মহুয়া মল্লিক
নৈনীর জন্ম আর অনুরাধার মৃত্যু প্রায় এক সঙ্গেই৷ একদিকে প্রসব বেদনায় নৈনীর মা ছটফট করছে, আরেক দিকে অনুরাধার শরীর মৃত্যুর ছোবলে নীল হয়ে আসছে৷ একদিকে স্তব্ধ হূৎপিণ্ড আরেক দিকে শিশুর কান্না৷ সাহা বাড়ি এভাবেই মৃত্যুর শোক ভুলে নৈনীকে বুকে জড়িয়ে নতুন করে বেঁচে উঠেছিল৷
নৈনী বড় হয়েছে অনুরাধার ছবি দেখে৷ মা চিনিয়েছে, এই হচ্ছে তোমার পিপি৷ তোমাকে পিপির মতো হতে হবে৷ পিপি একজন বিজ্ঞানী ছিলেন৷ ছোটবেলায় দুধের গ্লাস হাতে নৈনীর মা মিতাকে বড্ড ঝক্কি পোয়াতে হত৷ কিন্তু ঠাম্মি যেই ওর পিপির ছবির সামনে দাঁড় করিয়ে দিত, মেয়ে সব ভুলে এক চুমুকে দুধের গ্লাস ফাঁকা করে দিত৷ অনুরাধার ছবির দিকে মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকত৷ মিতারও মনে হত মেয়েটা ছবির সামনে দাঁড়ালে কেমন সম্মোহিত হয়ে যায়৷ এক একসময় মিতার গা শিরশির করে উঠত, মেয়েকে জাপটে ধরে তখন ওখান থেকে সরিয়ে নিতে পারলে বাঁচে৷
অনুরাধার মৃত্যুটা বেশ অদ্ভুত৷ এই ননদকে নিয়ে মিতার একটু বেশি অহংকার ছিল৷ অনুরাধা সাউথ ডেকোটার একটি ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানী ছিল৷ ছুটিছাটায় কদাচিৎ কলকাতায় আসত৷ সারাক্ষণ মোটা মোটা বই মুখে দিয়ে বসে থাকার বদলে এই মালির সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে বাগানের পরিচর্যা করছে তো, ঐ পিছনের পুকুরে সাঁতার কেটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে৷ নিজের জগতে মশগুল হয়ে থাকত৷ টানা গাড়িবারান্দায় বসে বসে ফুলের টুকরো মুখে দিতে দিতে মিতা ভাবত এই ননদের মতো উজ্জ্বল, মেধাবী, দামাল তার একটা মেয়ে হোক৷ হুবহু অনুরাধা যেন ছোট্টটি হয়ে তার কাছে ফিরে আসুক৷
অনুরাধারও কত পরিকল্পনা সেও চাইত একটা ভাইজি আসুক৷ তার নাম রাখবে নৈনী৷ তার বিয়ের জন্য বাবা-মা যেসব সোনার অলঙ্কার বানিয়ে রেখেছে সেসব আঠারো বছরের হলে মিষ্টি ভাইজিটার হাতে তলে দেবে৷
মিতা হাসতে হাসতে বলত, ‘‘তুই কী চিরকুমারী থাকবি?’’ আর বিয়ে না করলেও এক আধখানা গয়না তো পরতেই পারিস৷
অনুরাধা তার পদ্মকলির মতো চোখ দুটো মেলে হেসে উঠত৷ ‘‘দুর এসব আমার ভাল্লাগেনা৷’’
মিতা লক্ষ্য করে দেখেছে যত দিন যাচ্ছে নৈনী কেমন ওর পিপির প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেছে৷ অনেকদিন ভারত অনুরাধার ছবিটা বসার ঘর থেকে সরিয়ে নেবে৷ বিশাল এই সাহা বাড়িতে এই একমাত্র ছবিই ঝোলানো আছে৷ গুরুদেবের নিষেধ শোবার ঘরে মৃত মানুষের ছবি রাখা মানা৷ তাই এই ছবিটা সরিয়ে নিলেই মিতার শান্তি হত৷ আজকাল অনুরাধার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তার কেমন সারা শরীর শিরশির করে ওঠে৷ কিন্তু মিতাকে কিছু করতে হল না৷ একদিন সকালে উঠে নৈনী নিজেই ছবিখানা সরিয়ে নিল৷ ওর ঠাম্মির একটু খারাপ লেগেছিল তবে আদরের নাতনির ওপর রাগ করেননি৷
নৈনী একটু একটু করে বেড়ে উঠছে৷ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর রুক্ষতা বাড়ছে৷ আর বাড়ছে পৃথিবীর উপর আক্রোশ৷ সব কিছুতেই বিরক্তি৷ ছোটবেলায় আধো আধো গলায় বলত আমি বড় হয়ে পিপির মতো বিজ্ঞানী হব৷ এখন যদি কেউ ভুল করে বলে বসে, ‘‘ওমা আমাদের নৈনী হুবহু অনুরাধার মতো দেখতে হয়ে উঠেছে৷’’ ব্যাস মেয়ের মুখ ভার৷ সারাদিন দাঁতে কুটোটি কাটবে না৷ আজকাল সুপ্রিয়বাবু মানে নৈনীর বাবাও এসব কথায় বিরক্ত হন৷ ‘‘মেয়েটাকে সবসময় অনুরাধার সঙ্গে তুলনা করার কী আছে? ও ওর মতো হোক, ওর মতো করে বেড়ে উঠুক৷ অনুরাধা নেই এই সত্যিটা মেনে নিতে হবে সবাইকে৷’’
মিতা নিঃশব্দে সরে আসে সুপ্রিয়র সামনে থেকে৷ সত্যি তো৷ ও কেন অনুরাধার মতো হবে? হ্যাঁ জিনের প্রভাবে কিছু সাদৃশ্য তো থাকবেই৷ কিন্তু সেটা বারবার মেয়েটার কাছে বলার কিছু নেই তো৷ মেয়েটা বড় হচ্ছে হয়ত এসব কথায় বিব্রত বোধ করে৷ অনুরাধার মৃত্যুটা কেমন যেন রহস্যময়৷ আগের দিনও তরতাজা মেয়েটা দাপিয়ে বেড়ালো৷ ভোর রাত্রি থেকে ধুম জ্বর৷ তারপর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীর নীল হয়ে গেল৷ পোষ্টমর্টেম রিপোর্টে শরীরে বিন্দুমাত্র বিষের চিহ্নও পাওয়া গেল না৷ আশ্চর্য এক মৃত্যু৷ দুর্বল শরীরে উঠে এসে মিতাও দেখেছিল অনুরাধার মুখে যন্ত্রণার ছাপ ছিল না৷ শান্ত সমাহিত মুখে স্মিত হাসি৷ যেন নতুন দুনিয়ায় পা দেবার আগের মুহূর্তে একরাশ খুশি এসে মুখে ভর করেছিল৷ মিতা ভাবে এ কেমন মৃত্যু?
মিতার ঘুমটা ভেঙে গেল৷ বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা তুলে টাইম দেখল, রাত আড়াইটে৷ কী অদ্ভুত এইসময় ঘুম ভাঙল কেন? শরীরে কোনও অস্বস্তিও নেই৷ মিতা ঘুমন্ত সুপ্রিয়কে এক ঝলক দেখে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ল৷ ঘরের বাইরে এসে লম্বা করিডর ধরে হাঁটতে শুরু করল৷ হাঁটতে হাঁটতে নৈনীর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল৷ দরজার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলো এসে উঁকি মারছে দেখে মিতা আলতো হাতে দরজার পাল্লা ঠেলল৷ ভেতর দিকে বন্ধ ছিল না তাই দরজাটা হাতের একটু চাপেই খুলে গেল৷ দরজার দিকে পিঠ করে নৈনী বসে আছে৷ সারা ঘর অন্ধকার হলেও নৈনীর সামনের টেবিলে একটা লাল টুকটুকে মোমবাতি জ্বলছে, যদিও মোমবাতিটা দেখে মিতার কালচে জমাট রক্তের মতো মনে হল৷ কিন্তু নৈনী এত রাত্রে পড়ার টেবিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে কী করছে! পিছন থেকে ওর ঝামর ঝামর মেঘের মতো একরাশ চুলের জন্য টেবিলের উপরটা ভালো করে দেখতে পারছিল না মিতা৷ কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে আরো কয়েক পা এগিয়ে গেল৷ বিস্ফারিত হয়ে গেল তার চোখ৷ টেবিলের উপর অনুরাধার সেই ছবি যা ক’দিন আগে বসার ঘর থেকে নৈনীই জোর করে সরিয়ে দিয়েছিল৷ সামনে জ্বলন্ত মোম৷ বিন্দু বিন্দু গলে গলে নামছে তরল মোম, মিতার মনে হল কালচে রক্তের ফোঁটা৷ ও সম্মোহিতের মতো আরেকটু এগিয়ে যায়৷ নৈনী বুঝি টের পেয়ে গেল! একটু একটু করে ঘাড় ঘুরিয়ে মিতার চোখে চোখ রাখল৷ উফ কী ক্রুর দৃষ্টি! মিতার হাড় হিম হয়ে আসে৷ নৈনী হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়৷ চেয়ার ঠেলে এগিয়ে চলে অনুরাধার ছবির কাছে৷ ঠোঁট ফাঁক করে মিতার দিকে তাকিয়ে ঈষৎ হাসল৷ মিতার হাত-পা ঘেমে উঠেছে৷ তারপর সে দেখল হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নৈনী, অনুরাধার ছবির মধ্যে মিলিয়ে গেল৷ মিতা চিৎকার করতেও ভুলে গেল৷ কে যেন পা দুটো ঘরের মেঝেতে পেরেক বিদ্ধ করে রেখেছে৷ হঠাৎ মিতার চোখে পড়ল নৈনী তো ঘুমিয়ে আছে তার বিছানায়৷ তা হলে টেবিলের সামনে কে বসেছিল? এসব ভাবনার মধ্যেই দপ করে মোমবাতিটা নিভে গেল৷ ওর আয়ু ফুরিয়ে এসেছিল৷ একরাশ অন্ধকারের মধ্যে মিতা ডুবে গেল৷
মিতা তক্কে তক্কে ছিল৷ নৈনী স্কুল বেরিয়ে যেতেই ওর ঘরটা তন্নতন্ন করে খুঁজল৷ আলমারি, বইয়ের র্যাক, খাটের তলা, অ্যাটাচড বাথরুম৷ নাহ কোথাও অনুরাধার ছবিটা নেই৷ নেই মোমবাতির অস্তিত্ব৷ মিতার কপালে ভাঁজ দেখা যায়৷ তাহলে কালকের রাত্রের ঘটনাটা কী ছিল? কিছুই তাহলে কাল ঘটেনি? অন্ধকারের মধ্যে ছুটে আসতে গিয়ে দরজার পাল্লায় ধাক্কা লেগে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা থেঁতলে গিয়েছিল, এখনও রক্ত জমাট বেঁধে আছে৷ এটাও কী মিথ্যা?
সকালে ব্রেকফাস্ট এগিয়ে দিতে দিতে বারকয়েক চোরা চোখে নৈনীকে দেখছিল৷ নৈনীর কোনও ভাবান্তর নেই৷ সে অন্যদিনের মতোই চামচে করে সিরিয়াল মুখে তুলতে তুলতে একটা পেপারব্যাকে ডুবে গিয়েছিল৷ একদম অনুরাধার মতো, সেও খাবার টেবিলেও বইয়ে মুখ গুঁজে থাকত৷ মিতা মেয়ের মুখোমুখি চায়ের কাপ নিয়ে বসে পড়ে৷ আদা চায়ে আরাম করে চুমুক দেয়৷ কুসুমদি চা-টা বড্ড ভালো বানায়৷ চুমুক দিতে দিতে একটু একটু করে রাত্রের আতঙ্ক কেটে যাচ্ছে৷ সবটাই এখন দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে৷ পায়ের আঙুলটা কোনও ভাবে জখম হয়ে গেছে৷
মিতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েকে দেখতে থাকে৷ আঠারো বছর হতে আর দেড় মাস বাকি৷ মেয়েটা হঠাৎ করে কেমন বড় হয়ে গেল৷ হুবহু যেন অনুরাধা৷ পুরনো অ্যালবামে অনুরাধার এই বয়সের ছবি দেখেছে৷ একদম এইরকম ছিল অনুরাধা৷ তবে মিতা বারবার ভাবতে থাকে, অনুরাধার মতো হুবহু কী নৈনী? কোথাও যেন একটা পার্থক্য আছে৷ এত বছর ধরে মিতা সেটা ধরার চেষ্টা করেও পারেনি৷ কিন্তু পার্থক্য একটা আছেই৷ তাতেই তার চোখে হুবহু অনুরাধার মতো হয়েও নৈনী কোথাও যেন একটু আলাদা৷
নৈনী সামান্য খায়৷ ওর খাওয়া হয়ে গিয়েছিল৷ পেপারব্যাকটা টেবিলের উপর বন্ধ করে রেখে ও মিতার দিকে কঠিন চোখে তাকায়৷ তারপর হিমশীতল কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘‘কী এত দেখছ মা?’’ মেয়ের কাছে ধরা পড়ে গিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মিতা উঠে পালাতে পারলে বাঁচে তখন৷ নৈনীর রুমটা পরিষ্কার করে মিতা নীচে নামে তখনই গাড়িবারান্দায় তাদের অল্টোটা এসে নামে৷ স্কুলড্রেস পরে লাফিয়ে নামে নৈনী৷ আজ তাকে খুব খুশি লাগছে৷ মিতার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে কর, এত খুশির কারণটা কী? কিন্তু জিজ্ঞেস করলে যদি মেয়ে মুখ ভার করে তাই মিতা আর ও পথে না গিয়ে নৈনীর খাবার রেডি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷
আজকেও এক সময়ে মিতার ঘুম ভেঙে গেল৷ তীব্র একটা অস্বস্তি টের পেল৷ কিন্তু না টয়লেট যাওয়ার তাগিদ, না জল খাবার ইচ্ছে, না শরীরের কোনও অস্বাচ্ছন্দ্য৷ মিতা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কীসের এই অস্বস্তি৷ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ঘুমোবার চেষ্টা করছিল কিন্তু না যত সময় যাচ্ছে অস্বস্তিটা বেড়েই যাচ্ছে৷ একটা রাতচরা পাখি তীব্র শব্দে ডেকে উঠতেই মিতা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল৷ মেয়েটার হাবভাব একদম সুবিধের লাগছে না৷ বিশেষ করে কালকের রাত্রের ঐ ঘটনা! মিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে যান নৈনীর ঘরের দিকে৷ বন্ধ পাল্লার ফাঁকফোঁকর দিয়ে আগের রাত্রের মতোই হাল্কা একটা আলোর রেখা দৃশ্যমান হয়৷ নাইট বাল্বের আলো এ নয়৷ মোমবাতির কম্পমান ম্রিয়মাণ শিখা৷ মিতা আগের রাত্রের মতোই বন্ধ দরজায় চাপ দেন৷ কিন্তু না৷ নৈনী সাবধানী৷ আজ ভিতর থেকে দরজা বন্ধ৷ মিতা নিজের ঘরে ফিরে আসার জন্য পা বাড়ায়, তখনই বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে নৈনীর হাসির আওয়াজ ভেসে আসে৷ আর সেই সঙ্গে একরাশ মার্বেল যেন মেঝের উপর উঁচু জায়গা থেকে লাফিয়ে নামে৷ মিতার কানে তালা লেগে যায়৷ কোনোক্রমে সে টলতে টলতে নিজের ঘরে ফিরে আসে৷
সুপ্রিয়দের পারিবারিক বন্ধু আর বন্ধুপত্নী বহু বছর পর ফিজি আইল্যান্ডের পাট চুকিয়ে কলকাতায় স্থিতু হয়েছে৷ কালেভদ্রে দেশে আসলেও সুপ্রিয়দের বাড়ি সেভাবে বহুদিন আসেনি৷ তবুও যোগাযোগটা রয়েই গিয়েছিল৷ আজ সাহাবাড়িতে ডিনারে আমন্ত্রণ ছিল৷ দুটি পরিবারের মধ্যে হৈ হৈ করে সন্ধে কাটছিল হাল্কা স্ন্যাক্স, কফি ইত্যাদি নিয়ে৷ কথা প্রসঙ্গে বসু দম্পতি অনেকবার নৈনীর কথা তুললেন৷ মেয়েটাকে সেই অন্নপ্রাশনের সময় দেখেছিলেন তারপর বহু বছর দেখেননি৷ নিঃসন্তান দম্পতির আর তর সইছিল না মেয়েকে দেখার জন্য৷ কিন্তু নৈনীর এইদিন সন্ধেবেলায় কোচিং ক্লাস থাকে, ফিরতে ফিরতে সেই সাড়ে ন’টা৷ বসু দম্পতিদের অনেকটা ড্রাইভ করে যেতে হবে তাই মিতা কোনো আপত্তি না শুনে ডিনার টেবিল সাজিয়ে অতিথিদের ডাক দিয়েছিল৷ সেই মুহূর্তেই নৈনী ফিরল৷ এক রত্তি মেয়েটা এত বড় হয়ে গেছে দেখে তো বসু দম্পতি বিস্ময়ের ঘোর কাটে না৷ মিসেস বসু খাবার প্লেট এক পাশে সরিয়ে মেয়ের জন্য আনা একরাশ গিফট নৈনীর হাতে তুলে দিলেন৷ সুইস চকলেট, ব্রান্ডেড রিস্টওয়াচ, বড় একখানা টেডি এসব পেয়ে নৈনী আহ্লাদে আটখানা৷ সবাই একসঙ্গে খাওয়া শুরু করল৷ মেয়ের হাসি মুখ দেখে মিতার খুব ভালো লাগল৷ মেয়েটা তো সবসময় নিজেকে একটা শক্ত আবরণে মুড়ে রাখে, যা দেখে মিতার বুক কাঁপে বরং আজ এত স্বাভাবিক দেখে মনে মনে স্বস্তি বোধ করছিল৷
কথায় কথায় সুপ্রিয় বলে উঠলেন, রাত পোহালেই নৈনীর আঠারো বছর পূর্ণ হবে৷
‘‘আরেব্বাস কাল আমাদের প্রিন্সেসের জন্মদিন? এ হে আগে জানলে ওর বার্থডে গিফট নিয়ে আসতাম৷’’ মিস্টার বসুকে থামিয়ে দেয় মিতা, ‘‘ওসব পরে হবে, আসলে আমরা এইদিনটা কিছুদিন পরে সেলিব্রেট করি৷’’
মিস্টার বসু আক্ষেপের স্বরে বলেন, স্যাড অনুরাধার চলে যাওয়াও তো আঠারো বছর হতে চলেছে৷
সবাই মাথা নামিয়ে নেয়৷ কেউ আর খাবার মুখে তুলতে পারে না৷ মিসেস বসু পরিস্থিতিটা হাল্কা করার উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, ‘‘ওসব বাদ দাও, আমার নৈনী কেমন দিনে দিনে রূপসী হয়ে উঠেছে দেখেছ? ঠিক যেন অনুরাধা৷ ওর মতোই ডাকসাইটে সুন্দরী হবে৷’’
মিতার মুখটা পলকে ছাইয়ের মতো বিবর্ণ হয়ে যায়৷
মিস্টার বসু যোগ করেন, ‘‘নাহ, পুরো অনুরাধার মতো না, হুবহু অনুরাধা হলেও চোখের দৃষ্টিতে আকাশ-পাতাল তফাত৷ অনুরাধার দৃষ্টি নরম, মায়াবী আলোর মত ছিল, আর নৈনী....৷’’ কথা শেষ করার আগেই নৈনী খাবারের প্লেট ছেড়ে উঠে পড়ে৷ সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গিয়ে নিজের দরজা বন্ধ করে দেয়৷ শত অনুরোধেও দরজা আর খোলে না৷ বসু দম্পতি মুখ কালো করে ফিরে যায়৷ শেষে বাপির অনুরোধে মেয়ে দরজার ছিটকিনিটা একসময় খুলে দিয়েছে৷
আজকেও মিতার এক সময়ে ঘুম ভেঙে যায়৷ একই রকমভাবে তীব্র একটা অস্বস্তি ওকে জাপটে ধরে৷ ধীরে ধীরে আবার মিতা একইভাবে নৈনীর ঘরের দিকে চলতে শুরু করে৷ দরজার কাছে এসে চমকে যায় দরজা হাট করে খোলা৷ ভেতর থেকে মোমবাতির মৃদু আলো ভেসে আসছে৷ পর্দাটা হাল্কা দুলছে৷ মুঠোয় ধরে পর্দাটা সরায় সে৷ এ কোন অপার্থিব দৃশ্যের মুখোমুখি হয় মিতা? মুখোমুখি নৈনী আর অনুরাধা বসে৷ অনুরাধা একটি একটি করে স্বর্ণালঙ্কারে নৈনীকে সাজিয়ে তুলছে৷ ফিসফিস করে বলছে, সব আমার, সব আমার৷ এই যে তুই, তোর চুল, নখ, চামড়ার দ্যুতি, এমনকি মগজ সব আমার৷ সব আমার, তোর জন্য সব আমি ছেড়ে গেছি৷ কিন্তু একটি জিনিস আমি তোকে দিইনি, কেন দিইনি জানিস? তোর মা’কে শাস্তি দেব বলে৷ জানিস সেই জিনিসটা কি? নৈনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নাড়ছে হ্যাঁ, সে জানে তো৷ আজ বসু আঙ্কল বলেছে বলে বাড়ি শুদ্ধ লোক টের পেয়েছে, আমি তো চেয়ে মা যখন দেখে আর তোমার সঙ্গে মিল খুঁজে বার করার চেষ্টা করে তখন এই ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে আমি পুড়িয়ে দিই মা’কে৷ মা পালিয়ে যায়৷
অনুরাধা হিসহিস করে ওঠে আসলে তোর মা বোঝেই না তুই আর আমি আলাদা নই, তুই আর আমি একজন৷ দু’জনে রাত্রের অন্ধকারে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে৷
নৈনীর গলাটাও কেমন ফ্যাসফ্যাসে শোনায়, ‘‘আচ্ছা, এই চোখটা তো তোমার? তাহলে দৃষ্টিটা আলাদা হল কেন?’’
‘‘দুর পাগলি, ঐ চোখ আমার হবে কেন? দেখবি আমার চোখ, এই দেখ তবে৷’’
একটা সুদৃশ্য কাঠের বাক্স থেকে এক মুঠো মার্বেল খাবলে ধরে মেঝের উপর আছড়ে ফেলে অনুরাধা৷ অগুণতি মার্বেল ঝাঁপিয়ে নেমে মসৃণ মেঝেতে গড়িয়ে যায়৷ মিতা দেখে মার্বেলগুলো জ্বলজ্যান্ত চোখ হয়ে সারা ঘর ঘুরতে থাকে৷ এক সময় ওরা দিক পরিবর্তন করে মিতার দিকে ধেয়ে আসে৷ মিতা ছুটতে শুরু করে, করিডর, তিন তলার সিঁড়ি পেরিয়ে ছাদে এসে থামে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন