রাইটার্স ব্লক

মহুয়া মল্লিক

এক

কাঠের এই বাড়িটা যথেষ্ট পুরনো, দোতলায় হাঁটলে সারা বাড়িটা মচমচ করে ওঠে৷ একটা অশরীরী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দিনের বেলায়ও৷ সেন্টলুইসের এই এলাকাটা তেমন অভিজাত নয়৷ কিছু ব্ল্যাক পরিবারের বসবাস এদিকটায়৷ তাদের সঙ্গে মিলেমিশে আছে ইন্ডিয়ান আর চাইনিজ স্টুডেন্ট আর আর্থিক দিক দিয়ে দুর্বল কিছু আমেরিকান৷ তবে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত পাড়া৷ মাঝে মাঝে রাস্তার ওপাশের পার্কটায় চোরাই ড্রাগের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে দু’দলের গুলিগোলা যে চলে না তেমন নয়৷ তবে ঘটনা থেকে যাওয়ার পরই প্রতিবার রোজমেরী টের পান৷ এটুকু ছাড়া এমনিতে নির্ঝঞ্ঝাট পাড়া৷ বিকেলে হাঁটতে বেরোলে শুধু পার্কের ওদিকটা এড়িয়ে চলেন৷ দুই ছেলেমেয়ে মানুষ করার পর মিস্টার জোসেফের ফ্যামিলি বিজনেস হঠাৎ ফেল করে যাওয়ায় তাদের অভিজাত ভিলা বাড়ি, দামি কার বিক্রি করে পাওনাদারদের ধারদেনা মিটিয়ে শহরতলির এই পুরনো বাড়িতে ওঠা৷ পাড়াটার সঙ্গে মানান সই বাড়ি৷ বিবর্ণ, রঙচটা, শ্রীহীন৷ বাড়ির পিছনে আগাছার জঙ্গল৷ রোজমেরীর বড্ড ফুলের শখ৷ গত বছর সামারে এখানে শিফট করার পর ফুলের গাছ লাগানোর আর সময় পাননি৷ ঘরগুলো গুছিয়ে তুলতে তুলতেই সময় কেটে গেল৷ কার্পেটগুলো কালো তেল চিটে হয়ে গিয়েছিল৷ রিপ্লেস করার মতো আর্থিক অবস্থা না থাকায় ক্লিনিং সেন্টার থেকে লোক ডেকে সেসব পরিষ্কার করিয়ে তোলার পর দেখলেন বার্চ, স্প্রুসের বনে রঙমশাল, ফল সিজন এসে গেছে৷ এ বছর তাই সামারের শুরুতেই টিউলিপ, সানফ্লাওয়ারচ, ডেইজি, ড্যাফোডিল আর লিলিতে বাগান ভরিয়ে ফেলেছেন৷ তবে একা হাতে সবকিছু করতে বড্ড কষ্ট হয়৷ আর বাগানটা যা আগাছায় ভরা, বেশি সময় ওখানে থাকতেও ভয় লাগে৷

সারাদিন রোজমেরীর অফুরন্ত অবসর৷ জোসেফ সাতসকালে বেরিয়ে যান ফিরতে ফিরতে রাত্রি৷ বেচারা একা হাতে বিজনেসটা গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন৷ নিজের জন্য দুপুরে কিছু বানাতে ইচ্ছে করে না রোজমেরীর৷ এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস আর ঘরে বানানো কয়েকটা ব্রাউনি নিয়ে দোতলায় উঠে এলেন৷ পাশাপাশি দুটি ঘর৷ পিছনের দিকে একটি টানা ব্যালকনি যা দুটি ঘর থেকেই যাওয়া যায়৷ এখানে বসলে পিছনের বাগানটা খুব ভালো করে দেখা যায়৷ রঙবেরঙের ফুলগুলো যেন মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে অভিবাদন করলেই বড় বড় গাছগুলো যেখানে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে চোখ আটকে যায়৷ দুপুরের ঝলমলে রোদেও জায়গাটা কেমন ছায়াবৃত, অপার রহস্য নিয়ে যেন হাতছানি দেয় রোজমেরীকে৷ কে যেন ডাকতেই থাকে, এসো, এসো৷ রোজমেরী আর দাঁড়ান না৷ বাড়ির সামনের অংশে চলে আসেন৷ দুটো ঘরের সামনে করিডর মতো কিছুটা জায়গা তবে বদ্ধ৷ একটা ব্লাইন্ডের সামনে চেয়ার টেনে বসেন৷ এই বাড়ির মধ্যে এই জায়গাটাই তার সব থেকে পছন্দ, এটা বুঝে মিস্টার জোসেফ একটা ছোট্ট রাইটিং টেবিল আর দুটি চেয়ারে জায়গাটা সাজিয়ে দিয়েছেন৷ টেবিলের উপর হাল্কা নীল একটা পোর্সিলিনের ফুলদানি৷ এক গোছা সূর্যমুখী দিয়ে সাজানো৷ এ ফুল তার বাগানের নয়৷ রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে এই সময় সূর্যমুখী ফুটে থাকে৷ জোসেফ কাল ফেরার সময় নিয়ে এসেছেন৷ ব্রাউনিতে কামড় দিয়ে রোজমেরীর বাইরের দিকে তাকালেন৷ সামনের ব্ল্যাক পরিবারের বাচচা তিনটি আরো কিছু সঙ্গীসাথী জুটিয়ে ইয়ার্ডের প্লাস্টিক পুলে দাপাদাপি করছে৷ ওদের বাবা-মা সারাদিন বাইরে ব্যস্ত থাকেন৷ তিন ভাইবোনের বড়টি ছোট ভাইবোন দুটিকে সামলে রাখে৷ সবথেকে ছোটটি বছর চারেকের একটি ছেলে৷ রোজমেরীকে দেখলে প্রায় এগিয়ে আসে৷ মিষ্টি করে হাসে৷ উনি কোনোদিন কুকি, কোনোদিন ব্রাউনি খেতে দেন ছেলেটিকে৷ মুখ দেখে বুঝতে পারেন বেশ খিদে পেয়েছে৷ বড় দুটি বড্ড লাজুক, দূর থেকে রোজমেরীকে দেখলেও কাছে ঘেঁষে না৷ ওদের দেখতে দেখতে জুসের গ্লাসে চুমুক দিলেন৷ ফোনটা বেজে উঠল৷ চোখ কুঁচকে স্ক্রিনে নামটা দেখলেন৷ মিস্টার জোসেফ৷ অবশ্য নামটা দেখার দরকার ছিল না৷ কে আর এই বুড়িকে ফোন করবে! ছেলে-মেয়েদের একজন ডেনমার্কে আরেকজন জুরিখে নিজের নিজের মতো ব্যস্ত৷ বুড়ি মা’টার খবর নেবার সময় কোথায় ওদের! ক্রিসমাসে আর থ্যাংকস গিভিং-এ নিয়ম করে ডলার পাঠিয়ে দিয়েই ওরা কতর্ব্য সারে৷

‘‘হাই হানি বিজি ছিলে?’’

জুসের খালি গ্লাস একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে রোজমেরী জবাব দিলেন, না, না সেরকম কিছু করছি না৷ দোতলার ব্লাইন্ডসের সামনে বসে রাস্তা দেখছি৷ তারপর কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘হ্যাভ ইউ ফিনিশড ইয়োর লাঞ্চ?’’

জোসেফ উত্তর দিলেন তারপর হাসতে হাসতে বললেন তুমি নিশ্চয় আজও ডায়েটে? উফ খুব ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছ রোজ৷ এভাবে লাঞ্চ স্কিপ করবে না৷

রোজের মুখে একটা অন্যরকম আলো খেলা করে যায়৷ বয়সটা এক লাফে যেন অনেকটা কমে যায়৷ ধরা পড়ে যেতে মুখে মৃদু মৃদু হাসি৷ এই আবেশ অবশ্য বেশিক্ষণ থাকে না৷ জোসেফের পরবর্তী প্রশ্নে রোজ আবার আগের মতো নিষ্প্রাণ হয়ে যান৷ এরপর মামুলি দুয়েকটা কথা বলার পর ফোন রেখে দেন৷

দু’হাতে মাথা চেপে বসে পড়েন৷ উফ অসহ্য যন্ত্রণা৷ এর থেকে মুক্তি চান রোজমেরী৷ ছোট্ট টেবিলটার সঙ্গে একটা ড্রয়ার৷ সেটা টেনে বার করে এলোমেলো ভাবে ভিতরে হাতড়ান৷ একটা ফাইল, এক তাড়া সাদা এ ফোর সাইজের কাগজ আর দামি দুটি কলম বার করে আনেন৷ ফাইলের উপরে একটি প্রিন্টেড ক্যালেন্ডার৷ লাল কালির কলম দিয়ে আজকের ডেটটা ক্রস করেন৷ হিসেব করে দেখেন আর মাত্র ক’টা দিন বাকি আছে! এর মধ্যে কাজটা শেষ করতে পারবেন তো? ফাইলটা খোলেন৷ ভিতরের কাগজগুলোর গায়ে পরম মমতায় হাত বোলান৷ ভাবতে কষ্ট হয় এই পাতার পর পাতা তার লেখা! লাস্ট কটা মাস একটি শব্দও তার কলমের ডগায় আসেনি৷ একেই মনে হয় বলে রাইটার্স ব্লকেজ! আর মাত্র কয়েকটা পাতা লিখলেই উপন্যাসটা এডিটরের টেবিলে জমা দিয়ে আসতে পারেন৷ কিন্তু কিছুতেই পারছেন না রোজ৷ জোসেফ অফিস বেরিয়ে যাবার পর প্রত্যেদিন একবার চেষ্টা করেন রোজমেরী, কিন্তু একটা শব্দও আসে না৷ শব্দ সখীরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে৷ রোজ বোঝার চেষ্টা করেন, এ যাওয়া কী চিরতরে ছেড়ে যাওয়া? নাকি গতবারে মতো আবার ফিরে আসবে? কিন্তু গতবার তো ফিরে আসার পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল৷ হ্যাঁ তার শেষ উপন্যাস বেস্টসেলার৷ সেই অর্থেই মিস্টার জোসেফ আর সে নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে৷ কিন্তু এই লেখার জন্য ফিফটি পারসেন্ট এডভান্স নেওয়া হয়ে গেছে৷ পেপারে পেপারে বিজ্ঞাপন চলে এসেছে৷ এখন নির্দিষ্ট দিনে বই না প্রকাশ হলে বাকি টাকা তো দূর অস্ত, এডভান্সের টাকা সুদ সমেত ফেরত দিতে হবে সেই সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ব্রেক করার জন্য কোর্ট কেস৷ রোজমেরী আর ভাবতে পারেন না৷ যন্ত্রণায় মাথাটা ছিঁড়ে যায়৷ জোসেফ প্রতিটা দুপুর এভাবে মনে করিয়ে দেবার পরই একটা ধূসর যন্ত্রণার টানেলে রোজমেরী একটু একটু করে ঢুকে যান৷ এই সময়টা তিনি যেন ঘোরের মধ্যে থাকেন৷

এডভান্সের টাকার এমাউন্টটা নেহাত মন্দ না৷ এ টাকাটাও বিজনেসে লাগিয়েছেন জোসেফ, রোজমেরীর সম্মতিক্রমে৷ লেখাটা ঠিক সময়ে এডিটোরিয়াল ডেস্কে জমা না পড়লে আবার একটা ঝড়ে সবকিছু বেসামাল হয়ে যাবে৷ দুশ্চিন্তা রোজেরও কম নয়৷

এতক্ষণ আপন খেয়ালে ব্লাইন্ডে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন৷ বাইরে থেকে নিশ্চয়ই ব্লন্ড কালার চুলের এই বুড়িকে কিম্ভুতকিমাকার লাগছে৷ দলছুট হয়ে সামনের বাড়ির ক্ষুদে সদস্যটা এদিকেই এগিয়ে এসেছে আর তাকে দেখে হাত নাড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে৷ রোজমেরী আর দাঁড়ান না৷ তরতর করে নীচে নেমে আসেন৷ কালকের বানানো ব্রাউনি থেকে একটু বেশি পরিমাণে ফয়েলে র‌্যাপ করে দরজা খুলে ইয়ার্ডে নেমে আসেন৷ বাচচাটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, অনেকটা দিয়েছি সবাই মিলে খেও৷ প্যাকেটটি হাতে নিয়ে বাচচাটি ছুট লাগায়, তারপর একটু দূর থেকে মিষ্টি করে বলে, থ্যাংক ইউ৷

বিদ্যুৎ চমকের মতো রোজমেরীর মাথায় একটা সম্ভাবনা ঝিলিক মেরে যায়৷ তার মাথা থেকে একটু একটু করে পাষাণ ভার নামতে থাকে৷ হ্যাঁ এই হাসিমুখের প্রাণ চঞ্চল বাচচাটাই তার এতদিনের রাইর্টাস ব্লকেজ খুলে দিতে পারে৷ ইস এতদিন কেন এটা ভাবেন না? বেকার এতটা সময়ের অপচয় হল৷

দুই

সকাল থেকেই রোজমেরীর মনটা খুব খুশি খুশি৷ জোসেফ বেরিয়ে যেতে ডাস্টিং ক্লিনিং শেষ করে অনেকদিন পরে নানারকম অ্যারোমেটিক অয়েল মেসেজ নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ার নিলেন৷ জোসেফের সঙ্গেই পেট ভরে ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছেন৷ লাঞ্চে একার জন্য কিছু বানাবার তাগিদ কোনোদিনস অনুভব করেন না৷ গতকালের লেফটওভার দিয়ে চালিয়ে নেবেন৷ হাতে এখন অফুরন্ত সময়৷ ফ্রিজে বেশ কিছু আপেল আর স্ট্রবেরি আছে৷ মন ভালো থাকলে নিজের হাতে এটা সেটা বানান তিনি৷ কিচেনের দরজাটা পেরলেই লন্ড্রীরুম, লন্ড্রীরুমের দরজা খুললেই পিছনের বাগান৷ পায়ে পায়ে সেখানে নামতেই আগাছা আর লম্বা লম্বা ঘাসে পা জড়িয়ে গেল৷ জোসেফকে বলতে হবে কামিং উইকেন্ডে লন মোয়ার চালিয়ে এগুলো সাফ করতে৷ নানান প্রজাতির রঙবেরঙের লিলি ফুটে আছে৷ হাতে কিচেন নাইফ নিয়েই বাগানে নেমেছিলেন তিনি৷ ঝলমলে গ্রীষ্ম৷ সাপখোপ বা পোকামাকড় সহজেই চোখে পড়বে এই ভেবে কিছুটা নির্ভয়ে ফুলের সাম্রাজ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন৷ নানান ধরনের লিলি ফুল বাগান আলো করে ফুটে আছে৷ কী নেই সেই সম্ভারে! স্পাইডার লিলি, নডিং লিলি, টাইগার লিলি, উড লিলি৷ মিলিয়ে মিশিয়ে এক গোছা লিলি সংগ্রহ করলেন৷ কিচেন নাইফটা বেশ ভোঁতা হয়ে গেছে৷ নতুন নাইফ সেটটা আজকে বার করতে হবে৷ বাড়িতে ঢুকে ফুলগুলো বিভিন্ন জায়গায় সাজিয়ে রেখে আপেলপাই আর স্ট্রবেরী কেক বানাতে বসলেন৷ এই কেকটা জোসেফের খুব পছন্দ৷ প্রতিবেশী বাচচাটাকেও দেবেন একটু৷ বাচচাটির সঙ্গে এই গোপন মেলামেশা সেভাবে কেউ টের পায় না৷ এখন ওদের লম্বা ছুট৷ বাবা-মা যে যার মতো কাজে বেরিয়ে যায়৷ বড় ভাইবোন দুটি নিজেদের বন্ধু আর নানা রকম ইনডোর গেম নিয়ে মেতে থাকে৷ এই পুঁচকেটাই একা একা ঘুরে বেড়ায়৷ সেদিন তো তার আগাছাভরা জঙ্গলে চলে এসেছিল৷ ওপর থেকে দেখতে পেয়ে রোজমেরী ওর দিদিকে ডেকে বাচচাটিকে নিয়ে যেতে বলল৷

ভয় হয় ঐটুকু বাচচা ঐ বড় বড় গাছের জটলাটার কাছে না চলে যায়৷ জায়গাটা কেমন যেন গা ছমছমে৷ জোসেফের কাছে শুনেছেন গাছগুলোর ওপাশে তিরতির করে বয়ে চলেছে একটা ঝরনা৷ মাঝে মাঝে বনময়ূরের দল জল খেতে আসে ওখানে৷ এমন একটা লোভনীয় মনোরম দৃশ্যের কথা জেনেও রোজের কখনো ওখানে যেতে ইচ্ছে করেনি৷ এসব ভাবতে ভাবতেই নতুন নাইফের সেটটা বার করলেন৷ ছেলের বৌ অ্যানা এই সেটটা উপহার দিয়েছিল৷ এতকাল খুলে দেখার সময়ও হয়নি৷ বক্সটা খুলতেই উজ্জ্বল আলো পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে গেল৷ মনোযোগ সহকারে প্রতিটি নাইফ জরিপ করলেন তারপর বেছে বেছে একখানা তুলে নিয়ে বক্সটা বন্ধ করে সরিয়ে রাখলেন৷

গন্ধে বুঝতে পারলেন স্ট্রবেরি কেকটা হয়ে এসেছে৷ কেকটা বার করে ঠান্ডা হতে দিয়ে আপেল পাইটা ওভেনে বসিয়ে দিলেন৷ এখন অনেকটা সময়৷ সামনের ইয়ার্ডে এসে দাঁড়ালেন৷ আজ আর বাচচাদের হুটোপুটি দেখতে পেলেন না৷ একটু অবাক হলেন তিনি৷ এরা সবাই কী কোথাও হলিডে কাটাতে চলে গেল নাকি? ইস বাচচাটাকে আজ বসিয়ে আপেলটাই আর স্ট্রবেরি কেক খাওয়াবেন ভাবলেন!

দোতলায় এসে অভ্যাসমতো পিছনের ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই দেখলেন প্রতিবেশীর সেই বছর চারেকের পুঁচকেটা তার ফুলের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ মুখে একটা হাসি খেলে যায় রোজমেরীর৷ ও হো তুমি বুঝি এখানে! দাঁড়াও আজ মজা দেখাচ্ছি৷ তরপর করে ওপর থেকে নেমে আসেন রোজমেরী৷ পিছনের দরজা খুলে নেমে আসেন বাগানে৷ কড়া গলায় বলে ওঠেন, ‘‘হ্যান্ডস আপ’’৷ বেচারার হাতে এক গোছা ফুল৷ এভাবে ধরা পড়ে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা৷ রোজমেরী অতি কষ্টে হাসি চাপেন৷ আবার ধমকে ওঠেন, আমার সঙ্গে এসো পানিশমেন্ট পাবে তুমি৷ পানিশমেন্ট? একটু ঘাবড়ে যায় সে, তবুও অগ্রাহ্য করে ছুটে পালাতে পারে না৷ রোজমেরীর সঙ্গে পায়ে পায়ে পেরিয়ে যায় লন্ড্রী রুম, কিচেন৷ এসে দাঁড়ায় লিভিংরুমে৷ ওকে বসতে বলে রোজমেরী খবর নেয় ওর দাদা-দিদির৷ ওরা তো ‘‘স্যুপ কিচেনে’’ গেছে, জানায় বাচচাটি৷

রোজমেরীর মন দ্রবীভূত হয়৷ আহা ওখানে কারা যায় তিনি জানেন৷ খুব দরিদ্র পরিবারগুলি ওখান থেকে বিনা পয়সায় নিজেদের খাবার সংগ্রহ করে আনে৷ বাচচাটার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘‘আর ইউ হাংরি?’’ বাচচাটি নিঃশব্দে মাথা নাড়ে৷

রোজমেরী উঠে যান৷ সদ্য বার করা ধারালো নাইফটা দিয়ে স্ট্রবেরি কেক আর আপেলপাই পিস পিস করে কেটে রাখেন৷ পেপার প্লেটে সাজিয়ে আনেন কেক আর পাইয়ের টুকরো৷ প্লেটটা এগিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘‘ধরো, এটাই তোমার পানিশমেন্ট৷’’ বাচচাটি এমন মজার শাস্তি কখনো পায়নি৷ সে খাবারে মনোযোগ দেয় আর রোজমেরীর সমস্ত মনোযোগ আটকে যায় বাচচাটিতে৷ একটু পরে নাইফটা ধুয়ে মুছে বক্সে ভরে কিচেন লফটে আর পাঁচটা জিনিসের সঙ্গে তুলে রাখলেন৷

অনেকদিন পরে আজ তিনি খুব খুশি৷ ব্লাইন্ডসের সামনে বসে প্রতিবেশী বাড়িতে চোখ রাখতে রাখতে জোসেফকে ফোন করলেন৷ দু-একটা মামুলি কথার পর জানিয়ে দিলেন আজ রাত্রে তার জন্য ট্রিপল সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে৷ জোসেফকে রোজকারের একঘেয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিলেন৷ নাহ আজ আর রোজ কোনো ধূসর টানেলে ঢুকে যাবেন না৷ আজ তার বিশেষ আলো ঝলমলে একটা দিন৷ এই খুশিতে ডুবে থাকতে চান তিনি আপাতত কিছুটা সময়৷

ডিনার টেবিলে মনপসন্দ কেক আর পাইয়ের টুকরো দেখে জোসেফ বুঝলেন তার সুইটহার্টের মুড বেশ ভালো আজ৷ অনেকদিন পর গুমোট কেটে গিয়ে তিরতির করে মিষ্টি বাতাস বইছে৷ ফর্কে গেঁথে একটুকরো কেকের টুকরো মুখে তুলে জোসেফ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন, ট্রিপল সারপ্রাইজ বলেছিল না? তিন নম্বরটি কি?

রোজমেরীর মনে হয় এবার একটু দয়া এল, মুচকি হেসে বুড়োটাকে আর অপেক্ষা না করিয়ে সদ্য লেখা একগোছা কাগজ মেলে ধরলেন৷ জোসেফ উচ্ছ´সিত৷ তাহলে খুলে গেল রাইর্টাস ব্লকেজ? জিজ্ঞেস করলে, শেষ করে ফেললে? প্রাণের রোজ তাকে জানান, সবে তো আজ বসলেন৷ এর মধ্যে শেষ হয় নাকি! আরো কয়েকটা দিন যাক৷ তারপর পুরোটা ব্রাশ আপ করা৷ তারপর জমা দেওয়া৷

‘‘এবার তুমি নোটপ্যাডে লেখা অভ্যাস করো৷ এডিটিং, ব্রাশ আপ এই সমস্ত কাজগুলো অনেক স্মুথ হয়ে যাবে৷’’

রোজ উত্তর দেয় না৷ এঁটো বাসনপত্র ডিশওয়াশারে ভরে সুইচ অন করে দেন৷

তিন

মিস্টার অ্যান্ড্রুর ছোট্ট প্রকাশনা সংস্থা৷ কিন্তু তিনি প্রকৃত জহুরী, মহামূল্য হিরে চিনতে যে তাঁর ভুল হয়নি তা পান্ডুলিপিতে হাল্কা চোখ বুলিয়েই বুঝতে পেরেছেন৷ আর এই কারণেই এতগুলো ডলার তিনি রোজমেরীর উপর ইনভেস্ট করেছেন৷ কে বলতে পারে এই লেখাই হয়ত অ্যান্ড্রুর ছোট্ট পাবলিশিং হাউসকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দিল! ক্যুরিয়ারে লেখাটা জমা পরার পরই তিনি প্রমিস করেছিলেন বাকি ফর্মালিটিজগুলি খুব তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নেবেন৷

কিন্তু রোজমেরী ভাবেননি, সেটা এত তাড়াতাড়ি হবে৷ আর স্বয়ং অ্যান্ড্রু এভাবে তার বাড়ি আসতে চাইবেন৷ এমন একটা সময় আসছেন যে ডিনারে না বললে চরম অভদ্রতা হয়৷ জোসেফ বাইরে থেকে খাবার আনতে চেয়েছিলেন কিন্তু রোজমেরী নিজের হাতে বানানো খাবারেই আপ্যায়ন করতে চেয়েছেন অতিথির৷ বাড়িতে যা আছে তা দিয়েই ম্যানেজ করে ফেললেন৷

ডিনার টেবিলে বসে তো অ্যান্ড্রুর চোখ কপালে৷ দুরকম স্যালাড, পাস্তা, ব্রেড, বেকড পট্যাটো, গ্রীলড স্যামন, মাংস আর ফ্রুটক্রিম৷ প্রতিটি আইটেম অপূর্ব স্বাদের৷ মাংসের পদটা অদ্ভুত কিছু মশলা দিয়ে বানিয়েছেন৷ তুলতুলে নরম আর স্পাইসি৷ জোসেফ আর অ্যান্ড্রু চেয়ে চেয়ে খেলেন৷ অ্যান্ড্রুর পাবলিশিং হাউসের পাশাপাশি একটা ডেইলি নিউজপেপারও আছে৷ তিনি বারবার রিকোয়েস্ট করলেন মাংসের রেসিপিটা লিখিত আকারে দেবার জন্য৷ রোজমেরী হাসতে হাসতে জানালেন এমন কিছু ইউনিক না৷ সামনের সুপার মার্কেট থেকেই সমস্ত ইনগ্রেডিয়েন্ট সংগ্রহ করেছেন, যে কেউ ওটা বানাতে পারবে৷ কচি হরিণের মাংস স্যাটার ডে মার্কেটগুলোতে দেদার মেলে৷

খাওয়ার পর লিভিং রুমে আরো কিছুক্ষণ আড্ডা দিলেন তিনজন মিলে৷ চেকটা সেন্টার টেবিলের উপর রাখা ছিল৷ মোটাসোটা এমাউন্টটা প্রৌঢ় দম্পতিকে খুব স্বস্তি দিচ্ছিল৷ বিদায় নেবার আগে জোসেফ ভদ্রতা করেই বললেন, এতটা পথ কষ্ট করে এলেন আমাদের জন্য, আমরা ঠিকমতো আপ্যায়ন করার সুযোগ পেলাম না৷

‘‘আরে না, না৷ আমি এসেছিলাম নিজের কাজে৷ তাই ভাবলাম চেকটা দিয়ে যাই৷ আসলে আপনাদের নেবারের বাচচাটা মিসিং সেই ব্যাপারেই একটা নিউজ করতে এসেছিলাম৷ বাচচাটা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে৷ ভেরি স্ট্রেঞ্জ! তবে মিডিয়া উঠে পড়ে লেগেছে, আমেরিকান পুলিশও খুব তৎপর৷ খুঁজে আমরা বার করবই৷’’

এই ক’দিন জোসেফ তার প্রাণের রোজকে চোখে চোখে রেখেছেন৷ যতটা পেরেছেন সঙ্গ দিয়েছেন৷ গতবার রাইটার্স ব্লকেজ কাটার পর ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিলেন রোজ৷ অস্বাভাবিক আচরণ৷ স্নান খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে বেসমেন্টের ঘুপচি আঁধারে দুই হাঁটুর মাঝে মাথা গুঁজে বসে থাকতেন৷ জোসেফকেও কাছে ঘেঁষতে দিতেন না৷

জোসেফ তাই এবারে অনেক সাবধানী৷ ক’টা দিন রোজকে নিয়ে মায়ামি বিচে কাটিয়ে আসবেন সমস্ত প্ল্যান সেরে রেখেছেন৷ ফ্লাইটের টিকিটটা রোজমেরীকে দেখাতেই তিনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান৷ কাল সন্ধের ফ্লাইট, অনেক রাত্রি জেগে তিনি প্যাকিং সেরে ফেললেন৷

হঠাৎ খেয়াল হল সারা কাঠের বাড়িটা অস্বাভাবিকভাবে দুলছে আর সেই সঙ্গে স্ট্রবেরি কেক, আপেলপাইয়ের গন্ধে ভরে উঠেছে৷ এই দুটো গন্ধ ছাপিয়ে আরেকটা গন্ধ তীব্র হচ্ছে৷ তাজা রক্তের গন্ধ৷ রোজমেরী এবার ভয় পেয়ে যান৷ কিন্তু না তিনি ভয় পাবেন কেন! পুলিশ মিডিয়া এসব কিস্যু করতে পারবে না তার, কোথায় পাবে অ্যান্ড্রু ঐ পুচকেটাকে? সে তো এখন তাদের পেটের মধ্যে৷ তারিয়ে তারিয়ে যে মাংসটা খেল অ্যান্ড্রু সেটা তো এই ভোর রাত্রে হজম হয়ে গেছে৷

হঠাৎ আয়নায় নিজেকে দেখলেন রোজমেরী৷ ঠোঁটের কষ বেয়ে তাজা রক্তের ধারা গড়িয়ে নামছে৷ উসকো-খুসকো চুল৷ চোখে শতাব্দীর অন্ধকার৷ নিজেকে উইচ মনে হচ্ছে৷ নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে টের পেলেন সেদিনের ধারালো নাইফটা গোপন লফট থেকে নেমে এসে শূন্যে দুলতে দুলতে তাকে লক্ষ্য করেই ছুটে আসছে৷ কচি গলায় কে যেন বলে উঠল, ‘‘হ্যান্ডস আপ, পানিশমেন্ট তোমার জন্য৷’’

রোজমেরী চোখ বন্ধ করে লুটিয়ে পড়লেন বিবর্ণ কার্পেটের উপর৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%