ওপেন দ্য ডোর

মহুয়া মল্লিক

এক

মিতিন এই কনকনে ঠান্ডাতেও ঘেমে উঠেছিল৷ গুঁড়ি গুঁড়ি তুষারপাত আর ঝড়ো হাওয়ায় অনেকক্ষণ আগেই টের পেয়েছিল আজ কপালে ভোগান্তি আছে৷ কিন্ত বাসটা আচমকা ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে যেতেই সমস্ত মনোবল ভেঙে গেল৷ পাশে বসা তিতিরের দিকে এক ঝলক তাকাল৷ সে তো ইয়ারফোন গুঁজে চোখ বন্ধ করে দিব্যি গান শুনে যাচ্ছে৷ মিতিন এবার অধৈর্য হয়ে ওকে এক ঠ্যালা মারল৷

‘‘কী, কী হল’’? ইয়ারফোন খুলে তিতির সোজা হয়ে বসল৷

মিতিন তখন সিট ছেড়ে একদম গেটের দিকে এগিয়ে গেছে৷ অগত্যা তিতিরও আলস্য ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ দু-পা এগিয়েছে কি এগোয়নি নেমে যাওয়া যাত্রীরা হুড়মুড় করে আবার বাসে ফিরে এল৷ বেশিরভাগই স্থানীয় পাহাড়ি লোকজন৷ সমতলে গিয়েছিল প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে৷ এখন বাস ধসে আটকে যাওয়ায় নিজেদের জিনিসপত্র নামিয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে ঘুর পথে হাঁটা লাগাল৷

মিতিন এতক্ষণে অরিত্রদের ফোনে ধরার চেষ্টা করছিল কিন্তু বারবার নট রিচেবল আসায় বুঝে গেল ওদের সঙ্গে কিছুতেই যোগাযোগ করা যাবে না৷ ঠোঁট কামড়ে অসহায় চোখে বাইরের বিরূপ প্রকৃতিকে দেখছিল৷ ওদের পুরো টিমটাই ট্রেকিং এর উদ্দেশ্যে দু’দিন আগেই স্পটে পৌঁছে গেছে৷ বেশ রোদ ঝলমলে আবহাওয়া ছিল৷ কিন্তু এই সময় পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া কিশোরী মেয়ের মতোই অভিমানী, এই মেঘ মেঘ মুখভার তো এই আলো আলো ঝলমলে মুখ৷ কিন্তু হাল্কা তুষারপাত ওরা কল্পনাও করতে পারেনি৷

ড্রাইভার আর খালাসি দুজনেই বাসের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে৷ ‘‘মেমসাব, হামলোগ আগে নেহী যা পায়েঙ্গে, আপ লোগ আপনা বন্দোবস্ত কর লিজিয়ে’’৷

তিতিন আর মিতিন পরস্পরের দিকে তাকাল৷ বাসের মধ্যে এক লোল চর্মসার বৃদ্ধ ছাড়া আর কোনও যাত্রী অবশিষ্ট নেই৷ সেই বৃদ্ধও ধীরে ধীরে নেমে যাবার উপক্রম করতেই মিতিন কিছুটা মরিয়া হয়ে ড্রাইভারকে বলেই ফেলল, ‘‘এই দুর্যোগে কোথায় যাব ভাইসাব! আমরা যদি এই বাসেই রাতটা কাটিয়ে দিই’’?

ড্রাইভার আর খালাসি কিছু বলার আগেই সেই বৃদ্ধ এগিয়ে এল, ‘‘আপলোগ মেরে সাথ আইয়ে, একঠো বন্দোবস্ত হো জায়েগা৷’’

মিতিন এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখল বৃদ্ধকে৷ যতটা বৃদ্ধ ভেবেছিল ঠিক ততটা নয়, অন্তত বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর তাই বলছে৷ সাধারণ পাহাড়ি মানুষের থেকে উচ্চতাতেও বেশি৷ বৃদ্ধের চোখে চোখ পড়তেই থমকে গেল মিতিন৷ সবুজ মণি দুটো যেন আগুনের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে৷ মিতিন কিছু ভাবার আগেই তিতির ওকে তাড়া দিল৷

ওরা আর দেরি করল না, ব্যাকপ্যাক দুটো নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল৷

দুই

পাকদন্ডী বেয়ে দু’জনে যখন পৌঁছল, দিনের আলো তখন একদম কমে এসেছে৷ তুষারপাতের কোনও চিহ্নই এখন নেই৷ খাদের কিনারা ঘেঁষে কাঠের বেড়া দেওয়া একতলা একটা বাংলোর সামনে ওরা দাঁড়িয়ে আছে৷ আপাতত আজ রাত্রের মতো এটাই ওদের ঠিকানা৷ মিতিন দেখল তিতির বেশ ঘাবড়ে গেছে৷ জনমানব শূন্য এলাকা৷ কয়েক ধাপ নীচে কয়েকটা একই ধাঁচের বাংলো টাইপের কাঠ বাড়ি থাকলেও সেখানেও কোনও মানুষজন চোখে পড়ছে না৷ কী কুক্ষণেই যে তাদের ফিজিক্স প্র্যাক্টিকালের এক্সামটা ক্যান্সেল হয়ে একদম শেষ মুহূর্তে হল! নাহলে অরিত্রদের সঙ্গেই আসতে পারত৷ আর এই দুর্গম পাহাড়ি বিপজ্জনক পরিবেশেও তাদের এভাবে পড়তে হত না৷

লোকটি ততক্ষণে বাংলোর একটা রুম সাফসুতরো করে দিয়েছে৷ কথায় কথায় জানা গেছে বাংলোর মালিকরা শিলিগুড়িতে থাকেন, ছুটিছাটায় প্রায় আসা-যাওয়া করেন৷ তিতির তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতে, বৃদ্ধ মানুষটি সযত্নে এড়িয়ে গেলেন৷ শুধু জানালেন এই বাংলোর আউট হাউসে তিনি থাকেন৷

লাগোয়া টয়লেটে দুই বান্ধবী ফ্রেশ হয়ে, কফিমেকারে দু’কাপ কফি বানিয়ে আরাম করে বসল৷ চমৎকার ব্যবস্থা৷ অচেনা বিভূঁই-এ এমন রাজকীয় আতিথেয়তা জুটবে দু’জনের কেউ ভাবেনি৷ ক্লান্ত শরীরে অচিরেই তন্দ্রা জড়িয়ে এল৷

খটখট করে দরজা নাড়ার আওয়াজে মিতিনই প্রথম জেগে উঠল৷ বাইরে থেকে বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, ‘‘বিটিয়া দরওয়াজা খোলো’’৷ ধড়ফড় করে উঠে দরজা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে এক ঝাঁক অন্ধকার হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে ঝাঁপিয়ে ঢুকে পড়ল৷ আর চোখে পড়ল সবুজ দুটো আগুনের গোলা ধকধক করে জ্বলছে৷ মিতিনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল৷ লোকটি ধীরে ধীরে এক চিলতে আলোর মধ্যে এসে দাঁড়াল৷ শালপাতার একটা ঠোঙা মিতিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে জানাল, এর বেশ কিছু বন্দোবস্ত করতে পারেনি৷ চলে যাবার আগে শুধু বলে গেল, রাত্রে ভুলেও যেন দরজা না খোলে৷ কাটা কাটা ইংরেজিতে স্পষ্ট উচচারণ করল, ‘‘ডোন্ট ওপেন দ্য ডোর৷’’

দুজনেরই খুব খিদে পেয়েছিল৷ ভেবেছিল রাতটা বিস্কিট, চিপস দিয়ে চালিয়ে নেবে৷ শালপাতার মোড়ক খুলে দেখা গেল, ঝলসানো মাংস৷ অজানা কিছু মশলার গন্ধ ভেসে আসতেই দুজনে আর দেরি না করে হাত ধুয়ে এসে ভাগাভাগি করে খেতে বসে গেল৷

কীসের মাংস দু’জনেই বুঝতে পারল না, তবে এমন সুস্বাদু মাংস জীবনে তারা খায়নি এ ব্যাপারে নিশ্চিত৷

লাইট নিভিয়ে শুতে শুতে বেশ রাত হয়ে গেল৷ মিতিন একবার সাবধান করে দিল তিতিরকে, কিছুতেই যেন রাত্রে দরজা না খোলে৷ তিতির ততক্ষণে গরম কম্বলের নীচে ঢুকে গেছে, কোনোক্রমে বলল, ‘‘মাথা খারাপ! এই শোব আর এক ঘুমে রাত কাবার করে দেব৷’’

ঠিক কত রাত জানে না মিতিনের ঘুম ভেঙে গেল৷ কে যেন দরজার উপর মৃদু করাঘাত করছে৷ আর একটা ফ্যাসফ্যাসে গলা বাইরের ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে৷ ‘‘ওপেন দ্য ডোর, ওপেন দ্য ডোর’’৷ তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখল একবার, মেয়েটাকে যেন মরণ ঘুমে পেয়েছে৷ ওকে ডেকে লাভ নেই৷ মিতিন কুঁকড়ে বসে রইল৷ ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আওয়াজটা বেড়েই যাচ্ছে৷ মিতিন স্পষ্ট দেখল দরজার নীচে একটা সবুজ আলোর রেখা অশান্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে৷ মিতিনের আর কিছু মনে নেই৷

গুনগুন করে কাছে কোথাও একদল মানুষ তার নাম ধরে ডাকছে৷ পাখির ডাকের মতো গুঞ্জন, মৃদু, সুরেলা৷ চোখে মুখে জলের ছিটে পড়তেই চোখ খুলল মিতিন৷ তাকে ঘিরে অরিত্র, সপ্তর্ষি, অন্যান্যদের উদ্বিগ্ন মুখ৷ তাদের পুরো ট্রেকিং- এর দলটাকেই এই ঘরের মধ্যে দেখে মিতিন চমকে গেল৷ আর তখনই খেয়াল হল ঘর কোথায়? পাহাড়ের কোলে উন্মুক্ত আকাশের নীচে শুয়ে আছে সে, পাশেই তিতির শুকনো মুখে বসে৷ দু’জনের পোশাকই ভিজে সপসপ করছে৷ মাথায় তীব্র যন্ত্রণা৷ এখানে কীভাবে এল তারা? তাদের তো থাকার কথা বাংলোর সেই উষ্ণ আরামে জড়ানো ঘরের মধ্যে৷ আর কিছু ভাবতে পারল না সে, ধীরে ধীরে আবার চোখ বন্ধ করে দিল৷

অরিত্র তখন বলে যাচ্ছে, ওদেরকে ফোনে কন্ট্যাক্ট করতে না পেরে কাল সন্ধেতেই তারা টেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেছিল৷ রাত্রে ঘুমন্ত ড্রাইভার খালাসির কাছে জানা গেল, দুই মেমসাহেব একা একাই নেমে গেছেন পাহাড়ের গা বেয়ে কিছুটা নীচে৷ যতদূর চোখ যায় ওরা লক্ষ্য করেছিল, ওদের সঙ্গে কেউ ছিল না৷ কিন্তু মেয়ে দুটো যেন নিশির ডাকে দৌড়চ্ছিল এবং মাঝে মাঝে অদৃশ্য কারুর সঙ্গে কথাও বলছিল৷

মিতিনের কানে আর কিছু ঢুকছিল না৷ এখনো জিভে সেই সুস্বাদু মাংসের স্বাদ লেগে আছে৷ সব কিছু তাহলে কী ছিল? এক ভুলভুলাইয়ার মধ্যে সে ঢুকে গেছে, এ জন্মে এর থেকে সহজে বেরতে পারবে কি? এখনো কানের কাছে সে গমগমে আওয়াজ ‘‘ডোন্ট ওপেন দ্য ডোর’’ আবার পরক্ষণেই সেই ফ্যাসফ্যাসে গলা বলে উঠছে, ‘‘ওপেন দ্য ডোর৷’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%