মায়া রয়ে যায়

মহুয়া মল্লিক

এক

আবছা আলোছায়ার ঘরটা তার চোখের সামনেই মুহূর্তে কোন মন্ত্রবলে টানেলে পরিণত হয়ে গেল৷ ক্রমশ মেয়েটি সেই টানেলের মধ্যে ঢুকে গেল৷ তারপর সেই টানেল বরাবর হাঁটতে শুরু করল৷ পথ আর তার শেষ হয় না, অনন্তকাল ধরে যেন হেঁটেই যাচ্ছে৷ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে আনন্দবাবুর৷ এক মুহূর্তও তিনি আর এই অসহ্য দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে চান না কিন্তু কোন যাদুবলে তার পা’দুখানা সামনের বাড়ির খোলা জানালার সামনেই আটকে আছে মিনিট পনেরো৷

ব্যাপারটা এই নিয়ে পরপর তিন রাত্রি ঘটল৷ মাঝরাত্রে রোজই আনন্দবাবুর টয়লেটে যাবার প্রয়োজন পড়ে৷ পরশু তেমনই প্রায় রাত্রি দুটো নাগাদ টয়লেট সেরে বারান্দা দিয়ে ফেরার সময় সামনের বাড়ির সদ্য শেষ হওয়া দোতলার মুখোমুখি জানালাটা খোলা দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন৷

স্ট্রীটলাইটের আবছা আলোয় দেখতে ভুল হল না একটি মেয়ের অবয়ব৷ এক পিঠ খোলা চুল নিয়ে জানলার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে৷ আনন্দবাবুর ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়েছিলেন, যতদূর জানেন এত বড় বাড়িতে বৃদ্ধ বৃদ্ধা ছাড়া কেউ থাকেন না৷ তাও তাঁদের দোতলায় কোনোদিন উঠতে দেখেননি৷ মাঝরাত্রে খোলা জানালায় এই রহস্যময়ী নারীকে দেখে তাই অবাক হবারই কথা৷ ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার জন্য আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন৷ এক সময় নিজের উপস্থিতি জানান দেবার জন্য অল্প একটা কাশলেন৷ সেই শব্দ শুনেই মেয়েটি নড়েচড়ে উঠল৷ তারপর সামনের দেওয়াল অভিমুখে হাঁটতে শুরু করল৷ আনন্দবাবু বিস্ফারিত চোখে দেখতে থাকলেন, ম্যাক্সিমাম বারো বাই চোদ্দর ঘরটা যেন প্রকাণ্ড ফুটবল মাঠ হয়ে গেছে৷ আস্তে আস্তে হাঁটার গতি বাড়তে লাগল, তারপর এক সময় ছুটতে শুরু করল মেয়েটি, তবু যেন সামনের সাদা দেওয়ালটার কাছাকাছি পৌঁছতে পারছে না৷ এই দৃশ্য দেখে আনন্দবাবু আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পাননি৷ টিউবটা জ্বালিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলেন৷

সকালে বেশ দেরিতে ঘুম ভেঙে ছিল৷ বিছানা থেকে নেমেই বারান্দায় দৌড়ে ছিলেন, যথারীতি দোতলার সমস্ত জানলা বন্ধ৷ দিনের বেলায় পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর লেগেছিল এবং অফিসে কাজ করতে করতে ভেবেছিলেন গতরাত্রে হোটেলের রিচ খাবারে অ্যাসিডিটি ফর্ম করেছিল তাই মাঝ রাত্রে হ্যালুসিনেট করেছিলেন৷

কিন্তু দ্বিতীয় রাত্রে আবার মেয়েটিকে দেখলেন খোলা জানলার গ্রীলে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিছুটা অলস, বিষণ্ণ সেই ভঙ্গি৷ ঘাড় ঈষৎ বাঁকানো, এক পাশের গালে তেরছা ভাবে আবছা আলো এসে পড়েছে৷ মেয়েটি যেন আস্তে আস্তে সজাগ হয়ে উঠল৷

আনন্দবাবুর উপস্থিতি যেন মুখ না ঘুরিয়েও শুধুমাত্র ঘ্রাণের মাধ্যমে টের পেতে শুরু করেছে৷ এখুনি যেন শুরু করে দেবে গতরাত্রের মতো প্রাণপণ হাঁটা৷ আনন্দবাবু আর দাঁড়ালেন না৷ নিঃশব্দে পায়ের পাতা টিপে টিপে প্রায় দৌড়ে নিজের ঘরে ফিরে এলেন৷

কিন্তু তৃতীয় দিন অফিসে কাজ করতে করতে ভাবলেন এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে৷ রাত্রে ভালো করে ঘুমতে পাচ্ছেন না৷ সারাদিন অদ্ভুত রহস্যময়ী ঐ ছায়ামানবী হন্ট করে বেড়াচ্ছে৷ কাজকর্মে মন বসাতে পারছেন না৷ প্রতিমকে একবার বলে দেখবে৷ ও রাজী হলে ভালো না হলে আজ রাত্রে আরো সতর্ক থাকবেন৷

লাঞ্চ আওয়ারে প্রতিমকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, ‘‘আচ্ছা তুমি কোনোদিন ভূতপ্রেত দেখছে?’’ রুটির টুকরো চিবোতে চিবোতে প্রতিম কিছুক্ষণ আনন্দবাবুকে অবাক চোখে দেখল৷ যদিও তিনি প্রতিমের এই জহুরী চোখে পর্যবেক্ষণ লক্ষ্য করলেন না৷ আনমনে জলের গ্লাসে আঁকিবুকি কাটছিলেন৷

প্রতিম আস্তে আস্তে প্রশ্ন করল, ‘‘কেন বলুন তো? আপনি কী কিছু হ্যলুসিনেট করেছেন?’’ প্রতিমের প্রশ্নে আনন্দবাবু সতর্ক হন৷ এমনিতেই এই অফিসে তিনি কিছুদিন হল এসেছেন৷ ভালো করে সবার সাথে আলাপ পরিচয় হয়ে ওঠেনি৷ প্রতিমের সঙ্গেই যা একটু ঘনিষ্ঠতা৷ ও কিছু সন্দেহ করলে সর্বনাশ! শেষে না তার মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছে বলে অফিসে রটে যায়! তাই আপাতত রাত্রে ওকে সঙ্গী করার বাসনাটা মুলতুবি রাখলেন৷ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ওঠেন, ‘‘না, না তেমন কিছু না, এমনিই প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল তাই আর কি৷’’ চোখের কোণ দিয়ে দেখলেন প্রতিম কেমন অবিশ্বাসী চোখে তাকে দেখছে৷ তারপর একটুকরো অমলেট মুখে চালান করে দিতে দিতে বলল, ‘‘একটু সাবধানে থাকবেন আনন্দদা৷ এই সেদিন সিঁড়ি থেকে পড়ে কপালটা ফাটালেন৷ আমার মনে হয় কড়া অ্যান্টিবায়টিকের ডোজে আপনি ডাউজি ফীল করছেন আর সেখান থেকেই হ্যালুসিনেশন....৷’’ কথাটা শেষ করতে পারল না প্রতিম, আনন্দবাবু কখন যেন অভুক্ত প্লেট ফেলে ওয়াশ বেসিনের দিকে এগিয়ে গেছেন৷

দুই

ডাইনিং টেবিলের উপর একে একে মিষ্টির বাক্স, ফলের প্যাকেটগুলো সাজিয়ে রাখছিলেন আনন্দবাবু৷ প্রায় এক মাস পরে বাড়ি এলেন৷ অপালাদেবী বলে উঠলেন, ‘‘কী দরকার ছিল তোমার চাকরিটা করার? সারাজীবন তো চাকরি করলে৷ অবসরের পরে অন্তত মেয়ে বউ-এর সাথে আনন্দে দিনগুলো কাটাতে৷ চেহারার কী অবস্থা হয়েছে দেখেছ? খাওয়াদাওয়া কী করো না?’’

স্ত্রীর প্রশ্নবাণ সামলাতে সামলাতে বড় আয়নার সামনে দাঁড়ান আনন্দবাবু৷ বেশ কিছুদিন ধরেই প্যান্টগুলো ঢিলে হয়ে যাচ্ছে, বেল্ট দিয়ে পরতে হচ্ছে৷ আজ আয়নার সামনে আপাদমস্তক নিজেকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন৷ মেয়ে অদিতি চায়ের কাপ হাতে সামনে দাঁড়িয়েছে৷ চোখে তার বাষ্প৷ ‘‘বাপি চাকরিটা করার খুব দরকার ছিল? তাও যদি কাছে পোস্টিং পেতে, কথা ছিল৷ কোথাই সেই ধ্যড়ধ্যাড়ে বাঁকুড়া! কোনও মানে হয়!’’ আনন্দবাবু কথা বাড়ান না, মেয়ের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দেন৷ তারপর অপালাকে বলেন, ‘‘এখনো কর্মঠ আছি, আর তাছাড়া পি. ডি. সি. এল-এর অনারারি পোস্ট, গুচ্ছের টাকা মাইনে দিচ্ছে৷ হাতের লক্ষ্মী কেউ পায়ে ঠেলে নাকি!’’

সেদিন রাত্রে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন৷ পরের দিন রবিবার ব্রেকফাস্ট টেবিলে লুচির প্লেট টেনে নিতে নিতে এই ক’দিনের অস্বস্তিকর ঘটনাটা মুচমুচে হাসির সঙ্গে স্ত্রী কন্যার কাছে পরিবেশন করলেন৷ তারপর হাসতে হাসতে বললে, একেই বলে বুড়ো বয়সের ভীমরতি৷ না হলে শুনশান রাত্রে জনমানব শূন্য বাড়িতে নারী দেখি! ব্যাপারটা যতই তিনি হেসে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করুন, মেয়ে আর বৌ-এর মুখ শুকিয়ে গেল৷

রাত্রে নরম বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছিল না৷ এপাশ ওপাশ করছিলেন৷ অপালা আজ অদিতির ঘরে শুয়েছেন৷ এসিটা বন্ধ করে ঘুমবার চেষ্টা করলেন আনন্দবাবু৷ একটু তন্দ্রার মতো লেগেছে৷ হঠাৎ পরিচিত ঘরের দেওয়ালগুলো যেন মুছে গেল৷ ধীরে ধীরে জেগে উঠল বাঁকুড়ার সেই শোবার ঘরটি৷ তিনি চোখ বন্ধ করে রবিবারের দুপুরে ভাত ঘুম দিচ্ছেন৷ হঠাৎ শাড়ির মৃদু খসখস, চুড়ির রিনিঠিনিতে একটা মেয়েলি উপস্থিতি টের পেলেন৷ ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখলেন চৌকাঠের ওপাশে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বয়স চব্বিশ-পঁচিশ৷ চোখে চোখে পড়তেই মেয়েটির চোখ দুটো ঝিকিয়ে উঠল৷ আনন্দবাবুর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা একটা সরীসৃপ যেন পিছলে গেল৷

মেয়েটি এবার অভয় দেবার কন্ঠে বলে উঠল, ভয় পেও না কাকু৷ তুমি খুব ভালো৷ এত ভালো রান্না কর, জানো আমি তোমার রান্না করা সব খাবার খেয়ে নিই৷ আহ কতকাল পরে এত ভালো করে খাচ্ছি৷ তৃপ্তিতে মেয়েটি চোখ বন্ধ করে৷

বলে কী এই মেয়ে! সব খেয়ে নেয়! তাহলে তিনি কি খান! পাগল নাকি! দরজা তো বন্ধ মেয়েটি তার দোতলার ঘরে এল কীভাবে! তার এতসব ভাবনার মধ্যেই মেয়েটি পিছন ফিরে দাঁড়াল আর তারপর ঘাড়টা ঈষৎ বেঁকিয়ে একবার আনন্দবাবুর দিকে তাকাল৷ গালের এক পাশটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ খুব চেনা৷ তবে কী! আর ভাবতে পারলেন না৷ হঠাৎ মনে হল সূর্যটা নিভে গেল৷ তার এই অন্ধকার ঘরে একরাশ পাখি ডানা ঝাপ্টিয়ে উড়ে এসে তার কাঁধে, বুকে, হাতে, পায়ে বসে ঠুকরোতে চাইছে৷ এই অন্ধকারেই টের পাওয়া যাচ্ছে একরাশ তীক্ষ্ণ চঞ্চু যেন ঝলসে উঠছে৷ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন তিনি৷

অপালা আর অদিতি ঘুম চোখে দৌড়ে এলেন৷ ওরা এসে দেখলেন ঘামে ভিজে সপসপ করছে আনন্দবাবুর পরনের পাঞ্জাবিটা৷ আর মুখ দিয়ে একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ বেরিয়ে আসছে৷ অদিতি এগিয়ে এসে এক ঠ্যালা মারে বাবাকে৷ ধড়ফড় করে উঠে বসেন তিনি, শূন্য বোবা দৃষ্টিতে স্ত্রী কন্যার দিকে তাকিয়ে থাকেন৷

তিন

দেখতে দেখতে চাকরির মেয়াদ ভালোভাবে শেষ করে আনন্দবাবু বাড়ি ফিরলেন৷ এমনিতে কোনও অসুবিধা নেই তবে আগের থেকে অনেক গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ আগের মতো সংসারের খুঁটিনাটিতে তেমন মাথা ঘামান না৷ বই পড়ে সময় কাটান৷ শুধু শরীরটা দিনের পর দিন ভেঙে যেতে শুরু করল৷ ডাক্তারি পরীক্ষাতেও কিছু ধরা পড়ল না৷ বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা সবাই প্রায় এক কথাই বললেন, বয়সোজনিত কারণে শরীরটা ভেঙে পড়ছে৷ হেলদি ডায়েট ফলো করতে৷

এদিকে অপালা খাবার জোগাড় করতে করতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন৷ সকালে ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁই ছুঁই হলেই অস্থিরভাবে পায়চারি শুরু করেন আনন্দবাবু৷ মুখে উষ্মা, বারবার ঘড়ির দিকে তাকান৷ রুটি, পরোটা, লুচি এক একদিন একেকরকম বায়না৷ আর খাবার পরিমাণও কম না, যে মানুষ সারাজীবন দুটোর বেশি পরোটা, রুটি মুখে তোলেনি, পলকেই তিনি পাঁচ ছটা গলাধঃকরণ করে এক গ্লাস জল খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন৷

দুপুর বারোটায় ডাল, ভাজা সুক্তো, তরকারি, মাছ বা মাংসের হাল্কা ঝোল শেষ করে শুতে না শুতেই উঠে পড়ে ফ্রীজ হাটকে আম, আপেল, পেয়ার সিজনের ফল৷ পাউরুটি, কেক যেমন যা মজুত থাকে খেতে শুরু করেন৷ তারপরেও এক বুক খিদে নিয়ে শেষ বিকেলে অপালাকে ডাকেন, ‘‘অপা বড্ড খিদে পাচ্ছে, বিস্কুটে হবে না চা-এর সাথে এক বাটি মুড়ি দিও তো৷’’

অপালা আর অদিতি মুখ চাওয়াচায়ি করে৷ পঁয়ষট্টি বছরের কোনও মানুষ এত খেতে পারে! যেখানে সারাজীবন মানুষটি মিতহারী ছিলেন! রাত্রে পাশাপাশি শুয়ে মেয়ে ফিসফিস করে, ‘‘মা লক্ষ্য করেছ হার্টের ট্রাবল নিয়েও বাপি কেমন অমানুষিক পরিশ্রম করছে৷ বর্ষায় নিজেই এত বড় বাগানটা পরিষ্কার করে, মাটি তৈরি করে অত গাছ লাগিয়ে ফেলল৷ তোমার অস্বাভাবিক লাগে না?’’

অপালা জবাব না দিয়ে পাশ ফিরে শোয়৷ কী জবাব দেবেন! তাদের দু’জনের চিন্তাধারাই যে এক খাতে বইছে৷ মুখ খুললেই যেন একে অপরের কাছে ধরা পড়ে যাবেন৷ হার্টের যা অবস্থা, মানুষটা এতদিন বাঁচার কথাই না৷ একটা আর্টারি ব্লকড৷ ভীতু মানুষটা কিছুতেই ওপেন হার্ট সার্জারি করাতে রাজী হননি৷ সেই মানুষটাই এত কর্মঠ হয়ে উঠলেন কীভাবে! তবে কী নিজের স্বার্থেই কেউ ওকে বাঁচিয়ে রাখছে৷ আপাদমস্তক শিউরে উঠে জোর করে চোখের পাতা বন্ধ করলেন তিনি৷

ক’দিন হল একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে৷ অপালার আবদারে আনন্দবাবুকে সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে যেতে হয়েছিল৷ কিছুটা জেদ করেই রাজী করিয়েছিলেন অপালা৷ আসলে একটা পরীক্ষার জন্য মনে মনে তিনি প্রস্তুত ছিলেন৷ আনন্দবাবু একটু গাঁইগুই করলেও শেষে রাজী হয়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় কী যে হয়ে গেল, পা স্লিপ করে পড়ে গেলেন আর ডান হাতটা ক্র্যাক করে গেল৷ পুজো রইল মাথায়, চেনা রিক্সাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তারখানায় ছুটলেন অপালা৷

মেয়ে বলেছিল, ক’টা দিন বাপির ঘরে শোও মা৷ অপালার তেমন আপত্তি ছিল না৷ কিন্তু আনন্দবাবু রাজী হননি৷ তাই রাত্রে, মা মেয়ে যার যেমন ঘুম ভাঙে পাশের ঘরে একবার আনন্দবাবুকে দেখে আসেন৷

আজও মাঝরাত্রে অপালার ঘুম ভেঙে যায়৷ সন্তর্পণে বিছানা ছেড়ে ওঠেন যাতে মেয়ের না ঘুম ভেঙে যায়৷ অনেক রাত্রি জেগে পড়াশোনা করেছে মেয়ে৷ সারাদিন স্কুলের খাটনির পর এই রাত্রিটুকুই থাকে কলেজ সার্ভিস কমিশনের প্রস্তুতির জন্য৷

পাশের ঘরের দিকে এগিয়ে যান৷ ফ্যানের হাওয়ায় আনন্দবাবুর ঘরের পর্দাটা উড়ছে৷ ঘরের মধ্যে থেকে একটা হাল্কা আলো ভেসে আসছে৷ আনন্দবাবু তো ইদানীং ঘর অন্ধকার করে ঘুমান৷ মৃদু নাইট ল্যাম্পের আলোটাও সহ্য করতে পারেন না৷ তবে কী ঘুমের ঘোরে হাত পড়ে টর্চ লাইটটা জ্বলে গেছে? এসব ভাবতে ভাবতেই তিনি দরজার কাছে এসে দাঁড়ান৷ দরজার দিকে আনন্দবাবুর পা৷ আর পায়ের কাছেই একটা হাল্কা আলোর বলয়৷ চোখ কচলে ভালো করে দেখলেন একটি মেয়ে যেন সেই আলোর বলয়ের মধ্যে বসে ধীরে ধীরে আনন্দবাবুর প্লাস্টার করা হাতে, হাত বুলিয়ে দিচ্ছে৷ এবার স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন অপালা৷ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা যেন আস্তে আস্তে অপার্থিব হাসিতে ভরে যাচ্ছে৷ পর্দা আঁকড়ে দাঁড়িয়েই আছেন অপালা৷ তার উপস্থিতি টের পেয়ে মেয়েটি দরজার দিকে একটু যেন ঘাড় ঘোরাল৷ ঈষৎ শ্যামলা গাল, একটা মিষ্টি টোল পড়েছে৷ অপালা মুন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলেন সেদিকে৷

পরের দিন সকালে স্নান করতে করতে অদিতি অন্যদিনের মতোই চিৎকার করে উঠল, ‘‘মা দেরি হয়ে গেছে৷ খাবার সময় নেই৷ লাঞ্চ প্যাক করে দিও প্লিজ৷’’ আনন্দবাবুও বার দুই কিচেনের দিকে ঘুরে গেছেন৷ স্নান সেরে অদিতি দেখল তার লাঞ্চবক্স রেডি না করে, বাবাকে ব্রেকফাস্ট না দিয়ে মা নিজে এক গোছা রুটি নিয়ে কিচেনের মেঝেতে থেবড়ে বসেছে৷ সঙ্গে বড় বাটি ভর্তি সব্জী৷ অদিতি এই দৃশ্যের সামনে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল৷ আনন্দবাবুও কিচেনের সামনে এসে এসব দেখে বিড়বিড় করে উঠলেন, ‘‘এই ভালো, এই ভালো, আমার একদম খিদে নেই আমি বরং গোলাপ গাছগুলোতে জল দিয়ে আসি৷ ধীরে ধীরে তিনি বাগানে নেমে গেলেন৷ অদিতি অবাক চোখে একবার বাবাকে আর একবার মাকে দেখতে দেখতে টের পেল তার কানের কাছে কে যেন খিলখিল করে হেসে উঠল৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%