হাইওয়ে সুন্দরী ও একটি রামধনু

মহুয়া মল্লিক

এক

আমার সঙ্গে যাবে? বিষাদবিধুর এক শোকগাথায় মেয়েটি নিমজ্জিত ছিল। কাজলকালো দিঘির মতো চোখ দুটো তুলে আমাকে দেখল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। একটা হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল আর তারপরেই চমকে উঠে হাতটা সরিয়েও নিল। আমি প্রাণপণে বরফ ঠাণ্ডা হাতদুটোতে একটু উষ্ণতা ভিক্ষা করে চললাম। আবছা আলোছায়াতেও টের পেলাম মেয়েটির খয়েরি মণিতে কিছুটা বিভ্রম চলকে পড়ল। আমি আর দাঁড়ালাম না, এগিয়ে চললাম।

মেয়েটি সবরকম হিসেব কষে বুঝে ফেলেছে, হাইওয়ের এই অন্ধকারে একা খারাপ হয়ে যাওয়া গাড়িতে সারারাত কাটানোর থেকে আমার সমস্ত শীতলতাকে সঙ্গী কারই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। নাহলে আবার আক্রান্ত হবার আশঙ্কা।

আমি হনহন করে হাঁটতে শুরু করলাম। মেয়েটি আমার সাথে পা মেলাতে পারছে না, সে প্রায় দৌড়াচ্ছে। আমি মনে মনে মজা পাচ্ছি। এমনিতেই আমার জোরে হাঁটা অভ্যাস আর আজকে তো শরীরটা এত নির্ভার, আমি যেন ডানায় ভর করে উড়ে যাচ্ছি।

''প্লিজ শুনছেন, একটু আস্তে হাঁটবেন''। মেয়েটির কাতর কণ্ঠস্বরে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। হাঁপাতে হাঁপাতে ও আমার সামনে এসে থামল। হাইওয়ে ছাড়িয়ে আমরা লোকালয়ে ঢুকে পড়েছি। স্ট্রীটলাইটের আলোয় এবার মেয়েটিকে ভালো করে দেখলাম। বেশ আকর্ষক চেহারা। পরনে একটা গোলাপি রঙের শিফন, তার উপরে ওভারকোট। প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে বাঁচতে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে মাথার উপর তোলা। ঠোঁটের কোণ কেটে গিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। মেয়েটিকে দেখতে দেখতে অদ্ভুত একটা মায়া টের পেলাম। মনে মনে ফুঁসে উঠলাম, ছেলেগুলোকে পেলে খুন করে রাখতাম।

মেয়েটি ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। আমি মৃদু হেসে ওর কোমরে হাত রেখে বললাম, ''এসো আর একটু হাঁটলেই আমার গরিবখানা।'' পুরুষালি স্পর্শে মেয়েটি যেন একটু কেঁপে উঠল।

দুই

টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে মেয়েটি বেতের দোলনা চেয়ারখানাতে বসল। চোখে মুখে লেগে থাকা আলতো জলের কণাগুলো নক্ষত্রের মতো ঝিলমিল করছে। কফির কাপ এগিয়ে দিতে দিতে আমি দ্বিতীয়বার লক্ষ্য করলাম মেয়েটি অত্যন্ত সুন্দরী। ''তো রাতবিরেতে একা ড্রাইভ করে কোথায় যাচ্ছিলেন''? মেয়েটি কফি মগে চুমুক দিতে ঘরের চতুর্দিকে চোখ বোলাচ্ছিল। ''আপনি এখানে থাকেন?'' আমার অগোছালো ঘর দেখে শৌখিন মেয়েটির মনে হয় ভ্রম হচ্ছিল, এই খোঁয়াড়ে মানুষ থাকে কী করে! আসলে আমি এখানে ঠিক থাকি না। বাড়িটা তালাবন্ধই থাকে। দিন দুই হল কলকাতা থেকে এসেছি একটা লেখার কাজ নিয়ে, একটু নিরিবিলির জন্য! কেয়ারটেকার লোকটি অসুস্থ বলে ইলেক্ট্রিক বিলটাও জমা করতে পারেনি, তাই আপনাকে অন্ধকারের মধ্যে বসিয়ে রেখেছি।

মেয়েটি লজ্জিত হল। আরে না না, মোমের আলো আমার একটুও খারাপ লাগছে না বিশ্বাস করুন। তারপর কিছু মনে পড়েছে এইভাবে বলে উঠল, আসলে দেশের বাড়িতে ঠাকুমা খুব অসুস্থ খবরটা পেয়ে মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। গাড়িটা খারাপ না হলে এতক্ষণ পৌঁছে যেতাম।

দুজনের কফিই শেষ। কথারাও চুপ করে বাইরের বৃষ্টির সঙ্গীত শুনছে। মেয়েটি একদৃষ্টে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমাকে দেখছে না অন্য কিছু ভাবছে। আমি ধীরে ধীরে হেঁটে গেলাম ওর সামনে। আমার ছায়ার ঢাকা পড়তেই চমকে তাকালো আমার মুখের দিকে। তাকিয়েই থাকল। ওর মাথায় হাত রাখাতেই আমাকে টেনে নিল বুকের মধ্যে। ওর হাতের আঙুলগুলো খেলা করতে লাগল আমার পিঠ জুড়ে। আমি ওর নরম বুকের উষ্ণতায় মুখ ডোবাতেই একটা রামধনুর জন্ম হল।

শেষান্তে

ঘুম ভাঙতেই মেয়েটির মনে পড়ে গেল গতরাতের কথা। ইসস এভাবেই বুঝি সারারাত এই দোলনায় কাটিয়ে দিল সে? কিন্তু বেশ মনে আছে পুরুষটি কোলে করে এ বাড়ির একমাত্র শোবার ঘরে ওকে নিয়ে গিয়েছিল। সে একচোট হেসে নিল। ঘুমের ঘোরে কখন আবার এখানেই এসে বসেছিল মনেও নেই সে কথা।

কাচের জানলা দিয়ে রোদ এসে সারা বাড়িটা ঝকঝক করছে। পুরুষটিকে কোথাও দেখতে পেল না সে। হয়ত বাজার দোকান গিয়ে থাকবে। মেয়েটি খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে মাধবীলতায় ঘেরা বারান্দায় এসে বসল। প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করছে, ''প্রতিশ্রুতিবান লেখক সৌম্যব্রত সরকারের আকস্মিক প্রয়াণে বইপাড়া শোকস্তব্ধ।'' ছবির মানুষটি নাকি পরশু রাত্রেই মারা গেছেন! মেয়েটি আর কিছু ভাবতে পারল না। শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়াল। ওর সারা শরীরে তখনও সৌম্যব্রত জ্বলজ্বল করছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%