নন্দিনী ও রাতের রহস্য

মহুয়া মল্লিক

এক

অবশেষে বহুদিনের বন্ধ দরজাটা সাহস করে এই মাঝরাত্রে খুলেই ফেলল নন্দিনী৷ হাতের চাপে ক্যাঁচ করে একটা বিশ্রী আওয়াজ হল বন্ধ দরজাটায়৷ বহুদিনের জমে থাকা ভ্যাপসা গন্ধ ঘর ঠেলে যেন বেরিয়ে এল৷ কতদিন? তা প্রায় পাঁচ বছর এভাবে ঘরটা তালা বন্ধ পড়ে আছে৷ কোনো অনুষ্ঠান-পুজা-পার্বণেও নন্দিনী এই ঘরটা খুলে পরিষ্কার করতে দেয় না৷ এই নিয়ে মায়ের সাথে লক্ষ বার ওর ঝামেলা হয়েছে৷ চাবিখানি সযত্নে ও লুকিয়ে রাখে, অবশ্য হেলাফেলায় ওটা পড়ে থাকলেও নন্দিনীর হিম চাহনি অগ্রাহ্য করে মা কখনই এ ঘরের বন্ধ দরজা খুলত না৷

তাড়াতাড়ি ঘরের তিনখানা জানলা খুলে দিল ও৷ ক্লান্ত পায়ে হেঁটে গেল পুবের ব্যালকনির দরজার দিকে৷ ঘোরানো ওভাল শেপের ব্যালকনি, এখনও আগের মতোই মাধবীলতার গন্ধে ম ম করছে, একই রকম চাঁদের আলোয় থৈ থৈ করছে ঘরটা৷ তার বয়ঃসন্ধি প্রথম যৌবনের ঘ্রাণ মেখে ঘরটা আজও একইরকম রয়ে গেছে৷ বড় মায়া হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে কেন সে এতকাল তার আবাল্য মিতার কাছে আসেনি! হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠল ও, বিয়াল্লিশের নির্মেদ বেতসলতার মতো শরীরটা লুটিয়ে পড়ল চাঁদের আলো মাথা ব্যালকনিতে৷

খুব সকালে মা যখন ঘরে ঘরে ধূপ দেখাতে এল, আবিষ্কার করল গত পাঁচ বছর ধরে বন্ধ থাকা দরজাটা কীভাবে যেন খুলে গেছে আর নন্দিনী সূর্যের আলোয় স্নান করে ব্যালকনিতে ঘুমিয়ে আছে, দু’চোখ শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুরেখা৷ ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করছে কিছু, কাছে এগিয়ে গিয়ে শুনতে পেল মুনিয়া, মুনিয়া৷ কতকাল কতকাল পর এ বাড়িতে এই নামটা শুনল সে৷ মাথাটা যেন টলে গেল! লঘু পায়ে মা তিনতলার ঠাকুরঘরের সিঁড়ি ধরেছে৷

দুই

যাই বলিস নন্দিনী বাড়ির সবথেকে খাসা ঘরটা কিন্তু তুই দখল করেছিস৷ খুব হিংসা পাচ্ছে আমার৷ ‘‘ওমা এ আবার কেমন কথা? হিংসা পাচ্ছে?’’ নন্দিনী ছদ্ম ভ্রূকুটি হানে কলেজের বান্ধবী লোপামুদ্রাকে৷ ‘‘হয় হয় এমন কথা হয় ডিয়ার, আমাদের যেমন খিদে পায়, ঘুম পায় বা ধর বাথরুম পায় তেমনই আমার হিংসাও পায়’’৷ ‘‘উফ তুই পারিসরে লোপা, তা হিংসে পেলে মাঝে এখানে থাকিস না হয়৷’’ কলেজ হস্টেলে থাকা বান্ধবীকে বলে নন্দিনী, যদিও এই ঘরটা কারোর সাথে শেয়ার করতে রাজি না ও৷ কিন্তু বহরমপুর থেকে এই শহরে পড়তে আসা লোপার কথা আলাদা৷ একমাত্র ওর সাথে শেয়ার করতে মন চায়৷ এটা ওর আসামান্য রূপের জন্য নাকি ওর রবীন্দ্রনৃত্যের সুন্দর সব মুদ্রাগুলোর জন্য ঠিক বুঝতে পারে না নন্দিনী৷ লোপা তখন জড়িয়ে ধরেছে প্রাণের বান্ধবীকে, থ্যাংকিউরে ফাইন্যাল পরীক্ষার আগের প্রিপারেশন লিভে এখানেই থাকব, হস্টেলে অতজনের হাটে আমার পড়া হয় না একদম৷

তাই থাকিস, মৃদু হেসে প্রাণের সখীকে জড়িয়ে ধরে সে৷ সেই শুরু৷ পরীক্ষার আগের ক’টা দিন শুধু নয় কারণে অকারণে যখন তখন লোপা এই বাড়িতে থাকতে থাকতে এই বাড়ির মেয়েই যেন হয়ে উঠেছিল কখন৷ মধ্য রাত্রে অকৃপণ জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে দুই সখীর প্রাণের কথা উজাড় করা কিংবা সুরেলা কন্ঠে লোপার গান গেয়ে ওঠার সাথে এই ঘরটাও যেন কেমন অভ্যস্থ হয়ে গেল৷ সেও যেন নিরুচচারে বুঝতে বলছিল লোপা যেন পাকাপাকি রয়ে যায় এই বাড়িতেই৷

নন্দিনী কাজের বাহানায় এই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিল কিন্তু লোপাই ওকে যেতে দেয়নি ও তাই ব্যালকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল৷ ভাইয়া এসেছে ক’দিন, এমনিতে ছুটিছাটায় ট্রেকিং করতে চলে যায় বলে বাড়ি কমই আসে৷ উত্তরবঙ্গের একটি কলেজের অধ্যাপক সে৷ এ কারণেই লোপার সথে কখনো দেখা হয়নি এর আগে, যদিও মা আর বোনের কাছে লোপার এত কথা শুনেছে সে, যে এবাড়িতে ঢুকেই জুসের গ্লাস হাতে আপ্যায়নরতাকে দেখে তার বুঝতে অসুবিধাই হয়নি কে সে!

নাচের সাথে লোপা গানটাও ভালোই করে৷ ভাইয়ার আবদারে ও একটার পর একটা গান করে যাচ্ছে৷ ভাইয়া আধশোয়া হয়ে ওর মুখের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে, এতদূর থেকেও সেটা নন্দিনী স্পষ্ট টের পাচ্ছে৷ লোপাও মাঝে মাঝে সলাজ দৃষ্টিতে ভাইয়াকে দেখছে, ওদের দু’জনের দৃষ্টি বিনিময়ই নন্দিনীকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল এই ঘরটায় লোপার পাকাপাকিভাবে থাকার সময় এসেই গেল৷ মেহগনি কাঠের ড্রেসিং টেবিলের সুদৃশ্য আয়নাটা দিয়েই এতক্ষণ নিপুণভাবে সবটা দেখছিল সে৷

ঘোর ভেঙ্গে জেগে উঠল যেন নন্দিনী৷ পায়ে পায়ে কখন যেন মাঝ রাত্রে আবার এই ঘরটাতেই আজ দাঁড়িয়ে আছে সে৷ সুদৃশ্য বেলজিয়াম গ্লাসেই যেন অতীত এতক্ষণ ছায়া ফেলে গেল৷ ভালো করে লক্ষ্য করল নন্দিনী, খুব খুঁটিয়ে দেখল আয়নার কাচে বহুকালের ধুলোর আস্তরণ যেন ধূসর অতীত! আঁচলের প্রান্ত দিয়ে ঘষে ঘষে আয়নাটা পরিষ্কার করতে লাগল সে৷ আয়নার মধ্যে স্পষ্ট হতে থাকল, ফ্রেম বন্দী লোপামুদ্রার ল্যামিনেটেড ফটোগ্রাফ৷ শরীর কাঁপিয়ে হাসছে যেন ছবির লোপামুদ্রা৷ নন্দিনী এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷

তিন

‘‘দেখ নন্দিনী আমার কেমন কপাল, বিয়ের চার মাস হয়ে গেল তবুও তোর ভাইয়ার কাছে যাওয়া হয়ে উঠল না’’৷ টেবিলের উপর একটা কাচের বাটিতে জলের মধ্যে একরাশ জুঁই আর সূর্যমুখী ফুল সাজাতে সাজাতে বলছিল লোপা৷ মুগ্ধ চোখে ওর পুষ্পসজ্জা দেখছিল নন্দিনী৷ শুধু নিজের ঘরেই না নন্দিনীর ঘরে, মায়ের ঘরে একইভাবে ফুল রেখে এসেছে লোপা, রোজই রাখে৷ নীচের বাগানেই কত যে ফুল ফোটে, নন্দিনী তো চোখেই দেখে না মালি রাঘবকাকাই বাগানটা সামলায়৷ কীরে আমি একাই বকে যাচ্ছি কিছুতো বলবি নাকি?

নন্দিনী ঠিক কি বলবে খুঁজে পেল না৷ সত্যিই ভাইয়ার ব্যবহার বেশ অদ্ভুত৷ দুম করেই বিয়ের সিন্ধান্ত নিল, কথা ছিল অষ্টমঙ্গলা শেষে লোপাকে নিয়েই ফিরে যাবে৷ কিন্তু একাই ফিরে গেল মাঝে একবার দেড় মাসের মাথায় দু’দিনের জন্য এল, মা এ ব্যাপারে কথা বলতে একদমই পাত্তা দিল না৷ লোপাকেও বলে গিয়েছিল এদিকের কলেজে চেষ্টা করছে এখন আর গিয়ে কি করবে৷ অভিমানী লোপা একটি কথাও যাওয়া নিয়ে আর তোলেনি৷ আজ অনেকদিন পর এ নিয়ে মুখ খুলল লোপা৷ নন্দিনী মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘‘ছাড় না এ সব কথা, এখন তোর কত আনন্দের সময় বলত, যে আসছে তার কথা ভাব৷ আর দেখ বেবীটা হয়ে যাক তারপর সবাই মিলে তোদের ভাইয়ার কাছে রেখে আসব তবে ততদিন না ভাইয়া রূপসী বৌ-এর টানে এদিকেই না চলে আসে৷’’ নন্দিনীর কথা শুনে একটু হাসল লোপা, খুব কষ্টের একটুকরো হাসি৷ নন্দিনীর বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল৷

যথা সময়ে মুনিয়া পৃথিবীর আলো দেখল৷ মায়ের মতো রূপ সে পায়নি বরং নন্দিনীর বংশের মতোই কালো গায়ের রঙ নিয়ে মেয়ে জন্মাল, নন্দিনী ওর নাম রাখল কৃষ্ণকলি৷ মেয়ের রঙ দেখে ভাইয়ার খুব একটা পছন্দ হয়নি বোঝাই গেল৷ যাইহোক তিন রমণী নতুন করে ব্যস্ত হয়ে পড়ল একরত্তি কালো মাণিকটিকে নিয়ে৷

একটু করে বড় হতে লাগল লোপামুদ্রার আদরের মুনিয়া৷ এর মধ্যে বাপের বাড়ি থেকে কারুকে কিছু না জানিয়েই দেড় বছরের মুনিয়াকে নিয়ে হঠাৎই লোপা ঘুরে এল ভাইয়ার কাছ থেকে৷ আর ফেরার পর থেকেই অদ্ভুত চেঞ্জটা চোখ এড়াল না কারুরই৷ একদম যেন বোবা হয়ে গেল৷ সংসারের কাজকর্মেও উদাসীন, মেয়েকেও ওর ঠাকুমার হাতেই ছেড়ে দিল৷ শুধু নিময় করে বাগানে ঘুরে বেড়ানো বা পুষ্প চয়নটুকু বন্ধ হল না৷

নন্দিনী হাজারবার প্রশ্ন করেছে কি হয়েছে তার? শরীর খারাপ? কিছুতেই উত্তর খুঁজে পায়নি৷ একটা সময় সে নিজেও বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করা ছেড়ে দিল৷ মাঝে দু- একবার ভাইয়াও ঘুরে গেল৷ সংসারের চাকা স্বাভাবিক নিয়মেই ঘুরছিল শুধু প্রাণোচ্ছল মানুষটা যেন বোবা পাথর হয়ে গেল৷

গবেষণার কাজে ব্যস্ত নন্দিনী নভেম্বরের এক বিকেলে ফিরতে লোপা অস্ফুটে আবদারে জানাল, ‘‘নন্দিনী আজ আমার ঘরে শুবি?’’ বড় খাট, মুনিয়াও খুব লক্ষ্মী মেয়ে তোর অসুবিধা হবে না৷’’ মুনিয়াকে কোলে নিয়ে চটকাতে চটকাতে নন্দিনী জানাল সে শোবে তবে সেই আগের মতো আড্ডা দেবে সারারাত আর তাকে গান শোনাতে হবে’’৷ চমকে উঠল লোপা, গান? আর কি সে পারবে? বহুদিন প্রাকটিস নেই যে৷ ‘‘ওরে পারবিরে পারবি, আবার চেষ্টা কর নতুন করে৷’’ নন্দিনীর কথায় অনেকদিন পর প্রাণ খুলে হাসল লোপা৷

চার

মাঝ রাত্রে মুনিয়ার তীক্ষ্ণ কান্নায় পুরো বাড়িটা ঘুম থেকে জেগে উঠল৷ নীচে থেকে বৃদ্ধ চাকর, মালি একটা সময় উপরে উঠে এল৷ বন্ধ দরজার এ’পাশে উন্মুখ মুখগুলি দরজায় করাঘাত করেই যাচ্ছে, ঘরের মধ্যে মুনিয়ার কান্না ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে৷ এ পাশে নন্দিনীর শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত নেমে আসছে৷ দরজাটা ভেঙ্গে ফেলা হলেই ও যেন দেখতে পাবে...৷ এইজন্যই কি কাল লোপা ওকে সব কষ্ট উজাড় করে দিল, ভাইয়ার বিশ্বাসঘাতকতা, তাদের দাম্পত্য জীবন শুরুর বহু আগে থেকেই এক কলিগের সাথে লিভ ইন করে৷ হঠাৎ করে গিয়ে লোপা সেই সঙ্গিনীকে দেখে এসেছে৷ সব শুনতে শুনতে পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে গিয়েছিল নন্দিনীর৷ লোপা ওর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছে এ কথা যেন মা কোনোদিন জানতে না পারে৷ সারা রাত নন্দিনীর ঘুম আসেনি তবু সে মুনিয়াকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল আর লোপা তার প্রিয় ব্যালকনিতে অবসন্নের মতো বসে একটার পর একটা গান গেয়ে গেল৷ বেলজিয়াম আয়নার মধ্যে প্রতিফলিত লোপার অলস দুঃখী বিভঙ্গ দেখতে দেখতে কেমন ঘোর লেগে গিয়েছিল নন্দিনীর৷ একটা সময় ও বিছানা ছেড়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে শ্বেত পাথরের ব্যালকনি, খুব আলতো করে লোপাকে জড়িয়ে ধরে তুলল, বলল, ‘‘চল শুয়ে পড়বি চল৷’’ লোপা তখন হু হু কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে৷ কাঁদতে কাঁদতেই একবার বলল, ‘‘আমার মেয়ের দায়িত্ব আজ থেকে তোর, ওকে দেখিস নন্দিনী৷’’ নন্দিনী বোঝেনি সেই কথার গূঢ় অর্থ৷ এক সময় সশব্দে দরজাটা ভেঙ্গে পড়তে ওর চিন্তার জাল ছিন্ন হল৷ যা ভেবেছিল তাই, সিলিং থেকে ঝুলছে লোপামুদ্রার নিথর দেহটা৷ বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নায় সেই প্রতিবিম্ব থেকে দ্রুত চোখ সরিয়ে মুনিয়াকে বুকে জাপটে তুলে নিল সে৷

পাঁচ

রবিবার একটু বেশি বেলা অবধি গড়ায় নন্দিনী৷ শুধু কাজের মেয়ের ঘর পরিষ্কার করার সুবিধের জন্য একবার ঘুম ঘুম চোখে দরজাটা খুলে দেয়৷ নেশা ঝিম ঘুমটা ভাঙ্গছিলই না৷ একরাশ তাজা চাঁপা ফুলের সুবাস বাতাতে ঝাপটা দিয়ে উঠল৷ নির্ঘাত মুনিয়া, লোপার মতোই ফুলের প্রতি অনবদ্য আকর্ষণ এই মেয়েরও৷ আর তখনই মনে পড়ে গেল ওমা আজ তো কৃষ্ণকলির জন্মদিন, দেখতে দেখতে পনেরো বছরের হয়ে গেল সে৷ ঝটফট উঠে মুনিয়াকে উইশ করে জড়িয়ে ধরলো, আদুরে কণ্ঠে বলল, ‘‘বল কি বা’র্থ ডে গিফট নিবি?’’ ‘‘যা চাইব দেবে তো পিপি?’’ ‘‘দেব রে দেব চেয়েই দেখ না৷’’ এমনিতেই মুনিয়ার বায়ানাক্কা কম৷ জন্মদিনেও বাড়িতে পার্টি হয় না, ঠাকুরমার সাখে খুব সকালে মন্দিরে পুজো দিয়ে আসে আর বিকেলের দিকে কাছের বস্তির কিছু বাচচাকে বসিয়ে পেট ভরে খাওয়ায় নন্দিনীরা৷ মুনিয়ার বন্ধু তেমন কেউ নেই, মেয়েটাও সবার থেকে গুটিয়ে থাকে৷ পড়াশোনা আর গান নিয়েই নিজের জগতে থাকে ও৷ লোপার মতোই গানের গলা পেয়েছে৷ ভালো করে ওকে তাকিয়ে দেখল নন্দিনী৷ বেশ সুন্দর হচ্ছে দিনের দিন লোপার মুখের আদল দেখা দিচ্ছে৷ গায়ের রঙ কালো হলেও অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে সত্যি সে কৃষ্ণকলি৷

ওর পরিচিতরা যখন বলে তোর ভাইঝি তো ব্ল্যাক বিউটি রে৷ গর্বে বুক ভরে যায় নন্দিনীর তখন৷ মুনিয়া পিপিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘‘দেবে তো যা চাইব?’’ ‘‘হু বলে ফেল’’৷ ‘‘এই ঘরটা’’৷ কেঁপে উঠে নন্দিনী৷ এই সেই ঘর যা এককালে নন্দিনীর ছিল, কিছুটা সময় লোপার, যে ঘরের অনেক স্মৃতি মধ্যরাত্রে নন্দিনীকে নিরালা ব্যালকনিতে আজও কাঁদায়৷ একই রকম আছে৷ পুরনো ড্রেসিংটেবিল, খাট, আলমারি, বুক সেল্ফ এমনকি লোপার বধূ সাজের সেই ছবি খানাও৷ ‘‘বেশ তাই হবে, আজ থেকে এই ঘর তোর, তবে ব্যালকনিতে একটা গ্রীল বসিয়ে দিই তারপরে না হয় শিফট করিস’’৷ ‘‘না পিপি তুমি বলেছিলে পনেরো বছরের জন্মদিনেই এই ঘরটা আমায় দেবে’’৷ নন্দিনী নিজের জালেই জড়িয়ে গেছে দেখে মুনিয়ার আনন্দ আর ধরে না৷

মুনিয়া দিব্যি ঘরটা গুছিয়ে নিল মনের মতো করে৷ শুধু নন্দিনীরই সময় হচ্ছিল না মিস্ত্রি ডেকে গ্রীলের কাজটা করিয়ে নেবার৷ মা কয়েকবার মনে করিয়ে দিয়েছে তবু হচ্ছে হবে করে দিন কেটেই যাচ্ছে৷ মুনিয়াকে বারবার সতর্ক করে দিয়েছে রাত্রে ব্যালকনির দরজা খুলে ঘুমোবি না৷ বাধ্য মেয়ের মতো পিপির আদেশ মেনে নিয়েছে সে তবে রাত্রে ঘুম না এলে প্রায় ব্যালকনিতে বসে থাকে মাঝে মাঝে গানও করে, ঘুমের ঘোরে সে গান শুনতে শুনতে বিভ্রম লাগে নন্দিনীর, মনে হয় যেন লোপা গাইছে৷

এক সকালে মায়ের চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে দেখল সেই ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, কাজের দিদি আর মা তারস্বরে, মুনিয়া মুনিয়া করে চিৎকার করছে৷ অনেকটা বেলা হয়ে গেছে, মুনিয়ার স্কুল আছে, এখনো ঘুমচ্ছে! হলো কি মেয়েটার? অজানা ভয়ে বুক কেঁপে গেল! আবার দরজা ভাঙ্গা, আবার আবার.....

আঁচড়ে কামড়ে খুবলে খাওয়া মুনিয়ার উলঙ্গ দেহটা ছুটে গিয়ে বেডশিট দিয়ে জড়িয়ে ধরল কাজের দিদি৷ রেপ এন্ড মার্ডার৷

ভবানীপুর থানার অফিসাররা রুটিন মেনে বহু তদন্ত করলেন, চেষ্টার কসুর করেননি তারা, মিডিয়াও ক’দিন সরগরম হল, তারপর একসময় সব কিছু থিতিয়ে গেল, আনসলভড কেসের মতো এই ঘটনাও ফাইল বন্দী হয়ে ধামা চাপা পড়ে গেল৷ শুধু লোপার ফটোগ্রাফ গা কাঁপিয়ে হেসে ব্যঙ্গ করে যায় যেন বলতে চায়, ‘‘প্রাণের পুতলীকে তোর হাতে দিয়ে গেলাম, আগলে রাখতে পারলি না তো?’’ সেই থেকে বহুদিন বন্ধই পড়েছিল এই ঘর৷

ছয়

‘‘তুই এই ঘরেই থাকবি ঠিক করলি তাহলে?’’ এ ক’দিনে মা অন্তত চল্লিশবার একই প্রশ্ন করেছেন নন্দিনীকে৷ প্রতিবারই ‘‘হ্যাঁ’’ বলেছে নন্দিনী তবুও আজ ও সেই একই প্রশ্ন৷ কলেজ থেকে ফিরতি পথে এক গাদা ফল কিনে এনেছে, সেগুলোই প্যাকেট থেকে বার করে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখছিল নন্দিনী৷ পরে ধুয়ে ফ্রিজে তোলা হবে৷ হাতের কাজ সারতে সারতে নন্দিনী চোখ তুলে মা’কে দেখল তারপরে জানতে চাইল, ‘‘ঘরটা পুরোপুরি গোছানো হয়েছে তো’’? নতুন টিউবলাইটটা এ পাশের দেওয়ালে বসাতে বলেছিলাম, হয়ে গেছে কাজ? আমি কিন্তু আজ থেকেই ও-ঘরে থাকতে শুরু করব’’৷ মা বুঝতে পেরেছেন নন্দিনীকে কোনো মতেই বোধহয় রোখা যাবে না৷ ঐ অভিশপ্ত ঘরে ও থাকবেই, অজানা ভয়ে মায়ের বুক কেঁপে গেল৷

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে এই ঘরে শিফট করার পরে, অন্যকিছু টের পায়নি নন্দিনী, অন্তত মা যেসব ভয় পাচ্ছিল৷ শুধু মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে সুন্দর ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ায়, গভীর ঘুমের মধ্যে টের পায় ও, যেন ঘুম ভাঙলেই দেখতে পাবে মুনিয়া একগুচ্ছ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ কলেজে সেদিন এই ফুলের গন্ধটার কথা শাবেরীকে বলেছিল, ও তো হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, বলেছে অত বড় বাগান তোদের, দেখ কোথাও আনাচে কানাচে ফুল ফুটে আছে সেসব গন্ধই পাস তুই৷ কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেছে নন্দিনী ওকে বলতে পারেনি, ঘুম ভাঙ্গার পর নীচের ড্রেনের একটা পচা ভ্যাপসা ক্ষীণ গন্ধই পেয়েছে, ফুলের গন্ধটা যেন মুহূর্তে উধাও হয়ে গেছে৷

আজ কিছুতেই ঘুম আসছিল না নন্দিনীর, শরীরে একটা অস্বস্তি, ফ্যানের তলায় শুয়েও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে৷ সকাল থেকেই ও কিছুটা অস্থির৷ আজ থেকেই পার্ট ওয়ানের পরীক্ষা শুরু, নন্দিনী এক্সামিনেশন ইন চার্জ আছে, তাই অন্যদিনের থেকে একটু তাড়াহুড়ো করেই বেরোচ্ছিল, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছিল, হঠাৎ আয়না দিয়ে দেওয়াল জুড়ে টাঙানো লোপার প্রতিবিম্বের দিকে চোখ গেল, লোপার সেই বিনম্র সলাজ চাহনি যেন কিভাবে বদলে গেছে, হিংস্র দুই চোখ যেন পারলে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে জগৎ সংসার৷ এক সেকেন্ডেই পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে নন্দিনী ছবির দিকে দু’চোখ স্থির নিবদ্ধ করল, ক্রমশঃ বদলে গেল লোপার সেই জ্বলজ্বলে দৃষ্টি, কি অদ্ভুত লোপার চোখে যেন করুণ আকুতি ফুটে উঠছে৷ এই দৃষ্টি পড়তে পারছে নন্দিনী৷ রাত্রে শুয়ে শুয়ে ছটফট করতে করতে এক সময় বিছানা ছাড়ল নন্দিনী, কিছুক্ষণ মাধবীলতায় ঢাকা বারন্দায় এল, এখন আর ফুল ফোটে না, গাছটাও কেমন জানি বিবর্ণ শুকনো হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন৷

একটা সময় আয়নার সামনে বসে পড়ল ক্লান্ত অবসন্ন নন্দিনী৷ একদৃষ্টিতে নাইট ল্যাম্পের আলোয় আয়না জোড়া নিজের প্রতিবিম্বকে দেখছিল কিছুটা সম্মোহিতের মতো৷ একটু যেন তন্দ্রামতন এসে গিয়েছিল, ঘুমের মধ্যেই ফুলের গন্ধটা প্রকট হচ্ছিল, আসতে আসতে দু’চোখ খুলে গেল নন্দিনীর৷ আয়নার মধ্যে দিয়ে দেখতে পাচ্ছে মুখ বাধা মুনিয়াকে মেঝেতে শুইয়ে ছিন্নভিন্ন করছে একটা পশু, তার অবয়ব খুব চেনা কিন্তু মুখটা দেখতে পাচ্ছে না নন্দিনী৷ ভয়ে ও ঘাড় ঘোরাতেও ভুলে গেল৷ মুনিয়া, তার প্রাণের পুতলী রক্তাক্ত ছিন্নছিন্ন হচ্ছে, এক সময় পশুটা একটা বালিশ চাপা দিয়ে ধরল মুনিয়ার মুখে, হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ক্রমশঃ নিস্তেজ হয়ে গেল মেয়েটা, পশুটা উঠে দাঁড়াল, এতক্ষণে ওর মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নন্দিনী৷ পলকে ও ঘাড় ঘোরাল, কোথায় কি? এতক্ষণ তাহলে কি দেখল ও? মাথাটা টলে গেল অস্পষ্ট আলোয় লোপার ছবির দিকে তাকাল নন্দিনী, পড়তে পারছে লোপার নীরব দৃষ্টি, হ্যাঁ স্পষ্ট পড়তে পারছে৷ নিঃশব্দে বালিশটা তুলে নিয়ে ঘরের দরজা খুলল নন্দিনী৷

অন্ধকার বাগানে নামল সে৷ শুকনো পাতায় ওর পায়ের চাপে মর্মর ধ্বনি উঠছে রাত্রি দু’টোয় কেউ শোনার নেই৷ কোথাও দূরে একটা কুকুর ডাকল৷ বাগানের এক প্রান্তে ছোট্ট টালির ঘরটার সামনে তখন পৌঁছে গেছে নন্দিনী৷ তার শিকার তখন আফিমের ঘোরে গভীর ঘুমে মগ্ন৷ ভাগ্য ভালো দরজাটা চাপ দিতেই খুলে গেল৷ এই তো পশুটা চিত হয়ে শুয়ে আছে, ঠোঁট অল্প ফাঁক, বিশ্রী লালা গড়াচ্ছে৷ নন্দিনী আর দেরি করল না, বালিশটা ওর মুখের উপর চেপে ধরল, নেশা কেটে লোকটা জেগে বাধা দেবার শেষ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হল না৷ মৃতদেহের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে মিলিয়ে নিচ্ছিল নন্দিনী, হ্যাঁ এই সেই মুখ৷ তাদের প্রৌঢ় মালি রঘুদা, মুনিয়ার প্রিয় রঘুজ্যাঠা, যে সেই রাত্রে নৃশংস ভাবে ধর্ষণ করে খুন করেছিল মুনিয়াকে৷ পশুটার মুখের উপর একদলা থুতু ছিটিয়ে নন্দিনী বাগানে পা বাড়াল৷

ভোরের আলো ফুটছে, নন্দিনী বাকি রাতটুকু দু’চোখ এক করতে পারেনি, এবার তার চোখে ঘুম নামছে, বহুদিন পর শান্তিতে ঘুমবে সে৷ বিছানায় এলিয়ে দিল নিজেকে৷ সাইডটেবিলে স্লিপিং পিলের ছেঁড়া পাতাটা আর একটা সুইসাইড নোট সাক্ষী রইল নন্দিনীর ঘুমের মুহূর্তের৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%