ফর্মালিনের গন্ধ

মহুয়া মল্লিক

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে একই ভাবে সৌমাল্য। হাওড়া স্টেশনের এই বিশেষ জায়গাটিতেই ওর দাঁড়াবার কথা। অথচ রিমিল এখনও এসে পৌঁছল না। অন্তত মিনিট চল্লিশ আগে ওর পৌঁছানর কথা। প্রায় এক ঘন্টা ও এভাবেই ঠায় দাঁড়িয়ে। ইতস্তত চোখ বোলাচ্ছিল হুইলারের পত্রিকাগুলোর কভারে। কখনও বা উল্টে পাল্টে নেড়েচেড়ে দেখছিল। ফুড কোর্টের যেখানটায় ও দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ওর বয়সী দুটো মেয়ে অনেকক্ষণ বসে আছে। নিজেদের মধ্যে খোশ গল্প করছে, আর গরম পিংজাতে কামড় বসাচ্ছে। সেও তো অনেকক্ষণ হয়ে গেল। দুটো লার্জ কোকের গ্লাস ও শেষ। একজন কাকে যেন ফোন করছে, এক কানে হাত চাপা দিয়ে। আরেকটা মেয়ে চোখের কোণ দিয়ে ওকেই দেখছে, মুখে দুষ্টু দুষ্টু একটা হাসি। ভাবখানা এমন, কি হে গোবেচারা, প্রেমিকা টাইম দিয়ে তোমাকে ঝুলিয়ে দিয়েছে বুঝি?

মেয়েটির ঠোঁটের কোণের হাসিটা ঠিকঠাক বোঝার জন্যই আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখার চেষ্টা করতেই শুনতে পেল মোবাইলে কথা শেষ করে অন্য মেয়েটি বলছে, পালটা, হা ভগবান ঠিক সেই সময়ই ও ঘাড় ঘুরিয়েছিল, সে দুষ্টু দুষ্টু হাসির মেয়েটা ততক্ষণে বান্ধবীর হাতে তালি মেরে বলছে হেই লুক, পালটা। হাসির কলরোল উঠছে। সৌমাল্য বুঝতে পেরেছে, ঐ মেয়ে দুটি কারুকে রিসিভ করতে এসেছে, হয়ত সেই দূরপাল্লার ট্রেন বেশ লেট। ওদের সময় কাটছে না। টাইম পাসের জন্য ওরা তাকে টার্গেট করেছে। সত্যি আজকালকার মেয়েগুলো এক একটা চিজ। পোশাক—আশাকে সব যেন হুডখোলা গাড়ি আর স্বভাবে এক একটা মিনি ফুলন দেবী। মানে মানে ও ওদের সামনে থেকে সরে যাবার চেষ্টা করতেই দেখল রিমিল হন্তদন্থ হয়ে আসছে। পরনে ছাই ছাই একটা জিন্সের সাথে রাস্ট কালারের একটি কুর্তি, স্টেপ করে কাটা ছোট ছোট চুল কিছুটা অবিন্যস্ত। এসেই সৌমাল্যর হাত ধরে বলতে শুরু করেছে কি ভয়ানক জ্যামে আটকে গিয়েছিল। মেয়ে দুটোর দিকে একবার তাকাল সৌমাল্য, ওরা একেবারে মাদাম তুসোর মিউজিয়ামের মূর্তি, নির্বাক হয়ে রিমিলকে দেখছে। এই বোকাসোকা গোবেচারা ছেলেটার যে এমন একটা আগুন আগুন জি এফ থাকতে পারে তার সমীকরণ মেলাতে চেষ্টা করেও মেলাতে পারছে না।

রিমিলের হাত ধরে ততক্ষণে অনেকটাই এগিয়ে গেছে সৌমাল্য। হুইলার স্টল থেকে কেক, বিস্কুট আর একটা ডায়েট কোকের বোতল ততক্ষণে রিমিল সঙ্গে আনা একটা প্লাস্টিকের মধ্যে ভরে নিয়েছে। প্রতিবার ওরা এমনই করে। রিমিল এবার জিজ্ঞেস করল, আজ কোথায় যাচ্ছি? সৌমাল্য উত্তর দিল পাল্লারোড। সেটা কোথায়? সৌমাল্য বোঝাবার চেষ্টা করল, সেটা যে কোথায় ও নিজেই জানে না বর্ধমান কড লাইনের একটা স্টেশন। এখানেই টিকিট কাউন্টারের বাম পাশে রুট ম্যাপ দেখে ঐ জায়গারই দুটো টিকিট কেটে নিয়েছে। রিমিল কিছুক্ষণ কি যেন ভাবল, তারপর বলল, ''নামটা শুনিনি যখন তবে চেনাজানা পপুলার কোনও জায়গা হবে না, ভালোই হল ভিড়ভাট্টা কম হবে।'' রিমিল একটু ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলে। আর এইভাবে অচেনা অজানা স্টেশনে হারিয়ে যেতে ওর দারুণ লাগে। প্রায়ই তো ওরা দু'জনে হাওড়া স্টেশন বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে এভাবে অচেনা জায়গার টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়ে। পরে হয়তো সেই জায়গায় পৌঁছানোর অনেক আগেই নির্জন শান্ত কোনও স্টেশনে নেমে পড়ে, কিছুটা সময় সেই অনাম্নী স্টেশনে কাটিয়ে ফেরার ট্রেন ধরে। সে সব জায়গায় কেউ তাদের চেনে না, কোলাহল থেকে দূরে সেসব জায়গায় হারিয়ে যেতে খুব মজা লাগে রিমিলের। তাদের এই অদ্ভুত প্রেম যাপন সুস্থ মানুষরা সন্দেহের চোখে দেখে। আর প্রতিবারই সৌমাল্য সেইসব জায়গা থেকে ফেরে এক রাশ কবিতা নিয়ে। অনেক শব্দ অনেক লাইন মাথায় তখন ঘোরাফেরা করে। সেসব মেসের স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে মাঝরাত্রে অন্যরা ঘুমিয়ে পড়লে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে ডায়েরীতে না সাজিয়ে তোলা অবধি অদ্ভুত একটা অসুখে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে সৌমাল্য।

এনাউন্সমেন্ট শুনে দুজনে সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটা লাগাল। মাঝামাঝি দেখে একটা কম্পার্টমেন্টে উঠে পাশাপাশি দুজনে বসল। সৌমাল্য ওকে জিজ্ঞেস করল, আজ কিভাবে ম্যানেজ দিলে? ও জানে রিমিলের মা খুব কড়া ধাতের মহিলা। ডাক্তারি পড়ুয়া এই কন্যেটিকে তিনি যথেষ্ট আগলে রাখতে চান। এই নিয়ে এক এক সময় মা আর মেয়েতে তুমুল অশান্তি হয়। সেইসব কথা মনে পড়লে একটু থমকাল রিমিল। হেসে বলল, কি আর বলব? বললাম সৌমাল্যর কবিতা শুনতে যাচ্ছি। 'এই মেরেচে, তাই বললে নাকি? এবার কাকিমার সামনে পড়লে তো আমাকে গাদাগুচ্ছ মিথ্যে বলতে হবে, জানই তো আমি মিথ্যে বলতে পারি না।' রিমিল ভেংচে ওঠে, ''জানোই তো আমি মিথ্যে বলতে পারি না। কেন পার না হু? কোথাকার যুধিষ্ঠির এলেন রে।'' সৌমাল্যর উপর এক চোট নিয়ে মহারানি এখন জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। সৌমাল্য মনে মনে হাসল, এটা মোটেই ঝগড়া নয়, রিমিল কোন কারণে নিজে টেনশনে আছে তাই এমন পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা করছে। ও বলতে চাইছে কিছু। কিন্তু নিজে থেকে বলবে না যতক্ষণ না সৌমাল্য জোরাজুরি করে।

সৌমাল্য ব্যাগ থেকে একটা চিপসের প্যাকেট বার করে রিমিলের সামনে ধরল। যতই মেজাজ খাট্টা থাক এই একটা জিনিসে রিমিলের না নেই। কুটুর কুটুর করে দুজন চিপস মুখে দিতে শুরু করল। ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। আজ রবিবার বলেই হয়ত কম্পার্টমেন্ট একদম ফাঁকা। দু একজন সব্জিওয়ালী মাসি অলসভাবে দরজার সামনে বসে, কোমরের লুকনো থলি থেকে টাকা বার করে গুনে গেঁথে হিসেব মেলাচ্ছে। একটা ঘুগনিওলা ওদের কাছে ভাব জমাচ্ছে। মাসিরা নিজেদের সঙ্গে রাখা মুড়ির সাথে ঘুগনি মিশিয়ে মুখে তুলছে। বেশ একটা চলমান চিত্র। কয়েকটা কম বয়সী ছেলে ফাঁকা কম্পার্টমেন্ট জুড়ে ছোটাছুটি করছে। মনে হয় বালি বেলুড় অবধি ওদের গন্তব্য। সব মিলিয়ে বেশ ফাঁকা ফাঁকা দেখে রিমিলের মনটা ভালো হয়ে গেল। জলের বোতল থেকে ক' ঢোঁক জল খেয়ে বোতলটা ও বাড়িয়ে দিল সৌমাল্যর দিকে। তারপর সৌমাল্যর কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিল।

সৌমাল্য চট করে একবার দেখে নিল কেউ ওদের লক্ষ্য করছে কিনা, নাহ দু—চার জন যারা আছে তারা কেউ বা ঝিমোচ্ছে কেউ বা উদাস মুখ করে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। সৌমাল্য নিশ্চিন্ত হয়ে রিমিলের কপালে হালকা করে ঠোঁট ছোঁয়াল। রিমিলের মধ্যে তেমন ভাবান্তর হল না। সৌমাল্য এবার জিজ্ঞেস করল, মেঘ কন্যার মুখে এত মেঘ জমেছে কেন? রিমিল কিছু না বলে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবছিল কীভাবে শুরু করে। অথচ আর দেরি করা ঠিক হবে না। সৌমাল্যকে বললে ও ঠিক একটা উপায় বার করবে। ছেলেটা যতই গ্রাম্য দেখতে হোক না কেন ওর মাথাটা বেশ সাফ। অধ্যাপক বাবা—মার একমাত্র সন্তান সৌমাল্য মিত্র নিজে জয়েন্ট পেয়ে শিবপুরে এডমিশন নিয়েও ছেড়ে দিয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে শুরু করে। এমন একটা ছেলের বিদ্যা বুদ্ধি ভাবনা—চিন্তা যে যথেষ্টই পরিণত হবে সে বিষয়ে রিমিল নিসন্দেহ। ওর বাড়িতেও ওর মা বাবা সৌমাল্যকে বেশ পছন্দ করে। কিন্তু কেন জানি না রিমিলের মনে হয় বন্ধু হিসেবে ও বাড়ির দরজা চিরকাল খোলা থাকলেও, তাদের এই বিশেষ সম্পর্কটার কথা মা জানতে পারলেই সব শেষ হয়ে যাবে।

সৌমাল্য এবার রিমিলের হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে নীচু স্বরে আবার প্রশ্ন করল, বলবে না কি হয়েছে? রিমিল আর পারল না। ফুঁপিয়ে উঠল ছেলেমানুষের মতো। তারপর সব বলতে শুরু করল। প্রীতমের কথা, ওর সাথে রিমিল এর বিয়ে ঠিক হবার কথা। ও বাপির বন্ধুর ছেলে। রূপক কাকু খুব করে বাপি মাকে ধরেছে, প্রীতম এলেই এবার রেজিস্ট্রিটা সেরে যাবে। ও বোস্টনে থাকে। রিমিল পড়ার দোহাই দিয়ে রেজিস্ট্রিটা ঠেকাতে চেয়েছিল। কিন্তু কেউ শুনছে না ওর কথা। ফেসবুকে ওকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও পাঠিয়েছে ইতিমধ্যে প্রীতম। রিমিল এখনও একসেপ্ট করেনি। একনাগাড়ে সবকিছু বলে রিমিল হাঁফাচ্ছিল। তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে সৌমাল্যকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ''তুমি পার না আই মিন আমরা পারি না বিয়ে করে নিতে?'' ওর বলার ধরনে হেসে ওঠে সৌমাল্য। একেবারে ছেলেমানুষ ও। ওর হাতের উপর চাপ দিয়ে সৌমাল্য বলে হ্যাঁ পারি তো। তবে জানাজানি হলে কিন্তু তোমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে, তার জন্য তৈরি তো? রিমিল হেসে মাথা নাড়িয়ে সমর্থন জানায়। মনটা বেশ ভালো হয়ে যায় রিমিলের। সৌমাল্যরও মনে হল মেঘকন্যার মুখের এক্সট্রা মেঘটা উড়ে যাচ্ছে অচিন দেশে।

পাল্লারোড নামের সেই ছোট্ট শান্ত স্টেশনে পড়ন্ত শীতের রোদ মেখে যখন ওরা উঠে দাঁড়াল ফেরার ট্রেন ধরতে তখন ওদের মধ্যে অনেক কথা হয়ে গেছে যার সাক্ষী থাকল স্টেশনের ঐ জারুল গাছটা। ওরা ঠিক পনের দিন পরে শিয়ালদহ স্টেশনে মিট করবে। এর মাঝে সরস্বতী পূজো উপলক্ষে সৌমাল্য সবং এ ওদের বাড়ি যাবে, রিমিল এর কথা ওর বাবা—মাকে জানাবে, ওদের সম্মতি ছাড়া এত বড় স্টেপ নেওয়া রিস্ক হয়ে যাবে। রিমিলের মা বিগড়ে যাবেই তখন রিমিলের পড়াশোনা কনটিনিউ করার জন্য সৌমাল্যকে ওর মা—বাবার কাছেই সাহায্য নিতে হবে। ও নিজে এখনও এম এ কমপ্লিট করতে পারেনি। সব শুনে রিমিল রাজবংশী, সৌমাল্য মিত্রর জন্য পনের দিন পরে শিয়ালদহতে দেখা করবে জানিয়ে ট্রেনে উঠল, সারাদিনে শীতবোধটাই ছিল না, জানলাগুলো তুলে দিয়ে চাদরে নিজেকে মুড়ে বসল রিমিল। সৌমাল্যও হাল্কা একটা জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে নিয়েছে। এখন বেশ লোকের ভিড়, সৌমাল্য একদম গা ঘেঁষে বসেছে রিমিলের, এই উষ্ণতাটুকুর বড় প্রয়োজন ছিল ওদের দুজনেরই। সারা রাস্তা চুপচাপ ছিল ওরা, সৌমাল্য মাঝে একবার মুখ খুলে ওর পড়াশোনা, ডিসেকশন শুরু হল কিনা জানতে চেয়েছিল। রিমিল জানিয়েছিল, দূর একটা লাশ ও ম্যানেজ করা গেল না। এদিকে এত বেওয়ারিশ লাশের ছড়াছড়ি আর ওদের ভাগ্যেই একটা জুটছে না। এনাটমির প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের অবস্থা বেশ শোচনীয়। সৌমাল্য আশ্বস্ত করে অত ভেব না ঠিক পেয়ে যাবে।'' হাওড়া পৌঁছে যে যার রুটের বাস ধরল। দিনের শেষে দুজনেই নিজের নিজের ডেরায় ফিরছে ঝলমলে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে।

দুই

দিথির ফোনে খুব সকালে ঘুম ভাঙল রিমিলের। কিরে কাল এলি না কেন? রিমিল বিছানা থেকে মাথা তোলার চেষ্টা করল, পারল না মাথাটা ভার ভার লাগছে। জ্বরটা ছেড়ে গেছে তবুও ক্লান্ত লাগছে খুব। কোনরকমে দিথিকে বলল, আর বলিস না খুব জ্বর রে। সরস্বতী পূজার দিনে সকালে স্নান করেই এই বিপত্তি। দিথি জানাল, কাল ডক্টর সমাদ্দার একটা গুড নিউজ দিলেন, অবশেষে একটা লাশ পাওয়া গেছে। ছুটিছাটার জন্য প্রিজার্ভ করে রাখা আছে। সবাইকে ডক্টর সমাদ্দার এনাটমির ক্লাসে হাজির থাকতে বলেছেন। কাল পরশুর মধ্যেই ডিসেকশন শুরু হবে। উত্তেজনায় রিমিল বিছানায় উঠে বসে। ওহ তাই? বাপরে আমার ভয়ে হাত—পা কাঁপছে। এই তুই কি জানিস বেওয়ারিশ লাশটা কিভাবে মারা গিয়েছিল? বিষটিষ খেয়ে বোধহয়। তেমনই শুনেছিলাম। রিমিল শুনে বলল, থ্যাংক গড আমি মনে মনে চাইতাম জলে ডোবা লাশ যেন না হয়, পচা গলা ওয়াক।

ওর বলার ভঙ্গিতে দিথি হেসে ওঠে। রিমিল বলে, শোন আজ আর ক্লাসে যাব না, শরীর ভালো নেই, কাল থেকে রেগুলার যাব। ফোন রেখে ও বিছানা ছাড়ে, এটাচড টয়েলেটে ঢুকে যায়। ফ্রেস হয়ে বেরুতে দেখে মা বিছানাটা ঠিকঠাক করে এক গ্লাস দুধ নিয়ে বসে আছে। কাছে আসতে কপালে হাত রেখে বলল, গুড আজ আর জ্বর নেই, আজ পুরো দিনটা রেস্ট করো। কাল থেকে ক্লাসে যেও। রিমিলও এমনটাই চাইছিল। দুধের গ্লাস দেখে মুখ ভ্যাটকালো, কিন্তু মায়ের হাত থেকে নিস্তার নেই, নিমপাতা খাওয়ার মতো মুখ করে এক চুমুকে খেয়ে নিল। মা বলে গেল, বাসী জামাকাপড়গুলো ছেড়ে দিতে, কাজের মাসি কেচে দিয়ে যাবে।

মা কিচেনে ব্যস্ত হয়ে যেতে রিমিল আবার একবার ফোন লাগাল সৌমাল্যকে। একই যান্ত্রিক ঘোষণা, কারেন্টলি সুইচড অফ। ক'দিন ধরেই ছেলেটাকে ফোনে পাচ্ছিল না। প্রতিবারই বাড়ি গেলেই ও এমনটা করে। আসুক এবারও, রিমিল আচ্ছাসে ঝাড়বে। পৌঁছানোর খবরটুকু পর্যন্ত রিমিলকে দেয়নি। চারদিন ধরে ফোন করে করে ক্রমাগত সুইচড অফ পেয়ে পেয়ে অজস্র মেসেজ করেছে রিমিল। তারপর একদিন দুপুরে, সৌমাল্যর ফোন আসে অনেক কোলাহলের মধ্যে দিয়ে। রিমিল অভিমান করে, বাড়ি গিয়ে আমাকে মনেই থাকে না বুঝি? পাঁচ দিন কেটে যাবার পর আজ তোমার সময় হল! বাহ চমৎকার। সৌমাল্য হাসতে থাকে, আরে এখানে কেউ না কেউ সব সময় আমার পাশে থাকে ফোন এলেই হুমড়ি খেয়ে দেখবে কে করেছে, হাঁ করে কথা শুনবে সব। আমার খুব আনইজি লাগে। রিমিল কিছু বলে না চুপ করে থাকে। সৌমাল্য ওকে আশ্বস্ত করে ক'দিন পরেই তো যাচ্ছি। একেবারে শিয়ালদহ স্টেশনেই আমাদের দেখা হবে। আশা করি সেদিন তোমাকে একটা ভালো খবর দিতে পারব। ওয়েট করো পাগলি, জানোই তো ইন্তেজার কি ফল মিঠা হোতা হ্যায়। রিমিল জিজ্ঞেস করেই ফেলে, তোমার মা—বাবাকে আমাদের ব্যাপারটা কিছু জানিযেছ? সৌমাল্য বলে, সেভাবে না তবে আভাসে ইঙ্গিতে একটা আইডিয়া দিয়েই দিয়েছি। প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাক, এ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবে সৌমাল্য। সেই থেকে আজ ছ'দিন ধরে ও ইন্তেজার করেই যাচ্ছে। তবে মনে হচ্ছে বিচ্ছুটা গুড নিউজটা ট্রেনে যেতে যেতেই দেবে। আর মাত্র মাঝে দুটো দিন, রবিবারেই তো তাদের দেখা হবে।

অন্যবারের চেয়ে অনেক আগেই পৌঁছে গেছে রিমিল। এদিক—ওদিক খুঁজে দেখল সৌমাল্য তারও আগে এসে গেছে কিনা। আসেনি দেখে পায়ে পায়ে টিকিট কাউন্টারের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। কোথাকার টিকিট নেবে আগে কিছুই ঠিক থাকে না তাদের। ওদিক—ওদিকে তাকাতে পাশের একটা লাইন থেকে ক্যানিং শব্দটা ভেসে এলো, ও দুখানা ক্যানিং—এর টিকিট কেটে নিল। নির্দিষ্ট জায়গাটায় এসে অপেক্ষা করতে লাগল। সৌমাল্য আর আসেই না, বারবার ফোনে ট্রাই করে যাচ্ছে। যথারীতি সুইচড অফ। আশেপাশের লোকজন ওকে কৌতূহল নিয়ে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ কুইঙ্গিত করে যাচ্ছে। চোখ ফেটে জল এল রিমিলের ও ফিরে যাবে কিনা ভাবছিল আর তখনই দেখল সৌমাল্য আসছে। ইস কি রোগা হয়ে গেছে এই কদিনে। চুলগুলো উস্কোখুস্কো। কাঁধে একটা কিট ব্যাগ। রিমিল প্রশ্ন করল তুমি বাড়ি থেকেই আসছ নাকি? ছোট্ট করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল সৌমাল্য। রিমিল এবার ফর্মে ফেরে, ধমকে বলে, ''মোবাইলটা বন্ধ কেন? বাড়িতে অসুবিধার অবিশ্বাস্য অজুহাত দাও কিন্তু এখন খুলে রাখতে কি হয়েছিল? আমার যে কি চিন্তা হচ্ছিল।'' সৌমাল্য প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোতে এগোতে বলে, সে তো লাস্ট যেদিন কথা বললাম সেদিনই খোয়া গেছে। এখনও নতুন নেওয়া হয়নি। রিমিল তবু বলে, কিন্তু বুথ থেকেও তো একটা ফোন করা যেত। সৌমাল্যর বলতে খারাপ লাগে তবুও বলে, 'আসলে তোমার নাম্বারটা আমার মুখস্থ ছিল না, দরকার হয়নি বলে অন্য কোথাও লিখেও রাখিনি।' রিমিল কথা না বাড়িয়ে চুপ করে যায়।

অসম্ভব ভিড় প্রতিটি কম্পার্টমেন্টে। পাশাপাশি বসার সিট পেল না ওরা। মুখোমুখি বসল। এত ভিড় যে একটুও হাওয়া আসছিল না খুব অস্বস্তি হচ্ছিল রিমিলের। ট্রেন ছাড়তে রিমিল মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল আর সৌমাল্য ঠোঁটটা অল্প ফাঁক করে শিশুর মতো ঘুমোচ্ছিল, বড় শান্তির সে ঘুম। রিমিল একবার সেদিকে চেয়ে মনে মনে বলল, হবেই তো সেই কোন ভোরে ছেলেটা বেরিযেছে। ইতিমধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে ঝাপটা দিচ্ছিল। কিসের গন্ধ কেউই বুঝতে পারছিল না। অনেকেই ফিসফিস করছিল মাছের নাকি? নাকি ঝাঁজালো মদের? রিমিলের যেন একবার মনে হল ফর্মালিনের গন্ধ। ভিড় একটু পাতলা হতে জানলাগুলো দিয়ে হাওয়া ঝাপট মারছিল। গন্ধটা এক সময় ফিকে হয়ে গেল। ওরা ক্যানিং পৌঁছে এদিক—ওদিক ঘুরল। সৌমাল্য নিজে কিছুই বলছে না দেখে রিমিল একবার খোঁচাল, তোমার বাবা—মায়ের সাথে কথা হল? সৌমাল্য বলল, আজ খুব ক্লান্ত লাগছে পরে এ নিয়ে তোমার সাথে কথা বলব। পরে কবে? তোমার তো মোবাইলও নেই? আমার নাম্বারটা কি লিখে দেব? ''পরশুই দেখা হবে। আমি বিকেলে মেডিক্যাল কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব।'' আর কথা বাড়ায়নি রিমিল। ফেরার পথে অটোয় আসতে আসতে আবার সেই ঝাঁজালো গন্ধটা পেল। এখানেও গন্ধটা, নাহ ওর মনের ভুল হবে। নাহলে ল্যাবে হয়ত ওর এই ড্রেসে ফর্মালিন লেগে গিয়েছিল সেটাই হাওয়ায় মিশে ছড়িয়ে পড়ছে।

সারাদিনের ক্লান্তিতে বিছানায় শোওয়া মাত্রই ঘুম নেমে এল। পরেরদিন সকাল থেকেই খুব ব্যস্ততায় কেটে গেল। লাইব্রেরিতে বসে ও আর মেঘনা হিউম্যান বডি নিয়ে কিছুক্ষণ পড়াশোনা করল যাতে কালকের ডিসেকশন টেবিলে কোনও অসুবিধা না হয়। মঙ্গলবার সকালে উঠে রেডি হতে হতে ভাবছিল, লাশটাশ ঘেঁটে প্রেমিকের সাথে এপয়েন্টমেন্ট কি বিশ্রী ব্যাপার! সৌমাল্যর ফোনটা এ সময় খুব দরকারি, সেটা থাকলে আজকের এপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করে দিত। ব্যাগে এক সেট এক্সট্রা ড্রেস আর একটা ছোট্ট টাওয়াল নিয়ে নিল। ল্যাব থেকে বেরিয়ে হস্টেলে একটু ফ্রেস হয়ে চেঞ্জ করে তবেই বেরোবে। ঐ কাপড়ে কোথাও যেতে গা ঘিন ঘিন করবে।

একটা থিওরি ক্লাস করেই ওরা ল্যাবে চলে এল। ডক্টর সমাদ্দার একটা জেনারেল স্পিচ দিয়ে ওদেরকে টেবিলের কাছে আসতে বললেন। লাশটা সাদা চাদরে ঢাকা। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখুনি তাদের হাতে—কলমে প্র্যাকটিস শুরু হবে। লাশের শরীর থেকে ডক্টর সমাদ্দারের নির্দেশমতো তথাগত চাদরটা সরিয়ে দিতেই নগ্ন একটা শরীর বেরিয়ে এল। একী দেখছে রিমিল, এ তো তার সৌমাল্য! পরশু বিকেলেই তো ওর সাথে শেষ দেখা হয়েছ অথচ রেকর্ড মতো এই লাশ আট—দশদিনের পুরনো। তবে কি ওর বাবা—মা ওদের ব্যাপারটা না মানায় ও বিষ খেয়েছিল? মাথাটা ঘুরে গেল রিমিলের, থরথর করে কাঁপছিল ও। চোখের সামনের সবকিছু কেমন যেন আবছা লাগছিল। দিথি, মেঘনা, তথাগতরা ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, ডক্টর সমাদ্দার ওদের বললেন ওকে শক্ত করে ধরে রাখো, লাশ দেখে অনেকের এইরকম হয়। কিচ্ছু কানে যাচ্ছিল না রিমিলের। জ্ঞান হারাতে হারাতে ও টের পেল, নাকের মধ্যে ফর্মালিনের তীব্র গন্ধটা আবার আছড়ে পড়ল।

___

অধ্যায় ৩০ / ৩০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%