আমি এবং সর্বনাশী

মহুয়া মল্লিক

ওর সঙ্গে আমার দ্বন্দ্বটা ইদানীং বড্ড বেড়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি আমার যা কিছু পছন্দ সেসবে ওর তীব্র আপত্তি কেন! আমার শাড়ির রঙ, খোঁপায় আলতো জুঁইয়ের মালা অথবা মিঠাপাতি পানের জন্য অনাবশ্যক হেদিয়ে মরা সবকিছুতেই ওর তীব্র আপত্তি। বিড়বিড় করে বলে যতসব গেঁয়ো কনসেপ্ট। এই যেমন এখন আয়নার মধ্যে দিয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ও ফুঁসছে। আমি ঠোঁট ফাঁক করলেই ও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, ফালা ফালা করে দেবে আমায়।

আমি পাত্তা না দিয়ে নাইটক্রিমের বাহারি কৌটোটা বিশেষ মনোযোগ সহকারে দেখতে থাকলাম। দেখতেই থাকলাম। এই বিদ্যাটা আমি বেশ কিছুদিন রপ্ত করেছি। স্কুলে যখনই শাড়ি বিক্রেতারা আসে, হয় আমি ক্লাসে না হয় মিড ডে মিলের তদারকিতে ব্যস্ত থাকি। কদাচিৎ স্টাফরুমে থাকলেও পছন্দের শাড়িগুলো বিদিশা, তন্বীদের টপকে আমি কখনোই ম্যানেজ করতে পারি না। হয়ত একটা গ্রে সেস হাতে নিয়েছি, বিদিশা ছুটে এসে ওটাই টেনে নিয়েছে। বা আমি হয়ত নীল খাদিটা নেব ভেবে এগিয়ে গেছি তার আগেই তহমিনাদি ছোঁ মেরে ওটা তুলে নিয়েছেন। তারপর আমার দিকেই হাতের শাড়িটা এগিয়ে দিয়েছেন, ''দেখ তো মিঠু, এটা কেমন হবে?''

আমি কোনও কথা না বলে আত্মমগ্নের মতো শাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি, তাকিয়েই আছি। একটুকরো নীল সমুদ্র শাড়ির জমি থেকে লাফিয়ে ততক্ষণে আমার বুকের ভিতর ঢুকে গেছে। তহমিনাদি আমার নীরবতায় কী বুঝলেন কে জানে! হাতের শাড়িটা ফেলে তিনি ততক্ষণ একটা রাস্ট কালারের জামদানি নিয়ে মেতে গেছেন। আজও সেই একই খেলা কিছুক্ষণ চালাবার পর আয়নার মধ্যে তাকিয়ে ওকে খুঁজলাম। ও নেই। আমার নীরবতায় বিরক্ত হয়ে নিঃশব্দে কখন সরে গেছে।

দীপ, দীপ চৌধুরীকে নিয়েই ওর আর আমার ঝামেলার সূত্রপাত। এতগুলো বছর একা থাকতে থাকতে নিজের অজান্তেই আমি কেমন পুরুষ বর্জিত হয়ে গেছিলাম। সেই ছোটবেলায় গরমের ছুটির দিনগুলো ঠাম্মার কাছে থাকতে যেতাম। আদরে সোহাগে ক'টা দিন কী আনন্দ কী আনন্দ! সন্ধেতে বিশাল ছাদে ঠাম্মার কোলে শুয়ে গল্প শোনা আর কাছেই দামোদরের গর্ভ থেকে উঠে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া। দুপুরে মস্ত বাগানের কাঁচা মিঠে আম। সকালে ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই, যত ইচ্ছে ঘুমাও। কেউ টেনে তুলে দেবার নেই।

কিন্তু একদিন খুব সকালে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে দেখি, দাদু একটা মুড়ো নারকেল ঝাঁটা নিয়ে ঠাম্মাকে মারছে আর উঠোনে জড়ো হওয়া একরাশ মাছ ছুঁড়ে ছুঁড়ে পাঁচিল টপকে ফেলে দিচ্ছে। আমাদের প্রকাণ্ড উঠোনটা জুড়ে থিক থিক করছে ভিড়। সবাই নির্বাক দর্শক। কেউ এগিয়ে আসছে না, কেউ প্রতিবাদ করছে না। ছোট আমি কীই—বা করতে পারি? কাঁদতেও ভুলে গেলাম। পরে শুনেছিলাম পুকুরের মাছ থেকে ঠাম্মি একটা সিলভার কার্প নিজের বাপের বাড়িতে পাঠিয়েছিল। এই ছিল তার অপরাধ। ওই মাছ এমনিতেই কেউ খায় না, এ—বাড়ি ও—বাড়ি দান হতই। ঠাম্মি নিজে হাতে বিনা অনুমতিতে দিয়েছে কেন? এই তার অপরাধ। সেই পুরুষ মানুষকে ঘেন্না করার শুরু। পরে ফুলকাকু, বাবা, প্রাইভটে টিউটর কেউ না কেউ এই ঘেন্নাটাকে আরও উসকে দিয়েছে।

দীপের সঙ্গে আমার দেখাটাই কেমন যেন স্বপ্নের মতো। মাঝে মাঝে ভাবি আদৌ কী আমাদের কখনো দেখা হয়েছিল? নাকি সবটাই আমার কল্পনা! একা হতে হতে একটা সময় আমি নিজের মনের মতো কারুকে স্বপ্ন দিয়ে বানিয়ে নিয়েছি নিজের মতো করে? এত ভালো, এত সহনশীল, এত কেয়ারিং পুরুষ মানুষ আদৌ বুঝি হয়!

দীপের সঙ্গে সিনেমার অন্ধকার, ইকোপার্ক শীতের ওম ওম দুপুর অথবা ওর চোখের রামধনু নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা নেই। কিন্তু ও যখন রাতের পর রাত ফোনে ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকে, ''মিঠাই, অনেক তো হল ইচ্ছে আকাশ, একলা ডানায় ভেসে বেড়ানো জীবন, চলো এবার ঘর বাঁধি।'' ভয়, একটা অজানা ভয়, আর ঘেন্না মিলেমিশে টুঁটি টিপে আমাকে দেওয়ালে ঠেসে ধরে। খাঁচার মধ্যে একটা পাখি ডানা ঝাপটিয়ে যায়। আমার চোখের সুড়ঙ্গ বরাবর দীপ সেঁধিয়ে যেতে চায়। অসীম ধৈর্য নিয়ে দিনের পর দিন আমাকে কাউন্সেলিং করাতে নিয়ে যায়। আমি নাকি ঠিক হয়ে উঠছি ক্রমশঃ। হ্যাঁ হয়ত আমি ঠিক হচ্ছি, তাই দুম করে সমস্ত ব্লক অপশন চেপে ধরি। তার আগে দীপকে জানিয়ে দিই, সিকিউরিটিকে বলা আছে আমার পারমিশান ছাড়া কেউ এলে তাকে যেন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেওয়া হয়।

দীপকে এভাবেই দূরে সরিয়ে দেওয়া গেল। কিন্তু আরেকজন! সে যে কবে আমারই প্রতিপক্ষ হয়ে আমাকে শাসানো শুরু করল জানি না। কানে কানে ফিসফিস করে বলে যায়, ই. এম. আই. দিয়ে দিয়ে তো বুড়ি হয়ে যাবি, দীপকে ছাড়িস না। শাঁসালো মাল। আমাকে সর্বনাশের মন্ত্র শেখায় ও। ঐ সর্বনাশীকেই আগে শেষ করতে হবে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। দীপেরই দেওয়া বিষ্ণুপুরী সিল্কটায় ফাঁস তৈরি করে শূন্যে ছুঁড়ে দিই। একটা টুলের উপর দাঁড়াই। শেষবারের মতো আয়নায় তাকাই সর্বনাশীর জিভটা বেরিয়ে গেছে, চোখ দুটো বীভৎস ভাবে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%