রোল নাম্বার সেভেনটি ফাইভ

মহুয়া মল্লিক

এক

এই নিয়ে দ্বিতীয় দিন আমি টুয়েলভের ক্লাসে এলাম৷ আজকেও রোল কলের সময় ক্লাসটা অসম্ভব শান্ত হয়ে গেল, চাপা গলার ফিসফিস থেমে গেল, অদ্ভুত থমথমে এক পরিবেশ, বাইরের আলোও অনেকটা কমে এল যেন৷ আমি আড় চোখে ডান হাতের রিষ্ট ওয়াচটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম, তিনটে চল্লিশ বাজে, এখনই এত আলো কমে গেল কেন? মেঘ করেছে হঠাৎ? মেয়েগুলো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ রোল নাম্বার সেভেনটি ফাইভে তাদের নতুন টিচার এমন করে হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে এই বয়সের মেয়েদের চোখ তো কৌতুকে ঝিকিয়ে ওঠার কথা! কিন্তু মেয়েগুলো অসম্ভব শান্ত হয়ে বসে আছে৷ আমাদের কলকাতার মেয়েরা হলে এতক্ষণে আমার এই ক্যাবলা মুখ দেখে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ত৷ আমি ধীরে ধীরে বাকি রোলগুলো ডাকতে শুরু করলাম৷ অনেকেই অনুপস্থিত, কিন্তু কোনও রোলের ক্ষেত্রেই সেভেনটি ফাইভের মতো অনুভব হল না৷ এটেন্ডেন্সের খাতা রেখে আমি ধীরে ধীরে পড়াতে শুরু করলাম৷ মেয়েরা খুব একটা দুষ্টু না, তাই প্রায় নব্বইজন মেয়েকে কন্ট্রোল করতে খুব একটা অসুবিধা হয় না৷ গ্রামের স্কুলে পোস্টিং-এর এটা একটা সুবিধা, আমার শহরের স্কুলে পোস্টিং পাওয়া বন্ধুরা নাকি ক্লাসে পঞ্চাশজন মেয়ে নিয়েও নাজেহাল হচ্ছে৷ আজ চেয়ারে চিউংগাম আটকে রাখছে তো, কাল জল বিছুটির পাতা ঘষে রাখছে৷

ক্লাস শেষ করে লম্বা করিডর দিয়ে আসার সময় ভাবছিলাম, সেভেনটি ফাইভ রোলটা ডাকার সময় কেন এমন হয়, কাকে জিজ্ঞেস করা যায়? আমার পাশেই দেবস্মিতাদি বসে, কিন্তু সে বেশ রাশভারী, জুনিয়র বলে আমায় খুব একটা পাত্তা দেননা৷ স্যারদের কারুকে জিজ্ঞেস করে দেখব? তখনই বনানীদিকে দেখলাম চাবি হাতে তিনতলার ল্যাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন৷ আমাদের ফোর্থ ক্লাস স্টাফ৷ হ্যাঁ এই দিদিকেই সময় করে জিজ্ঞেস করে নেব৷

স্টাফরুমে এসে দেখি হৈ হৈ কান্ড৷ সেক্রেটারি এসেছেন গরম জিলিপি নিয়ে৷ আমাকে দেখেই বললেন, ‘‘এস কুহু, হস্টেলে অসুবিধা হচ্ছে না তো? আমার মিসেস কিন্তু বারবার বলে দিয়েছেন অসুবিধা হলেই যেন আমাদের বাড়িতে উঠে আসো’’৷

মৃদু হাসলাম৷ নাহ আমার এখানে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না৷ বরং কারুর বাড়ির আতিথেয়তায় অস্বস্তি বাড়ত৷ গোটা কুড়ি মেয়ে, আর রান্নার লোক, কাজের লোক নিয়ে দিব্যি আছি আমি৷ শুধু রাত্রে পোকার উৎপাতে বই পড়তে পারি না৷ তাছাড়া যত রাত বাড়ে পাল্লা দিয়ে আলোর উজ্জ্বলতাও কমে আসে৷ এটুকু ছাড়া আমি মোটামুটি অ্যাডজাস্ট করে গেছি৷ প্রথম দিন তো হস্টেল আছে শুনে অবাক হয়েছিলাম, এই গ্রামে আবার কোথা থেকে পড়তে আসে? ভুল ভাঙল জয়েন করার পর৷ এই হস্টেলটা মূলত আদিবাসী মেয়েদের জন্য, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে যাদের যাতায়াত করা খুব কষ্টসাধ্য৷

‘‘জিলিপি চলে তো? তোমরা আবার আজকালকার মেয়ে! আমার নিজের মেয়ে তো এসব দেখলে আঁতকে ওঠে’’৷

আমি শালপাতার বাটিটা হাতে ধরতে ধরতে বললাম, উপলক্ষ্য?

সবাই একসঙ্গে হাসতে হাসতে বলে উঠল, ‘‘আমাদের স্কুলে এরকম চলে, এর জন্য কোনও উপলক্ষ্য লাগে না’’৷ আমি আর কথা বাড়ালাম না৷ জিলিপিতে কামড় দিলাম, আমার হামলে পড়ে খাওয়া দেখে সবাই বুঝে নিল মিষ্টির প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতাটা৷ একটু একটু করে টের পাচ্ছিলাম, ক্লাসের মধ্যে চেপে বসা পাথরটা সরে যাচ্ছে৷

দুই

আজকেও একটু ভুল করে ফেলেছি৷ ভুলটা করেই আগের দুদিনের মতো আর না থমকে পরের রোলে চলে গেছি৷ আর তখনই ঠিক আমার পিছনে একটা চাপা দীর্ঘনিঃশ্বাস টের পেলাম৷ না থেমেই একবার পিছনে তাকালাম, ব্ল্যাকবোর্ডটা যেন বড্ড বেশি কালো লাগছে৷ যেন এই মাত্র কালো রঙ করা হয়েছে৷ মেয়েগুলোর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে, হয়ত আমার মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠেছে৷ নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়েদের আগের দিনের পড়া থেকে প্রশ্ন করতে শুরু করে দিলাম৷

ট্রেনিংয়ের সময় আমাদের বারবার শেখানো হয় স্টুডেন্টদের বেশি করে ইনভলভড করলে তাদের অমনোযোগী হবার প্রবণতা কমে যায়৷ মেয়েদের মুখ থেকে ধীরে ধীরে আতঙ্কটা কেটে যেতে দেখে আমিও স্বস্তি বোধ করলাম৷ বনানীদিকে জিজ্ঞেস করতেই হবে৷ ‘‘দিদি রোল নাম্বার সেভেনটি ফাইভ আর ডাকবেন না, আমার খুব কষ্ট হয়’’, মেয়েটি ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলছে৷ আমার চোখ খুলে গেল, মেয়েটির মুখ আমার কাছে আরও নেমে আসছে৷ ধারালো চোখ মুখ, এক ঢাল কোঁকড়নো চুল, পান পাতার মতো মুখ৷ কে ও? আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম৷

অর্পিতা আমার টেবিলে একটা স্টিলের বাটিতে জলের মধ্যে একরাশ ফুল সাজিয়ে রাখছিল৷ আমায় ওভাবে উঠে বসতে দেখে চমকে গেল, ‘‘দিদি স্বপ্ন দেখেছেন’’? অর্পিতাকে এভাবে দেখে আমিও কম চমকাইনি৷ ‘‘অর্পিতা তুই এখানে? মানে দরজা খোলা পেলি কীভাবে’’? অর্পিতা ক্লাস টেনের ছাত্রী৷ এখানে যে ক’জন মেয়ে থাকে তার মধ্যে ঐ একটু সাহস করে আমার কাছে ঘেঁষে৷ আমি খুব ফুল ভালোবাসি বলে রোজ নিয়ম করে বাগান থেকে ফুল এনে টেবিলে রেখে যায়৷ সন্ধ্যাবেলায় আমার ঘরে বসে পড়াশোনাও করে এক-আধদিন৷ আর এর মধ্যেই জেনে নিয়েছে আমি কাজের সময় বারবার লিকার চা খাই৷ আমার জন্য প্রায় চা নিয়ে আসে৷ ওকে প্রশ্নটা করতেই ও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে৷

‘‘দরজা তো খোলাই ছিল দিদি৷ আপনি ভোরের দিকে বাগানে গিয়েছিলেন, আপনার ঘরের সামনে ভিজে মাটির ছাপও ছিল৷ মালতী মাসি একটু আগেই মুছে দিল৷’’

‘ঠিক আছে তুই যা, রবিবার বলে যেন সবাই মিলে আড্ডা দিও না৷ তোমার সামনেই মাধ্যমিক সেটা মাথায় রেখে পড়তে বসে যাও৷’’

অর্পিতা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে চলে গেল৷ আমি ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে একবার ফুলগুলোর দিকে তাকালাম, দু-একটা অচেনা ফুলও আছে৷ কাচের একটা বাটি কিনতে হবে, স্টিলের বাটিতে ঠিক মানাচ্ছে না৷ ব্রাশ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালাম৷ এখান থেকে বাগানের একটা অংশ দেখা যায়৷ সেদিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ঘুমের মধ্যে আমার হাঁটার অভ্যাস আছে এটা জানা ছিল না তো! গেট খুলে বাগানেই বা গেলাম কীভাবে? আমি তো জানিই না চাবি কোথায় থাকে! নাকি গেট খোলাই ছিল? আমার ঘরের সামনে কাদামাটির ছাপ তো অন্য কারুরও হতে পারে৷ তবে একটা খটকা লেগেই থাকল, অর্পিতা দরজাটা খোলা পেল কী করে? আমার ঘরের সঙ্গেই বাথরুম, তাই রাত বিরেতে বাইরে যাবার দরকারই পড়ে না৷ দরজা রাত্রে বন্ধ করেই শুয়েছিলাম স্পষ্ট মনে আছে৷ মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বেসিনের আয়নার দিকে তাকালাম, আয়নাটা সাবানের ফেনা জমে স্পষ্ট হয়ে আছে, রোজ ভাবি পরিষ্কার করব কিন্তু এই দশদিনে সেটা হয়ে ওঠেনি৷ আয়নার দিকে তাকাতেই মনে হল একটা ছায়া ছায়া মুখ যেন সরে গেল৷ বদ্ধ বাথরুমে আমি ছাড়া কেউ তো নেই৷ সভয়ে পিছনে তাকালাম সাদা দেওয়াল ছাড়া কিছু নেই৷ তাড়াতাড়ি ছিটকিনি খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷ মালতীমাসি চা আর বিস্কুট নিয়ে তখনই ঘরে ঢুকতে ধড়ে প্রাণ এল৷ মালতীমাসি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দিদিমণি মুখটা শুকনো কেন? শরীর খারাপ?’’

প্রয়োজনের থেকে বেশি জোরে জোরে করে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম, আমি একদম ঠিক আছি৷ মালতীমাসি কিছু না বলে চায়ের কাপ প্লেট হাতে ধরিয়ে চলে গেল৷ গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কিছুটা ধাতস্থ হলাম৷

তিন

বইপত্র নিয়ে দুপুরের বাগানের মধ্যে বসে পড়াশোনা করছিলাম৷ এই দিকটা আমার বেশি পছন্দের, বেশ কয়েকটা বড় গাছ গোল হয়ে জায়গাটা ঘিরে রেখেছে, মাঝে ঘাসের গালিচা৷ কৃষ্ণচূড়া গাছের বাঁধানো বেদিতে বসে থাকি বইপত্র ছড়িয়ে৷ টেনের মেয়েরা ভাতঘুম না দিয়ে রোদে বসে পড়াশোনা করছে আমার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে৷ মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে আমার দিকে তাকাচ্ছিল, হয়ত সকালের ঘটনাটা অর্পিতা ওদের বলছে৷ আমি ওদের দিকে কড়া চোখে তাকাতেই আবার পড়ায় ডুবে গেল ওরা৷ সন্ধে হয়ে আসছিল, অবসন্নের মতো আমি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে ছিলাম৷ শরীর ভারী হয়ে আসছিল৷ আমার কি জ্বর আসছে? একসময় চোখ বন্ধ হয়ে এল৷ কতক্ষণ এভাবে বসে ছিলাম জানি না, কে যেন খুব কাছেই বলে উঠল, ‘‘দিদি প্লিজ আমায় আর ডাকবেন না, আমার ভীষণ কষ্ট হয়’’৷ মুখের উপর গরম নিঃশ্বাস টের পাচ্ছি৷ আতঙ্কে নীল হতে হতে আমি চোখ খুলে উঠে দাঁড়ালাম, অপির্তা আর রান্নার দিদি লন্ঠন হাতে আমাকেই ডাকতে আসছিল, উফ ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন৷

ক’দিন পরে টেস্ট এক্সাম৷ টুয়েলেভের মেয়েরা এমনিতেই কম এসেছে৷ আজ আমি খুব সাবধান৷ রোল কলের ঝামেলায় না গিয়ে মেয়েদের বললাম একটা স্লিপে রোল নাম্বারগুলো লিখে দিতে৷ তারপরেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তোমাদের মধ্যে হস্টেলে কেউ থাক?’’ দুটি মেয়ে উঠে দাঁড়াল৷ একদম বিশেষত্বহীন চেহারা৷ দেখে থাকলেও মনে নেই ওদের নাম জবা মাহাত আর রাখী সোরেন৷ মেয়ে দুটিকে বললাম, আজ সন্ধেতে আমার ঘরে একবার আসতে৷ মেয়ে দুটি খুব শান্ত, মাথা নেড়ে আমার নির্দেশ মেনে নিল৷ লাস্ট পিরিয়ডে আজ আর ক্লাস নেই আমার৷ আমি সটান তিন তলায় উঠে গেলাম৷ বনানীদিদিকে একা পাব জানতাম৷ দিদি ফিজিক্সের ল্যাব বন্ধ করছিলেন৷ আমাকে দেখে এক গাল হেসে বললেন, ‘‘দিদি কেমন লাগছে আমাদের গ্রাম? একদিন আপনাকে আমাদের গ্রাম দেখাতে নিয়ে যাব৷ পুব দিকে পদ্মবিলে গেলে আপনার মন ভরে যাবে৷’’ একটু হেসে দিদিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘ক্লাস টুয়েলভের মুকুট টুডুকে চিনতেন?’’ বনানীদি এমন একটা প্রশ্ন আশা করেননি, দু মিনিট আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন তারপর বললেন, ‘‘মেয়েটা মাস দুয়েক আগে মারা গেছে, হস্টেলেই থাকত তো৷ কেন দিদিমণি কিছু হয়েছে?’’ বলব না বলব না করে বলেও ফেললাম, ‘‘আসলে ওর রোলটা ডেকে ফেললেই দেখি মেয়েদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক আর তাছাড়া.....’’

‘তাছাড়া কী দিদিমণি?’’

‘‘আমার নিজেরও কেমন জানি অদ্ভুত একটা ফীলিংস হয়, যেন মনে হয় মেয়েটা কাছেই আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে৷’’

বনানীদি বললেন, ‘‘অপঘাতে মৃত্যু তো, একটু সাবধানে থাকবেন দিদিমণি৷ আর রোল নাম্বারটা কেটে দেবেন, তাহলে আর ভুল হবে না৷’’

অপঘাতে মৃত্যু শুনে একরাশ প্রশ্ন ভিড় করে আসছিল৷ কিন্তু ছুটির ঘণ্টা বেজে যেতেই বনানীদি তাড়াতাড়ি কেমেস্ট্রি আর বায়োলজি ল্যাব বন্ধ করতে এগিয়ে এলেন৷ আমিও নীচে নেমে এলাম৷ স্টাফ রুমে এসে লাল কালি দিয়ে রোল নাম্বার সেভেনটি ফাইভ কেটে দিলাম৷ আর ভুল হবে না৷

সন্ধেবেলায় টুয়েলেভের মেয়ে দুটি আমার ঘরে এল৷ ঘরে আমার বিছানা, আর টেবিল চেয়ার ছাড়া কিছু নেই, ওদের বিছানায় এক পাশে বসতে বললাম৷ ওরা কিছুতেই শুনল না, মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসল৷ ওদের কাছে মুকুট টুডুর সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলাম৷ মুকুট পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল, ওর ইচ্ছা ছিল ডব্লু. বি. সি. এস. অফিসার হবার৷ পড়াশোনার বাইরে জগতের আর কোনও কিছুর ব্যাপারে ওর আগ্রহ ছিল না, বাগানের যে জায়গাটায় আমি বসে থাকি ওটা মুকুটেরও খুব পছন্দের জায়গা ছিল৷ ওর মৃত্যুর ব্যাপারে ঐটুকু মেয়েদের কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছিল না, ওরা মনে হয় আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছিল, নিজেরাই বলতে শুরু করল, ‘‘ওর ভাই-এর শরীর খারাপ শুনে বাড়ি গিয়েছিল৷ কিন্তু সবার আপত্তি সত্ত্বেও দু’দিন থেকেই চলে আসছিল৷ আসার পথেই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করল৷ ও যে এমন করতে পারে, আমরা কেউ ভাবিনি দিদি৷ কত স্বপ্ন ছিল ওর, খুব লড়াকু মেয়ে ছিল৷’’ মেয়ে দুটোর চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল৷ আমি কোনোক্রমে বললাম, ‘‘মুকুটের ছবি আছে তোমাদের কাছে?’’ রাখী উত্তর দিল, ‘‘আছে, অর্পিতা তো চা নিয়ে আসবে আপনার, ওর হাতে পাঠিয়ে দিচ্ছি৷’’

একটু পরেই অর্পিতা এল৷ দুটি ছবি আমার দিকে এগিয়ে দিল৷ একটা গ্রুপ ছবি আরেকটা সাদাকালোয় পাসপোর্ট ছবি৷ ছবি দেখতে দেখতে চমকে উঠলাম আমি৷ স্বপ্নের সেই মেয়েটা হুবহু ছবির মধ্যে আটকে আছে...

চার

‘‘মিথ্যা কথা, ওরা সবাই মিথ্যা বলছে৷ আমি নিজে ঝাঁপ দিইনি দিদি, ওরা আমায় ঠেলে ফেলে দিয়েছে৷’’ আমার মুখের উপর ঝুঁকে মুকুট কথাগুলো বলছে৷ হাল্কা আলোয় আমি ওর চোখের কোণে জল চিকচিক করতে দেখলাম৷ ওর চোখ ফেটে যেন রক্ত গড়িয়ে নামছে৷ আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম৷ কোথায় কী! আমি কি স্বপ্ন দেখলাম? শরীরটা অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে, আর এই শীতের রাতেও ঘামে ভিজে গেছি৷ লাফিয়ে উঠে আলো জ্বাললাম৷ ভোর হয়ে আসছিল৷ বাকি রাতটুকু জেগে কাটিয়ে দিলাম৷ ভোরের আবছা আলোয় দেখলাম, একটা মেয়ে বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ দু’হাতে যেন দুটি বাচ্ছা ধরেছে যত্ন করে৷ চোখ কচলে ভালো করে জানলার কাছে গিয়ে দেখতে গেলাম, কেউ কোথাও নেই৷ মেয়েটা তো এখানেই ছিল? মুহূর্তের মধ্যে কোথায় গেল?

সকালে অর্পিতা আসতেই ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে মালি বা দারোয়ানের পরিবার থাকে কিনা? অর্পিতা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলল, ‘‘কেন দিদি?’’

‘‘এটা আমার প্রশ্নের উত্তর হল না অর্পিতা৷’’ বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেই নিজেকে সামলে নিলাম৷ মনে হল পুরো ব্যাপারটা বললে হয়ত ওর আন্দাজ করতে সুবিধা হবে৷ চায়ে চুমুক দিতে দিতে সবটা বলে ফেললাম৷ আতঙ্কে অর্পিতার মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল৷ ‘‘মুকুটদিদি তো ভোরবেলায় পুতুল দুটো নিয়ে বাগানে ঘুরত৷ বলত ফুলের মধু আর কাঠপিঁপড়ের ডিম খাওয়ায় পুতুলদের৷’’ স্তম্ভিত হয়ে অর্পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ কী বলছে মেয়েটা! এত বড় মেয়ে পুতুল খেলত? তাও আবার নিয়ম করে পুতুলকে খাওয়াত? আমি ভুলে গেলাম অর্পিতাকে বলতে যে ফুলের মধ্যে মধু থাকে না, মধু পাওয়া যায় মৌচাকে৷ মৌমাছিরা ফুল থেকে নেক্টর সংগ্রহ করে, ও সম্ভবত নেক্টরের কথাই বলতে চেয়েছে৷

‘‘হ্যাঁ দিদি, মুকুটদি একটু অদ্ভুত ছিল৷ বলত ছোটবেলায় ওর খুব অসুখ করেছিল, সবাই ধরে নিয়েছিল ও বাঁচবেই না৷ সেই সময় ওর দাইমা ওর গায়ের ময়লা তুলে তাতে কাদা মিশিয়ে পুতুল দুটি বানায়৷ তারপরেই মুকুটদি সেরে ওঠে৷ তারপর থেকে পুতুল দুটি মুকুটদির সঙ্গী৷ ওর মা যত্ন করত পুতুল দুটির, বড় হবার পর মুকুটদিই ওদের দায়িত্ব তুলে নেয়৷’’

আমি চুপ করে শুনছিলাম৷ এবার জিজ্ঞেস করলাম, পুতুল দুটি দেখেছ?

‘‘হ্যাঁ দিদি৷ খুব অদ্ভুত পুতুল দুটির গড়ন৷ বেঁটে, চ্যাপ্টা, কালো মাটির তৈরি বলে কুচকুচে কালো রঙের৷ তবে দুটো পুতুলের চোখই খুব অদ্ভুত, তাকালে গা ছমছম করত৷’’

অর্পিতা চলে যাবার পর আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম, রাতের স্বপ্ন বা মুকুটের কথা তেমন মনে থাকল না৷ স্কুলেও সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম৷ সন্ধেবেলায় চুপচাপ শুয়ে ছিলাম, গত রাত্রে ঘুম হয়নি বলে কখন চোখ দুটো লেগে গিয়েছিল৷ হঠাৎ মনে হল ঘরের মধ্যে কেউ চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, খসখসে আওয়াজ৷ মুখের উপর গরম নিঃশ্বাস৷ চোখ খুললেই মুকুটকে দেখতে পাব জানি৷ মনে মনে কথা শুরু করলাম৷

—-কেন বারবার আমার কাছে আসছ? আমি তো আর তোমার রোল ধরে ডাকিনি৷

—-আমি তো ঘুমিয়েছিলাম দিদি৷ আপনি আমায় জাগিয়েছেন৷ জলের নীচে ঘুমিয়ে ছিলাম৷ অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় থাকতে থাকতে আমার শরীরের শ্যাওলার স্তর জমে গিয়েছিল৷

মুকুট এলেই তাই আমি একটা আঁশটে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ পাই৷ হঠাৎ মনে পড়ল, মুকুট যেন বলেছিল, কারা যেন ওকে জলে ফেলে দিয়েছে৷ ওকে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিলাম, সেই মুহূর্তেই অর্পিতার গলা, ‘‘দিদি আপনার চা৷’’ স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধটার বদলে সারা ঘরে অর্পিতার আনা ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে৷ ক’দিন আগে মেলা থেকে একটা নীল রঙের কাচের বাটি এনেছি, সেটা পেয়ে পাগলি মেয়েটা দুবেলা ফুল সাজাচ্ছে৷ চা খেতে খেতে মুকুটের কথাগুলো কানে গুনগুন করছিল৷ আমি সেসব থেকে মন সরিয়ে অর্পিতার স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম৷ মেয়েটা আমাকে বড্ড ভালোবাসে৷

এক রবিবার খুব সকাল সকাল উঠে পড়লাম৷ জানলা দিয়ে দেখলাম অর্পিতা ফুল তুলছে, ওকে ইশারায় ডাকলাম৷ ‘‘আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবি?’’ ও এক পায়ে তৈরি৷ কিন্তু হস্টেলের মেয়েদের বাইরে নিয়ে যেতে হলে সুপার ম্যামের পারমিশন লাগে৷ সুনন্দাদি এখনো ঘুম থেকে ওঠেননি, আমি বললে আপত্তি করবেন না৷ অর্পিতাকে তৈরি হতে বলে দরখাস্ত লিখতে বসলাম৷ লিখিত দরখাস্ত ছাড়া মেয়েদের বাইরে ছাড়ার অনুমতি নেই৷ আমি নিয়মের বাইরে যেতে পছন্দও করি না৷

টোটোতে ঘাট মাত্র মিনিট সাতেক লাগে৷ নৌকা ছাড়তে দেরি দেখে অর্পিতাকে পেট ভরে কচুরি আর জিলিপি খাইয়ে দিলাম, নিজে এক কাপ চা খেলাম৷ নৌকা ছাড়ার পর অর্পিতা জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি দিদি?

—-মুকুটের বাড়ি৷

—-আপনি ঠিকানা জানেন?

মুখে এসে যাচ্ছিল, ‘‘হ্যাঁ মুকুট তো বুঝিয়ে দিয়েছে৷’’ মেয়েটা ভয় পাবে বলে সামলে নিলাম৷ মুকুটের বাড়ির লোকজন বলতে ওর মা আর ঠাকুমা৷ গোবর নেকানো উঠোনো মুরগি চড়ে বেড়াচ্ছিল, তার পিছনে পিছনে ওর ছোট ভাই বোন দুটি ঘুরছিল৷ মুকুটের বাবার কথা জানতে চাইলাম৷ মুকুটের মা পরিষ্কার ফুলছাপ কাচের গ্লাসে জল এগিয়ে দিতে দিতে জানাল, ‘‘দূরের গাঁয়ে ধান ঝাড়ার কাজে গেছে, ফিরতে এক হপ্তা লেগে যাবে৷’’ পুরুষ মানুষ না থাকায় নিশ্চিন্ত হলাম৷ দাই মার খোঁজ নিতেই, মুকুটের মা ওর ভাইকে নিজেদের ভাষায় কী যেন বলল৷ ছেলেটি’ খোলা দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল৷ একটু পরেই এক খুনখুনে বুড়ি লাঠিতে ভর দিয়ে উপস্থিত হল৷ তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল, ‘‘মুকুটের ইস্কুলের মাস্টারনি এয়েচে শুনলুম৷’’ তারপর আমাকে দেখতে পেয়েই লাঠি ঠুকঠুক করে সামনে এসে বসল৷ চোখ সরু করে আমাকে দেখতে থাকল৷ তারপর ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘‘আমি জানতাম তুমি আসবে৷’’

—- কী করে জানতেন?

—মুকুট যে আমারও স্বপ্নে আসে৷ বড় কষ্ট ওর৷ বলে, দাইমা ঘুমতে পারি না, ওরা এভাবে আমায় শেষ করে দিল? ওদের বিনাশ ছাড়া আমার যে শান্তি নেই৷

মাথা নেড়ে বললাম, ঠিক বলে মুকুট৷ এই নিন৷ আমার ঝোলা ব্যাগ থেকে পলিথিনের প্যাকেটটা বার করে দিলাম৷ দাইমা প্যাকেট থেকে পুতুল দুটি বার করে আনল৷ পুতুল দুটি দেখেই মুকুটের মা ডুকরে কেঁদে উঠল৷ ‘‘এই দুটোর জন্য মেয়েটা সেদিন ছটফট করে বেরিয়ে গেল, কীনা ওরা না খেয়ে আছে!’’ দাইমার চোখের দৃষ্টি বদলে গেছে, গনগনে চোখে পুতুল দুটির দিকে তাকিয়ে আছে৷ আমার কাজ হয়ে গিয়েছিল, আসার সময় বুদ্ধি করে এক প্যাকেট দানাদার এনেছিলাম৷ মুকুটের ভাইবোনের হাতে প্যাকেটটা তুলে দিয়ে বেরিয়ে এলাম৷

অর্পিতার চোখে মুখে অনেক প্রশ্ন৷ পুতুল দুটি কোথায় পেলাম? ওদের বাড়ির ঠিকানা? আর কেন ফিরিয়ে দিলাম পুতুল দুটি? ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম৷ ও বুঝতে পারল, এত কথা ওর জানতে নেই৷

সে রাত্রে নিজেকে ভারমুক্ত লাগছিল৷ অমাবস্যার রাত, দাই মা আগুন জ্বেলে, পুতুল দুটিকে পুড়িয়ে ফেলে আজই নদীতে ফেলে দেবে৷ নেমকহারামের এই শাস্তিই হওয়া উচিত, শুধু মাত্র দুটো দিন অভুক্ত থাকার কারণে তারা মুকুটকে শেষ করে দিয়েছিল৷ আজ থেকে মুকুটও নিশ্চিন্তে ঘুমবে৷

পাশ ফিরে শুতে শুতে আমি ঠিক করে নিলাম, অন্য ক্লাসে রোলকলের সময় সেভেনটি ফাইভ ডাকার সময় আর আমায় আতঙ্কে ভুগতে হবে না৷ আপনাদেরকেও বলি, সেভেনটি ফাইভ ডাকার সময় একবার ভালো করে দেখে নেবেন ক্লাসরুমের বাতাস ভারী হয়ে আসে কিনা, হঠাৎ আলো কমে যায় কিনা! হাজার হোক সাবধানের মার নেই৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%