ভ্রূণজ ভোর

মহুয়া মল্লিক

এক

লাইব্রেরি থেকে বেরোতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল জিনির। রিডিংরুমে কিছু পুরনো পেপার নিয়ে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল ও। শেষ মুহূর্তে হোল্ডে রাখা বইগুলো নিয়ে পড়িমরি করে বাইরে বেরিয়ে এল। আর বাইরে এসে দাঁড়ানো মাত্রই স্নোফল শুরু হল। কী অদ্ভুত! ওয়েদার ফোরকাস্টে স্নোফলের কোনও উল্লেখই ছিল না। ক্যাপটা মাথায় তুলে নিল ও স্নোফল থেকে বাঁচতে। ইসস কেন যে মোবাইলটাও সঙ্গে নিয়ে এল না! একটা কল করে দিলে আর্য গাড়ি নিয়ে চলে আসত। বাবুর কী আর হুঁশ আছে, বাইরে স্নোফল হচ্ছে! ল্যাপটপে হলিউডি মুভি নিয়ে সে ব্যস্ত। বাইরের দুনিয়ার রঙ বদল নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই।

ফুটপাথ ধরে দ্রুতগতিতে জিনি হাঁটছিল আর ভাবছিল কীভাবে লেখাটা আজ শুরু করবে। ইন্ডিয়া থেকে রোজ সম্পাদকের মেইল আসছে, শারদীয়ার লেখাটা পাঠাতে। জিনি খুব একটা সামাজিক গল্প বানিয়ে বানিয়ে লিখতে পারে না। গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখতে লিখতেই দু—একটা রিয়েল লাইফ বেসড স্টোরি লিখে পাঠিয়েও দিয়েছিল দেশের দু—চারটে লিডিং পত্রিকায়। কী আশ্চর্য তারপর থেকেই এই ধরনের লেখা চেয়ে বিভিন্ন পত্র—পত্রিকার মেইল আসতে শুরু করল। তেমনই একটা পত্রিকার হয়ে আজ লাইব্রেরিতে সকাল থেকে পড়াশোনা করছিল ও।

খুব অদ্ভুত একটা নিউজ পুরনো পেপার ঘাঁটতেই চোখে পড়েছিল। বছর কয়েক আগে এই মিসৌরি স্টেটের বিভিন্ন শহরে দেখা দিয়েছিল ভয়াবহ এক সমস্যা। ক্যানসাস সিটি, সেন্ট লুইস, স্প্রিংফীল্ড বিভিন্ন শহর থেকে রহস্যজনকভাবে কিছু মহিলার উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে মিডিয়া এবং প্রশাসনে রীতিমতো শোরগোল উঠেছিল। জানা গিয়েছিল মহিলারা প্রত্যেকেই একা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল টুকটাক শপিং, নিকটবর্তী পার্কে ওয়াকিং—এর উদ্দেশ্যে। তাদের কেউ আর ফেরেনি। ঘটনাগুলো পৃথক শহরে ঘটলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রত্যেকেই ঘটনাস্থলে একটা কালো টয়েটো ক্যাম্রী দেখতে পেয়েছিল। আর হ্যাঁ তন্নতন্ন করে পেপারগুলো খুঁজে জিনি আরেকটা তথ্য পেয়েছিল, মহিলাদের প্রত্যেকের গর্ভেই নিরাপদে বেড়ে উঠছিল একটা প্রাণ। মিডিয়া জল্পনা—কল্পনা করেছিল, ভ্রূণ চুরির কোনও র‌্যাকেট হবে কিন্তু কাজে নেমে তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। যেমন পাওয়া যায়নি উধাও হওয়া মহিলাদের সন্ধান। মেয়েগুলো যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল।

জিনির কপালে ভাঁজ পড়ল, ভ্রূ কুঁচকে গেল। স্নোফলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঝড়ো হাওয়ার তান্ডব। সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। আশেপাশে কোনও শেল্টারও চোখে পড়ছে না। ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট, ক্যাপ আর ব্যাগ হওয়ায় নিজেকে এবং লাইব্রেরির বইগুলো বাঁচাতে পেরেছে। চশমার কাচটা ভালো করে মুছে হাঁটার গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল। সামনের ইউটার্নটা নিলেই তাদের কমপ্লেক্সের মেইন গেট দেখা যাবে। উফ কিছুটা স্বস্তি। সারাদিন এই সব খবর নিয়ে কাটানোর পর এই আবহাওয়া জিনিকে একটু নার্ভাস করে দিয়েছিল।

আর ঠিক এইসময় ক্যাচ করে ব্রেক কষে একটা গাড়ি এসে থামল। চমকে তাকিয়েছিল জিনি। আবছা আলোয় গাড়ির রঙটা নজর করার আগেই অটোমেটিক দরজা খুলে গেল, সভয়ে দু—পা পিছিয়ে আসতেই ড্রাইভিং সিটে পরিচিত মুখ দেখে জিনি নিজেই গাড়িতে উঠে বসল। তাদের মুখোমুখি অ্যাপার্টমেন্টের শ্যারন। জিনির বেশ ভালো বন্ধু। ইন্ডিয়ান কালচার সম্পর্কে জানতে মেয়েটা ভীষণ আগ্রহী তার বয়ফ্রেন্ড ইন্ডিয়ান বলে। গত বছর অন লাইনে শাড়ি কিনে পুজোর সময় বয়—ফ্রেন্ডকে চমকে দেবে বলে শাড়ি নিয়ে জিনির কাছে চলে এসেছিল। বেচারি জানেই না, ব্লাউজ, পেটিকোট এগুলোও লাগে। জিনি হাসতে হাসতে নিজের নতুন পেটিকোট আর শ্যারনের টপ দিয়ে সে যাত্রা ম্যানেজ দিয়েছিল। ঘটনাটা মনে পড়তেই জিনির ঠোঁটে হাসি খেলে যায়।

—কী হাসছ কেন? তোমার হাবির কিছু দুষ্টুমি মনে পড়ে গেল নাকি!

জিনি নিজেকে সামলে নিয়ে শ্যারনকে ভালো করে দেখে। চুলে নতুন হাই লাইট করিয়েছে। লালচে একরাশ কার্লি চুল, জলপ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে কোমর ছুঁয়েছে। ড্রাইভিং করতে করতে মাঝে মাঝে হট কফির গ্লাস তুলে সিপ করছে। একটু যেন উদাসীন। ওর ইন্ডিয়ান বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে প্রবলেম হচ্ছে, ব্রেক আপ হয়ে যেতে পারে, এমন একটা আভাস দিয়েছিল কিছুদিন আগে। জিনি প্রসঙ্গটা তুলবে কিনা ভাবতে ভাবতেই দেখল শ্যারন হঠাৎ গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের কমপ্লেক্সের গেট ছাড়িয়ে গাড়িটা হু হু করে ছুটে চলেছে। স্পিডোমিটারের কাঁটা বিপজ্জনক সীমা ছুঁয়ে ফেলছে।

সভয়ে জিনি এবার শ্যারনের দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, ''উড নট ইউ কাম ব্যাক নাউ? ডু ইউ হ্যাভ এনিথিং কামিং আপ নাউ?'' কিন্তু প্রশ্ন মুখেই আটকে গেল। শ্যারনের সারা মুখে কী নিষ্ঠুর একটা হাসি! লালচে চুলগুলোতে স্ট্রীটলাইটের আলো ঠিকরে লাল রক্তের নদী মনে হচ্ছে। শ্যারন তার দিকে তাকিয়ে কফির গ্লাসে লম্বা একটা চুমুক দিল। জিনি স্পষ্ট দেখল, ওর ঠোঁটের কোণ বেয়ে কাঁচা রক্ত গড়িয়ে নামছে। আর অদ্ভুতভাবে চেনা মুখটা ভেঙেচুরে অচেনা হিংস্র একটা মুখ জেগে উঠছে। আর তখনই হড়হড় করে জিনি বমি করে ফেলল। টক জল উঠে এলো, এই নিয়ে তিনবার। জিনি এতক্ষণে বুঝতে পারল এ মাসে পিরিয়ড মিস হবার কারণটা। কথাটা মনে হতেই শ্যারনের দিকে তাকালো। শ্যারন নাকি এক অচেনা হিংস্র মহিলা তার দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে মাথা নাড়াল। যেন বলতে চাইল, ইউ আর রাইট ডিয়ার''। জিনিস শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমেল স্রোত নীচে নেমে গেল।

দুই

কমলিকা কফি বানাচ্ছিল, চিনি ছাড়া কফি। কিন্তু কখন যে ভুল করে এক চামচ চিনি মিশিয়ে দিয়েছে, এবং দিব্যি টুংটাং করে চামচ নেড়ে চিনি কফি ঘন দুধের মধ্যে মেশাতে শুরু করেছে, একদম খেয়াল নেই। টোস্টারে দু স্লাইস ব্রেড সোনালি মুচমুচে হয়ে লাফিয়ে জানান দিল তারা রেডি আর তখনই ঘোর ভাঙল কমলিকার। অন্য সময় হলে এই কফি সিঙ্কে ফেলে দিয়ে সে আবার নতুন এক কাপ বানিয়ে নিত। কিন্তু ভুল করে বানানো এই কফিও তার বেশ ভালো লাগছে।

দিনের এই সময়টা তার বিশেষ কাজ থাকে না। রান্নাবান্না রাত্রে সারে। লেফটওভার দিয়ে লাঞ্চটা চালিয়ে নেয়। আজকাল একটা নতুন নেশা হয়েছে। ব্লগ লেখা। অথচ দেশে থাকতে লেখালিখি বা বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া বিশেষ বইটই ঘেঁটে দেখাও হয়নি।

প্রথম প্রথম দীপ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে একাউন্ট খুলে দিয়েছিল, বৌয়ের সময় কাটানোর জন্য। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হওয়ায় কমলিকার সময়টা দিব্যি কেটে যাচ্ছিল। তারপর একদিন দুম করে নিজের রোজনামচা লিখে ফেলতেই বন্ধুদের উৎসাহ, কমেন্টস আর অজস্র লাইক— কমলিকা ভেসে গিয়েছিল। ঘোর কাটতে নিজেই অবাক হয়েছিল, সে লিখেছে এই লেখা! স্টুডেন্ট হিসেবে একদম এভারেজ ছিল সে, স্কুল লাইফে বাংলায় মেরেকেটে বিয়াল্লিশের বেশি সে পায়নি। এই নির্ভুল বানান, চমৎকার বাক্য গঠন এসব সে নিজে করেছে!

মাঝে মাঝেই তার মনে হয় এই অ্যাপার্টমেন্টে একজন কেউ তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে, স্নান করছে, বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছে এবং হ্যাঁ জোর করে লিখিয়ে নিচ্ছে। কথাটা দীপকে বলতেই দীপ হো হো করে হেসে ওঠে। দুর কী যে বলনা, সর্বক্ষণ ঘর বন্দী হয়ে তোমার মাথাটা যাচ্ছে। কমপ্লেক্সের মধ্যে এত সুন্দর জিম, সুইমিং পুল, ওখানে তো কিছুটা সময় কাটাতে পারো। কমলিকা তর্কে না গেলেও বেশ বুঝতে পারে, সে অন্য কারুর জীবনটা তার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে কাটাচ্ছে। আর অদ্ভুত ব্যাপার, এই জীবনটা তার বেশ ভালো লাগছে। যেমন এই কিটকিটে মিষ্টি কফিটাও...

ল্যাপটপ অন করে লিখতে বসে গেল। দেড় ঘণ্টা পরে যখন কীবোর্ড থেকে মাথা তুলল দেখল সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। তাড়াতাড়ি সিনকের বাসন ডিশওয়াশারে দিয়ে, ঘর পরিষ্কার করে, ড্রয়ার থেকে একরাশ জামাকাপড় নিয়ে লন্ড্রি রুমে ছুটল। সব কাজ সারতে সারতে তিনটে বেজে গেল। তারপর স্নান এবং লেফটওভার দিয়ে লাঞ্চ। একটু গড়িয়েই উঠে পড়ল কমলিকা। চারিদিকটা এত মনোরম, টিউলিপ আর সূর্যমুখীতে সেজে আছে তাদের কমপ্লেক্সটা, হাঁটতে বেরিয়ে গেল সে। এখন সামার, সূর্য ডুবতে ডুবতে সেই রাত্রি ন'টা।

প্রায় ঘণ্টা খানেক হাঁটাহাঁটি করে পুলের ধারে চুপ করে বসেছিল কমলিকা। সাদা কালো বাদামি একরাশ বাচ্চা মাছের মতো পুলের নীল জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আসলে সে এখানে বসে বসে দীপের ওয়েট করছিল। সুইমিংপুলের গায়েই সারি সারি লেটার বক্স। দীপ রোজ অফিস ফেরত লেটার বক্স চেক করে। চিঠি আসা উঠেই গেছে, লোকাল বাজার দোকানের বিজ্ঞাপন আর ফ্রী কুপন নিয়ম করে আসে। উইকেন্ডে সেসব বেছে নিয়ে তারা শপিংয়ে বেরিয়ে যায়।

''তুমি এখানে?''

কমলিকার মগ্ন রূপ দেখে দীপ অবাক হয়। ''হ্যাঁ ঐ আর কি, একটু ওয়াকিং— এ বেরিয়েছিলাম।'' কমলিকা উঠে দাঁড়ায়। ওরা সঙ্গে ফেরে। কমলিকাই চাবি ঘোরায়, কিন্তু একী তালা কিছুতেই খোলে না। ওর হাত থেকে চাবির গোছাটা নিয়ে দীপও চেষ্টা করে বার কয়েক। তারপর পকেট হাতড়ে নিজের কাছে রাখা চাবির গোছাটা বার করে। আবার চেষ্টার উপর চেষ্টা। কিছুতেই দরজা খোলে না। একজন আমেরিকান ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ব্যাপারটা তাঁর চোখে পড়ল। তিনিই বুদ্ধি দিলেন, মেইনটেনেন্স অফিসে প্রবলেমটা জানাতে, ওদের কাছে মাস্টার কী থাকে। ফোন পেয়েই স্টাফ ছুটে এল। ওদের চাবি নিয়ে কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর লোকটি বলল, ''দিস হ্যাজ বিন লকড ফ্রম ইনসাইড। আই ক্যান বেট এ ডলার দ্যাট দেয়ার ইজ সামওয়ান ইন দেয়ার।'' দীপের মুখ শুকিয়ে গেছে, ''আর ইউ শিওর দেয়ার ইস সামওয়ান ইন হিয়ার?''

''হ্যান্ড্রেড পারসেন্ট স্যার। আপনারা একটু ওয়েট করুন, এই চাবিতে হবে না, আমি অন্য চাবির সেট নিয়ে আসছি।'' দরজা খোলার পর ভিতরে কিন্তু কারুকেই দেখা গেল না। দীপ ইতিউতি খুঁজে হতাশ হল তারপর মন্তব্য করল, ''এইরকম জানলা দরজা দিয়ে যে কেউ টপকে ভিতরে ঢুকে আবার বেরিয়ে যেতেই পারে। তবে চুরি যাবার মতো কিছুই নেই, কয়েকটা ক্রেডিট কার্ড আর পুরনো ল্যাপটপ, ক্যমেরা, হ্যান্ডিক্যাম এসব বিনা পয়সায় এদেশে কারুকে দিলেও ছুঁয়ে দেখবে না।''

কমলিকা দেখল, দীপ চায়ের হুকুম দিয়ে বেশ নিশ্চিন্তে সোফায় গা এলিয়ে দিল। তার কিন্তু অস্তিত্বটা কিছুতেই কাটল না, যেন মনে হচ্ছে কেউ তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। এখুনি ঘাড়ের কাছে তার নিঃশ্বাস টের পাবে, এখুনি যেন পিছন থেকে বেরিয়ে এসে পিঠে কিল মেরে ধাপ্পা দেবে।

তিন

না এমব্রায়ো স্টিলিং র‌্যাকট, না কোনো সিরিয়াল কিলারের কাণ্ড। মেয়েটি পরিত্যক্ত কাঠবাড়ির মধ্যে একাকী হেঁটে বেড়ায়। জনমানব শূন্য একটা মায়াবী জঙ্গলের মধেও এই কাঠের দোতলা বাড়িতে সে একপ্রকার বন্দিনী। দোতলার খোলা জানালা দিয়ে চোখে পড়ে বড় বড় পাইন, বার্চ আরও নাম না জানা গাছ। গাছের নীচে নরম সোনালি সবুজ মসের স্তর। পিছনেই একটা ঝরনা তিরতির করে বয়ে চলেছে। কাল শেষ বেলার আলোয় দুটো ময়ূর জল খেতে এসেছিল। চারপাশে হিংস্র কোনও জন্তু নেই, হয় তারা জঙ্গলের আরো গভীরে তাকে নয়তো কোনো অজানা ভয়ে ধারেকাছে ঘেঁষে না। নাহলে নিরীহ প্রাণীরা এত নির্ভয়ে ঘুরে বড়াতে পারত না। মেয়েটি এখনো বুঝতে পারে না এখানে সে কী ভাবে এল, কে সে! তার নাম কী? কিছুই তার মনে পড়ছে না। খিদে, তৃষ্ণাও অনুভব করছে না। শুধু কাল রাত্রে অন্ধকারের মধ্যে ভীষণ ভয় পেয়েছি। দিনের আলোয় ভয়টা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে।

পায়ে পায়ে সে এ—ঘর ও—ঘর ঘুরে বেড়ায়। নীচে নামার সিঁড়ি খোঁজে কিছুতেই পায় না। যতবার খোঁজার চেষ্টা করে, কিছুক্ষণ পরে দেখে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার খুব ভয় করে, প্রচণ্ড শীত করে হঠাৎ। পায়ে পায়ে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়ায় সে। কেন জানি মনে হয় সিঁড়িটা এই ঘরের মধ্যেই আছে। কেন জানি মেয়েটার মনে হয় এই সিঁড়িটায় পা রেখে নেমে গেলেই সমস্ত রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে। দেহের সমস্ত শক্তি জড়ো করে সে দরজাটা ঠেলতে শুরু করল আর ঠিক তখনই পেটের মধ্যে একটা মোচড় টের পেল। হড়হড় করে সে টক জল বমি করে ফেলল আর কী অদ্ভুত ঠিক তখনই সে কে, কীভাবে এখানে এল সব মনে পড়ে গেল তার। চেনা কেউ একজন তাকে গাড়িতে তুলে নেয় তারপর এলোপাথাড়ি ছুটতে থাকে সেই গাড়ি মাইলের পর মাইল। একসময় সে চেনতা হারিয়ে ফেলেছিল।

সন্ধের আবছা আলোয় তার ঘুম ভাঙে। দু'দিন ধরে পেটে কিছু পড়েনি। শরীর অবসন্ন। তবু উঠে দাঁড়ায়। সেই বন্ধ দরজাটা তাকে টানতে থাকে। একসময় টের পায় সে বন্ধ দরজাটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এবং কী আশ্চর্য! হাতের আলতো চাপেই দরজাটা খুলে গেল এবার। মেয়েটি এদিক—ওদিক তাকিয়ে ঘরের মধ্যে পা দিল। বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে একটা দুর্গন্ধ ভেসে এল। ঘরের জমাট অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে, এক কোণের প্রশস্ত সিঁড়িটা চোখে পড়ল। মেয়েটি টলতে টলতে সেদিকে পা বাড়াল। এক পা এক পা করে যত সে নীচে নামছে মনে হচ্ছে রহস্যের অতল কূপের মধ্যে সে ঢুকে যাচ্ছে। এ যেন মরণকূপ, এর থেকে মুক্তি নেই তার। তবু এক অজানা রহস্য মেয়েটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই মৃত্যুকূপের হিম গহ্বরে।

কিন্তু এ কী, এ কোথায় এল সে! চারিদিকে রক্তমাখা নানান আকৃতির ভ্রূণ থরে থরে সাজানো আছে। এ কোন পৃথিবী! মেয়েটি নিজের তলপেট চেপে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পড়ে, তীক্ষ্ন হাসির কলরোল ওঠে ভ্যাপসা দম বন্ধ করা ঘরের মধ্যে। মেয়েটি চোখ কচলে ভালো করে দেখার চেষ্টা করে, হাসির উৎস। না কিচ্ছু চোখে পড়ে না। মেয়েটি অনুভব করে কে যেন তাকে চেপে ধরেছে, তীক্ষ্ন নখরে তার পেটটা ফালা ফালা করে দিচ্ছে, অশরীরী হাতে তুলে আনছে তার জঠরের পরম সম্পদ। জ্ঞান হারাবার আগে মেয়েটির বড্ড জানতে ইচ্ছে করল, এই প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রেতাত্মা কি কোনও অতৃপ্ত মা? যে নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে পারেনি? চোখের আলো নিভে যাবার আগে সে শুধু দেখতে পেল রক্তমাখা একটা ভ্রূণ ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এ দেয়াল সে দেওয়াল ধাক্কা খেতে খেতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

লেখাটা শেষ করে কমলিকার প্রচণ্ড ঘুম পেল। খোলা ল্যাপটপের পাশেই মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়ল। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল সে জানে না। একসময় ধড়ফড় করে উঠে বসে। খোলা স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে দেখে অজস্র শুভেচ্ছাবার্তা। কেউ কেউ বহুদিন আগের একটি ঘটনার সঙ্গে তার লেখার একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। কমলিকা, লেখাটা আবার পড়ে। চমকে যায়। এ লেখা সে লিখল কখন? লিখল কীভাবে! আজকাল তার সব কিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

তাকে একবার কাছের সুপারমার্কেটে যেতে হবে। প্যাস্ট্রী শিট ফুরিয়ে গেছে। আজ দীপের জন্য ওর ফেভারিট পিজ প্যাটিস বানাতে হবে। চায়ের সঙ্গে এই ক্রিস্পি প্যাটিস তুলে দিয়ে খবরটা জানাতে হবে। আজ সকালেই সে প্রেগ্নেন্সি স্ট্রিপে হোম টেস্ট করে জানতে পেরেছে, ''সে আসছে।''

ডেনিমের ক্যাপ্রী, ব্লু টপ আর হোয়াইট শ্রাগে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার কয়েক দেখল আয়নায়, নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছে, মুখ চোখে যেন হাজার আলোর রোশনাই। বেরিয়ে আসে কমলিকা। ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করে। খুব বেশি দূর যেতে হয় না। কাছেই ''প্রাইস চপার।'' টুকিটাকি শপিং সেরে ফেরার পথ ধরে। নির্জন রাস্তা। দুপুরের এই সময়টা গাড়ির যাতায়াত কমে যায়। নিজেরমনে হাঁটতে থাকে কমলিকা। কিছুটা এগোবার পর একটা কালো টয়টো ক্যাম্রী গাড়ি সজোরে ব্রেক কষে দাঁড়ায় তার পাশে। ধীরে ধীরে অটোমেটিক দরজা খুলে যায়। ড্রাইভিং সিটে নীল চোখের এক চোখ ঝলসানো সুন্দরী বসে। তাকে দেখে মুক্তোর মতো এক সারি দাঁত ঝিকিয়ে হেসে ওঠে। কমলিকা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে, পা দুটো তার যেন মাটিতে আটকে গেছে। কিন্তু খুব অল্প সময়, তার পরেই কমলিকা ঘোর থেকে জেগে উঠল, কে যেন ভিতর থেকে তাকে বলছে, পালাও বিপদ। কে যেন তাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে এই অকুস্থল থেকে। কমলিকা প্রাণপণে ছুটতে শুরু করে, পিছনে তাকালে দেখতে পেত সেই সুন্দরী মহিলা নিষ্ঠুর হাসতে হাসতে এক্সিলেটারের চাপ ক্রমশঃ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কমলিকা ছুটছে, আর একটু, সে ঠিক পারবে, ইউ টার্নটা ঘুরলেই তাদের কমপ্লেক্সের গেট, ওখানে একবার ঢুকে গেলে সে বিপদমুক্ত। ছোটার গতি আরো বাড়িয়ে দিল সে, এটুকু পথ তাকে পেরিয়ে যেতেই হবে। তার জন্য নতুন আলোর নতুন ভোর যে অপেক্ষা করে আছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%