মহুয়া মল্লিক
আমাদের নতুন বাড়ি থেকে স্কুল হেঁটে মাত্র দশ মিনিটের রাস্তা। কিন্তু স্কুল ছুটির পর রোজ বাড়ি ফিরতে আমার দেরি হয়। প্রথম প্রথম মা আর ঠাকুমা এসব খেয়াল করেনি। দুপুরের রোদ যখন নরম হয়ে আসে ওরা তখন আমাদের নতুন বাড়ির মস্ত বারান্দাটায় সেলাই বোনা—কাঁটা ইত্যাদি নিয়ে বসে। ঠাকুমা চটের আসনে রঙবেরঙের উলের ফুল তোলায় এক্সপার্ট, আর মা নানান রকম উলের প্যাটার্নে নতুন পাড়ার সব্বাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ইতিমধ্যে। আশেপাশের বাড়ির মেয়ে বৌদের সঙ্গে মা ঠাকুমা এই সময়টা দিব্যি কাটায়। বাগান থেকে চমৎকার ফুরফুরে একটা হাওয়া দেয়। হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসে ফুলের গন্ধ। আমাদের মালি বসন্তকাকা সারাদিন গাছেদের পরিচর্যা নিয়ে এমন মেতে থাকে যে নাওয়া—খাওয়া পর্যন্ত ভুলে যায়। গাছে গাছে তাই এমন রঙ মশাল। বাড়িটা আমার ঠাকুরদার বানানো। বহুদিন বসন্তকাকার ভরসায় পড়েছিল। মা ঠাকুমা আর কলকাতায় এক চিলতে ঐ স্যাঁতস্যাঁতে কোয়ার্টারে থাকতে চাইত না। দিদি কলেজ পাস করে চাকরি নিয়ে মেদিনীপুরে চলে যেতে মা আর ঠাকুমা জোর করেই এখানে চলে আসে। বাবা একাই থাকে কলকাতায়। পনেরো দিন অন্তর শনিবারে বাড়ি আসে আর সোমবার ভোর রাত্রে ফিরে যায়। এবার ছুটি নিয়ে বাবা ক'দিন রয়ে যেতেই ব্যাপারটা চোখে পড়ল। প্রথম দিন আমার দেরি দেখে বাবা খুব একটা আমল দেয়নি। দ্বিতীয় দিন দেরি হতেই আমাকে জেরা করা শুরু হল। আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। বাসন্তকাকা ফস করে বলে দিল, ''খুকি তো রোজ দেরি করেই ফেরে। মা ঠাকুমা কিছু বলে না বলে আমিও...।''
ব্যাস শুরু হয়ে গেল তিনজন মিলে আমাকে জেরা, ''কোথায় থাকিস এতক্ষণ?'' ''কাদের সঙ্গে মিশিস?'' শেষে বাবার রণ হুঙ্কার, ''কুসঙ্গে পড়লে কিন্তু তোমার মেয়েকে হাড়গোড় ভেঙে এই বাগানে পুঁতে রাখব।'' টসটস করে চোখের জল ঝরে আমার পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিল।
পরের দিন থেকে আমার জন্য রিক্সা বহাল হয়ে গেল। রিক্সার সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলে চড়ে যাবে বসন্তকাকা। কী লজ্জা! চৌদ্দ বছর বয়সটা যে এত সন্দেহজনক, আমার বাড়ন্ত শরীরটা যে এত লজ্জার কারণ সেই প্রথম টের পেলাম। সেদিন আমার অস্থিরতা বেড়ে গেল। স্কুলে জানা পড়াগুলো বলতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকলাম মাথা নিচু করে।
সন্ধেতে ঠাকুমা চাপা স্বরে মাকে বলল, ''দেখেছ বৌমা, কুসুম কেমন অস্থির অস্থির। চোখের মণি দুটো কেমন চঞ্চল হয়ে ঘোরাফেরা করছে!''
মা ততোধিক ফিসফিস করে উত্তর দিল, ''মেয়েটা ভালোবাসা করল নাকি! কোলকাতা ছেড়ে না এলেই বুঝি ভালো হত।''
অন্যদিন ঘুম না এলে আমি ঠাকুমার পাশ থেকে নিঃশব্দে উঠে যাই। ঘরের লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে বসে থাকি। দোতলার বারান্দা দিয়ে দূরের গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকি। অন্ধকারে মাঝে মাঝে বিন্দু বিন্দু আলো কয়েক মুহূর্ত উঁকি দিয়েই হারিয়ে যায়—সেইসব মুগ্ধ হয়ে দেখি। আমি জানি ওইগুলো মাছ ধরা নৌকার আলো। যথারীতি আজও ঘুম এল না। বিছানা ছেড়ে বারন্দায় বেরিয়ে আসি। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার রাখাই থাকে সেখানে বসে বারান্দার গ্রীলে গাল ঠেকিয়ে দিই। দূরের অন্ধকার তার মোলায়েম স্নেহছায়ায় আমাকে যেন জড়িয়ে ধরে। আহ বড্ড শান্তি।
হঠাৎ শিউরে উঠি, গঙ্গার বুকে এ কী দেখছি? এ যে ভাসমান এক আলোক তরী। সর্বাঙ্গ তার আলোর উজ্জ্বল গহনায় ঝলমল। মায়াবিনী কুহকিনী হয়ে সেই আলোকতরী কালো জল কেটে কেটে অমাকে গ্রাস করতে যেন এগিয়ে আসছে। সেই মুহূর্তে কে যেন কান্না মিশিয়ে মেয়েলি গলায় ডেকে উঠল, ''আমিনা, কুথা গেলিরে মা আমার।'' পলকেই সেই আলোকতরী ভোজবাজির মতো গায়েব আমার আর কিচ্ছু মনে নেই। সকালবেলায় অজ্ঞান অবস্থায় বারান্দার এক কোণে আমাকে আবিষ্কার করে ঠাকুমা। তখন আমার দুচোখে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ। ভিজে আঁচল দিয়ে ঠাকুমা ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি মুছিয়ে দিচ্ছে সেই দাগ, যাতে বাবার চোখে না পড়ে। বাবার চোখে পড়লে অনর্থ ঘটবে।
না আমি প্রেম করিনি। তবে প্রেম আমার হতে পারত। আমার চোখ, মুখ, চিবুক, উচ্চতা, উন্নত বক্ষ, মরাল গ্রীবায় সোনালি ইশারা সবই প্রেমে পড়ার পক্ষে উপযুক্ত। সর্বোপরি কলকাতার পালিশ, মুর্শিদাবাদের এই গঞ্জ শহরের যুবকদের বুকে রীতিমতো সুনামির বান ডাকল। আমাকে দেখতে নাকি বাংলা সাহিত্যের এক নামি লেখিকার মতো! সেদিন একদল কলেজ পড়ুয়া ছেলে সেই লেখিকার নাম নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিল, ''তুমি তো দেখছি একদম অমুকের মত দেখতে? ওঁর লেখাগুলোর মতো হট তো?''
একজন অসভ্য ছেলে চোখ টিপে ইশারা করল, ''শহুরে মামণিকে তাহলে কাল্টিভেট করতে হয়।'' আমি মাছি তাড়ানোর মতো ওদের তাচ্ছিল্য করে এড়িয়ে যাই। অথচ মনীষা, ইন্দ্রনীলের মতো আমারও একটা প্রেম হতেই পারত।
আমি বড্ড অশান্ত, অস্থির। এই অস্থিরতা মুর্শিদাবাদে এসে আরো বেড়ে গেছে। ঐ বাড়িটা আমাকে বড্ড টানে। একদিন স্কুল ফেরত রাস্তা হারিয়ে আমি ঐ নির্জন পাড়াটায় ঢুকে পড়ি। বাড়িটা আর পাঁচটা বাড়ির থেকে একটু এক টেরে। পড়ন্ত বিকেলের আলো মেখে কেমন বিষণ্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একতলা বাড়ি, টালির ছাদ, জরাজীর্ণ। বোঝা যায় বহুকাল এখানে মানুষের বসবাস নেই। বাড়িটা আমাকে চুম্বকের মতো টানতে লাগল। ছোট্ট একটা লোহার গেট। তালাহীন। গেট খুলে আমি ভেতরে এগিয়ে গেলাম। বড় বড় গাছ আর ঘাসেদের জঙ্গল। ঘাসের মধ্যে পা ডুবিয়ে আমি বাড়িটার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। যেন কতকালের চেনা। পরম মমতায় শ্যাওলা ধরা, রঙ জ্বলা দেওয়ালের গায়ে হাত বোলাতে থাকলাম। সেই শুরু, এরপর প্রত্যেকদিন স্কুল ফেরত বাড়িটাকে নতুন করে আবিষ্কারের আশায় ছুটে চলে যাই সেখানে। হ্যাঁ প্রেমে পড়ছি আমি একটা ভাঙাচোরা বসতবাড়ির।
অবশেষে আমাকে পাওয়া গেল ঐ জরাজীর্ণ বাড়িটার চাতালে। সকালে আকাশে মেঘ দেখেই অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল। ঐ বাড়িটা আমায় ডাকছিল, একটা কণ্ঠস্বর আমাকে ডাকছিল। ''আমিনা, বেটিরে আমার''। আমিনাকে ডাকছিল কেউ কেঁদে কেঁদে একটানা ঘ্যানঘ্যান করে। কিন্তু আশ্চর্য আমার ভিতরের মনটা সাড়া দিচ্ছিল। আমি এক ছুটে সবার চোখ এড়িয়ে পথে নেমেছিলাম। বাড়িটার কাছাকাছি যেতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এল।
সন্ধের বৃষ্টিভেজা অন্ধকারে পাড়ার লোক আর বসন্ত কাকা উদ্ধার করল আমায়। ভুল, আমাকে না আমিনাকে উদ্ধার করল ওরা।
''খুকি, তুমি এখানে। এ হে তোমার গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গো। বলি মা—টা যে তোমার কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো করমচার মতো লাল করে ফেলেছে।''
''কে আমার মা। আমার মা তো এই ঘরে ঝুলছে,'' অস্থিরভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে বললাম। হ্যাঁ আমিই বললাম। উপস্থিত জনতার চোখে সার্চলাইটের মতো আমাকে তন্নতন্ন করতে লাগল। আমার ঘুম পাচ্ছে ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
চলে যাচ্ছি আমরা এই জায়গাটা ছেড়ে আবার কলকাতায়। বাবা প্রিন্সিপাল ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলেছেন, আমার বছর নষ্ট হবে না।
আমি জানি বাবা, ঠাকুমা, মা সবাই আমাকে নিয়ে নানান কথা বলে, খারাপ হাওয়া লেগেছিল আমার গায়ে। ঠাকুরের প্রসাদী ফুল মাথায় ঠেকাতে সব অন্ধকার কেটে গেছে। হাসি পায় আমার। তোমরা কুসুমকে নিয়ে এসেছিলে আর ফিরছ আমিনাকে নিয়ে। তাহলে কুসুম গেল কোথায়?
করমচার মতো লাল চোখ আর এক মাথা কোঁকড়ানো চুল ঝাঁকিয়ে আমি হাসি হি হি করে। কুসুম আছে। কোথায় আছে তা একমাত্র আমি জানি।
''খাজা খিজিরে''র উদ্দেশ্যে নিবেদিত মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত বেরা ভাসান বা ''আলোকতরী'' উৎসবের কথা জন্মইস্তক শুনে এসেছে আমিনা। কিন্তু কেউ তাকে নিয়ে যায়নি। চোদ্দ বছর বয়সে, ফাগুন ডাকা বয়সে আমিনা মাকে লুকিয়ে একদল পাড়ার লোকের সঙ্গে গঙ্গার তীরে চলে গিয়েছিল। জায়গাটা যদিও অনেকটা দূর। খুব ভালো করে আলোকতরী দেখাও যায় না। তবুও বিচিত্র আলোকবর্ণের ছটায় ওর চোখ সার্থক হয়েছিল। ফেরার পথে বুঝতে পারে সে দলছুট হয়েছে। রাস্তা খুঁজে বাড়ি আসার আগেই একদল মদ্যপের হাতে সদ্য ফাগুন লাগা যৌবন দুমড়ে মুচড়ে একাকার। আমিনার মা ভোর রাত্রে রক্তাক্ত মেয়েকে খুঁজে পায়। এই মেয়েকে সে কোথায় থোয়! ঘরে নিলে সমাজ তাকে ত্যাগ দেবে। মেয়ের গলা টিপে খুন করে বাগানে পুঁতে দেয় আর নিজে সূর্য ওঠার আগেই গলায় দড়ি দেয়।
কুসুম আছে। আমিনার পরিত্যক্ত হাড়গোড়ের সুধা নিয়ে পরম যত্নে বেড়ে উঠেছে এক বাহারী বনলতা। শীর্ণ লতায় বড় বড় রক্তলাল কুঁড়ি এসেছে। অথচ কিছুদিন আগেও আগাছা ভরা বাগানে না ছিল লতাটি না ছিল এমন ফুলের সম্ভাবনা। আমিনা জানো, এলাকার কেউ কক্ষনো এমন রক্তলাল ফুল দেখেনি। আমিনা মনে মনে ফুলগুলোর নাম দেয় কুসুম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন