবাসি। আমার আরও একটি পরিচয় আছে, সেটা আমার জীবন নির্বাহের জন্য; বাংলা কথায় যাকে বলে পেট চালানোর জন্য প্রয়োজনীয়। আমি একটি খবরের কাগজে চাকরি করি। সেটা তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ না, খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজও নয়। আমি এডিটোরিয়াল ডিপার্টমেন্টের খুব সাধারণ একজন কর্মী।
আমি, আমার স্ত্রী ও একটি পুত্রসন্তান নিয়ে আমার সংসার। কিন্তু আমার স্ত্রী মনে করে সংসার আমার কাছে সেকেন্ডারি। আমার সবকিছুই ওই নাটকের দল। নাটকের স্ক্রিপ্ট, অভিনয়, রিহার্সাল, মঞ্চ, আলো...। আর আমার পুত্রসন্তানটি নয়, দলের ছেলেমেয়েরাই আমার অরিজিনাল সন্তানসন্ততি। বাড়িরটি জাস্ট বায়োলজিকাল। আমাদের সংসারে দুটি শিবির। মা ও ছেলের প্রধান শিবির। আমি দ্বিতীয়। বা বলতে পারেন আমি অনেকটাই এ-বাড়ির অতিথি।
এই যে আড়াইতলা বাড়িটি দেখছেন, এই বাড়ি আমার পৈতৃক। এই বাড়ির যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণ, সাজানো, পরিপাটি রাখা, এ সবই আমার স্ত্রী করে। তার কথায় এই বাড়িটি করে ওর স্বর্গত শ্বশুরমশাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছেন। নইলে আমাকে ভাড়াবাড়িতেই সারাজীবন কাটাতে হত। কেননা আমি সেভাবে টাকা জমাতে পারিনি। ব্যাঙ্কের খাতা প্রায় শূন্য। প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকেও বার দুয়েক টাকা তুলেছি নাটকের দলের ঋণ মেটাতে। তবে এখন আমাদের দলের অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। বলতে পারেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আমাদের বেশ ক’টা প্রডাকশন খুবই প্রশংসিত হয়েছে। বাদ দিন নাটক আর নাটকের দলের কথা। আপনি বরং তৈরি হন আরও বড় একটা নাটক দেখার জন্য।
রঙ্গমঞ্চ এই কলকাতা শহর। কুশীলব প্রাথমিক ভাবে মনে হবে সতেরোজন নাবালক। কিন্তু তা নয়। জেনে বা না-জেনে অভিনয় করব আমরা সবাই। এমনকী আপনিও।
এই কাহিনি আমার নয়, কিন্তু বলতে পারেন এই কাহিনির সঙ্গে আমি কোনও না কোনওভাবে জুড়ে গিয়েছি। আসলে এই কাহিনি একটি স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের মাঝে সরু ফিতের মতো পড়ে থাকা দুমড়ে যাওয়া দশ বারোটি দিনের। জানি না, হয়তো সেই দিনগুলো মুছতে মুছতে একটা গোটা জীবন লেগে যাবে।
আমার এই স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে আমি আপনাকে নিয়ে যাব। এই কাহিনির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আপনি যদি কান্নার শব্দ শোনেন, তাহলে ভাববেন আমি কাঁদছি।
এই কান্না কিন্তু আপনাকে আবিষ্কার করতে হবে। পুরুষমানুষের কান্না কেমন হয় আপনার যদি সে ধারণা থাকে, তবেই আপনি সেই কান্না শুনতে পাবেন। না-হলে শুধুই কিছু সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস শুনবেন।
এছাড়া আপনি কিছু কথা শুনতে পাবেন, এই যেমন ‘আমার কী প্রচণ্ড চুল উঠছে দেখো!’, কিংবা ‘আমার অসম্ভব গা জ্বালা করছে, সারা গা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে’। যে বলবে সে আমার স্ত্রী শকুন্তলা দাশগুপ্ত।
কান্না হল, কথা হল, বাকি থাকে বাজনা—। মিউজিক!
আপনি এবার সেই বাজনাও শুনতে পাবেন। আপাতভাবে গিটার। হ্যাঁ, আপনার গিটারই মনে হবে। একটু কান খাড়া করে শুনুন, আঠেরো বছর বয়েসের জীবনের সাহসী সুর বাজছে—‘আঠেরো বছর বয়স কী দুঃসহ/ স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/ আঠেরো বছর বয়েসেই অহরহ/ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি!’
যে বাজনাটা বাজছে তার সুরটা মনে হয় এমনই। ঠিক ভেবেছেন, যে বাজাচ্ছে সে আমার ছেলে আর্যনীল। আর্যনীল দাশগুপ্ত। ইলেভেন পেরিয়ে ক্লাস টুয়েলভ। এই তিনজনকে আপনারা চিনে রাখুন, আমি আমাদের পরিচয় এটুকুই দিলাম। খুব সাদামাটা। একদম আমপাবলিকের সঙ্গে মিশে থাকা। আসলে একটু পরেই আমার পরিচয় আর আমি দিতে পারব না। তখন আমাদের পরিচিত করাবার দায়িত্ব নেবে খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল, অসংখ্য মানুষের আঙুল আর অবশ্যই পুলিশ।
আসুন পুলিশকে দিয়েই আমাদের পরিচয় শুরু করা যাক। পুলিশ মানে থানা। পুলিশ মানে লালবাজার হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট। দুঁদে গোয়েন্দা। গোয়েন্দা দেখেই আপনার মনে হচ্ছে—এ নির্ঘাত গোয়েন্দা কাহিনি। তবে প্রথমেই বলে রাখি এটা কোনও গোয়েন্দা কাহিনি নয়। বরং আমাদের বাড়ির বারান্দার দিকে তাকান। দেখবেন, দেওয়াল জুড়ে অনেক অনেক মুখোশ। আর গ্রিল ঘেঁষে জলের উৎসাহে, রোদের উত্তেজনায় বাতাসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে গাছ। এই কাহিনি মুখোশ আর গাছের...।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন