মহুয়া মল্লিক
মেয়েটার চেহারাতে ক্লান্তির ছাপ৷ চেহারাতে একটা আলগা লাবণ্য জড়িয়ে থাকলেও চোখে পড়ার মতো কিছু না৷ পরনে সুতীর সালোয়ার কামিজ, সুতীর ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে জিনিসপত্র নামাবার তদারকি করছে৷ আমি উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, সঙ্গে পুরুষ মানুষ আছে কিনা! তেমন কারুকে চোখে পড়ল না৷ মেয়েটা বিবাহিত কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না, অবশ্য আজকাল কোন মেয়ে আর বিয়ের চিহ্ন বহন করে ঘুরে বেড়ায়? তবে দিবাকরবাবু অবিবাহিত একলা মেয়েকে ভাড়া দিয়ে আর ভুল করবেন না৷ হ্যাঁ যা ভেবেছি, মেয়েটির সিঁথিতে এক চিলতে সিঁদুর আছে, ঐ না থাকার মতো৷ জিনিসপত্র তেমন নেই একটা স্টিলের খাট, আয়না লাগানো আলমারি, ফ্রীজ, কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর কয়েকটা বস্তা৷ আশেপাশের লোকজন কৌতূহলী চোখে দেখছে কিন্তু এগিয়ে এসে কেউ আলাপ-পরিচয় তো দূর এক গেলাশ জলও এগিয়ে দেবে না৷ কিন্তু ক’দিন পরেই হাঁড়ির খবর নিতে হাজির হবে৷ এদের দেখে দেখে চোখ পচে গেছে৷
তারা অফিস থেকে ফিরে রান্নাবান্না সারছিল৷ সকালেরটাও রাত্রেই বানিয়ে রাখে৷ সকালে শুধু অফিসের টিফিন আর চা বানায়৷ আসলে তার ঘুম ভাঙতে চায় না৷ এই বদ অভ্যাসটা এখানে এসেই হয়েছে৷ রাত্রে সে নাকি ঘুমতে পারে না৷ চোখ বন্ধ করলেই কে যেন কানের কাছে সিতারা, সিতারা বলে ডেকে ওঠে৷ হ্যাঁ ওর আসল নামটা আমি জানি৷ হিন্দু নাম ছাড়া বাড়ি ভাড়া পেতে অসুবিধা হত৷ ভাবছেন নিশ্চয় ডকুমেন্টস দেখলেই ধরা পড়ে যাবে৷ দূর এসব গণ্ডগ্রামে কাগজ দেখে বাড়ি ভাড়া দেয় না৷ নগদে ভাড়া গুণে নেয়৷ একলা মেয়ে হলে একটু মুশকিল হয়, তবে তারার সিঁথিতে তো সিঁদুর আছে৷ ও থাকলেই হবে৷
তারা ব্যাগের মধ্যে স্টিলের টিফিন কৌটো আর জলের বোতল ঢুকিয়ে বেরিয়ে পড়ল৷ মাথার উপর ছাতা খুলে, বুকে হলুদ ফাইলটা ধরে পাড়াটা দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল৷
—-এখানে কীসের অফিস কে জানে! কোথায় যায় বলত সেজেগুজে? বিলুর কথার মাঝেই তপন হাতটা বাড়িয়ে দিল৷ বিলু বিরক্ত চোখে তাকাতেই তপন বলে উঠল, ‘‘মালটা ছাড় আগে, তারপর বলছি৷’’ ওর হাতে বিড়িটা গুঁজে দিতেই দু টান দিয়ে তপন গোপন খবর দেবার মতো ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, ‘‘মেয়েছেলেটার পঞ্চায়েত অফিসে বেশ খাতির, তবে ওখানে কাজ করে না৷ একটা বিদেশি এন. জি. ও-র হয়ে কাজ করতে এসেছে৷ আশেপাশের আরও কয়েকটা গ্রাম নিয়ে কাজ করে৷ গরিব পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়, কাজটার ব্যাপারে কিছু জানি না বস৷’’
‘‘মান্টু সোনা আমার, অনেক খবর জোগাড় করেছ, বাকিটা ওর শোবার ঘরে চা খেতে খেতে ওর থেকে শুনব৷’’ তপন বিড়ি টানতে ভুলে গেল, বলে কী! ওর শোবার ঘরে সটান ঢুকে যাবে?
আমি ওদের কথা শুনতে শুনতেই তারার পিছু নিই৷ এই তো বাঁশ বাগানের রাস্তাটা ধরে ও তরতর করে এগিয়ে চলছে৷ জায়গাটা বেশ ভালো অন্ধকার, সীতারা বলে ডেকে চমকে দেব নাকি? নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলাম৷ হাসির শব্দ কি মেয়েটার কানে গেল? কেমন যেন ভীত সন্ত্রস্তভাবে দৌড়ে বাঁশবনটা পেরিয়ে গেল৷
আজ আমি ছায়ার মতো লেগে থাকলাম ওর পিছনে৷ হতদরিদ্র বাড়িগুলো ঘুরে ঘুরে জিজ্ঞাসাবাদ করে ফাইল খুলে কাগজে নোট করে রাখছিল৷ অর্ধেক বাড়িতে তো মুখের উপর দরজাই বন্ধ করে দিয়েছে৷ দুপুর গড়িয়ে যখন রোদের তেজ মিঠে হল, তারা একটা গাছের তলায় বসে টিফিন বক্স খুলে রুটি তরকারি খেল৷ তারপর এক ঢোঁকে অনেকটা জল খেয়ে ফেলে বোতলটার দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকাল৷ মনে হয় ভাবছিল, এখনও অনেক কাজ বাকি, জল না পেলে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে৷ আশেপাশে একটাও চাপাকল চোখে পড়ল না৷ লোকালয় ছাড়িয়েও অনেকটা বেরিয়ে এসেছে সে, অবশ্য জল চাইলেই যে লোকে তাকে জল দিত এমন না৷ তারা উঠে পড়ল, চলতে শুরু করল ওর অন্য গন্তব্যে৷ মুখের বিমর্ষ ভাবটা দূর করে মুখে যথাসম্ভব স্মার্টনেস ফোটাবার চেষ্টা করল৷
ছবি?
প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে তারা ফ্যালফ্যাল করে ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে৷ তারার অবস্থা দেখে ওরা হা হা করে হেসে ওঠে৷ ওদের আস্পর্ধা দেখে তারা অবাক হয়ে যায়৷ ভর সন্ধ্যাবেলায় ছেলে দুটো কড়া নাড়ল, একগাল হেসে বলল, ‘‘আলাপ করতে এলাম৷’’ তারাকে লোকাল অফিস থেকে ইন্সট্রাকশন দেওয়াই আছে, লোকাল লোকজনকে না চটাতে৷ তারা তাই দ্বিধা নিয়েও দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ওদের ভিতরে আসার সুযোগ করে দিয়েছিল৷ নিজের চা খাওয়া হয়নি, ওদের সঙ্গেই চা খেতে বসল৷ তপন নামের ছেলেটা চায়ের কাপ হাতে সটান ঘরে ঢুকে গিয়ে এদিক-ওদিক চোখ বোলাচ্ছিল৷ বিলেই প্রশ্নটা করল৷ তারার মুখ দেখে তপন এবার বলল, ‘‘বুঝতে পারছেন না, তাই না? আপনার ফ্যামিলি ছবি, বিয়ের ছবি দেখতে পাচ্ছি না তো, আপনি তো ম্যারেড৷’’
‘‘ছবি নেই, আমি এখানে এক বছরের জন্য এসেছি৷ এত কিছু নিয়ে আসার দরকার পড়েনি৷’’
‘‘দিদি তো আবার ফেসবুক করেন না, তাহলে মোবাইলে এক পিস ছবি কি থাকবে না আপনার হাজব্যান্ডের?’’ লাল লাল ছোপ ধরা দাঁত বার করে বিলে বিশ্রী ভাবে হেসে উঠল৷ তারার মুখ চোখ লাল হয়ে উঠছে৷ এরা পেয়েছে কী! তার ঠিকুজি কুষ্ঠি জানাতে বাধ্য নয় সে৷ ছেলে দুটো এবার বলে ওঠে ওসব বর ফর নেই বলেই দিন না মাইরি, কেন সতী সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন?’’
‘‘বেরিয়ে যাও এখুনি, নাহলে তোমাদের পুলিশে দেব৷’’ চিৎকার শুনে আমি উঁকি মারলাম৷ তারার এমন রুদ্রমূর্তি আমি দেখিনি৷ থরথর করে কাঁপছে৷ বিলেরা একটু ঘাবড়ে গেছে, আধ খাওয়া চায়ের কাপ রেখে বেরিয়ে গেল৷ তবে আমি জানি ওরা কতটা বিষাক্ত৷ একা মেয়ে দেখলে ওদের দাঁতগুলো ধারালো হয়ে ওঠে নারী মাংসে কামড় বসাবার জন্য৷ এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে৷ সেই মেয়েটার মাথায় সিঁদুর ছিল না, তার বাড়িতে কাজের সূত্রে আসা পুরুষটিকে জড়িয়ে নোংরা কথা, দরজার শিকল তুলে দিয়ে গ্রামবাসীদের ডাকা, নানাভাবে হেনস্থার শিকার হয়ে সেই মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়ে মরেছিল৷ তারার মাথায় সিঁদুরের রেখা দেখে তাই ভেবেছিলাম, মেয়েটা বেঁচে যাবে৷ ভুল ভেবেছিলাম৷
তারা কাঁদছিল, সীতারা থেকে তারা হয়েও তার মুক্তি নেই৷ হিন্দুর গ্রাম, অজস্র মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সীতারার এখানে ঠাঁই হত না৷ জোনাল অফিস থেকে এও বলেছিল, একা মেয়ে দেখলেই উৎপাত শুরু হবে, বিবাহিতা সেজে যাও৷ ছ মাসের মধ্যে এই রকম পঞ্চাশটি গ্রামের দরিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী পরিবারগুলি থেকে স্ত্রীরোগে ভুগছে এমন মহিলাদের ডেটা তৈরি করে পাঠাতে হবে একটি এন. জি. ও. সংস্থাকে৷ তারপর তাদের আসল কাজ শুরু হবে৷ তারাদের কাজ শুধু গ্রাউন্ড লেভেলে৷ ডেটা পাঠাবার পর এক্সপার্ট টিম অ্যানালিসিস করে কাজ শুরু করে দেবে৷
তারা ফোনটা ব্যাগ থেকে বার করল৷ ফেরার পর হাত পা ধুয়ে সবে রান্নাঘরে ঢুকেছে তখনই আপদগুলো এল৷ দু’বার ফোন করার পরও প্রতীক যখন ফোনটা ধরল না, একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল, ‘‘আরজেন্ট, কল মি৷’’ প্রতীকের ফোন এল রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর৷ একটু যেন গম্ভীর গলা৷ ‘‘সীতারা, বাড়িতে কিছুতেই তোমাকে মেনে নেবে না৷ আমাদের বরং আর যোগাযোগ না রাখাই ভালো৷’’
‘‘একটা শিক্ষিত ছেলে হয়ে তুমি হিন্দু মুসলিম বিভেদ করছ? আমার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আগে একবারও মাথায় ছিল না এই বিভাজনের কথা?’’ তারা গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে৷ প্রতীক, চাকরি পাবার পর থেকেই একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছিল৷ সীতারার খুব ভয় করত, কিন্তু সে লক্ষ্য করল সাময়িক উত্তেজনার বশে সে চিৎকার করে উঠেছিল ঠিকই কিন্তু এখন যেন ভয়টা একটু একটু করে কমে যাচ্ছে৷ নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে পড়ল, কিন্তু শুলেই কি ঘুম আসবে? একটু পরেই তো কে যেন তার নাম ধরে ডাকবে, ‘সিতারা, এই সিতারা...৷’ প্রতি রাত্রের মতোই সে আতঙ্কে উঠে বসবে, গ্রামের লোকরা বুঝি জেনে গেল তার পরিচয় গোপন করার কথা? কেউ থাকে না, শুধু বাতাস যেন ফিসফিস করে কানে কানে কী যেন বলে যায়৷
ক’টা দিন ব্যস্ততার বধ্যে কেটে গেল৷ আসা-যাওয়ার পথে বিলে বা তপনকে দেখা যায়নি৷ ধমকানি খেয়ে অসভ্য ছেলে দুটো শুধরে গেল নাকি? লক্ষণ ভালো লাগছে না৷ ঝড়ের পূর্বাভাষ নয়তো! বাতাসে কীসের যেন একটা গন্ধ টের পায় তারা৷ নাক টেনে গন্ধটা বোঝার চেষ্টা করে, তারপর হনহন করে হেঁটে যায়৷
ঠিক এক সপ্তাহ পরে এক ঝড়-জলের রাতে চোখ দুটো একটু লেগে এসেছিল তারার৷ ছাদের টালি সরিয়ে ঝুপ ঝুপ করে জনা চার তার ঘরে ঢোকার পর তারার ঘুম ভাঙে৷ বড্ড দেরি হয়ে গেছে৷ প্রতিরোধ করার সময়টুকু মেয়েটা পায়নি৷
এই প্রথমবার আমি জোরে ডেকে উঠলাম সিতারা...জানি না অশরীরী গলার স্বর কোন মন্ত্রবলে আজ পালটে গেল! মেয়েটা চিৎকার করে উত্তর দিল, হ্যাঁ আমি সিতারা সিতারা খাতুন৷ জন্তুগুলো নামটা শুনে একটু থামল, তারপর নতুন উদ্যমে মেয়েটাকে ছিড়ে ফেলতে লাগল আদিম উল্লাসে৷ লুঠ হয়ে যেতে যেতে তারা শুধু ভাবছিল নারীর নরম মাংসের কোনও ধর্মও হয় না৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন