তিব্বতী লকেট

মহুয়া মল্লিক

এক

অন্ধকার পার্কিংলটের মধ্যে হাঁটতে ঝিলমিলের বড্ড অস্বস্তি হচ্ছিল৷ আজ এত কম আলো জ্বলছে কেন কে জানে! এর আগেও অনেক রাত্রে ফিরেছে সে, গাড়ি পার্ক করে হেঁটে এসেছে অ্যাপার্টমেন্ট পর্যন্ত, কখনো অসুবিধা হয়নি৷ আলো কম বেশি জ্বলে এখানে এ নিয়েও অসুবিধা হয়নি আগে৷ আসলে ডাউন টাউনের এসব অ্যাপার্টমেন্টগুলো এরকমই, খুব সস্তায় পাওয়া যায়, তাই মেইনটেনেন্স নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামায় না৷ এতদিন ঝিলমিল শেয়ারিং এ থাকত একটি ডাচ মেয়ের সঙ্গে, কিন্তু নানারকম অসুবিধা হচ্ছিল, তাই বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়া মাত্র যোগাযোগ করছিল৷ ভাগ্য ভালো একজন ইন্ডিয়ান কাপল অ্যাপার্টমেন্টটা ছাড়ব ছাড়ব করছিল, প্রজেক্ট শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই দেশে ফিরতে হবে তাদের তাই লিজ ব্রেক হওয়ার ক্ষতিপূরণ এড়াতে নিজেরাই ভাড়াটে খুঁজতে উঠে পড়ে লেগেছিল৷ ঝিলমিলকে দেখে ওদেরও বেশ পছন্দ হয়েছিল, আর ঝিলমিলের পছন্দ হয়েছিল খোলামেলা অ্যাপার্টমেন্টটা৷ ওয়ান বি এইচকে হলেও বেশ হাত পা ছড়িয়ে থাকা যাবে৷ কার্পেট যদিও বেশ পুরনো, ঝিলমিল ঠিক করে নিয়েছিল, নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করেই কার্পেট পরিষ্কার করিয়ে নেবে৷ কারণ তার টিভি দেখা, বই পড়া বা ল্যাপটপ নিয়ে কাজ সবই তো পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে৷ তার এই অভ্যাস নিয়ে ছোটবেলায় ঠাকুমা যে কত বকুনি দিয়েছে৷

বাড়ির কথা মনে পড়ায় ঝিলমিল একটু উদাস হয়ে গিয়েছিল৷ এসব ভাবতে ভাবতে অ্যাপার্টমেন্টের একদম কাছে পৌঁছে গিয়েছিল সে৷ মাথাটা হঠাৎ ভারভার লাগে, নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে৷ আর তারপরেই বিপত্তি, সিঁড়ির একদম মাথায় কালো বিড়ালটা বসেছিল, প্রথমেই ওর চোখ দুটো চোখে পড়েছিল, ধিকিধিকি আগুনের মতো জ্বলছে, ঝিলমিল ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে, বিড়ালটাকে তাড়াতেই সে এক ঝাঁপ দিয়ে তার কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল৷ ক্ষিপ্র গতিতে বিড়ালটাকে সরে যেতে দেখে একটু অবাকই হয়েছিল ঝিলমিল, কারণ এখানে অনেকেই বিড়াল পোষে, সেইরকমই কারুর পোষা হবে, সুযোগ পেলেই এরা বাইরে ঘুরে বেড়ায়৷ পোষা বিড়াল তো পায়ে পায়ে ঘোরে এভাবে পালায় না৷ তবে ঝিলমিল বেশি ভাবার সময় পায় না, তার কাঁধের কাছটা জ্বালা জ্বালা করে ওঠে, তাড়াতাড়ি দরজা খুলে নিজের অ্যাপর্টমেন্টে ঢুকে এসে উজ্জ্বল আলোর নীচে দাঁড়াতেই চোখে পড়েছিল, সাদা টপের হাতায় সূক্ষ্ম রক্তের দাগ৷ তার মানে বিড়ালটা আঁচড়ে দিয়ে গেছে৷ সামান্য একটু ফাস্ট এড করে বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দেয়৷ শরীরটা এত খারাপ লাগে যে জামাকাপড় পাল্টানোরও সুযোগ হয় না৷

খুব সকালবেলায় লোকজনের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল, উইকেন্ডে এত সকালে ওঠার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না ঝিলমিলের৷ বিরক্ত মুখে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়, তখনই চোখে পড়ে গতরাতের সেই কালো বিড়ালটা মরে পড়ে আছে, মাথাটা কেউ ধড় থেকে খুবলে নিয়েছে, নৃশংস দৃশ্য৷ ঝিলমিল দৌড়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে বমি করে ফেলল৷

এই ঘটনার ঠিক দুদিন পরে আবার ঝলমলে একটা দিন৷ উইকেন্ড কাটিয়ে ঝিলমিল অন্যদের মতন বেশ ফ্রেশ মুড নিয়ে অফিসে গেল৷ এদেশে নিয়ম অনুযায়ী উইকডেন্ডে সে মুখ গুঁজে কাজ করে আর ছুটির দিনটা নিজের মতো কাটায়৷ এবারই তার ব্যতিক্রম হয়েছিল, হাল্কা জ্বর আর মন খারাপ নিয়ে কাটানোর পর আজ অবশ্য সে বিন্দাস মুডে কাজ সেরে ফিরে এল, তারপর ড্রেস পাল্টে জিমে চলে গেল৷ আজ একটু বেশি ওয়ার্কআউট করার প্ল্যান৷ ট্রেডমিলের উপর ছুটতে ছুটতে কাচের দেওয়াল দিয়ে দেখে সুইমিং পুলে তেমন লোকজন নেই, তার মানে, বেশ রাত হয়ে গেছে৷ এমন ফাঁকা পুল দেখে ঝিলমিল বরাবরই লোভ সামলাতে পারে না, আজও তার ব্যতিক্রম হল না৷ তাড়াতাড়ি জিম থেকে বেরিয়ে পুলে নেমে পড়ল৷ ভাগ্যিস সুইম স্যুটটা লকারে রাখা ছিল৷ মনের সুখে জল তোলপাড় করতে করতে একসময় টের পেল সে ডুবে যাচ্ছে, এইটুকু জলে কেউ ডোবে না, কিন্তু কে যেন তার মাথাটা ধরে নীচের দিকে টানছে, কাছেই কোথাও একটা বিড়াল একটানা কেঁদে যাচ্ছে৷ ঝিলমিল হাত পা নেড়ে জল ঠেলে উপরে উঠতে চাইছে, এবার যেন কেউ ওর হাত, পা চেপে ধরেছে৷ ওরা ঠিক কতজন? একজনের পক্ষে কি এভাবে দুটো হাত, দুটো পা এবং মাথা চেপে ধরা সম্ভব? ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে ঝিলমিল৷

দুই

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঝিলমিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখছিল৷ কদিন আগেই তার সঙ্গে এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল, যদিও কেউ শুনতে চায়নি তার কথা৷ জিমের ট্রেনার পুলে তাকে ডুবে যেতে দেখে ছুটে এসে শেষ মুহূর্তে তাকে বাঁচিয়েছিল৷ ডক্টর ডাকা হয়েছিল, ডক্টর বলেছিলেন, সে ভীষণ উইক ছিল, কয়েক সেকেন্ডের ব্ল্যাকআউটে এমনটা হয়েছিল, এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই৷ রেস্ট আর হেলদি ডায়েট দরকার৷ আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখে, এই তো তার ফর্সা গলায় আঙুলের ছাপ, কেউ যে গলা টিপে ধরেছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ৷

গলায় একটা বাহারী স্কার্ফ ঝুলিয়ে সে অফিসে বেরিয়ে যায়৷ হেলদি ডায়েটের মধ্যে থাকলেও পর্যাপ্ত রেস্ট নেওয়া সম্ভব না৷ এক-আধদিন ওয়ার্ক ফর্ম হোম করলেও টানা সেটাও করা যায় না৷ ড্রাইভ করতে করতে অপরূপ প্রকৃতিকে দেখছিল৷ মেপেলের পাতায় পাতায় কমলা রঙের বৈভব, রঙের এমন বিস্ফোরণ, এমন উৎসব চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না৷

সেই সময় জিয়ার ফোন এল৷ ‘‘কেমন আছিস ঝিল?’’ অনেকদিন দেখা হয় না৷ আজ বসবি কোথাও? সুহানাকেও বলেছি৷’’

জিয়ার ফোন এলেই মন ভালো হয়ে যায়৷ তারা দুজন নার্সারির বন্ধু৷ আঙ্কল ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাবার সময় নাকি দুজনে খুব কেঁদেছিল, সেসব তাদের মনেও নেই৷ এখানে এসে আবার অদ্ভুতভাবে যোগাযোগ হয়ে গেছে৷ জিয়ার সঙ্গে ওয়েভলেন্থেও মেলে ভালো৷ সে অনেকটাই তার মতো৷ এখানকার ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট ডক্টরেট করছে, সুহানা ওর বন্ধু, দুজনের সেম সাবজেক্ট৷ ওদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটালেই মন ভালো হতে বাধ্য৷

ঝিলমিলকে চুপ থাকতে দেখে জিয়া তাড়া দিল, ‘‘কীরে বিজি থাকবি? তাহলে অন্যদিন৷ আসলে এখানে তো উইকেন্ড ছাড়া কেউ বসে না, এটা মাথায় রাখা উচিত ছিল আমার৷’’

‘‘কী যে বলিস জিয়া! আমরা কি আমেরিকান নাকি? সেটা নয়, আসলে....’’৷ ঝিলমিল আমতা আমতা করে৷ বন্ধুকে বলতে পারে না, রাত করে বাড়ি ফেরার কথা আর সে চিন্তাই করতে পারে না৷ যদিও এই চার দেওয়ালেও সে খুব যে সুরক্ষিত তাও না, রোজ রাত্রে ঘুমের মধ্যে মনে হয় কে যেন মুখের উপর ঝুঁকে তাকে দেখছে, চোখ খুললেই মনে হয় পর্দার আড়ালে কে যেন মিলিয়ে গেল৷ বা বন্ধ কল দিয়ে জল বেরিয়ে যাবার আওয়াজ, দৌড়ে কল বন্ধ করতে গিয়ে দেখে, কোথায় কি!

‘‘আসলে কি? আমাকেও বলতে আপত্তি?’’

‘‘বাইরে কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না রে, আমার এখানে যদি বসিস?’’

‘‘এই কথা? বেশ আমরা পৌঁছে যাব, তুই ফিরবি কখন সেটা জানা৷’’

‘‘এই ধর এইট পি. এম.৷’’

‘‘ওক্কে, সফট ড্রিঙ্কস আর চিপস ছাড়া আর কিছু ব্যবস্থা করিস না, আমরা নিয়ে যাব সব৷’’

ঝিলমিলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল জিয়া৷

তিন

একটানে ঝিলমিলের গলা থেকে স্কার্ফটা খুলে দিল সুহানা৷ জিয়াই প্রথম লক্ষ্য করে ড্রেস চেঞ্জ করে আসার পরও স্কার্ফটা খোলে নি সে৷ জিয়া-দু একবার বলতেই এড়িয়ে গেছে, সবার হাতে হাতে জুসের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে কিচেনে ঢুকে গেছে৷

সুহানা স্কার্ফটা খুলতেই সেটা আঁকড়ে ধরে ঝিলমিল৷ কাতর গলায় বলে, ‘‘প্লিজ৷’’ ব্যাপারটা জিয়ার চোখেও আশ্চর্য লাগে, সামান্য একটা স্কার্ফ নিয়ে এমন করছে কেন মেয়েটা? এত ন্যাকা টাইপ তো গত এক বছরের মেলামেশায় একটুও মনে হয়নি ওকে! তাহলে?

জুসের গ্লাসটা রেখে উঠে আসে জিয়া৷ ঝিলমিলের পিঠে হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘‘কী হয়েছে রে? এমন করছিস কেন?’’ ওর গলায় এমন কিছু ছিল, ঝিলমিল ঘুরে দাঁড়ায় তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে, সুইমিং পুলের ঘটনাটা বলে, তারপর বলে, ‘‘কেউ আমায় মেরে ফেলতে চাইছে, এই দেখ আমার গলায় এখনো দশ আঙুলের দাগ, আর এটা ঢাকতেই...৷’’ সুহানাও উঠে এসেছে ততক্ষণে, ওরা দুজনেই ঝিলমিলের গলার দিকে তাকায়, উজ্জ্বল আলোর নীচে ভালো করে দেখে, কোনও দাগ চোখে পড়ে না ওদের৷ সে কথা বলতেই ঝিলমিল পাগলের মতো আয়নার সামনে দৌড়ায়, তারপর ওদের ডাকে, ‘‘এই তো দাগ, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি, আর তোরা মিথ্যা বলছিস!’’ জিয়া আর সুহানা লক্ষ্য করে কথাগুলো বলতে বলতে চোখ লাল হয়ে উঠছে ঝিলমিলের, সারা শরীর কাঁপছে আর মুখ দিয়ে থুতু ছেটাচ্ছে৷ ওরা পরস্পরের দিকে তাকায় কয়েক মুহূর্ত, ওদের মধ্যে একটা গোপন বোঝাপড়া হয়ে যায়৷

জিয়া আরেকটু কাছে যায়, ‘‘হ্যাঁ এই তো দাগ, এতক্ষণ চোখেই পড়েনি৷’’ দেখাদেখি সুহানাও একই কথা বলে৷ ঝিলমিল এবার একটু শান্ত হয়৷ নিজেকে সামলে নেয়৷ স্কার্ফটা আবার গলায় জড়াতে গেলে জিয়া বাধা দেয়, ‘‘আমরাই তো আছি, ছাড় না, চল এবার ডিনার করে নিই৷’’ ঝিলমিল মুখেচোখে জল ছিটিয়ে ওদের সঙ্গে খাবার গরম করে প্লেট সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷ খাওয়াদাওয়া শেষে জিয়া, সুহানাকে ফিরে যেতে বলে৷ ঝিলমিলের কাছে রাতে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই দেখে ঝিলমিলের চোখে কৃতজ্ঞতার ছায়া৷ মেয়েটা বেশ কয়েক রাত্রি ভালো করে ঘুমায়নি৷ চোখের নীচে কালি দেখে প্রথমে ভেবেছিল কাজের চাপে এই অবস্থা, কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ তা নয়৷ আজ অন্তত ভালো করে ঘুমাক তবে তার আগে জিয়া অনেক গল্প করবে৷ গল্প করতে করতেই খুঁজে বার করবে আসল কথাটা৷ সুহানা এক ফাঁকে তাকে জানিয়েছে, ‘‘ব্যাপারটা তার ভালো লাগছে না, কোথায় একটা গোলমাল আছে, ঝিলমিল তো এমন প্যানিক করার মেয়ে নয়৷ তুই সবটা জানার চেষ্টা কর, তারপর ওর এক বান্ধবীকে এই বাড়িতে আনবে, সম্ভবত বাড়ির কোনও দোষ৷’’

ঝিলমিল এই ক দিনের সমস্ত ঘটনা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল জিয়াকে৷ শুনতে শুনতে জিয়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল, তবু সে ঝিলমিলের কথা শেষ হলে জিজ্ঞেস করে, ‘‘জল খাবি?’’ বলল বটে, তবে জলের বোতলটা অনেক আগেই খালি করে ফেলেছে সে নিজেই৷ জল আনতে কিচেন অবধি যেতে হবে ভেবেই হাত-পা আরও যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে৷ ঝিলমিলকে এক ঝলক দেখে উঠে পড়ল বিছানা থেকে৷ শোবার ঘর পেরিয়ে, লম্বা একটা প্যাসেজ ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে তবে কিচেন৷ জিয়া দেখল একটা জমাট অন্ধকার যেন নড়েচড়ে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে গেল৷ তবু সে সাহসে ভর করে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল, বাইরের আলোয় ঘরটা আবছা আলোছায়ায় ভরে আছে, ফলে আরও রহস্যময় লাগছে৷ কিচেনের দরজার সামনে গিয়ে থমকে গেল জিয়া, একটু আগেও এখানে কেউ ছিল৷ মিষ্টি একটা পারফিউমের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে কিচেন জুড়ে, এই গন্ধটা তারা কেউ আজ কেন কোনোদিন ব্যবহার করেনি৷ কেউ ছিল, জিয়ার পায়ের শব্দ পেয়েই দেওয়াল বরাবর যেন উড়ে গেল, ধাক্কা লেগে চুরমার হয়ে যাবে এই ভয়ে কয়েক সেকেন্ড জিয়া চোখ বন্ধ করেছিল, চোখ খুলেই দেখে কেউ কোথাও নেই৷ লাইট অন করতেই উজ্জ্বল আলোয় ভরে যায় কিচেন৷ জানলা বা গারবেজ রাখার সরু প্যাসেজের দিকের দরজাটা বন্ধ৷ যে ছিল সে কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? অদ্ভুত তো!

জল নিয়ে ফিরে আসে৷ ঝিলমিল দু হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে বসেছিল৷ ওকে জল খাইয়ে শুইয়ে দিল৷ ওর পাশে শুয়ে জিয়া আবার কথা শুরু করল৷ ঝিলমিলও জিয়ার সঙ্গে সহমত, অ্যাপার্টমেন্টের কোনও দোষ নেই৷ জিয়া নিজেও এখানে রাত কাটিয়ে গেছে, সুহানাও৷ আর ঝিলমিল তো প্রথম থেকেই একাই থাকে৷ কিন্তু হঠাৎ একটা গন্ডগোল শুরু হল, সেই যেদিন রাত্রে বাড়ি ফেরার সময় বিড়ালটার সঙ্গে টক্কর হল, তারপর থেকেই সব বদলে গেল৷ কে বা কারা যেন রাত হলেই ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়৷ সব সময় যেন ঝিলমিলকে লক্ষ্য রাখছে৷ জিয়া চুপ করে শোনে, ঝিলমিলের একটা বাক্যও তো মিথ্যা নয়, সে নিজেই টের পাচ্ছে কে যেন আশেপাশেই আছে৷ ঘাড় ঘোরালেই যেন তাকে দেখতে পাবে৷

চার

মারিয়া ঘরে ঢুকেই নাক টানতে শুরু করল, তারপর কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি করল কিছু সময়৷ একসময় ক্লান্ত হয়ে একটা চেয়ারে বসে কারুকে ফোন করল৷ ঝিলমিল, মারিয়ার রকমসকম দেখে খাঁটি বাংলায় বলে ফেলল, ‘‘এ কাকে ধরে আনলি? এ তো আস্ত পাগল৷’’ সুহানা ইশারায় চুপ করতে বলে ওকে, তারপর বলে মারিয়া কিন্তু ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা ‘‘প্যারানর্মাল এক্টিভিটি’’ সলভ করে ফেলেছে৷

একটু পরেই ফোন রেখে তার ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা মাঝারি মাপের কাচের বাটি বার করে টেবিলের উপর রাখে৷ নিজেই কিচেন থেকে জল এনে বাটিটা ভর্তি করে, তারপর ব্যাগ থেকে একটা ছোট কৌটো বার করে৷ বেশ সুন্দর দেখতে কৌটোটা৷ সেখান থেকে সাদা গুঁড়ো গুঁড়ো কিছুটা পদার্থ জলের মধ্যে ফেলে অপলক তাকিয়ে থাকে জলভরা পাত্রের দিকে৷ সাদা গুঁড়োটা সম্পূর্ণ মিশে গেলে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করতে থাকে৷ একসময় ধীরে ধীরে চোখ খোলে মারিয়া, জলভরা পাত্রের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একটা রহস্যময় হাসি৷

ওদের তিনজনের দিকে তাকায় মারিয়া, তারপর ঝিলমিলকে নির্দেশ দেয় সেদিন যেভাবে সেজে গিয়েছিল ঠিক সেভাবে সেজে যেন আবার আসে, সেদিনের রুমাল, ব্যাগ, এমনকি লিপস্টিকের রঙ পর্যন্ত যেন এক থাকে৷ এই অদ্ভুত কার্যকারণের মানে খুঁজে পাচ্ছিল না ঝিলমিল, এসবে তার বিশ্বাস নেই৷ তবু দুই বন্ধুকে আঘাত দিতে না চেয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল৷ কিছুক্ষণ পরেই সেদিনের মতো সেজে এল৷ ব্লু ডেনিম, সাদা টপ, লেদারের বেল্ট, বড় বড় ইয়াররিং, পার্পল লিপস্টিক, ডার্ক ব্রাউন হ্যান্ড ব্যাগ—-সব এক৷ তবু তাকে দেখে মারিয়ার কোঁচকানো ভ্রূ সোজা হয় না, জলভরা পাত্রের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধমক লাগায় ঝিলমিলকে৷

‘‘পুওর গার্ল, যদি বাঁচতে চাও, মনে কর আর কী ছিল সেদিন তোমার শরীরে?’’ ঝিলমিল একটু কেঁপে ওঠে, তারপর আবার ঘরের দিকে দৌড় লাগায়৷ একটু পরেই মারিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায় যখন, সবাই দেখে তার গলায় দুলছে অপূর্ব সুন্দর নানান রঙের পুঁতির একটা হার, তার ঠিক মাঝখানে বড়সড়ো একটা লকেট, তিব্বতে এধরনের লকেট দেখতে পাওয়া যায়৷ সম্ভবত তিব্বত বেড়াতে গিয়ে কেউ এনে দিয়েছে ঝিলমিলকে৷ লকেটটার রক্তলাল রঙের দিকে চোখ আটকে যায় জিয়া আর সুহানার৷ এদিকে পাত্রের জলে প্রবল আলোড়ন দেখা যায়, কী করে এটা সম্ভব? এই প্রথম ওরা দেখে মারিয়ার ভ্রূ জোড়া স্বাভাবিক আর মুখে চোখে প্রসন্ন ভাব ফুটে উঠেছে৷ ইশারায় তার সামনের চেয়ারে ঝিলমিলকে বসতে বলে৷ ঝিলমিল আলোড়িত জলের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে চেয়ারটা টেনে বসে পড়ে বাধ্য মেয়ের মতো৷

‘‘কোথায় পেয়েছ এই লকেটটা?’’

মারিয়ার প্রশ্নের সামনে চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করে ঝিলমিল৷ নাহ তার তো মনেই পড়ছে না, কোথায় পেয়েছে এটা! তবে সেদিন আয়নার সামনে সাজতে সাজতে মনে হচ্ছিল গলাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, জুয়েলারি বক্স খুলে সোনার চেনটা বার করার জন্য ড্রয়ারটা টানতেই একটা কাগজের মোড়ক চোখে পড়ে, কৌতূহলী হয়ে সেটা খুলতেই হারটা বেরিয়ে আসে৷ তার বান্ধবী তিস্তার গলায় এই রকম একটা হার দেখে মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কোথায় পেয়েছে জিনিসটা? তখনই জেনেছিল এটা তিব্বতী লকেট৷ সেইরকমই একটা জিনিস যে তার কাছেও আছে এটা সে জানতই না৷ তাই বেশি না ভেবে ওটা পরে নিয়েছিল৷

জিয়া বলার চেষ্টা করে, ‘‘এখানে তো ইন্ডিয়ান কাপল থাকত, তারা ফেলে গেছে কি?’’

মারিয়া এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল৷ জিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘‘তারা এ জিনিস কেন ফেলে যাবে? তাদের সঙ্গে কি ঝিলমিলের পূর্ব পরিচয় ছিল? চেনাজানা কেউ ক্ষতি করার জন্য এটা রেখেছে, এটা মারাত্মক জিনিস৷’’

‘‘চেনাজানা কেউ?’’ নিজের অজান্তেই ওরা তিন বান্ধবী তিনজনকে একবার আলতো চোখে দেখে নেয়৷ ঝিলমিলের মেলামেশা সবই বাইরে, এখানে জিয়া-সুহানা ছাড়া কেউ তো আসেই না৷ নাহ ক্রমশ ব্যাপারটা জটিল হয়ে যাচ্ছে৷ ঝিলমিল, মারিয়ার সম্মতি নিয়ে কফি বানাতে উঠে যায়৷ ওকে হেল্প করতে যায় সুহানা৷

চারজনে বসে কফি খাচ্ছিল৷ তিব্বতী লকেটটা একটা প্যাকেটে মুড়ে নিজের ঝোলা ব্যাগে ভরে নিয়েছে মারিয়া৷ ঝিলমিলের একটু মন খারাপ যে হয়নি তা না, জিয়া ওকে কথা দিয়েছে ওর থেকেও ভালো একটা লকেট তাকে গিফট করবে৷ ঠিক এই সময় ঝিলমিলের মায়ের ফোন আসে৷ টুকটাক কথা বলার পর তিনি সরাসরি চলে যান তিব্বতী লকেট বসানো হারটার প্রসঙ্গে৷

‘‘তোর নতুন ডিপিতে দেখলাম, হারটা৷ লকেটটা কী সুন্দর না! যেন রক্ত প্রবাল জ্বলজ্বল করছে৷ ওসব তোদের বয়সেই মানায়, আমাকে এসব জিনিস যে কেন দেওয়া বুঝি না৷’’

ঝিলমিল সজাগ হয়৷ মা জানে এই লকেটের কথা? তার মানে এটা মায়ের জিনিস? হ্যাঁ তার মা তো খুব সুন্দর সুন্দর জাঙ্ক জুয়েলারিতে সাজে৷ মায়ের দারুণ কালেকশান৷ ইসস সে কী বোকা! একবারও ভাবেনি মা তার জুয়েলারি বক্সে ওটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল৷ শিফটিং-এর সময় এদিক ওদিক হয়ে বেরিয়ে এসেছে৷’’

মা’কে থামিয়ে দিয়ে ঝিলমিল জিজ্ঞেস করে, ‘‘ওটা কে দিয়েছিল তোমায় মা?’’

‘‘কেন? তোর দেবযানী আন্টি দিল তো! মনে নেই গতবার তো ওরা তিব্বত ঘুরে এল, তারপরই সুনয়নার ছেলের বিয়েতে, আমায় দেখেই বলল চটপট এটা তোর ব্যাগে ঢুকিয়ে নে৷ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করারও সুযোগ দেয়নি৷ আমিও ভুলে গিয়েছিলাম, এবার তুই যখন এলি, খুঁজে পেতেই ভাবলাম....৷’’

মা বড্ড কথা বলে৷ মাকে থামিয়ে দিয়ে মামুলি দু-একটা কথা বলে ফোন রেখে দিল ঝিলমিল৷ তারপর সবটা বন্ধুদের শেয়ার করল৷ মা আর দেবযানী আন্টির গানের প্রোগ্রামের কথা, দুজনের ঠান্ডা লড়াই-এর কথা৷ দেবযানী আন্টি গানটা ছাড়েননি, যত্ন করে চর্চা করে গেছেন বছরের পর বছর ধরে, বিপুল সুনাম অর্জন করেছেন৷ মা জয়েন্ট ফ্যামিলি, সংসার, সন্তানের চাপে সব ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল৷ কিন্তু বছর কয়েক একটু অবসর মেলায় আবার ফিরেছে৷ মায়ের গলা ঈশ্বরদত্ত৷ অল্প সময়েই প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে৷ সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে চেনা বন্ধুরা সব সময় মাকেই বেশি ফেভার করে৷ দেবযানী আন্টি এটা নিতে পারে না৷

‘‘আর তাই ঈর্ষার আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চেয়েছিল প্রধান কমপিটিটরকে৷ এ ছিল মন্ত্রপূত লকেট৷ এই লকেট যেই ধারণ করত তারই ক্ষতি হত, শেষে মৃত্যু’’৷ মারিয়ার কথা শুনে শিউরে ওঠে ওরা তিনজন৷ মারিয়া, ঝিলমিলের কাঁধে হাত রাখে৷ আশ্বাস দেয় আর কিছু হবে না৷

সুহানা বলে, যে এত বড় ক্ষতি করতে চাইল, তার কিছু হবে না? একটা কঠিন শাস্তি কী দেওয়া যায় না ঐ আন্টিকে?

মারিয়া হাসে, ক্ষমা সুন্দর সে হাসি৷ ‘‘তুমি, আমি কে শাস্তি দেবার? বুকে ক্রশ আঁকতে আঁকতে বলে, প্রত্যেকেই তার কর্মের ফল ভোগ করে এই পৃথিবীতেই৷’’

ঠিক সাতদিন পরে বন্ধুদের অনুরোধে ‘‘হাউস ওয়ার্মিং’’ পার্টি চলছে ঝিলমিলের ঘরে৷ হাল্কা মিউজিকের সঙ্গে ঝিলমিল নাচছে, ওর চোখমুখ ঝলমল করছে৷ জিয়া আর সুহানা সেই আগের ঝিলমিলকে ফিরে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%