মহুয়া মল্লিক
জুন বিষণ্ণ হলে আমার ভালো লাগে না। ও হাসবে, গান গাইবে, ঘনঘন লিপস্টিকের শেড চেঞ্জ করবে আর আমাকে সেলফি পাঠিয়ে প্রশ্ন করবে, ''এই রাজা, আমায় কেমন দেখাচ্ছে?'' আমি তো জুনের পায়ের নখ থেকে মাথার চুলে মজে আছি, আমি কী বলব! অন্ধ পুরুষের কাছে জুন দাঁড়িয়ে একই কথা জিজ্ঞেস করলে সেও ওর গন্ধ চুল আর সুরেলা কণ্ঠ শুনে নির্ঘাত বলে উঠবে, ''তুমি তো সর্বাঙ্গ সুন্দর, আলাদা করে রঙের পরতে তোমায় সাজার দরকার কী?''
ফস করে আরেকটা সিগারেট ধরালাম। আগেরটা ঠিক তিন মিনিট একুশ সেকেণ্ড আগে শেষ করেছি। জুন পছন্দ করে না আমার এই ঘনঘন সিগারেট খাওয়া। কড়া গলায় শাসিয়ে রেখেছে, ''মুখ থেকে একটাও সিগারেটের গন্ধ পেলে কিন্তু নো চুমু''। মৌজ করে সিগারেটে সুখটান দিলাম। হোক গন্ধ, জুনতো আজ বিষণ্ণ, এই বিষাদ প্রতিমাকে তো আমি চিনি না। আমি তো চাই উচ্ছল ঝরনার মতো বাঙময় জুনকে। জুন বিষণ্ণ হলে ক্রিস্টালের কাপে সোনালি টলটলে চায়ে অল্প বিটনুন ছড়িয়ে একটা বই মুখে বসে যায় ওর শ্বেত পাথরের পড়ার টেবিলে। একটু একটু করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে হারিয়ে যায় বইয়ের পাতায়। কাপের পর কাপ আর এক বই থেকে আরেক বইয়ের পাতায় এভাবেই কাটিয়ে দেয় ঘন্টার পর ঘন্টা। তারপর একসময় ঝটকা দিয়ে ওঠে। স্নান সেরে পরিপাটি সেজে আমায় ফোন করে, ''রাজা, তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে এসো আজ, নদীর পাড়ে একটু হাঁটতে যাব।''
জুনকে দেখি, কমলা রঙের স্লিভলেস ব্লাউজ আর একই রঙের শিফন শাড়িতে আগুন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা ঝোলা দুল আর গলার কাছে জ্বলজ্বল করছে আমার উপহার দেওয়া হিরের লকেটটা। ওকে দেখতে দেখতে জল তৃষ্ণা পায় আমার, ফ্রিজের দিকে এগিয়ে যাই, বেছে বেছে একটা কমলা রঙের বোতল বার করে ঢকঢক করে জল খাই। ও আমার সামনে থেকে সরে যায়। একটু পরেই এক কাপ চা নিয়ে আসে। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিই। জুন আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ''প্লিজ রাজা, আলো কমে আসছে, এরপর গেলে কিন্তু একটাও পাখি দেখতে পাব না।'' নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে পাখিদের ঘরে ফেরা দেখতে দেখতে এক এক সময় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে, ''নির্দিষ্ট সময়ে সবাই কেমন বাড়ি ফিরে আসে, সায়নের কবে সময় হবে বাড়ি ফেরার?'' চমকে উঠি আমি। হ্যাঁ সায়নের কথা শুনলেই চমকে উঠি প্রতিবার। জুনের হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। সিগারেট ধরাই জুনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই।
মাঝে মাঝে জুন পরী হয়ে যায়। ওর পিঠের উপর গজিয়ে ওঠে রূপালি তারের কারুকাজের মতো স্বচ্ছ দুটি ডানা। জুনের তখন মাটিতে পা পড়ে না, ডানা ঝাপ্টিয়ে ও উড়তেই থাকে। উড়ে যায় শহরের অভিজাত শপিংমলে, সাজানো পার্ক বা নদীর কিনারায়। আমি ওর পিছনে দৌড়তে থাকি, দৌড়তে দৌড়তেই আমার জিভ বেরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে আমায় দেখে আর চিৎকার করে জুন, ''এত দেরি করছ কেন রাজা? দেখছ না কর্নারের টেবিলটার দিকে ঐ ছেলেমেয়ে দুটো লোভীর মতো এগিয়ে যাচ্ছে!'' এই ফুডকোর্টের ঐ জোনটা জুনের খুব পছন্দের। ওখানে বসে জুসের গ্লাস নিয়ে ও ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারে। ওখান থেকে নীচের চলমান রাস্তাটা দেখতে দেখতে জুন এক—একদিন বলে ওঠে, ''রাজা আমার ইচ্ছা করে এই কাচের দেওয়ালটা ভেঙে উড়ে যাই।'' ''কোথায় যাবি তুই পাগলি আমাকে ছেড়ে?'' ওর উষ্ণ নরম তালু নিজের গালে চেপে ধরতে ধরতে প্রশ্ন করি। জুন আমাকে দেখেই না, ও মনে মনে উড়তেই থাকে। ওর এই পরী হওয়া দিনগুলোতে আমিও খুব ভালো থাকি। আমাকে আর মেসের স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে ফিরতে হয় না। আমার গলা জড়িয়ে ও আব্দার করে, ''আমার কাছ থেকে যাও প্লিজ আজ রাতটুকু। চাইলে তুমি এখানেই থেকে যেতে পারো, তুমি সায়নের তুতো ভাই, মেসে পড়ে থাকবে কেন? সায়ন নিজওে তো কতবার থেকে যাবার কথা বলেছে তোমাকে, কী বলেনি?''
ঘাড় নাড়তে নাড়তেই অরেঞ্জ জুসে চুমুক দিই। সামনের কাচের দেওয়ালের দৃশ্যপট বদলে যায়। একটু একটু করে জেগে ওঠে নীল সমুদ্র। জুন সীগাল হয়ে ডানা ঝাপ্টায় সমুদ্রের বুকে।
রাত্রে ঘুমের মধ্যে টের পাই আমার বিছানায় উঠে এসেছে জুন, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে ফিসফিস করে বলে, ''আমার খুব শীত করছে রাজা''। জুনের নগ্ন শরীরটা উজ্জ্বল আলোর নীচে বড্ড দেখতে ইচ্ছা করছিল। নিজেকে সংযত করে আরেকটা সংযমের রাত কাটিয়ে দিই। কাঠ হয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। জুনের তীক্ষ্ন নখের আঁচড়ে আমার বুক পিঠ ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে। হোক, কাল তো ঐ ডেটল তুলো দিয়ে নিজের হাতে শুশ্রূষা করবে। সেই সময় আমি ওর ভিজে ভিজে নরম ঠোঁট দুটো নিজের রুক্ষ ঠোঁটের মধ্যে যত্ন করে তুলে নেব।
সৌরভের অপেক্ষা করছিলাম, এই দশটা পাঁচটার চাকরি আর পোষাচ্ছে না। সেলসের লাইনে কাজ করতে করতে এ লাইনের ঘাঁতঘোঁতগুলো ভালোই চিনে গেছি, নিজে একটা বিজনেস স্টার্ট করা যেতেই পারে। তবে পুঁজির টান, সৌরভ অনেকদিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছিল, বড়লোক বাপের ছেলে, ফ্যামিলি বিজনেস ছেড়ে নিজে কিছু করতে চাইছে। সে হিসেবে ভালোই, ওর পুঁজি আমার পরিশ্রম।
হাত—ঘড়িতে আরেকবার চোখ চলে গেল, সৌরভ এখনো এল না! ঠিক তখনই পাশের টেবিলের ছেলে দুটির দিকে নজর গেল। বাইশ—তেইশ বছরের ছেলে। অনেকক্ষণ ধরেই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে মোবাইলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। ওদেরই একজনের ট্যাবে চোখ পড়তেই থমকে গেলাম। জুম ইন করে ওরা কী একটা দেখছে আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। বড় স্ক্রিণ হওয়ায় আমিও দেখতে পাচ্ছি এবার অল্প অল্প। একটি মেয়ের বুকের বিভাজিকায় ট্যাটুর ছবি, ফণা তোলা একটা সাপ। ট্যাটুটা দেখেই থমকে গেছি। তারপরেই ছেলে দুটো আরেকটা ছবিতে চলে গেল। এবার একটা বিছের ট্যাটু। আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল।
ছেলেগুলো হঠাৎ আমায় লক্ষ্য করল, তারপরেই ট্যাবটা একপাশে নামিয়ে রেখে খাওয়াদাওয়ায় মন দিল। আমি লক্ষ্য করছিলাম খেতে খেতেই ছেলেগুলো আমায় আড় চোখে দেখছিল।
''হাই, বস অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিস?''
সৌরভ হাসিমুখে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে একটা ঝিনচ্যাক মেয়ে, ওর লেটেস্ট বান্ধবী নিশ্চয়। আমি আগ্রহ না দেখিয়ে ওদের সামনের চেয়ার দেখিয়ে দিই। মেয়েটার নাম দেবলীনা। ও চোখের পলক না ফেলে আমাকে দেখতেই থাকল। এভাবে কথাবার্তা বলতে একদম ভালো লাগছিল না। এসব কনফিডেন্সিয়াল কথার মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি ঠিক সহ্য হচ্ছিল না। আমি উঠে পড়লাম। ''আসি রে বাকি কথা পরে হবে।'' ''আরে শ্লা এত তাড়াতাড়ি কাটছিস কেন? ব্যাচেলার মানুষ এত তাড়া কীসের?'' শরীরটা ভালো নেই বলে কাটাই। আসতে আসতে শুনতে পেলাম, দেবলীনা বলছে, ''তোমার বন্ধু দারুণ সেক্সি তবে ওর শরীর থেকে কেমন একটা পচা গন্ধ বেরচ্ছে।''
বলে কী মেয়েটা? দিনে দু'বার স্নান করি দামি বডিশ্যাম্পু দিয়ে। বিদেশি ইউডিকোলন ঢালি তারপরেও গন্ধ? সৌরভ হেসে ওঠে, তোমার নাকটা একবার ই.এন.টি—কে দেখাও বেবি। রাজা ভীষণ শৌখিন ছেলে। আর আমি তো দিব্যি সুন্দর গন্ধ পেলাম ডার্লিং। দেবলীনা উত্তরে কী বলল, তা আর শুনতে পেলাম না।
টুং করে আরেকটা মেসেজ ঢুকল, জুনের মেসেজ। ওর তেত্রিশটা কল কেটে দেবার পর লাগাতার মেসেজ করেই যাচ্ছে। মেসের এই তেলচিটে বিছানায় ঘুম আসছিল না, জুন আমার অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছে। সপ্তাহের মধ্যে বেশিটাই তো ওর বাড়িতে কাটাই। হাতড়ে হাতড়ে মোবাইলটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে গ্যালারিতে ঢুকলাম। সেই ছবিটা। জুনের নীল লাইক্রার স্কার্টটা জোর করে কোমর থেকে কিছুটা নামিয়ে দিয়ে মেরুদণ্ডের একদম শেষ প্রান্তে বিছের ট্যাটুটা মন্ত্রমুগ্ধর মতো দেখছিলাম। জুনই বলেছিল, রাজা একটা ছবি তুলে রাখ। ছবিটা তোলার পর ওকে পাঠাতে চেয়েছিলাম, ও হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে আমার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, ''দিতে হবে না এটা শুধু তোমার, যত্ন করে রেখে দাও।'' আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি, ঐ ট্যাটুটার উপর অজস্র চুমু খেয়েছিলাম। একটু পরে নিজেকে সামলে নিতে নিতে জুন বলেছিল, বিছে নিয়ে এত খেল না, যেদিন কামড় খাবে বুঝবে রাজা।
হ্যাঁ আজ বুঝছি। বিছের কামড়ের জ্বালা কেমন। ঘরের লাগোয়া ছাদে বেরিয়ে এলাম। মাথার উপর তারায় ভরা আকাশ। আমি পায়চারি করতে শুরু করলাম, হঠাৎ দেখি মুঠোয় ধরা ফোনটা ভাইব্রেট করছে। ট্রু কলারে দেবলীনা কলিং। ফোনটা ধরতেই একটা ফ্যাসফ্যাসে গলা, ''আজ বিকেলেই প্লাজামলে আপনাকে মিট করলাম, চিনতে পারছেন কি? এনিওয়ে আমি দেবলীনা। সৌরভের কাছে আপনার নাম্বারটা নিলাম।
এত রাত্রে এই মেয়ে জ্বালাতে এল কেন? তবু ভদ্রতা করে বলি, ''হ্যাঁ ম্যাম বলুন।''
আপনি একটু সাবধানে থাকবেন প্লিজ। সৌরভের বন্ধু তাই বললাম।
—কেন বলুন তো? ওহো সেই পচা গন্ধটা। আমি হেসে ফেললাম।
খুব রেগে গেল মেয়েটা। হাসবেন না প্লিজ। যাক আপনি যখন শুনেই নিয়েছেন, আমার বলতে সুবিধা হল। শুনুন নিজেকে বাঁচান, আপনার শরীরের ভিতরে পচন ধরেছে, একটা পচা গন্ধ সেখান থেকে উঠছে। এখনো সময় আছে নিজেকে বাঁচান।
এই মেয়েটা আমার প্রেমে পড়েছে নির্ঘাত। সাত বছরের বড় জুন যখন বৌ হয়ে এল, প্রথম দুটো বছর ঘটা করে ভাইফোঁটা, রাখী এসব করেছিল। পরে একদিন লোভীর মতো বলে উঠেছিল, ''এইসব রিচ্যুয়ালস চুলোয় যাক, তুমি কাছে দাঁড়ালেই তোমার বুকে নাক ঘষতে ইচ্ছা করে।'' জুনের কাছে এতো সামান্য মেয়ে। একটু খেলার ইচ্ছা হল। বললাম, ''তুমি আমায় বাঁচাতে পারবে?''
মেয়েটা ফোনের ও—প্রান্তে থমকে যায় কয়েক পলক, তারপর তেমনই ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে, ''আর ইউ সিরিয়াস?''
''হ্যাঁ তো। তুমি চাও না আমায় বাঁচাতে?''
মেয়েটা এবার বলে, ঠিক আছে আপনি এই মুহূর্তে সবথেকে যে জিনিসটা ভালোবাসেন সেটার নাম একটা কাগজে লিখে রুমালে বেঁধে নিয়ে আসবেন। কাল ঠিক আটটায় আজকের জায়গায় আমি ওয়েট করব। ছাড়ছি এখন।
একচোট হেসে নিই। মাথার জট খুলে যাচ্ছে একটু একটু করে। এবার বরং জম্পেশ একটা ঘুম দিয়ে নিই।
দেবলীনার পরনে টকটকে লাল একটা শাড়ি। কান থেকে লম্বা লাল সুতোর দুল ঝুলছে। মেয়েটা ঠিক কী করতে চাইছে আমি বুঝতে পারছি না। এই মুহূর্তে স্ট্রিটলাইটের আলোয় ওর পরনের শাড়ি কালচে রক্তের মতো লাগছে। আমি ওর পিছনে চলতে চলতে চমকে গেলাম। মেয়েটা সেই যে রুমালটা আমার হাত থেকে নিয়ে গম্ভীর মুখে ওকে অনুসরণ করতে বলল, সেই থেকে হেঁটেই যাচ্ছি, পথ আর ফুরায় না।
''আসুন'', ঈষৎ ঘাড়টা বাঁকিয়ে আমাকে বলল মেয়েটা। মেয়েটার ঠোঁটের দু কোণে সাদা কী যেন ঝলক দিয়ে উঠল, আমার হৃৎপিণ্ড থমকে যাবার উপক্রম। মেয়েটার দাঁত নাকি? আগে লক্ষ্য করিনি তো। লক্ষ্য করলাম একটা কবরখানার মধ্যে ঢুকে পড়েছি।
দেবলীনা একটা গাছের তলায় চোখ বুজে বসে রুমালটা নিজের মাথার দুপাশে কয়েকবার ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে কীসব বলল। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেল! ম্রিয়মাণ চাঁদের আলোয় রিস্টওয়াচের দিকে তাকালাম ক'টা বাজে দেখতে। একী আমার কব্জী থেকে কালচে তরল গড়াচ্ছে কেন? রক্ত! রক্ত এল কী করে! দেবলীনা চোখ খুলে হাসল শব্দ করে, কাছেই কয়েকটা রাতচরা পাখি উড়ে গেল ডানা ঝাপটিয়ে। হাতের রুমালটা গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে উঠে দাঁড়াল, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কেউ আর আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। এবার আপনি যেতে পারেন। আমি অন্য রাস্তায় ফিরব। আশা করি পথ চিনে ফিরতে অসুবিধা হবে না?
মুহূর্তে কী যে হয়ে গেল আমার, একটা মেয়ে শুধু আমার জন্য, আমাকে বিপদমুক্ত করার জন্য এত আকুল হয়ে উঠেছে? জুন কখনো আমার কথা এভাবে ভেবেছে? মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেলাম। আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে ও নাক টেনে বাতাসে কিছু শুঁকল, তারপর হাসতে হাসতে বলল, ''আপনি বিপদমুক্ত, পচা গন্ধটার বদলে লেবু ফুলের গন্ধে ভরে গেছে আপনার শরীর, টের পাচ্ছেন?'' আমি ওসব টের পাচ্ছি না, আমি এই অন্ধকারের মধ্যেও মেয়েটার উদ্ধত বুক, কোমরের খাঁজ লক্ষ্য করছিলাম। ওর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে আমার হাতকে যথেচ্ছ অবাধ্য হতে দিলাম। একসময় মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে গলার কাছে মুখ ডোবাল। কিছুক্ষণ পরেই আমাকে ছেড়ে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হনহন করে মিলিয়ে গেল।
এক বুক সুখ নিয়ে ফিরছিলাম। ফিরতে ফিরতে জুনের শরীরের সেই গোপন ট্যাটুটার কথা মনে পড়ে গেল আর সেই মুহূর্তেই আমি ঠিক করে নিলাম জুনকে মেরে ফেলব, গলা টিপে যেমন করে রাসু চাচা হাঁস মুরগি মারে সেভাবে জুনকে মেরে ফেলব খুব তাড়াতাড়ি। দুধ সাদা বিছানার উপর ছটফট করতে করতে একসময় নিথর হয়ে যাবে জুনের নীল হয়ে ওঠা শরীর। আহা জুন, আমার নীলকান্তমণির মতো জুন, অপরূপ বিধ্বস্ত সৌন্দর্যের জুন।
আমার পা যেন নিজের বশে নেই। জুনের বাড়ির দিকে আমি প্রায় ছুটতে শুরু করলাম।
বেলা করে ঘুম ভাঙল। শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। দেবলীনার ডাগর শরীরটা ভেসে উঠল চোখের পাতায়। যাহ মোবাইলে তো ওর নাম্বারটাই সেভ করে রাখিনি। সৌরভকে ফোন করলাম। ইনিয়ে বিনিয়ে শুরু করলাম, ''মেয়েটা তন্ত্রমন্ত্র জানে মনে হয়, আমাকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করল কাল, একটু নাম্বারটা দে তো, থ্যাংকস জানাই একটা।''
''কাল? তুই কি টিভির নিউজ দেখিসনি? ও তো পরশু দিন সন্ধেতে বাস অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। সেই নিয়ে শহর তোলপাড়।'' ফোনটা নামিয়ে রেখে ঘাড়ে হাত দিই, দেবলীনার স্পর্শ এখনো টাটকা, কিন্তু জ্বালা জ্বালা করছে কেন এত?'' আয়নার সামনে দাঁড়াতেই চমকে উঠলাম, দুটো লালচে বিন্দু, রক্ত চুইয়ে শুকিয়ে গিয়ে তৈরি হলে যেমন হয় আর কি! তবে কি...
অভ্যাসবশতঃ জুনের নাম্বারটা ডায়াল করে ফেললাম, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে জুন ফোনটা ধরল। কর্কশ গলায় বলে উঠল, ''কী দরকার যখন তখন ফোন করার? সায়ন এসেছে বহুদিন পরে, আমাদের এখন একদম বিরক্ত করো না। বেশি জ্বালাতন করলে কিন্তু আমি পুলিশকে সব জানাব।''
''কী জানাবে তুমি পুলিশকে?''
''দিনের পর দিন সায়নের অনুপস্থিতিতে তুমি বড় ভাইয়ের বৌকে...''
লাফিয়ে উঠলাম আমি। শালী বলে কি! আমি না ও আমার গায়ে পড়ে...! নেহাত মরা মানুষকে খুন করা যায় না নাহলে এখুনি ওকে আরেকবার খুন করতাম। কথাটা মনে আসতেই চমকে উঠলাম, জুন ফোন ধরল কী করে? সায়নই বা ফিরে এল কীভাবে? ওকে তো আমি নিজের হাতে সরিয়ে ফেলেছিলাম। যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যেতে লাগল, আমার পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল।
কতক্ষণ সেন্সলেস হয়ে মেঝেতে পড়েছিলাম জানি না। সুস্থ বোধ করতেই ঝড়ের বেগে হারিয়ে এলাম। সোজা জুনের বাড়ি। এই তো দরজাটা খোলা। আগের মতোই আমার জন্য অবারিত দ্বার। জুন আর সায়ন কফির মগ হাতে মুখোমুখি বসে। সামনে মিউট করা টিভির পর্দা। এদিক—ওদিক তাকিয়ে ফল কাটার ছুরিটা তুলে নিলাম। পা টিপে টিপে এগোতে লাগলাম। ওরা দুজনেই পিছনে ঘুরে আমায় দেখতে লাগল তারপর একসঙ্গে শব্দ করে হেসে উঠল। ''আপদটা মরেও পিছু ছাড়ল না, কিছু একটা করতে হবে এবার?'' সায়ন বলে উঠল। জুন বেহায়ার মতো হাসছে, সায়নের দিকে চোখ মটকে ইশারা করে বলল, ''কেমন অভিনয় করে গাধাটার সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করিয়েছি বলত? সায়ন জড়িয়ে ধরে জুনকে। ঐ ট্যাটুর ছবি দেখিয়ে প্রথম ওর মাথাটা গেল তারপর দেবীর অভিনয়, কবরখানায় ভয়েই ইডিয়েটটা হার্টফেল করল। সায়ন হা হা করে হাসতে হাসতে জুনের ঠোঁটে চুমু খেল।
আমি রাজা সান্যাল ভেবলে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ঝাড়বাতির নীচে। আমি মৃত না ওরা? হিসেব মতো ওদের তো নিজের হাতে খুন করেছি। সায়ন এবার বলল, সৌরভও একটা পার্সেন্টেজ পাবে, সেটা মিটে গেলেই আমরা সুইজারল্যাণ্ড উড়ে যাব। সেকেণ্ড হানিমুন আহা!
জুন আমুদে গলায় বলে, গাণ্ডুটার বাবা যে পুরো সম্পত্তিটা ওকে দিয়ে গিয়েছিল, কে দেখে বলবে? কঞ্জুসের মতো বাঁচিয়ে রাখত। সব এখন আমাদের, একেই বলে পরের ধনে পোদ্দারি। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের হাত—পা দেখি, সব তো মানুষের মতোই। তাহলে ওরা আমাকে অতীত বলছে কেন? জুন এবার আমার গায়ে কী যেন ছিটিয়ে দেয়, সারা শরীর জ্বলে যায় আমার, রেলিংবিহীন জানলা গলে ঝাঁপ দেবার আগে বিড়বিড় করে বলে যাই, আমি ফিরে আসব, আবার ফিরে আসব তোমার শরীরের ট্যাটু হয়ে। গুড বাই জুন।
সারারাত জুনের ঘুম হয় না। না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শীর্ণকায় ওর চেহারা, চোখ কোটরে বসে গেছে, চোখে নীচে এক পোঁচ কালি। আয়না দেখলেই ভেঙে ফেলে ও। একটা ঘরে বন্দী থাকে জুন, সে ঘরে একটাও আয়না নেই। পাশের ঘরে নিত্য নতুন নারী সঙ্গে মেতে ওঠে সায়ন তা স্পষ্ট টের পায় জুন। আজ অনেক কষ্টে দুচোখের পাতা এক করেছিল সে। এমন সময় ঘুম ভেঙ্গে যায়, মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্ত থেকে জেগে ওঠে বিছেটা। ওর সারা শরীরে দংশন করতে করতে ঘুরে বেড়ায়। জুনের চিৎকারে রাতের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন