পুতুল বাড়ি

মহুয়া মল্লিক

এক

দরজাটা খুলতেই ক্যাঁচ করে আওয়াজ হয়, সোহিনী ভয় পেয়ে সুদীপের জামার হাতাটা খামচে ধরে। সুদীপ বিরক্ত হয়ে তাকায়, তারপর মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে বলে ওঠে, ''ইলেক্ট্রিসিটি নেই নাকি?'' ''সব আছে সাহাব, মেনসুইচ বাড়িওয়ালার ঘরের ভিতর, ওটা অন করে দিলেই আলোয় ভেসে যাবে''। সোহিনী মনে মনে বিরক্ত হয়, এ কেমন ল্যাণ্ডলর্ড? কাল যখন সুদীপ বাড়ি দেখতে আসার কথা বলল, তখন তো বেশ খেজুরে আলাপ করে জেনে নিলেন কবে এই শহরে এসেছে? চেনাজানা কেউ আছে কিনা?

ক'জন মেম্বার কখন যে বেরিয়ে গিয়েছিল ওরা টের পায়নি। হুঁশ ফিরল লোকটি একটা চার্জার লাইট নিয়ে ফিরতে। ''বুঝলেন কিনা সাহাব, বাড়িওয়ালা খুব করিতকর্মা লোক, সব বন্দোবস্ত করে তবে নেমন্তন্ন খেতে গেছেন। নিন ভাবিজি ভালো করে দেখে নিন।''

কাঠের দোতলা বাড়ি। দুটি শোবার ঘর, একটি বসার ঘর, রান্নাঘর আর দুটি বড় বড় বারান্দা। স্নান আর টয়লেটের জন্য নীচে যেতে হবে। রানিং ওয়াটার নেই। কাজের লোক দিয়ে জল তুলে মজুত রাখতে হবে। তবু মন্দের ভালো। সোহিনী চুপ করে এই ব্যবস্থাই মেনে নিল, সুদীপ বলেই দিয়েছে এইসব পাহাড়ি এলাকায় এর থেকে বেশি আশা না করতে, এই পাওয়া যাচ্ছে তাই অনেক। সোহিনীর নাকে একটা চিমসে গন্ধ আসছিল, এ নিয়ে মুখ খুললেই সুদীপ বলবে, ''অনেকদিন ঘরবাড়ি বন্ধ থাকলে এমন হয়।'' ওদের ছেড়ে কাচের দরজা খুলে বাইরে দাঁড়াল সোহিনী। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিল। বুনো ফুলের মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে। চাঁদের আলোয় দূরের ছায়া ছায়া পাহাড় অজানা রহস্য মেখে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটা অপছন্দ করার মতো সত্যি নয়। আর বেশ কিছু ফার্নিচার আছে, ল্যাণ্ডলর্ড বলেই দিয়েছেন, সুদীপরা চাইলে এগুলো ব্যবহার করতেই পারে।

খুশিমনেই ওরা গেস্ট হাউসে ফিরে আসে। ল্যাণ্ডলর্ডের সঙ্গে বাকি কথা ফোনেই সেরে নেবে। খুব সম্ভবত সামনের রবিরার শিফট করে যাবে। গেস্ট হাউসে ফিরে দেখে পাখি ওর মাসির কাছে ঘুমিয়ে পড়েছে। সোহিনী মেয়ের কপালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করে বোনকে, ''জ্বরটা আর আসেনি দেখছি, ও খেয়েছে কিছু?'' তিস্তা পাখির গায়ে গরম চাদর জড়িয়ে দিতে দিতে বলে, ''না রে দিভাই, অনেক কষ্টে হাফ কাপ দুধ আর একটা বিস্কিট খাইয়েছি।'' সুদীপ ততক্ষণে ফ্রেস হয়ে নিয়েছে। কেয়ারটেকারকে রাতের খাবার দিতে বলে সোহিনীদের পাশে এসে বসে। ঘুমন্ত পাখিকে কয়েক পলক দেখে তারপর বলে, ''মেয়েটার এখানে এসেই শরীর খারাপ হল, কে জানে জায়গাটা ওর স্যুট করবে কি না!''

রাতের খাবার নিয়ে পবন সিং ঢুকতেই সবাই খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। রুটি, চিকেন কষা, ডাল ফ্রাই আর একটা করে শুকনো মিষ্টি। পবন সিং—এর বৌ রান্না করে চমৎকার। সোহিনী আর তিস্তা রোজই একটা করে রুটি বেশি খেয়ে ফেলে। তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যেই হাসাহাসি করে। খেতে বসে টুকটাক কথা হয়। বাড়ির প্রসঙ্গ উঠতেই সোহিনী চুপ করে যায়। সুদীপ, তিস্তাকে শোনাচ্ছিল কেমন বাড়ি, কেমন ভিউ পাচ্ছে এসব। তিস্তা উচ্ছ্বসিত, ''সামনেই এক্সাম নাহলে কয়েকটা দিন থেকে যেতাম।'' সোহিনী খেতে খেতে পাখিকে দেখছে। কে জানে কেন বাড়ির প্রসঙ্গ আসতেই তার অস্বস্তি হচ্ছিল! সুদীপকে সে বলব বলব করেও বলে উঠতে পারেনি যে ঘরগুলো যখন সে ঘুরে ঘুরে দেখছিল একটা চাপা কান্নার আওয়াজ পেয়েছিল। অনেকজন নিচু স্বরে কাঁদলে যেমন আওয়াজ হয়, অনেকটা সেইরকম। কে জানে তার কেন জানি ভালো লাগছে না! আর তাছাড়া ল্যান্ডলর্ড লোকটিও বড্ড অদ্ভুত, ফাইন্যাল কথা বলতে যাচ্ছে আর তিনি গায়েব। অনুষ্ঠানের কথা তো আগে থেকেই জানতেন। সোহিনীর মনে হচ্ছে, কিছু যেন রহস্য লুকিয়ে আছে তাই ল্যান্ডলর্ড মুখোমুখি হতে চাননি।

''দিভাই, খাচ্ছিস না কেন? তোর কি মন খারাপ?'' তিস্তার কথায় চমকে উঠে সোহিনী। ''নাহ, মন খারাপ ঠিক না, আসলে নতুন জায়গা তো। তুই চলে গেলে একা লাগবে। সুদীপ তো সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।''

সুদীপের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, হাসতে হাসতে সে বলে, ''আসলে তা না তিস্তা, তোর দিভাই কলকাতার ফুচকা মিস করবে।''

সোহিনী রিরক্ত হয়, সবসময় সুদীপের এই ফাজলামি সহ্য হয় না। খাওয়া অসম্পূর্ণ রেখেই সে উঠে পড়ে।

রাত্রে ঘুমের মধ্যে সোহিনী ঐ বাড়িটার স্বপ্ন দেখে। দিনের আলোয় বাড়িটা ভীষণ সুন্দর লাগছে। সোহিনী একটা গাছের নীচে টুলে বসে আছে। গাছটা গোলাপি ফুলে ছেয়ে আছে, এত ফুল যে পাতা দেখা যায় না। সোহিনীর চারপাশেও ফুলের আল্পনা। আর তাকে ঘিরে ছোট ছোট মেয়েরা গান করছে। সোহিনী কান পেতে গানের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করে, ভাষাটা অজানা তবে গানের সুরটা খুব করুণ, যেন আর্তি ঝরে পড়ছে। বাচ্চা মেয়েগুলোর বয়স দুই থেকে পাঁচ বছর। সোহিনী বাচ্চাদের ভিড়ে পাখিকে খোঁজে। পাখির তো এখানেই থাকার কথা, ঐটুকু মেয়েকে উপরে রেখে সোহিনীই বা কেন নীচে বসে থাকবে? হঠাৎ পাখির আওয়াজ পায়, ''মাম্মাম জল খাব।'' সোহিনী বাচ্চাদের ভিড়ে পাখিকে খোঁজে। প্রত্যেকের টুপি সরিয়ে মুখ দেখার চেষ্টা করে, নাহ এরা কেউ তার পাখি নয়। পাখির কণ্ঠস্বর আবার ভেসে আসে, ''মাম্মাম জল।''

তিস্তা ঠেলা দেয় সোহিনীকে, ''এই দিভাই এত ঘামছিস কেন? বিড়বিড় করে কি বলছিস? পাখি জল খতে চাইছে।''

ধড়ফড় করে উঠে বসে সোহিনী। এই তো পাখি, তার আর তিস্তার মাঝে শুয়ে। ছোঁ মেরে পাখিকে কোলে তুলে নেয়, তারপর তিস্তার এগিয়ে দেওয়া জলের বোতল খুলে মেয়েকে জল খাওয়ায়। বাকি রাতটুকু পাখিকে কোলে নিয়ে বসে থাকে। কাল সকালেই সুদীপকে বলে দেবে, ঐ বাড়িতে সে কিছুতেই যাবে না। তিস্তার সঙ্গে কলকাতায় ফিরে যাবে।

দুই

তিস্তা যে ক'দিন ছিল হাতে হাতে সব গুছিয়ে দিয়ে গেছে। যেটুকু বাকি ছিল কাজের মেয়েটিকে নিয়ে সোহিনী গুছিয়ে নিচ্ছে একটু একটু করে। মেঝেতে বসে খেলনা নিয়ে খেলছিল পাখি। নতুন বাড়িতে এসে ওর জ্বরটা সেরে গেছে। ঘন্যাঘ্যান করাটাও কমে গেছে। নিজের মতো খেলে তবে কাল্পনিকে সংলাপে মেতে থাকে। একদিন তো রান্না করতে করতে সোহিনী শুনতে পেল, পাখি বলছে, ''আমার ডলটা কেন নিচ্ছ? তোমারটা তো কত সুন্দর।'' সোহিনী পড়িমরি করে ছুটে এসেছিল, দরজাটা বোধহয় খোলা আছে। অচেনা কেউ ঢুকে পড়েছে, কিন্তু কেউ কোথাও নেই। পাখি একা একাই খেলছে। সোহিনী রান্নাঘরে ফিরে গিয়েছিল তবে খটকা একটা ছিলই। যেমন গতরাত্রেও সেই কান্নার আওয়াজটা পেয়েছে। কান খাড়া করে সোহিনী আওয়াজটা শুনছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ঘুমের মধ্যে পাখি কেঁদে উঠতে সমস্ত মনোযোগ ওর প্রতি চলে যায়। এর আগেও তিস্তা থাকাকালীন একবার শুনেছিল, ওকে বলতে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠেছিল, ''অ্যাই দিভাই, রাতদুপুরে ইয়ার্কি ভালো লাগছে না।'' তার মানে ও আওয়াজটা পায়নি। সকালে আবার প্রসঙ্গ তুলতেই তিস্তা বলেছিল, ''আমি ঝুমরির কাছে খবর নিয়েছি। ওটা একধরনের পাখির কান্না।''

এইসব ভাবতে ভাবতেই দ্রুত হাতে ঘরের কাজ করছিল। ঝুমরিকে আজ একটু সব্জি আনতে পাঠাবে। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে দোকানিরা তাজা সব্জির পশরা নিয়ে বসে। সেই সময় ভদ্রলোক উঠে আসেন, এর আগেও এসেছেন ল্যান্ডলর্ড, তবে প্রতিবারই সুদীপের সঙ্গে দরকারে। এই প্রথমবার সুদীপের অনুপস্থিতিতে। হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ, দরজার বাইরে থেকে সেটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ''তোমার আন্টি পাঠিয়েছে। নিজের হাতে বানিয়েছে। তোমরা খেলে খুশি হবে।'' সোহিনী ভদ্রতা করে চা খেয়ে যেতে বলে, ভদ্রলোক মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে নীচে চলে যান। ঝুমরিও ব্যাগ আর টাকা—পয়সা নিয়ে বেরিয়ে যায়। ওবেলায় কাজে আসার সময় নিয়ে আসবে জিনিসপত্র। এইসব এলাকায় ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে, ঝুমরিকে তাই তাড়াতাড়ি আসতে বলে সোহিনী।

ঝুমরি থাকতে থাকতেই স্নান সেরে নেয় সে, তাই এই সময়টা অখণ্ড অবসর। খাবার টেবিলের উপর রাখা খাবারের ব্যাগটার কথা মনে পড়তেই দৌড়ে যায় সে। তিনটে বড় বড় কৌটো। এক এক করে খুলে ফেলে কৌটোগুলো। একটায় পরোটা, একটায় শুকনো সব্জি, আরেকটায় পায়েস। প্লেটে একটু পায়েস নিয়ে খায় সোহিনী। চালের বদলে কোনও পাহাড়ি শস্যদানার তৈরি এই পায়েসের স্বাদ স্বর্গীয়। অনেকটাই খেয়ে ফেলে সোহিনী। ল্যান্ডলেডি প্রথম দিন কফি আর নিজের হতে বানানো কুকিজ পাঠিয়েছিলেন, সে স্বাদও অতুলনীয়। খেতে খেতেই সোহিনী ভাবছিল, ভদ্রমহিলা কেন যে সবার সামনে আসেন না! একটু আলাপী হলে সোহিনী এইসব রান্না শিখে নিতে পারত। মা বলে যে যত ভালো রান্না করতে পারে তার মন তত উদার। সোহিনীর বড্ড ইচ্ছা হয় ভদ্রমহিলার মুখোমুখি হতে। খেতে খেতেই ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসে ওর। টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুম ভাঙে কান্নার আওয়াজে। সেই কান্নাটা ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ধড়ফড় করে উঠে বসে সোহিনী। ফোন বাজছে, কলকাতা থেকে এক বন্ধুর ফোন। পাখি, পাখি কোথায়? এখানেই তো খেলছিল! সর্বনাশ দরজাটা তো খোলা। সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে আসে সোহিনী। ল্যান্ডলর্ডের হাতের মুঠোয় পাখির ছোট্ট হাত ধরা। কৃতজ্ঞতায় মাথা ঝোঁকায় সোহিনী। ল্যান্ডলর্ড বলেন, ''তোমার মেয়ে খুব স্মার্ট। নিজে নিজেই আমার মিসেসের সঙ্গে আলাপ করে এসেছে, আর এই গিফটাও পেয়ে গেছে।'' সোহিনী দেখে পাখির হাতে ধরা একটা ফাইবারের পুতুল। পুতুলের চোখ দুটো খুব অদ্ভুত, সবুজ আগুন ছিটকে বেরুচ্ছে যেন। তাড়াতাড়ি পাখিকে কোলে তুলে নিয়ে উপরে উঠে আসে সোহিনী। সেসময় পুতুলটা ওর শরীর স্পর্শ করে। পুতুলের গা এত গরম হতে পারে? এত গরম পুতুলটা পাখি ধরে আছে কেমন করে? ওর কচি হাত তো পুড়ে যাবার কথা! পাখির চোখমুখ কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওকে ম্লান করে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল সোহিনী।

ঝুমরি ফিরল একরাশ টাটকা সব্জি নিয়ে। অর্ধেক সব্জির নাম জানে না সোহিনী। ঝুমরিই ওর মতো করে রান্না করে দেয়, খেতে ভালোই লাগে। উপর থেকে দেখতে পায়, বাসন ধুতে ধুতে ঝুমরি উত্তেজিত হয়ে ল্যান্ডলর্ডের সঙ্গে কথা বলছে। ল্যান্ডলর্ডও মাথা নেড়ে নেড়ে কথা বলে যাচ্ছেন। ওদের ভাষা বুঝতে পারে না সোহিনী। বাসনের ঝুড়ি নিয়ে ফেরা মাত্রই সোহিনী জিজ্ঞেস করল কিছু হয়েছে কি না! ঝুমরি বলল, ''আবার একটা বাচ্চা মেয়ে হারিয়ে গেছে।''

''আবার মানে? প্রায় এমন হয় নাকি?''

''হ্যাঁ, তবে এবার অনেকদিন পরে হল।''

''থানায় জানায় না?''

''জানিয়েও লাভ নেই। আজ অবধি একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।''

''ওরা কি খাতে পড়ে গেছে? বা হিংস্র জন্তু টেনে নিয়ে গেছে?''

''না তেমন কিছু হলে চিহ্ন পাওয়া যেত। জানো ভাবী, মেয়েগুলো প্রতিবার কর্পূরের মতো উবে যায়। বাপ—মা'রা ক'দিন খুর কান্নাকাটি করে। তারপর সব ভুলে যায়। মেয়েটা যেমন ফর্সা ছিল তেমন ছিল সবুজ কাচের মতো চোখ।''

কথা বলতে বলতেই ঝুমরি চা বানিয়ে ফেলে। সোহিনীর কাপ এগিয়ে দিয়ে নিজের কাপ নিয়ে বসে। সোহিনীর এই পড়ন্ত বেলায় বড্ড মনখারাপ করে। আপনজনদের জন্য প্রাণটা হু হু করে ওঠে। চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ঝুমরি হঠাৎ বলে ফেলল, ''মুনিয়া রানিকে একটু নজরে রেখো, তোমার চোখ এড়িয়ে এদিক—ওদিক চলে যায় না যেন, সময়টা খুব খারাপ। সে আবার ফিরে এসেছে।''

''কে?''

''কে ফিরে এসেছে ঝুমরি?''

ঝুমরি চায়ের বাসন নিয়ে নীচে চলে যায়। একটু পরেই ফিরে আসে। এসেই বলে, ''মুনিয়া রানির জন্য যদি তাবিজ নিয়ে আসি, পরাবে?''

সোহিনী এ সমস্ত কুসংস্কার বিশ্বাস করে না আবার কারুর বিশ্বাসে আঘাত দিতেও পারে না, তাই চুপ করে থাকে। এসসময় জিজ্ঞেস করে, ''তোমার মৃত মেয়ের নামে আর পাখিকে ডেক না, এতদিন কিছু বলিনি, তোমার দাদাবাবুও ব্যাপারটা পছন্দ করেন না।''

''আমার মেয়ে তো মরে যায়নি ভাবী।''

''মানে? তুমিই তো বলেছিলে...''

''না, মুনিয়া হারিয়ে গেছে।'' দুই চোখ টলটল করে ওঠে ঝুমরির। কম বয়সি মা, কতই বা বয়স ওর? তার তিস্তার বয়সি বা তার থেকে একটু ছোট। ওর পিঠে হাত রাখে সোহিনী।

সেই রাত্রে ধুম জ্বরে গা পুড়ে যায় পাখির। সুদীপও খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। সোহিনীর যত রাগ গিয়ে পড়ে পুতুলটার উপর। ওটা এখুনি ফেলে দিতে হবে। মেয়েকে সুদীপের জিম্মায় রেখে, সোহিনী তন্নতন্ন করে পুতুলটা খোঁজে। কোথাও পায় না। আশ্চর্য! কোথায় গেল পুতুলটা? পাখি কি জানলা দিয়ে গলিয়ে নীচে ফেলে দিয়েছে? নাকি পুতুলটা উবে গেল এই মেয়েটার মতো? তারও চোখের মণির রং ছিল সবুজ, কথাটা মনে পড়তেই সোহিনী থরথর করে কেঁপে উঠল।

তিন

আজও নীচের তলা থেকে রান্নাবান্নার গন্ধ ভেসে আসছে। এই ক'মাসে এইরকম গন্ধ কদাচিৎ ভেসে এসেছে। অন্যদিন নীচের মানুষগুলো হয়তো সিদ্ধ ভাত খেয়ে কাটিয়ে দেয়। ল্যান্ডলর্ড কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, ''তোমাদের আন্টি একদম হাঁটাচলা করতে পারে না, শরীরও ভালো থাকে না তাই নিজের মতো থাকতেই পছন্দ করে। এককালে খুব সুন্দরী ছিল তো, তাই লোকজনের সামনে এখনকার শ্রীহীন রূপ নিয়ে আসা পছন্দ করে না, তবে লোকজন পছন্দ করে। যেদিন শরীরটা জেগে ওঠে, টুকটাক রান্নাবান্না করে। তোমাদের কথা ভেবে একটু বেশি বেশি বানিয়ে, আমার হাতে পাঠিয়ে দেয়।'' সোহিনী চুপ করে শুনছিল, একসময় বলে উঠেছিল, ''রূপ কি আর সারাজীবন এক থাকে? তবু আন্টিকে একটু বুঝিয়ে বারান্দায় বসিয়ে দেবেন, রোদ হাওয়া একটু তো গায়ে লাগা দরকার!'' ব্যাপারটা ল্যাণ্ডলর্ডের পছন্দ হয়নি, তড়িঘড়ি উঠে চলে গিয়েছিলেন।

আজ আবার রান্নার গন্ধ পেতেই সুদীপ ল্যাপটপে কাজ করতে করতে চোখ নাচিয়ে সোহিনীকে বলল, ''আজ আর কিছু না, সুস্বাদু, রকমারি পদ এল বলে।'' সোহিনী চোখ পাকায়, ''আচ্ছা লোভী তো তুমি।'' তার ভাত, ডিমের ঝোল, আর একটা ভাজা হয়েই গিয়েছিল, এমন সময় ল্যাণ্ডলর্ড এলেন এবং যথারীতি বেশ কয়েকটা খাবার ভরা কৌটো দিয়ে গেলেন। সোহিনী খুলে খুলে দেখছিল, ফ্রায়েড রাইস, চিকেন কষা, মিক্সড ভেজ, মাছের একটা ফ্রাই আর পায়েস। যতবারই খাবার এসেছে একটা জিনিস কিন্তু কমন, সেটা হল পায়েস। সোহিনী ভেবেছে আজ কৌটোগুলো ফেরত দেবার সময়ে জিজ্ঞেস করবে, আপনি বুঝি আন্টির হাতের পায়েস খেতে খুব ভালোবাসেন?

সুদীপের আজ ছুটির দিন। ভরপেট খেয়ে সবাই একটা জম্পেশ ঘুম দিল। ঝুমরি কাজ করতে এসে খবরটা দিল, আজকে আবার একটা ফুটফুটে মেয়ে আরেকটু নীচের দিকে যে বস্তিটা আছে সেখান থেকে হারিয়ে গেছে। সোহিনী একবার ঘুমন্ত সুদীপ আর পাখিকে দেখে নিয়ে শোবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর ঝুমরিকে ধরল, কয়েকটা কথা তার জানা দরকার।

—এই যে মেয়েটা হারিয়ে গেল, কখন জানা গেল সেটা?

—বাবা—মা তো কাজে বেরিয়ে যায়, তারা ফেরার পর দুপুরে ব্যাপারটা টের পেয়েছে শুনলাম।

—মেয়েটা কত বড়?

—বছর চার।

—মা—বাবা কাজে গেলে কার কাছে থাকত? নাকি একা রেখেই যেত?

—না গো ওর নানী দেখত। মেয়েটা যেকোনো ফাঁকে বেরিয়ে গিয়েছিল, আর বাঁকের মুখেই তো বড় রাস্তা। সবাই বলাবলি করছে কেউ মেয়েগুলোকে ধরে বাইরে চালান করে দিচ্ছে না তো?

ঝুমরির রান্নাঘর পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ঝাড়ু দিতে শুরু করল ও। সোহিনী অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল।

—এ বাড়ির মালকিনকে তুই দেখেছিস?

—হ্যাঁ তা দেখেছি, তবে বহুদিন আগে।

—শেষ কবে দেখেছিস?

মাথা চুলকায় ঝুমরি। তারপর অনেক ভেবে বলে মুনিয়া যখন জন্মায় সে বছরই শেষ দেখেছি। ওপরের বারান্দায় বসে থাকত, এক ঢাল ভিজে চুল ছড়িয়ে। খুব সুন্দরী ছিল। তবে আমাদের পাহাড় দেশের লোক ছিল না। গায়ের রঙ ছিল মিশমিশে কালো, তবু এত সুন্দর দেখতে যে কী বলব ভাবী! তবে...

—তবে কী?

—চোখের দিকে তাকালে বুক কেঁপে যেত। আর একটা জিনিস দেখতাম, কোলে এক—একদিন এক—একটা পুতুল থাকত। বাড়িতে বাচ্চা ছিল না আর ঐ বয়সের মানুষের পুতুলের শখ দেখে সবাই হাসাহাসি করত খুব। কেউ কেউ তো বাড়িটার নাম দিয়েছিল ''পুতুলবাড়ি।''

—আর দেখিস নি?

—নাহ, খুব অসুস্থ তো, আর বাইরে আসে না।

—ডাক্তার আসতে দেখেছিস তোরা কেউ?

—ডাক্তার কেন আসবে বৌদি?

—এই যে উনি এত অসুস্থ।

—সে তো শহর থেকে দাদু ওষুধ নিয়ে আসে শুনেছি।

—আচ্ছা তুই যা।

সন্ধেবেলায় চা খেয়ে সুদীপ মেয়েকে নিয়ে একটু হাঁটতে গেল। সোহিনীর রোজ রোজ এভাবে ফাঁকা টিফিন কৌটো ফেরত দিতে খুব খারাপ লাগে। একটা কেকের প্যাকেট নিয়ে সে টিফিন কৌটোগুলো ফেরত দিতে গেল। অনেকক্ষণ বেল বাজাবার পর দরজা খুললেন ল্যাণ্ডলর্ড। সোহিনীকে এই অসময়ে দেখে খুব একটা খুশি হলেন না। দরজার একটা পাল্লা খুলে এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন যাতে ঘরের ভিতরের কিছু দেখা না যায়। সোহিনী মরিয়া হয়ে পায়েসের কথাটা জিজ্ঞেস করায়, ভদ্রলোক খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলেন, ''আমার সুগার আমি ওসব পছন্দ করিনা, ওর মন রাখতে খাই, আর ও বলে আজ আমার জন্মদিন, একটু পায়েস না বানালে হয়? আসলে অসুস্থ হবার পর ওর মাথাটা আর কাজ করে না, যেদিন উঠে বসে সেদিনটাই নিজের জন্মদিনের মতো সেলিব্রেট করে।'' সোহিনী হঠাৎ বলে বসে, ''একটু খাবার জল দেবেন? চাবিটা আসলে সুদীপ নিয়ে বেরিয়েছে।'' মিথ্যা বলা অভ্যাস নেই, নিজের গলাটাই তাই নিজের কাছে কেমন অবিশ্বাস লাগে! ভদ্রলোকের চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে, ওখানেই সোহিনীকে দাঁড়াতে বলে জল আনতে চলে যান। অবশ্য বেশি দূর যেতে হয় না, সামনেই ফ্রিজ। ভদ্রলোক এদিকে পিছন হয়ে জলের বোতল বার করছেন যখন, তখন সোহিনী খুব দ্রুত মাথাটা গলিয়ে দেখে নেয় ঘরের ভিতরটা। একটা বিবর্ণ সোফা, রঙচটা কাঠের সেন্টার টেবিল আর একটা শোকেশ, তাতে থরে থরে নানান রকমের পুতুল সাজানো। ঠিক তখনই চোখে পড়ল এক কোণে একটা বেতের মোড়ার উপর একটা পুতুল বসানো, পুতুলে এমন বিষণ্ণ মুখ সোহিনী আগে কোনোদিন দেখেনি। লম্বা একটা বিনুনি করা, বিনুনির ডগায় নীল রিবন বাঁধা, আর লাল একটা ফ্রক পরানো। পুতুলটা দেখে সোহিনীর গা শিরশির করে উঠল।

''এই নাও জল।''

সোহিনী চমকে জলের বোতলটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে ক ঢোঁক জল খেয়েই সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তারপর চাবির ব্যাপারটা মনে পড়ে যেতেই হনহন করে রাস্তার দিকে হাঁটা দিল।

পরের দিন সকালে ঝুমরি এসে খবর দিল, ''কাল যে মেয়েটা হারিয়ে গেছে তার মাথায় প্রচুর চুল ছিল, ওর নানী সবসময় একটা বিনুনি বেঁধে রিবন বেঁধে দিত, কালও তেমন বিনুনি বেঁধে নীল একটা রিবন বেঁধে দিয়েছিল। আজ সকালে কাটা বিনুনিটা পাওয়া গেছে, রিবনটা দেখেই সবাই চিনতে পেরেছে। মেয়েটা আর বেঁচে নেই গো ভাবী।''

সোহিনী আর একটু হলেই মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল, কোনোরকমে দেওয়াল ধরে টাল সামলাল আর সেই মুহূর্তেই ঠিক করে নিল, পুজোয় কলকাতা গিয়ে সে আর পাখিকে নিয়ে কিছুতেই এখানে ফিরবে না। এখনই সুদীপকে এ নিয়ে কিছু বলবে না, বরং পাখিকে এই কদিন ভীষণ চোখেচোখে রাখতে হবে।

চার

বিকেলবেলায় মেয়েকে নিয়ে সোহিনী একটু বাগানে হাঁটছিল, সেই মুহূর্তেই ল্যাণ্ডলর্ড শহর থেকে ফিরলেন প্রচুর বাজার করে। শাকসব্জী, মাংস, মাছ, দুধ, ড্রাই ফ্রুটস আর মশলার ছোট ছোট প্যাকেটগুলো বড় বড় শপিং ব্যাগ থেকে উঁকি মারছিল। এসব দেখেই সোহিনীর বুক কেঁপে উঠল। ভদ্রলোক সোহিনীকে দেখে এক মুখ হাসি নিয়ে এগিয়ে আসতেই, সোহিনী মেয়েকে কোলের কাছে শক্ত করে টেন ধরল।

''তোমার আন্টির শরীর আজ একটু ভালো, কাল মনে হয় উঠে বসতে পারবে, ওর আব্দারেই একটু বাজার করে নিয়ে এলাম।'' সোহিনী একটু হাসার চেষ্টা করল। আর ক'দিন পরেই মহালয়া, তারপরেই তারা কলকাতা রওয়ানা দেবে, গোছগাছ মোটামুটি হয়েই গেছে। সুদীপকেও কনভিন্স করে ফেলেছে, মেয়ের ঠাণ্ডা লাগার ধাত, শীতটা কাটিয়ে পরে ফিরবে। মনটা তাই বেশ ফুরফুরে ছিল, কিন্তু এইসব আয়োজন দেখেই তার শরীর খারাপ লাগতে শুরু করল। পাখিকে নিয়ে উপরে এসে সুদীপের প্রতীক্ষায় বসে রইল। রাত থেকে তার প্রচণ্ড জ্বর এল। পরের দিন সকালে সুদীপই, ঝুমরির সাহায্য নিয়ে খাবার বানাল। আজ তাকে অফিস যেতেই হবে, জরুরি একটা কাজ আছে। ঝুমরি জানাল, অন্য বাড়ির কাজ সেরেই চলে আসবে। সুদীপ বেরিয়ে যেতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে রইল সোহিনী। ঐটুকু মেয়ের কি আর ওভাবে আটকে থাকতে ভালো লাগে! গল্প বলে ওকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করল। একসময় সোহিনীর চোখ লেগে গেল। ঝুমরির আওয়াজে চোখ খুলে হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকে। প্রথমে তো বুঝতেই পারে না, সে কী বলছে!

''ভাবী, মেয়েটা কোথায় গো? ইস একটু আমার আসা পর্যন্ত সামলে রাখতে পারলে না? দেখছ এখানে কীসব কাণ্ড ঘটছে।''

''বাগানে দেখ শিগগির।''

''সে কি আমি দেখিনি ভেবেছ? কোথাও না পেয়েই তো তোমায় জাগালাম।''

''জাগালাম'' মানে জেগে ওঠা। কথাটা শুনেই তড়াক করে উঠে দাঁড়ায় সোহিনী। ঝুমরিকে বলে, ''এখুনি তোর দাদাবাবুকে ফোন কর।'' তারপর তরতর করে নীচে নামতে শুরু করে। ল্যাণ্ডলর্ডের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতেই থাকে পাগলের মতো। ভিতর থেকে পায়েসের গন্ধ ভেসে আসে। একসময় দরজা খুলে যায়, পাল্লা দুটো আটকে দাঁড়িয়ে থাকেন ল্যাণ্ডলর্ড। সোহিনী ভদ্রলোককে দেখে চমকে যায়, লাল একটা সিল্কের কাপড় ধুতির মতো করে পরা, কপালে লম্বা সিঁদুরের টিকা, চোখ দুটো লাল টকটকে। সোহিনীকে দেখে হিসহিস করে ওঠেন, ''কেন এসেছিস তুই?''

শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গেছেন ভদ্রলোক, তাই তাকে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে আসতে সুবিধা হয় সোহিনীর। আর সে ঢোকা মাত্রই দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়। ভদ্রলোককে বেশ নিশ্চিন্ত মনে হয়। তিনি ঝুমরির এসময়ের আসার কথা জানেন না।

সোহিনীর দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসেন। সোহিনী এসব পরোয়া না করে পাখিকে তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে, চোখে পড়ে সেদিনে সেই নীল রিবন বাঁধা পুতুলটা অর্ধেক কাটা বিনুনি নিয়ে শো কেশের একদম উপরের তাকে জায়গা পেয়েছে। চোখে পড়ে রান্না ঘরে মাছ, মাংস আর সব্জী কেটে ধুয়ে রাখা। ওভেনে পায়েস ফুটছে। কিন্তু মালকিনের বা পাখির দেখা নেই।

সোহিনী পাগলের মতো ভিতরের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই লোকটা এসে পথ আটকায়। ''শয়তানী এক পা এগেলে তুই শেষ হয়ে যাবি।''

সোহিনী অবাক হয়ে দেখে, ভদ্রলোক মেয়েলি গলায় কথা বলছেন। নিজেকে সামলে নিয়েই সে ভিতরের ঘরে ঢুকে পড়ে। একটা রকিংচেয়ারের উপর একটা কঙ্কাল বসে আর তার গায়ে দামি একটা শাড়ি জড়ানো। সোহিনীর পায়ের ধাক্কায় চেয়ারটা দুলে ওঠে, সে সভয়ে দু পা পিছিয়ে আসতেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। তখনই চোখে পড়ে চেয়ারের ঠিক উপরের ছবির দিকে, এক মধ্যবয়সি মহিলার ছবি। অপূর্ব মুখশ্রী আর এক ঢাল চুল, তবে চোখ দুটো দেখলেই গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। হঠাৎ সেই চোখ হেসে উঠল যেন! রকিংচেয়ারের দুলুনিটাও বেড়ে গেল, আর সেই সঙ্গে মেয়েলি গলার হিসহিসানি, ''আজ আমার জন্মদিন, আজ আমার জন্মদিন, অন্যের আয়ু নিয়ে আজ আমার জেগে ওঠার দিন, তাই তো পায়েস রাঁধা হচ্ছে, পায়েস খাবি না তুই?'' কঙ্কালের হাত দুটো প্রসারিত হয়ে সোহিনীর গলা চেপে ধরে, মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে পড়তে সোহিনী শুনতে পায় একটা গাড়ি থামার আওয়াজ আর তারপর দরজায় একসঙ্গে অনেকের করাঘাত।

জ্ঞান ফিরলে দেখে ঝুমরির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে, পাখি সুদীপের কোলে বসে মাকে দেখছে চুপটি করে। চেনাজানা আরও কয়েকজনকে চোখে পড়ল। সুদীপ বলল, ''এইরকম একটা ভূতুড়ে পরিবেশ আর ভয়ঙ্কর খুনির সঙ্গে তোমাদের দিনের পর দিন রেখে বেরিয়ে গেছি, ভাবলেই হাত—পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।''

পুলিশ অফিসারটি বললেন, ''আপনি ঠিক আছেন তো ম্যাডাম?'' লোকটাকে এ্যারেস্ট করেছি, সে জেরার মুখে স্বীকার করেছে এইভাবে কচি প্রাণের বিনিময়ে সে তার মৃত স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনত। তন্ত্র সাধনাও বিয়ের আগে থেকেই গোপনে করত আর সেইভাবেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ। এবার আপনি বলুন আপনার সন্দেহ হয় কীভাবে?''

সোহিনী প্রথম থেকে সব খুলে বলে। সবাই শুনতে শুনতে শিউরে ওঠে। সোহিনী বলে, মুনিয়ার কথা, সবুজ চোখের মেয়েটির কথা আর লম্বা বিনুনির মেয়েটির কথা শুনেছিলাম, হুবহু ঐরকম পুতুলগুলো দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল। ভাগ্যিস সন্দেহ হয়েছিল, নাহলে তো আর নীচের তলায় গোলাপি ফ্রক, ফুলো গাল আর কোঁকড়ানো চুলের একটা নতুন পুতুলের আবির্ভাব হত। সোহিনী এবার জিজ্ঞেস করে, পাখিকে কোথায় পেলে?

ঝুমরি উত্তর দেয়, ''কোথায় আবার? একটা প্যাকিং বক্সের মধ্যে মেয়েটাকে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে পুরনো খবরের কাগজ চাপা দিয়ে রেখেছিল শয়তানটা। তুমি যেভাবে ছুটে গেলে, আমি জানতাম মায়ের মন তো ঠিক টের পেয়েছে, তাই তন্নতন্ন করে খুঁজতেই পেয়ে গেলাম। মেয়ের হাত—পা অসম্ভব গরম ছিল।''

সোহিনী অন্য কথা ভাবছিল, এই লোককে কি এ্যারেস্ট করে রাখা যাবে? ঠিক তখনই ডিউটি অফিসারের একটা ফোন আসে, টুকটাক কথা সেরে তিনি জানান, ''হি ইজ নো মোর। লকআপের মধ্যেই ওর মৃত্যু হয়েছে, গলায় দশ আঙুলের ছাপ, অথচ লকআপে আর কেউ ছিল না।''

গাড়ি এসে গিয়েছিল, এই বাড়ি আর নিরাপদ নয়, সুদীপরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে গেস্ট হাউসের দিকে রওয়ানা হল। অন্ধকার মেখে বাড়িটা দাঁড়িয়ে রইল নতুন পুতুলের অপেক্ষায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%