মহুয়া মল্লিক
নদীর একদম গা ঘেঁষে পোড়ামাটির মন্দিরটা দাঁড়িয়ে আছে৷ অবস্থা খুব সঙ্গিন৷ ডান পাশটা নদীগর্ভে কিছুটা ঝুঁকে আছে৷ ফুটিফাটা গাত্রে এখানে ওখানে বটের চারা৷ কয়েকটা তো রীতিমতো মহীরূহের রূপ নিয়েছে৷ বোঝাই যায় মন্দিরে দেবমূর্তি নেই৷ এককালে পূজাপাঠ হত এখন শুধুই স্মৃতি৷ তবু যেন একরাশ রহস্য মেখে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটা৷ জরাজীর্ণ দশা কিন্তু আকর্ষণ একটুও কমেনি৷ এক পাশে ছলাৎ ছলাৎ করে নদী বয়ে যাচ্ছে৷
নবমিতা তন্ময় হয়ে মন্দিরটা দেখেই যাচ্ছিল৷ নিসর্গ চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়াতে নবমিতার ঘোর ভাঙল৷ ‘‘যাহ প্লাস্টিক কাপ? বললাম মাটির ভাঁড়ে চা খাব....৷’’ ‘‘আরে না পেলে’’? চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে নিসর্গ ঘড়ি দেখে, ‘‘কখন যে পৌঁছতে পারবে কে জানে? আজ আর কাজকর্ম কিছু হবে না৷’’ নবমিতা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, নিসর্গ এমন করছে যেন ভীষণ কাজ পাগল ছেলে সে৷ ওর সঙ্গে আগেও দু-একবার অডিট করতে গিয়ে দেখেছে ঢিমে তালে কাজ করে৷ দুদিনের কাজ পাক্কা চারদিনে গুছিয়ে তোলে৷ অথচ আজ এমন দেখাচ্ছে.....
নবমিতা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মন্দিরটায় আবার মনোযোগ দিল৷ সেই মুহূর্তেই মাঝনদী থেকে উঠে এল একটা দমকা হাওয়া৷ ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ৷ মন্দিরের নড়বড়ে আলকাতরা মাখা দরজার পাল্লা দুটো ঈষৎ ফাঁক হল৷ নবমিতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরের ভিতরে ঢুকে গেল৷
মন্দিরের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ একটু ভ্যাপসা গন্ধ৷ বাদুড় চামচিকে বা ইঁদুর মরে পড়ে থাকলে এরকম গন্ধ হয়৷ একটু পরেই অন্ধকারটা নবমিতার চোখে সয়ে গেল৷ সে এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে গর্ভগৃহ, বিগ্রহ রাখার উঁচু বেদি, কলুঙ্গি যেখানে বহু বছর আগে হয়ত ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালানো হত৷ এইসব ভাবতে ভাবতেই ঘিয়ের গন্ধ আর ধুনোর গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা দিল৷ নবমিতা এবার একটু ঘাবড়ে গেল৷ এই পরিত্যক্ত মন্দিরে এসব কী হচ্ছে! একটু আগেই তো এখানে ভ্যাপসা একটা গন্ধ ছিল তার লেশমাত্র আর নেই৷ নাহ এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা ঠিক হবে না৷ ভাবা মাত্রই নবমিতা ঘুরে দাঁড়াল৷ দরজাটা কই? নিজে নিজেই কখন বন্ধ হয়ে গেছে সেটা ও টের পায়নি৷ তাই ভেতরটা এত অন্ধকার৷ প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেই তো মুশকিল আসান হয়৷ হাল্কা আলোয় দরজাটা সহজেই খুঁজে পাবে৷ মন্দিরটা যে এত বড় বাইরে থেকে দেখে সে বুঝতে পারেনি৷ আর সেও বেখেয়ালে এটা ওটা ভাবতে ভাবতে কখন যে কোন প্রান্তে চলে এসেছে টের পায়নি৷ ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল পায় না৷ ওহ শিট! মোবাইল তো সে গাড়িতে রেখে নেমেছিল৷
এবার নবমিতার শীত করে উঠল৷ দরজাটা সে খুঁজে পাবে তো? নিসর্গ বা শান্তুনুদারা কি দেখেছে তাকে মন্দিরে ঢুকতে? এসব ভাবতে ভাবতেই এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কীসে যেন হোঁচট খেয়ে সে ধুলোতে লুটিয়ে পড়ল৷
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় নবমিতা৷ ইতিমধ্যে মন্দিরের দরজাটা খুলে গেছে হয়ত দমকা হাওয়াতেই৷ ক্ষীণ আলোয় নবমিতা দেখার চেষ্টা করল কিসে হোঁচট খেল সে৷ ওর পায়ের কাছেই লাল বিবর্ণ একটা কাপড়ের টুকরোতে কী যেন একটা পড়ে আছে! প্রবল কৌতূহলে নবমিতা কাপড়ে জড়ানো বস্তুটা তুলে নিল৷ অবশ্য ওর ভ্রূ কুঁকড়ে গেছে৷ হোঁচট খাবার সময় স্পষ্ট টের পেয়েছিল একটা উত্তপ্ত প্রমাণ মাপের শরীরের উপর সে আছড়ে পড়েছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই দরজা খুলে ক্ষীণ আলো উপস্থিত হওয়ায় সে দেখল সে যার উপর আছাড় খেয়েছিল বড়জোর সেটা ইঞ্চি দশের লম্বা হবে৷ যাকগে অন্ধকারটা চেপে বসায় তার হয়ত আতঙ্কে সাময়িক মাথার ঠিক ছিল না৷ নবমিতা এসব চিন্তা সরিয়ে রেখে কাপড়টা দুহাতে সরিয়ে দিল৷ ওমনি একটা সুন্দর পুতুল বেরিয়ে এল৷ হাল্কা আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সোনালি একরাশ চুল, নীল দুচোখের মণি আর গালে গোলাপি আভা৷ জড়ানো কাপড় দেখে টের পাওয়া যাচ্ছে বহুকাল এটা ওখানে পড়ে আছে কিন্তু পুতুলের পরনের সাটিনের লাল টুকটুকে জামাটা নতুনের মতো ঝলমল করছে৷ পুতুলটাকে দেখেই নবমিতার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল৷ কতক্ষণ মগ্ন হয়েছিল ঠিক নেই বাইরে ওর নাম ধরে ডাকাডাকি করতেই সজাগ হয় নবমিতা৷ ইচ্ছে করছিল এক ছুটে বাইরে গিয়ে নিসর্গকে পুতুলটা দেখায়৷ এই ভাবনাটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই টের পেল পুতুলটার নীল মণি দুটো যেন নড়াচড়া করে উঠল৷
যেন পুতুলটা নিষেধ করছে আর পাঁচজনের সামনে তাকে না আনতে৷ দুর প্রাণহীন একটা পুতুল, এও কী সম্ভব? নিজের বোকামিতে নিজেই হেসে উঠল৷ পুতুলটা তাড়াতাড়ি ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে সে বেরিয়ে এল৷ নিসর্গ’র মুখ হাঁড়ি৷ শান্তনুদা দূর থেকেই চিৎকার করে উঠলেন, ‘‘তোকে নিয়ে আর পারা যায় না৷ যাচ্ছি একটা কাজে, তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে তা না নদী, মন্দির করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছিস৷ ঐ পোড়ো মন্দিরে কেউ ঢোকে? সাপ কোপের আস্তানা৷’’ নবমিতা সাড়া না দিয়ে মুচকি হেসে ড্রাইভারের পাশের সিটে টুক করে বসে পড়ে৷ পিছনে নিসর্গ’র পাশে বসলে ওর এইসব পাগলামি নিয়ে ট্যাঁস ট্যাঁস করে কথা শোনাবে৷ শান্তনুদা শুধু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে একবার বলে উঠলেন, ‘‘যাহ আমার সিটটা গেল৷’’
ওদের গাড়ি হু হু করে ছুটে চলেছে মাঠ ঘাট ধানি জমি পেরিয়ে৷ আর ঘণ্টাখানেক গেলেই বাঁকুড়া পৌঁছে যাবে৷
‘‘মিতা, জলের বোতলটা দাও তো৷’’ নবমিতা তাড়াতাড়ি ব্যাকপাক খুলে জলের বোতলটা এগিয়ে দেয়৷ এক ঢোঁক খেয়েই ও বলে ওঠে, ‘‘একী জলটা তো একদম ফুটন্ত, কিছুক্ষণ আগেও তো চিল্ড ছিল৷’’ বোতলটা হাতে নিয়ে নবনিতাও দেখে নিসর্গ ভুল কিছু বলেনি৷ বোতলটা আর ব্যাকপ্যাকে ঢোকায় না৷ ব্যাকপ্যাকটাই কোলে তুলে নেয়৷ একটু পরেই ও টের পায় ওর পা দুটো যেন পুড়ে যাচ্ছে৷ এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্তর্পণে ও ব্যাগের ভিতরে হাত ঢোকায়৷ আর অবাক হয়ে যায়৷
ডিনারের পর নিসর্গ’র ইচ্ছে ছিল নবমিতার সঙ্গে একটু আড্ডা মারে৷ কিন্তু ও টায়ার্ড এই বাহানায় শুতে চলে এসেছে৷ আসলে পুতুলটা ওকে টানছিল৷ দুপুরে আর সময় পায়নি৷ পৌঁছোনোর পর থেকে সন্ধে সাতটা অবধি মুখ গুঁজে কাজ করে সবাই বেশ ক্লান্ত৷ সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবছিল নবমিতা৷ ডান হাতের কব্জিটা আরেকবার দেখল৷ আঁচড়ের দাগটা এখনো স্পষ্ট৷ হাল্কা হাল্কা রক্ত ফুটে আছে৷ গাড়িতে যখন ব্যাকপ্যাকটা থেকে উত্তাপ ছড়াচ্ছিল, সভয়ে নবমিতা হাত ঢুকিয়ে পুতুলটাকে পরখ করতে গিয়েছিল৷ টের পেয়েছিল পুতুলটার গা বেশ গরম৷ যেন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে৷ নবমিতা অবাক হয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল আর কেঁপে উঠছিল পুতুলটার গা কেমন চামড়া দিয়ে বানানো মনে হচ্ছে৷ সেই মুহূর্তে একটা ছোট্ট হাত তার ডান কব্জিটা যেন আঁচড়ে দেয়৷ মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল, ‘‘আহ’’৷ ‘‘কী হলো আবার?’’ নিসর্গ পিছনের সিট থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল, দেখে নবমিতা নিজেকে সামলে নিয়েছিল৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পেয়েছিল পায়ের উপর ছড়িয়ে থাকা উত্তাপটা বেমালুম উধাও হয়ে গেছে৷ মনের ভুল ভেরে নবমিতা সবটা উড়িয়ে দিয়েছিল৷
ঘুমনোর আগে বালিশের এক পাশে পুতুলটাকে শুইয়ে দিল৷ আহ কী মিষ্টি দেখতে৷ শুধু জড়িয়ে ধরলে কেমন যেন একটা ফীলিং হচ্ছে৷
অনেক রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল৷ কে যেন প্রবল আক্রোশে সারা ঘর তছনছ করছে আর চাপা গলায় হুঙ্কার দিচ্ছে, ‘‘কিল নবমিতা৷’’
এক রাত্রেই নবমিতার অবস্থা দেখে যে কেউ শিউরে উঠবে৷ জামা কাপড় ফালাফালা৷ সারা শরীরে আঁচড়ের দাগ৷ দিনের আলোতেও আতঙ্গে কেঁপে উঠছে সে৷ এখনো স্পষ্ট করে জানা যাচ্ছে না ওর সঙ্গে ঠিক কি হয়েছিল৷ রাত্রে ওর রুম থেকে চিৎকার শুনে শান্তনু, বাসব আর নিসর্গ ছুটে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করেও লাভ হয়নি৷ ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখা গেল সারা ঘর লণ্ডভণ্ড আর ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে নবমিতা৷ গেস্ট হাউসের নিরাপত্তা নিয়ে একচোট চিৎকার চেঁচামেচির পর ডাক্তার ডাকা হল৷ এখন কিছুটা সুস্থ নবমিতা৷ শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আর ইতিউতি চোখ বুলিয়ে কি যেন খুঁজছে৷
শান্তনুদাই আপাতত ওদের টিমলিডার৷ এই অবস্থায় নবমিতাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়াই উচিত মনে করলেন৷ গাড়ি ঠিক হয়ে গেল৷ নিসর্গের উপর দায়িত্ব পড়ল ওকে পৌঁছে দিয়ে আসার৷ তৈরি হবার সময় নবমিতা খাটের তলা, টয়লেট সব জায়গায় পুতুলটা খুঁজল কিন্তু না কোথাও পেল না৷ নিসর্গরাও দেখেনি, দেখলে ঠিক একবার না একবার জিজ্ঞেস করতই নবমিতাকে৷
যাক আপদ বিদেয় হয়েছে ভেবে নবমিতা ও নিয়ে মাথা ঘামায়নি৷ বরং ফেরার সময় নিসর্গ’র কাঁধে মাথা রেখে অনেক নির্ভর লাগছিল৷
একটু তন্দ্রার মতো এসেছিল৷ হঠাৎ কানের কাছে ‘‘কিল নবমিতা’’ কে যেন ফিসফিস করে বলতেই লাফিয়ে উঠল নবমিতা৷ নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখল ড্রাইভার কিছুতেই স্পিড কন্ট্রোল করতে পারছে না, বিপরীত দিক থেকে যমদূতের মতো ধেয়ে আসছে একটা মালবাহী ট্রাক৷ শিউরে চোখ বন্ধ করে দিল নবমিতা৷
প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখল তালগোল পাকানো তিনটে দেহের মাঝখানে নীল মণির অদ্ভুত সন্দুর একটা পুতুল একমুখ হাসি নিয়ে শুয়ে আছে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন