চন্দ্রপুরের চাঁদনি রাত

মহুয়া মল্লিক

রাই লেটার বক্সে চিঠিটা দেখে অবাক হল। আসা—যাওয়ার পথে লেটার বক্স খুলে চিঠি দেখা তার অভ্যাসের মধ্যে পড়েও না। তার কোনও চিঠি আসে না আর যদিও অফিসিয়াল কিছু আসেটাসে কেয়ারটেকার নিজের হাতে রেখে দেয়। রাইয়ের ফেরার সময় হাতে ধরিয়ে দেয়। এই বিল্ডিং—এ মোট বারোটা ফ্ল্যাট। জি প্লাস ফোর বিল্ডিং। নিয়মমতো গ্রাউন্ড ফ্লোরে কার পার্কিং। আজ অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়েছে শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছিল বলে। শেষ আওয়ারে কাজও তেমন ছিল না। রাই ফুল খুব ভালোবাসে। ফেরার পথে একগুচ্ছ লাল গোলাপ বেশ সস্তায় পেয়ে গেল। একা রেন্টাল ফ্ল্যাটে থাকলেও পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে থাকতে ভালোবাসে ও। অনেকেই ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকতে চায়। একসঙ্গে দু—তিনটি মেয়ে থাকলেও সুবিধা। রাইয়ের একদম পছন্দ নয়। ওর মতে দু'হাতে রোজগার করছি একটু আরামে থাকব বলে। নিজের মতো করে থ্রিলার মুভি বা থ্রিলার বইতে ডুব দিয়ে জমাট রাত্রি কাটানোর যে কী সুখ সে যে টের পেয়েছে সেই জানে।

রাই খামটা ভালো করে দেখল। হাল্কা নীল রঙের লম্বা খাম। এক পাশে এক ঝাঁক উড়ন্ত পাখির ছবি। খামের উপর নীলচে বেগুনি কালিতে তার নাম ঠিকানা জ্বলজ্বল করছে। জেনারেল পোস্টে এসেছে। হাতের লেখাটা যেন এক ঝলক চেনা চেনা লাগল। কিন্তু রাই কিছুতেই মনে করতে পারল না কার হাতের লেখা। চিঠিটা ধীরেসুস্থে পড়বে ভেবে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে তরতর করে রাই সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করল। লিফট থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই সিঁড়ি ব্যবহার করে। টপ ফ্লোর অবধি হেঁটে যেতে একটু শরীরচর্চাও হয়ে যায়।

বাড়ি ফিরে ব্যল্কনির এক ঝাঁক সবুজের পরিচর্যা, টুকটাক রান্না। মায়ের সঙ্গে ফোন এসবের মাঝে চিঠিটার কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। রাত্রে খাবারের প্লেট নিয়ে টিভির সামনে বসে খবরের চ্যানেলগুলো সার্ফ করতে করতে হঠাৎ চিঠিটার কথা মনে পড়ল। খাওয়া মাথায় উঠল। হাতে কাজ সেরে হাল্কা উষ্ণ কম্বলে নিজেকে মুড়ে চিঠিটা খুলে বসল।

প্রিয় গায়ত্রী,

জানি আমাকে তোর মনে পড়বে না কিন্তু হাতের লেখাটা চেনা চেনা লাগবে। তবু চিঠিটা তুই পড়বি আমি জানি। খুব মন দিয়ে একবার, দু'বার, বারবার পড়বি। আর আজ থেকে দিন গুণবি কবে তুই এই চাঁদে ভেসে যাওয়া উপত্যকায় দু'হাত ডানার মতো ছড়িয়ে এসে দাঁড়াবি।

আমাকে তোর মনে নেই জানি। মনে থাকারও কথা নয়। আমার তোকে আজও মনে আছে। ক্লাসের সেরা স্টুডেন্টকে কার না মনে থাকে বল! তার উপর তুই গান, আবৃত্তি, ছবি, বিতর্ক সবেতেই তুখোড়। সেসব আমার কিছুই ছিল না। তবে হ্যাঁ একটা জিনিস ছিল আমার যা তোর ছিল না। আমি দেখতে পেতাম। ভবিষ্যৎ দেখতে পেতাম।

যেমন দেখেছিলাম ঝাড়ুদার শান্তিরামের ছেলেটা লরির তলায় পিষে যাবে। যেমন দেখতে পেতাম পিটি স্যারের ডান হাতটা আর কোনোদিন বেত ধরতে পারবে না। আর কোনোদিন আমাকে সপাং সপাং করে মারতে পারবে না। এই কথা কটা সরল বিশ্বাসে তোকে বলে দিয়েছিলাম। তুই তখন আমার টিফিনবক্স থেকে ঘিয়ে ভাজা মুচমুচে পরোটা, আলু চচ্চড়ি আর কুলের আচার তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছিলি। তোর রোজ রোজ বাড়ি থেকে আনা শুকনো পাউরুটির টোস্ট, ঠান্ডা ম্যাগী এসব ভালো লাগত না। আমি বুঝতে পারিনি তুই খেতে খেতে অন্য প্ল্যান করে রাখছিস। আমার সব কথা হেডম্যামকে জানিয়ে দিলি। এও বলে দিলি তোকে আমি বলেছিলাম, ডানাওয়ালা মানুষ হয়ে তুই উড়ে যাবি একদিন। ব্যাস আমার মাথা খারাপ এই অজুহাতে আমাকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। আমি অন্য স্কুলে গেলেও রোজ ছুটির পর লুকিয়ে লুকিয়ে তোকে দেখতাম। নজরে আসত তোর পিঠের দু'দিকে ছোট ছোট দুটো ডানা গজিয়েছে। ধীরে ধীরে সেগুলো বড় হবে আর একদিন তুই ডানা ঝাপটিয়ে ঠিক উড়ে যাবি। সেদিন সবাই জানবে আমার মাথা খারাপ কোনোদিন ছিল না।

যদি প্রমাণ চাস। যেকোনও পূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রপুরে চলে আয়। ঠিকানা দিয়ে দিলাম। এসে গৌরাঙ্গকে খোঁজ করিস, ও তোর থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। আমি ঠিক সময়ে তোর সামনে পৌঁছে যাব।

ইতি

তোর বন্ধু

চিঠিটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে রাই নিজের পিঠে হাত ছোঁয়াল। যেন এক জোড়া ডানা খুঁজছে। আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে গেল। এই শীতেও ঘেমে নেয়ে গেছে। কেমন ভূতগ্রস্ত মানুষের মতো নিজেকে দেখতে লাগছে। চিঠিটা খামের মধ্যে পুরে ফেলে, ঢকঢক করে হাফ বোতল জল খেয়ে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল রাই। তারপর কি মনে হতে লাইটটা জ্বালিয়ে কম্বলে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল।

দুই

রাতের ভয়টা সকালের আলোয় একটু একটু করে ফিকে হতে শুরু করতেই রাইয়ের ঘোর ভাঙল। আরে চিঠিতে তাকে গায়ত্রী বলে সম্বোধন কেন করা হয়েছে! কে এই গায়ত্রী? তাহলে কী ভুল করে এই চিঠি তাকে পাঠানো হয়েছে? যদি তাই হয় ঠিকানার উপরে ''রাই সেনগুপ্ত'' লেখা কেন? আর কেনই বা চিঠিটা পড়তে পড়তে অস্পষ্ট এক ছেলেবেলা তাকে হাল্কা করে ছুঁয়ে যাচ্ছে? রাই দেখল চিঠিটা তাকে সারাদিন নানা ভাবে টানছে। কতবার যে সে চিঠিখানা পড়ে দেখল। রাত্রে আবার হিম আতঙ্কে নীল হয়ে কাটালো। দিনের বেলায় মোটামুটি স্বাভাবিক।

কিছুদিন এইভাবে কাটানোর পর একদিন সে ঠিক করেই ফেলল চন্দ্রপুরে যাবে। একটু খোঁজখবর নিতেই জায়গাটার সম্পর্কে জানা গেল। হাওড়া থেকে মেদিনীপুরগামী ট্রেনে চেপে ছোট্ট একটা স্টেশনে নেমে পড়লেই হল। সেখান থেকে ট্রেকারে বা প্রাইভেট কারে চন্দ্রপুর যাওয়া যায়। অদূরে কাঁসাই নদী রুপালি সরু একটা ফিতের মতো বয়ে যাচ্ছে। অনেকদিন রাইয়ের কোথাও যাওয়া হয়নি। অফিস আর বই এই নিয়ে কংক্রিটের জঙ্গলে সে হাঁফিয়ে যাচ্ছিল। তার উপর এই চিঠি। রাই—এর একটু তাজা বাতাস চাই। সে হিসেবে চন্দ্রপুরে আউটিং মন্দ কী!

নির্দিষ্ট দিনে বেরিয়ে পড়ল সে। অফিসে জানিয়ে দিল দু—তিনদিন আসবে না। বাবা—মা'কে ফোন করে বাইরে যাবার ব্যাপারটা আর জানাল না, অহেতুক তাদের চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই। বেশ হাল্কা একটা শীতের আমেজ। চারিদিকে ঝিলমিল রোদের পেলব আদর। আহা! ঘুরে বেড়ানোর প্রকৃষ্ট সময় বৈকি। রাই বেশ গুছিয়ে ট্রেনের জানালার ধারে বসেছে। প্রথমে একটা থ্রিলার নভেল খুলে বসেছিল। ট্রেন যত এগোতে লাগল সব কিছু ভুলে বই বন্ধ করে সে দু'পাশের দৃশ্যপটে নিজেকে সঁপে দিল।

যথাসময়ে স্টেশনে নামার পর এক ভাঁড় চা খেয়ে সে যখন স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আসছে তারই বয়সি একটি ছেলে ছুটে এল। ''ম্যাডাম গাড়ি রেডি, গৌরাঙ্গদা পাঠিয়েছেন।''

''কে এই গৌরাঙ্গদা?'' ভাবতেই রাইয়ের সেই চিঠির কথা মনে পড়ে গেল। কিছু সময় ভ্রূ'টা কুঁচকে গেল। আজকেই তার আসার কথা এই গৌরাঙ্গ লোকটা জানল কী করে? ''স্ট্রেঞ্জ!'' কাঁধ শ্রাগ করে রাই ছেলেটিকে অনুসরণ করে একটা সাদা মারুতিতে উঠে বসল। ছেলেটি ড্রাইভ করতে করতে অনাবশ্যক বকে যাচ্ছিল। এবারে ভালো বৃষ্টি হওয়ায় ফসলও ভালো হয়েছে। কাঁসাই নদীতেও এবার বেশ জল আছে। তাদের গ্রামে সার্কাস বসেছে, গ্রামের লোকদের খুব আনন্দ। এইসব বকবক চলতে চলতেই গাড়ি একসময় লোকালয় ছাড়িয়ে একটা টিলার মতো জায়গায় উঠল। জায়গাটায় গাছপালা একটু কম। সমতলের থেকে সামান্য উঁচু। তবে বেশ কিছু পাকা বাড়ি। কে জানে হয়ত এই গ্রামের সম্ভ্রান্ত মানুষের এইখানেই বাস। দূরে কাঁসাই নদী বহতা লাবণ্য হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

একটা ছিমছাম একতলা বাড়ির সামনে গাড়িটা এসে থামল। এক নজরে বাড়িটা দেখেই রাইয়ের মন খুশিতে ভরে উঠল। বাড়ির মালিক যে শৌখিন, বাড়িটা একঝলক দেখলেই বোঝা যায়। সামনেই একটুকরো বাগান। শুধু গেটের ক্যাটক্যাটে সবুজ রঙটা বড্ড বেমানান এই বাড়িটার সঙ্গে।

রাই মন্ত্রমুগ্ধ পায়ে বারান্দায় উঠে এল। একরাশ শুকনো পাতা দমকা হাওয়া গাছ থেকে সেই মুহূর্তেই ঝড়ে পড়ল বারান্দার উপর। ড্রাইভার ছেলেটি এক গোছা চাবি রাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ''ম্যাডাম, গৌরাঙ্গ একটু আগেই খড়্গপুর গেছেন। একেবারে রাত্রে ফিরবেন আপনার খাবার নিয়ে। আপনি ততক্ষণ বিশ্রাম নিন। আর আপনার তো চেনা জায়গা, আশা করি অসুবিধা হবে না। তবে এবার কিন্তু বহুদিন পরে এলেন আপনি।''

রাই একটু থমকে গেল। বারান্দার হাল্কা রোদে বেতের চেয়ারের উপর বেশ গুছিয়ে বসেছিল। ছেলেটির কথায় মুখটা কেমন তিতকুটে মেরে গেল। প্রথমবার সে এখানে এল অথচ...। একসময় চাবির গোছাটা নিয়ে উঠে এল। ভিতরে ছোট ছোট দুটি ঘর। দুটি ঘরের মাঝে একটা বসার এবং খাওয়ার ঘর। খাবার টেবিলের উপর একটা ফ্লাস্ক আর হটপট রাখা। পাশে আঁকাবাঁকা হাতের লেখায় দু'লাইন লেখা,''ম্যডাম আপনি মেথি পরোটা ভালোবাসেন, গরম গরম খেয়ে নিন। সঙ্গে এক ফ্লাস্ক কফি রইল। আশা করি সন্ধে অবধি আপনার চলে যাবে।''

এবার রাইয়ের একটু ভয় ভয় করতে লাগল। তার সম্পর্কে এত খুঁটিনাটি এরা কীভাবে জানল? সে কি কোনো চক্রান্তের শিকার হতে চলেছে? তাহলে তো এভাবে একা একা একটা চিঠিকে ভরসা করে এতদূর আশাই তার উচিত হয়নি। ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে যায়।

আনমনে হটপটটা খুলতেই মেথির গন্ধ ঝাপটা মারে। সঙ্গে লঙ্কা চেরা দিয়ে শুকনো আলুচচ্চড়ি আর নলেন গুড়ের দু'খানা মণ্ডা। আহা মণ্ডা গ্রাম অঞ্চল ছাড়া তেমন পাওয়া যায় না। কতদিন এসব খাওয়া হয় না রাইয়ের। সে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে খেতে বসল। খাওয়ার শেষে বাসনপত্র সব ধুয়ে পরিষ্কার করে এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় বসল। আশেপাশে বেশ কয়েকটা বাড়ি চোখে পড়লেও মানুষজন চোখে পড়ল না। প্রত্যেকটা বাড়ির জানলা দরজা বন্ধ। হয়ত এখানে কেউ থাকে না। বাড়ির মালিকরা বাইরে থাকে, ছুটিছাটায় ক'টা দিন কাটিয়ে যায়। ঘুম ঘুম পেতে লাগলো রাইয়ের। দরজা বন্ধ করে ভিতরে এসে শুয়ে পড়ল একসময়। পরিপাটি, পরিষ্কার বিছানা। আরামদায়ক একটা কম্বল, যেটা সারা দুপুর রোদ পেয়ে বেশ উষ্ণ। ঘুম আসতে দেরি হল না রাইয়ের। বিভুঁইয়ে একবারের জন্য কোনও সংশয় কাজ করল না, বরং পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল অচিরেই।

একসময় প্রবল দরজা ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙে রাইয়ের। কেউ ম্যাডাম ম্যাডাম বলে উচ্চস্বরে ডাকছে। ঐ বুঝি গৌরাঙ্গ এল। এখানে বৈদ্যুতিক আলো নেই সেটা রাই দুপুরেই টের পেয়েছিল। কিন্তু আজ বোধহয় পূর্ণিমা, জ্যোৎস্নার আলো কাচের জানলা গলে ঘরে ঢুকে থৈ থৈ করছে।

দরজা খোলার আগে রাই একবার জিজ্ঞেস করে, কে? গৌরাঙ্গদা নাকি?

''হ্যাঁ ম্যাডাম আমি। একটু দেরি হল।''

দরজা খুলতেই লোকটা পরিচিতের মতো ঘরে ঢুকে এল। হাতের খাবারদাবার টেবিলের উপর গুছিয়ে রেখে, আলো জ্বেলে রাইয়ের জন্য চা করতে ঢুকে গেল এক চিলতে রান্নাঘরে। রাই বাইরের বারান্দায় বসে বারকয়েক বাড়িতে ফোন করার চেষ্টা করল। লাইন পেল না। সেই সময় গৌরাঙ্গ চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ম্যাডাম এবার অনেকদিন পরে এলেন। সব খবর ভালো তো? দিদিমণি প্রায় আপনার কথা বলেন।

রাই চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে যায়। এই লোকটাও তাকে কারুর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে। আচ্ছা এই দিদিমণিটাই বা কে? সেই চিঠির বন্ধু কি? জিজ্ঞেস করার আগেই লোকটা আবার মুখ খুলল, ''রাত্রে আমি এ বাড়িতে থাকতে পারব না, আমার বৃদ্ধ বাবার শরীরটা ভালো নেই। আপনার অসুবিধা হবে না তো?''

''না, না প্রবল আপত্তিতে মাথা নাড়ায় রাই।'' বরং সে মুক্তি পেল যেন। অচেনা একটা লোকের সঙ্গে ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকতে হলেই তার অস্বস্তি বাড়ত।

গৌরাঙ্গ চলে যাবার আগে সে শুধু একবার জানতে চাইল, ''দিদিমণির দেখা কখন পাব?''

লোকটি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে উত্তর দিল, ''ফুলকপি মটরশুঁটি দিয়ে খিচুড়ি আর ধনেপাতা দিয়ে কষা মুরগির মাংস আপনার রাত্রের খাবার জন্য আমার গিন্নি বানিয়ে দিয়েছে। গতবার এটা খেয়ে আপনি খুব প্রশংসা করেছেন।'' কথা ক'টা বলে লোকটা হাত কচলে হাসতে লাগল।

হাসি থামলে বলল, কাল আপনার ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসব। চলি ম্যাডাম।

রাই অস্ফুটে বলে উঠল, ''দিদিমণি, আপনার দিদিমণির দেখা কখন পাব? চিঠি লিখে ডেকে আনলেন তিনি, অথচ একবারও সামনে এলেন না!''

''ভাগ্য ভালো থাকলে আমার এই যাওয়া আর আসার সময়টুকুর মধ্যেই দেখা পেয়ে যেতে পারেন।'' কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই গৌরাঙ্গ নামের লোকটা সামনের রাস্তায় হারিয়ে গেছে। রাই লক্ষ্য করেছিল লোকটি কথাগুলো বলতে বলতে কেমন অর্থপূর্ণ একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়েছিল।

রাইয়ের জেদ চেপে যায়। দেখা যাক অদৃশ্য থেকে কে তার কী করতে চায়! এর শেষ দেখেই সে ছাড়বে।

তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে নিল। নাহ গৌরাঙ্গ ভুল কিছু বলেনি, তার বৌ সত্যি ভালো রাঁধে। বিশেষ করে মুরগির কষাটা! আহ অসাধারণ! এমারজেন্সি লাইটটা জ্বালিয়ে একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে জগত সংসার ভুলে গেল। একটু একটু করে রহস্যের সমুদ্রে ডুবে গেল।

''গায়ত্রী, ওঠ উঠে পড়। আমি এসেছি। দেখ আমি এসেছি।''

রাই—এর ঘুম ভেঙে যায়। বারান্দার দিকের জানলায় কে যেন টোকা দিচ্ছে। চোখ কচলে দেখে, একটি মেয়ের অবয়ব। বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকে রাই।

''কী রে গায়ত্রী, বাইরে আসবি না?''

ঘোরের মধ্যে দরজা খুলে বারান্দা ছাড়িয়ে বাগান পেরিয়ে গেট খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় রাই। একদল মেয়ে জটলা করছিল। সকলের পরনে সাদা শাড়ি। বাতাসে পতপত করে সকলের শাড়ির আঁচল উড়ছে। ওকে দেখতে পেয়েই মেয়েগুলো একে অপরের গায়ে ঢলে পড়তে পড়তে পরস্পর পরস্পরকে গায়ত্রী সম্বোধন করতে লাগল। তারপর একসময় রাইকে মাঝে রেখে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়তে পড়তে পরস্পর পরস্পরকে গায়ত্রী সম্বোধন করতে লাগল। তারপর একসময় রাইকে মাঝে রেখে একে অপরের হাত ধরে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল। ঘুরতেই থাকল। অনন্ত সময় মাঝে বয়ে গেল। একসময় রাই দেখল, কোথায় বড় মেয়ের দল? এক দল স্কুল ড্রেস, দুই বিনুনীর স্কুল ছাত্রী তাকে ঘিরে নেচে যাচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখতেই চিনতে পারল, সায়নী, অবন্তিকা, সোনালি, টিয়া। সব তার ছোটবেলার বন্ধু। এভাবেই তারা খেলত টিফিনের সময়। এক মুন্নি নেই।

মুন্নির কথা মনে পড়তেই এক ঝটকায় সব তার মনে পড়ে গেল। ওর ভালো নাম ছিল গায়ত্রী। স্কুল থেকে ছাড়িয়ে দেবার পর প্রায় সে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে আসত। কেউ ওর সঙ্গে খেলত না, কথা বলত না। টিচারদের ভয়ে সবাই কেমন এড়িয়ে চলত। ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে বলত,গায়ত্রীর সঙ্গে কেউ মিশবি না। মুন্নি একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, একদিন তোরা সবাই গায়ত্রী হয়ে যাবি দেখিস। সেদিনের পর রাই আর কোনোদিন ওকে দেখেনি।

রাই টের পাচ্ছে ওর একদম পিছনে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। উচ্চতায় ওর সমান সমান। তার ঘন নিঃশ্বাস রাইয়ের শরীরে এসে লাগছে। রাই এবার সর্বশক্তি জড়ো করে পিছন ফিরে তাকাল। দৈর্ঘ্যে বড় হলেও মুন্নির বাচ্চাবেলার মুখ হুবহু। শুধু চোখ দুটো হিংস্র কী ভীষণ। রাই এবার কেঁপে উঠল। আর তখনই ওকে ঘিরে থাকা বাচ্চাগুলো এক একজন সাদা পাখি হয়ে গেল। ওদের সাদা পালকে দুধ সাদা চাঁদের আলো চুঁইয়ে নামছে যেন! গায়ত্রী ওদের দিকে তাকিয়ে ঠা ঠা করে হেসে উঠতেই সারা বনভূমি যেন কেঁপে উঠল। আর ওরা ডানা ঝাপটিয়ে একে একে উড়তে শুরু করল। সারিবদ্ধভাবে সবাই চাঁদের দিকে উড়ে গেল। যেন চাঁদই ওদের ঘরবাড়ি, ওদের নিরাপদ আশ্রয়।

হাসি থামিয়ে এবার গায়ত্রী রাইয়ের দিকে তাকাল। চোখ নাচিয়ে বলল, ''কী রে বিশ্বাস হল তো? এবার তোর পালা।''

রাই কিছু বলতে যাবার আগেই দেখল তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেছে। সারা শরীরে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন। বড় বড় সোনালি পালকে শরীর মুহূর্তে আচ্ছাদিত হয়ে গেছে। শরীরটাও খুব হাল্কা লাগছে। ধকধক করে জ্বলছে গায়ত্রীর চোখ। এবার সে আলতো করে ধাক্কা দিল রাইকে। ধারালো নখ পালক ভেদ করে চামড়ায় গেঁথে যাচ্ছে। রাইয়ের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আবারো ধাক্কা। তীক্ষ্ন নখে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে রাই। সে এবার সভয়ে দুই ডানা প্রসারিত করে দিল। ধীরে ধীরে টিলার উপর থেকে নিজের ভারহীন দেহটা শূন্যে ভাসিয়ে দিল।

এই অঞ্চলে লোকবসতি নেই। যতদূর চোখ যায় নদীর কিনারা ঘেঁষে জঙ্গল আর টিলা। পরের দিন কয়েকজন কাঠুরিয়া শুকনো কাঠ সংগ্রহ করতে এসে দেখল, গাড়ির চাকার দাগ আর তার পাশেই সোনালি রঙের বড় বড় রক্তমাখা পালক। পালকগুলো হাতে নিয়ে তারা ভাবছিল, এত বড় পালক যখন পাখিটাও নিশ্চয় অনেক বড়। গাড়ির চাকার দাগ দেখে একজন শুধু ভাবছিল, প্রতি বছর এই সময় গাড়ির চাকার দাগের পাশেই অদ্ভূত কিছু পালক ছড়িয়ে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%