মহুয়া মল্লিক
আমি বলেছিলাম না ফুলেদের কথা আমি শুনতে পাই? খুব হেসেছিলে না তখন? এখন হোঁচট খেয়ে পড়ে বুঝতে পারছ তো, মিহি ভুল বলে না৷ আগেই বলেছিলাম কাম্মা ওদের বাড়ি যেও না৷ তা কি বললে তুমি? ‘‘ওমা মিহি যাব না কেন? ওরা এত ভালোবেসে লাঞ্চে নেমন্তন্ন করল, আর তুমি বারণ করছ যেতে? ও বাড়ির দাদাইটা তো তোমায় কালকেই এ বড় একটা ক্যাডবেরী দিল, চল মিহি সবাই মিলে মজা করব ওদের বাড়িতে’’৷
তা এখন মজা কর৷ মিহি মনে মনে কথাগুলো বলে একচোট হেসে নিল৷ কাকাইয়ের বিয়ের পর নতুন কাম্মাকে পেয়ে মিহি আনন্দে আত্মহারা৷ ক’দিন তো দারুণ হৈ হৈ করে কাটল৷ তারপর সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে আসা৷ গ্রামের বাড়িতে আসতে মিহির একটুও ভালো লাগে না৷ কিন্তু এবার ব্যাপার অন্যরকম, কাম্মার সঙ্গ থাকায় গ্রামের বাড়ি খুব একটা খারাপ লাগছে না৷ তাদের বড় বাড়িটার সামনেই একটা মাটির বাড়ি৷ বাড়ির মাটির হলেও বেশ ঝকঝকে তকতকে৷ আর বেশ সাজানো, দেওয়ালে সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা আর প্রচুর ফুলের গাছ৷ ওই বাড়িটায় একটা দাদাই, একটা পিসি আর একটা কাজের বয়স্ক মহিলা থাকে৷ দূর থেকে বাড়িটা দেখলেই মিহির অস্থির লাগে, সে ঐ বাড়িটাকে এড়িয়ে চলে৷ পিসিটা কেমন যেন তাকে দেখলেই অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে৷ মিহির একটুও ভালো লাগে না৷
গ্রামে চট করে ডাক্তার পাওয়া যায় না৷ কম্পাউন্ডার গোছের একজন কারুকে ধরে নিয়ে এল পাড়ার কেউ৷ কাম্মার কপাল আর হাঁটুতে ভালোই লেগেছে৷ ড্রেসিং করে ওষুধ লাগিয়ে দিতে দিতেই বেলা গড়িয়ে গেল৷ কোনোরকমে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকল৷
খেতে বসে পিসিটার সঙ্গে বারবার চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছিল৷ কী শীতল দৃষ্টি, মিহির বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠছিল৷ খাওয়াদাওয়ার পাট চুকে যাবার পর একটু গল্প হল তবে তেমন জমল না৷ কাম্মার শাড়িতে পা জড়িয়ে আছাড় খাওয়াতে কোথায় যেন একটা ছন্দপতন হয়ে গেছে৷ মিহি দেখল পিসিটা, কাম্মাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল৷ মিহির আর সাহস হয়নি ওদের গল্প শুনতে যাবার৷ তবে ফেরার পর থেকে কাম্মা তার সঙ্গে একটিও কথা বলেনি৷ কে জানে পিসিটা কিছু বলেছে নাকি! আচ্ছা মিহি কী এমন করেছে? সে তো শুধু কাম্মাকে যেতে বারণ করেছিল ওদের বাড়ি৷ সে তো ভালো করতেই চেয়েছিল কাম্মার৷ কাম্মাকে তার এত ভালো লাগে, তার কোনও ক্ষতি কি তার ভলো লাগবে?
বিকেলে সে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ ঘুম থেকে উঠে দেখল বাড়িটা কেমন থমথমে৷ কাম্মার ব্যথাটা কি বাড়ল? নাকি জ্বর এল? খেলতে গিয়ে পড়ে হাত পা ছড়ে এলেই রাত্রে তার জ্বর এসে যায়৷ কাম্মারও বুঝি তেমন কিছু হল? এক ছুটে সে কাম্মার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল৷ কাকাই আর কাম্মা চাপা স্বরে কিছু কথা বলছিল, তাকে দেখেই চুপ করে গেল৷ কাম্মাকে দেখে তার শান্তি হল৷ শরীর ঠিকই আছে৷ খুব সুন্দর করে সেজেছে কাম্মা৷ খোঁপায় ঐ সামনের বাড়ির পিসিটার দেওয়া কয়েকটা ফুল লাগানো৷ মিহি মুগ্ধ চোখে কাম্মাকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তোমার ব্যথাটা বাড়েনি তো কাম্মা? আমি তো ভাবলাম তোমার জ্বর ওসে গেছে’’৷
কথাটা শুনে কাম্মা প্রথমে একটু কেঁপে উঠল আর তারপরেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে কাকাইয়ের দিকে তাকাল৷ ওদের দু’জনের মধ্যে চোখে চোখে কথা হয়ে গেল৷ অবশ্য কী কথা সেটা মিহি বুঝতে পারল না৷ সে এখন মাত্র সাত বছরের মেয়ে, আরেকটু বড় হলে হয়ত বড়দের চোখের ভাষা পুরোপুরি বুঝতে শিখে যাবে৷ কাকাই হঠাৎ কড়া গলায় বলে উঠল, ‘‘এই তুই যা তো এখান থেকে, সবসময় বড়দের মধ্যে পাকামি করতে আসা৷ বৌদি দেখছি মেয়েটাকে একটুও শিক্ষা দিতে পারেনি৷’’
কাকাই এভাবে বলতে পারে? মিহির কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না, সে একছুটে ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, রাগে শরীর কাঁপছে ওর৷ ইচ্ছা করছে সবকিছু তছনছ করে দিতে কোনোদিকে না তাকিয়ে সে পিছনে বাগানের অন্ধকারে নেমে গেল৷ ওদিকে মালিদাদুর বাড়ি, ঐখানেই টিমটিম করে আলো জ্বলছে, বাকি সব অন্ধকার৷
‘‘এই নীলাঞ্জনা, দেখ তো নেলপলিশের কালারটা কেমন যাচ্ছে?’’ সদ্য নেলপালিশ লাগানো হাত দুটি নীলাঞ্জনার মুখের সামনে তুলে ধরল শাবেরী৷ হয় সারাক্ষণ সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, নাহয় বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ফোনে গল্প করে৷ পড়াশোনায় একটুও মন নেই৷ এমন একজন রুমমেট পাওয়া খুবই দুর্ভাগ্যের নীলাঞ্জনার মতো একজন পড়ুয়া মেয়ের কাছে৷ কাল রাত্রে নীলাঞ্জনা ইম্পরট্যান্ট একটা নোটস বানাচ্ছিল, শাবেরী দুম করে লাইট অফ করে দিয়ে বলল, ‘‘অনেক পড়েছিস, এবার ঘুমতে দে তো৷’’ নীলাঞ্জনা এমনিতেই মুখচোরা মেয়ে, বইখাতা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছিল৷ কিন্তু শাবেরীর ফোনালাপে ঘুমবার কী উপায় আছে!
‘‘কীরে কালকের ইন্সিডেন্টটার জন্য রাগ করেছিস? বল না কালারটা যাচ্ছে কিনা?’’ নাছোড়বান্দা মেয়ে এই শাবেরী৷ যতক্ষণ না নীলাঞ্জনা উত্তর দেবে সে ঘ্যানঘ্যান করেই যাবে৷ বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে নীলাঞ্জনা দেখল নীল রঙের নখগুলো৷ নীল রঙটা যেন ছুঁচের মতো বিদ্ধ করছে তার চেতনা৷ বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, চোখ যেন নীল আগুনে ঝলসে যাচ্ছে৷ কেন এমন হচ্ছে ও জানে না৷
শাবেরী বলেই যাচ্ছে একটানা, ‘‘রাগ করিস না সোনা, এই তো আজ সারাদিন বাইরে থাকব৷ ছুটির দিনটা তুই যত ইচ্ছা পড়, কেউ বিরক্ত করবে না৷ সাহিলের সঙ্গে রাত্রে কথা না বললে ঘুম আসে না রে৷ এবার বল না কেমন লাগছে?’’
মুখ ফসকে বলে ফেলল নীলাঞ্জনা, ‘তোর ফরসা আঙুলে লালের শেড বেশি ভালো লাগত৷’’ কথাটা বলেই বুঝতে পারল ভুল করে ফেলেছে৷ ভীষণ ভুল৷ শাবেরীর নীল নখগুলো পলকেই যেন রক্তলাল হয়ে উঠল, এবং নখ থেকে টুপটাপ কবে রক্ত ঝরতে শুরু করল৷ নীলাঞ্জনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল, শ্বাসকষ্ট শুরু হল৷ গলা শুকিয়ে কাঠ৷
শাবেরী ওকে ঠেলছে, ‘‘এই নীল কী হল তোর? শরীর খারাপ বুঝি? কী যে হয় মাঝেমাঝে তোর বুঝি না বাবা৷’’ জলের বোতলটা শাবেরীর হাত থেকে নিতে নিতে নীলাঞ্জনা দেখল রক্ত কোথায়? দিব্যি নীল রঙ ঝিলিক দিচ্ছে নখে৷ বুক থেকে পাষাণভার নেমে গেলেও মনখারাপটা চেপে বসে রইল৷ শাবেরী মেয়েটা খারাপ না, তাকে যথেষ্ট ভালোবাসে৷ হস্টেলের মিল মুখে না রুচলে অমলেট বানিয়ে দেয়৷ তাছাড়া তার জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে৷ বাড়ি যাবার সময় তার ময়লা বিছানার চাদরটাও নিয়ে গিয়ে কাচিয়ে নিয়ে আসে৷ একটু হাসিমুখে বলতেই পারত, দিব্যি লাগছে নীল নেলপলিশে৷ বইপত্র বন্ধ করে শুয়ে পড়ল নীলাঞ্জনা৷
শাবেরী ফিরল অনেক রাতে৷ গেট আটটায় বন্ধ হয়ে গেলেও মেয়েরা গেটকিপারকে কীভাবে যেন ম্যানেজ করে সুপারের নজর এড়িয়ে টুক করে ঢুকে আসে৷ শাবেরীর হাতে ব্যান্ডেজ জড়ানো দেখে আঁতকে উঠল নীলাঞ্জনা৷
‘‘আর বলিস না, একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে সাহিল এমন ব্রেক কষল, আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায়৷ রক্তারক্তি কান্ড, একটা নখ ভেঙে গেছে৷ অবস্থা যদি দেখতিস, মনে হচ্ছিল নখে লালচে শেডের নেলপলিশ লাগিয়েছি৷ ঠিক যেমনটা তুই সকালে বললি৷’’ শাবেরী পোশাক ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠল৷ নীলাঞ্জনা লুকিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল, ও কি কিছু মিন করছে?
নীলাঞ্জনা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শাবেরীর কাঁধে হাত রাখল৷ ‘‘আই অ্যাম স্যরি, আমি আসলে ঠিক ওভাবে...’’
‘‘আরে দূর এত সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন? যাইহোক আজ আর হস্টেলের রুটি আলুর ঝোল মুখে তুলছি না, ফ্রায়েড রাইস আর চিলিপনির প্যাক করে এনেছি দু’জনের৷ তুই খাবারটা সার্ভ করে ফেল৷ আর হ্যাঁ চামচে করে আমায় খাইয়ে দিতে পারবি তো? আঙুলে ভীষণ ব্যথা রে৷’’
‘‘খুব পারব’’, শাবেরীকে জড়িয়ে ধরে নীলাঞ্জনা৷
খুব সকালে কাদের যেন চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল মিহির৷ চিৎকারটা বাগানের দিক থেকেই আসছে৷ মিহি বিছানা থেকে উঠে পড়ল৷ অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে সে৷ কারা চিৎকার করছে দেখতে নীচে নেমে এল মিহি৷ মালিকাকা আর তার বউ বুকফাটা চিৎকার করছে৷ ওদের পোষা টিয়া পাখি দুটোকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছে কেউ৷ এ মানুষের কাজ৷ হিংস্র জন্তু হলে খাঁচার মধ্যে থেকে বার করে খেয়ে ফেলত৷ এভাবে বদ্ধ খাঁচায় মেরে রেখে যেত না৷ মিহি দেখে কাম্মা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কাকাইয়ের শার্টের হাতা আঁকড়ে ধরেছে৷
‘‘জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, তুমি আবার উঠে এলে কেন?’’ কাম্মার জ্বর এসেছে? মিহি এগিয়ে যায়, কাম্মা ততক্ষণে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেছে৷ পিছনে পিছনে কাকাইও৷ মিহি দরজার কাছে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, কাল বিকেলের পর ও বুঝেছে কাম্মার ঘরে যখন তখন আর তার যাবার অধিকার নেই৷
‘‘আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে চাই না বাপ্পা৷ প্লিজ গাড়ির ব্যবস্থা কর৷ মিহিকে দেখলেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে৷ দেখলে তো ও জ্বরের কথা জিজ্ঞেস করল আর কাঁপুনি দিয়ে রাতে জ্বর এল৷ আর...আর...পাখি দুটোকে নির্ঘাত ঐ শয়তান মেয়ে...৷ তোমাদের কাজের মেয়েটা বলছিল কাল সন্ধেতে নাকি মিহি বাগানের দিকে গিয়েছিল৷’’
‘‘আহ রূপা!’’ চাপা গলায় কাকাই ধমকে ওঠে৷ মিহির হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল৷ কাম্মা তার সম্পর্কে এসব কী বলছে! আর সে বাগানের দিকে গিয়েছিল ঠিক কথা৷ কাল ওভাবে কাকাই বকার পর প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল বলেই তো সবার থেকে পালিয়ে গিয়েছিল৷ সে মালিদাদুর ঘরের কাছেও গিয়েছিল৷ পাখি দুটিকে দেখেছিল, ওদের সঙ্গে কথাও বলেছিল৷ মালিদাদু আর দিদা আর দিদা তখন বাড়িতে ছিল না৷ কিন্তু তাই বলে পাখি দুটোকে ঘাড় মটকে...৷ তার আর এখানে একটুও ভালো লাগছে না৷ কেউ অবিশ্বাস করলে কি একটুও ভালো লাগে?
কাল রাত্রে কে যেন নাম ধরে তাকে ডাকছিল৷ সে তো চোখ খুলতেই পারছিল না৷ তবু কে যেন একটানা ডেকে যাচ্ছিল৷ ‘‘মিহি বাইরে এস, মিহি জেগে ওঠো৷’’ সে অবশ্য যায়নি৷ অন্ধকার দেখলেই তার ভয় লাগে৷ শুধু কাল বিকেলেই অন্ধকার বাগানের দিকে সে চলে গিয়েছিল৷ এত কষ্ট হচ্ছিল তার যে আলো অন্ধকার বোধটাই চলে গিয়েছিল তখন৷
কাম্মার ঘরের সামনে থেকে একরাশ মনখারাপ নিয়ে সে ফিরতে শুরু করে, দোতলার এই বারান্দা দিয়ে সামনের মাটির বাড়িটা দেখা যায়৷ সেই পিসিটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে, মুখে একটা হিংস্র হাসি৷ মিহি এ হাসির অর্থ বুঝতে পারল না তবে তার ভীষণ ভয় করছিল৷ সে কার কাছে যাবে? এ বাড়িতে তার আপনজন কোথায়? এর থেকে মামার বাড়িতে সে ভালো থাকে৷ মা গত বছর আকাশের তারা হয়ে যাবার পর থেকেই সে একা হয়ে গেছে৷ এ বাড়ির সবাই তো বলে নতুন মা আনবে তার জন্য৷ বাপিও রাজি, কতদিন আর মেয়েকে অন্যের দায়িত্বে ফেলে রাখবে? কাকাইয়ের বিয়ের পরই নাকি বাপির বিয়ে হবে৷ বড়দের চাপা আলোচনা থেকে সে বুঝেছে নতুন মায়ের সন্ধানেই নাকি তাদের গ্রামে আসা৷ মিহি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আস, মালিদাদুরা চলে গেছে ঠাম্মি বলেছে নতুন পাখি কেনার টাকা দেবে তাদের৷ একটু আগের হট্টগোল থেকে বাড়িটা একদম শান্ত হয়ে গেছে৷ এত চুপচাপ পরিবেশ দেখলেও মিহির ভয় করে৷ মা চলে যাবার সময় তাদের কলকাতার বাড়িটাও এমন শান্ত হয়ে গিয়েছিল৷ মায়ের কথা আজ বেশি বেশি মনে পড়ছে৷ কাকাই কখন যেন নীচে নেমে এসেছে৷ ঠাম্মির সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলছে৷ ঠাম্মি হঠাৎ বলে উঠল, ‘মা মরা মেয়ে বলে মিহি একটু অদ্ভুত আচরণ করে ঠিকই, ওর কথাকে রূপাই বা এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন?’’
মিহি এবার সত্যি সত্যি মায়ের জন্য কেঁদে উঠল, মা নেই বলেই সে এত একা৷
হ্যারিকেনের আলোর সামনে বসে বসে মন্দিরা দুলছিল৷ তার কোলের কাছে সাদা কাপড়ের উপর কালো পুতুলটা বসেছিল৷ থ্যাবড়ানো নাক, ঠোঁট৷ বীভৎস দেখতে এই পুতুলটাকে৷ দিনের বেলাতেও কেউ দেখে ফেললে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবে৷ অথচ মন্দিরার পুতুলটিকে দেখলে সেইরকম অনুভূতি হয় না৷ এ পুতুল তার নিজের হাতে বানানো, বড় আপনজন৷ সন্তান স্নেহে তাকে আঁকড়ে থাকে, সখীর মতো জড়িয়ে থাকে আবার মায়ের মতো তার কাছে আশ্রয় খোঁজে৷ দিবাকরবাবু ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন৷ মেয়ের পাশে বসে পুতুলটির দিকে একবার তাকালেন৷ তারপর মৃদু কন্ঠে বললেন, ‘‘আর কেন? যা চেয়েছিস তাই তো পাচ্ছিস৷ ববিনের সঙ্গেই তোর বিয়ে হচ্ছে৷ এবার এসব ফেলে দিয়ে নতুন জীবন শুরু কর৷’’
‘‘কক্ষনো না৷ বিয়ে কি স্বেচ্ছায় করছে ববিন? পরিস্থিতির চাপে পড়ে...’’ কথা শেষ না করে এক ঝটকায় উঠে পড়ে মন্দিরা৷ বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে কুৎসিত পুতুলটা৷ ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে যায়৷
দিবাকরবাবু মেয়ের চলে যাওয়াটুকু দেখেন৷ এ মেয়েকে তিনি বোঝেন না৷ তাঁর মনে হয় যত নষ্টের গোড়া ঐ কালো পুতুলটা৷ তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন পুতুলটা নষ্ট করে ফেলার কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও পারেননি৷ মন্দিরা ঠিক টের পেয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে৷ দিবাকরবাবুর বুক চিরে দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে৷
কাকাইরা চলে গেছে৷ বাড়িতে শুধুই দাদাই, ঠাম্মি আর বাপি৷ মিহির সঙ্গে দেখা করতে আজ নাকি নতুন মা আসবে৷ ঠাম্মি বলেছে, ‘‘মিহি তুমি নতুন মাকে দেখে নিও, তোমার পছন্দ হলেই নতুন মা আমাদের বাড়িতে আসবে৷’’ ব্যাপারটা মিহির একদম ভালো লাগেনি, তবে মানুষটাকে দেখার একটু কৌতূহল হচ্ছে৷
বিকেলবেলাতেই সব কৌতূহল মিটে গেল৷ সামনের বাড়ির সেই পিসিটা নাকি তার নতুন মা হবে! সে চুপচাপ বসেছিল৷ বাপি আর পিসিটা কথা বলছিল৷ বাপি বলল, ‘‘আমার মেয়েকে যত্নে রেখ তাহলেই হবে৷ তবে মন্দিরা আমার শর্তটা মনে আছে তো? পরে এ নিয়ে অশান্তি হোক আমি চাই না৷’’
মন্দিরা নামের মহিলা একবার মিহির দিকে তাকিয়ে নিল৷ মিহি মুখ শুকনো করে বসে আছে৷ মিহিকে দেখতে দেখতে তার মুখে নিষ্ঠুর একটা হাসি খেলে গেল৷ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘‘আমার গায়ের রঙটার জন্যই বুঝি? আসলে এই রঙ বংশধররা পেলে চৌধুরী বংশের অপমান৷’’
‘‘আহ মন্দিরা, কবে মা কী একটা কথা বলেছিল, সেটা এখনো ধরে বসে আছ কেন? আমি মিহির কথা ভেবেই দ্বিতীয় সন্তান চাই না৷’’
মন্দিরা মাথা নেড়ে জানাল, মিহির বাবা যেন নিশ্চিন্তে থাকে, এমন অন্যায্য দাবি সে করবে না৷ মুখে বলল বটে, তবে মনে মনে গর্জে উঠল, ‘‘এর শোধ আমি তিলে তিলে নেব’’৷ মিহি খুব ভয় পাচ্ছিল, এই মহিলার সঙ্গে তাকে এক ঘরে, এক বিছানায় থাকতে হবে? বাপিকে ছেড়ে থাকবে মামার বাড়িতে তাও ভালো৷ এর সঙ্গে কিছুতেই সে থাকবে না৷ তার ছোট বুদ্ধি দিয়ে সে বুঝে গিয়েছিল, এ বিয়ে হবেই৷
সেদিন রাত্রে ঠাম্মির পাশে শুয়ে শুয়ে বলেই ফেলল সে, ‘‘নতুন মাকে দেখলে তার খুব ভয় করে, তাকে যেন মামার বাড়িতেই রেখে আসে৷’’ ঠাম্মি কী বুঝল কে জানে! মিহিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রাখল৷ ঘুমের মধ্যে মিহি টের পাচ্ছিল, কে যেন বারবার তার নাম ধরে ডাকছে, বারবার বলছে, ‘‘মিহি জেগে ওঠো, বাইরে চলে এসো৷’’ মিহি ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকল৷ ভয়ে চোখ খুলল না৷
ভোর রাত্রে তার খুব জ্বর এল, জ্বরের মধ্যেই সে স্বপ্ন দেখল, তাদের মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে সে খেতে বসেছে৷ নতুন মা তাকে খেতে দিচ্ছে৷ নতুন মায়ের সিঁথিতে সিঁদুর, নাকে সোনার নথ কিন্তু পরনে সেই সাদা শাড়ি৷ মিহিকে এক থালা কাঁচা মাংস এগিয়ে দিয়ে বলছে, ‘‘খাও, খাও, একদম তাজা মাংস, রক্ত গড়িয়ে নামছে, খেয়ে ফেল সবটা৷’’ মিহি স্বপ্নের মধ্যেই ডুকরে কেঁদে উঠল৷
আমি মন্দিরা৷ আমার বয়স তিপান্ন৷ চুলে হালকা রুপোলি ঝিলিক বাদ দিলে শরীরের গঠন, মুখের টানটান চামড়া দেখে বয়সটা টের পাওয়া যায় না৷ আজ আমার একমাত্র মেয়ে লন্ডন থেকে ফিরবে৷ হ্যাঁ আমার মেয়ে৷ ববিনের অকাল মৃত্যুর পর মিহি আমার মেয়ে হয়ে উঠেছিল৷ যদিও ওর মামার বাড়ির লোকজনের এতে মত ছিল না৷ আইনি সাহায্য নিয়ে আমি মিহিকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলাম৷ আসলে ববিন উইলটাই এমন ভাবে করে গিয়েছিল, মিহির নামেই সব সম্পত্তি৷ ওকে ছাড়া তাই আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ মিনি প্রথমদিকে আমার সঙ্গে থাকতে এসে ভয়ে আধমরা হয়ে থাকত৷ আমার কালো পুতুলটাকে দেখলে ভিরমি খেত৷ কিন্তু ধীরে ধীরে ভয়টা জয় করে ও আমার মেয়ে হয়ে উঠল৷ আমার দ্বারা চালিত হতে শুরু করল৷ আমি যখন যা বলতাম তাই করত৷ হস্টেলে থাকতে গিয়ে দু-একটা এমন কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল, ঐ যেমন ছোটবেলাতে করেছিল আরকি৷ সবার বিষনজরে পড়ে গেল৷ সেমেস্টারের শেষ হবার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছিল৷ তবে পরীক্ষাটা দিয়েছিল৷ তারপর তো আরও পড়াশোনা করতে লন্ডন চলে গিয়েছিল৷ যত ও দূরে সরে গেছে তত আমার সুবিধা হয়েছে এই বিপুল সম্পত্তি ভোগ করার৷ আমার একজন প্রেমিক আছে, ঐ যাকে আপনারা নিজস্ব পুরুষ বলেন৷ তা আমি আর সুবীর মিলে একটা দারুণ প্ল্যান করে ফেলেছি মিহিকে ঘিরে৷ সেসব পরে জানবেন৷ আজ ফিরছে আমার মেয়ে নীলাঞ্জনা, হ্যাঁ আপনাদের মিহিই আমার নীলাঞ্জনা৷
ওর ঠাকুমার খুব ফর্সা রঙের গুমোর ছিল তাই ববিন যখন আমার কথা বলেছিল, মুখ বেঁকিয়ে এই কালো মেয়েকে উড়িয়ে দিয়েছিল৷ ধুমধাম করে লাল টুকটুকে বউ আনল৷ সে বউ থাকল কই? আমার কালো পুতুলের খাদ্য হয়ে গেল৷ তারপর ববিন সহ একে একে সবাই তো... মিহিকে বাঁচিয়ে রেখেছি কেন? ঐ যে ও আমার হয়ে গেছে বললাম না!
নীলাঞ্জনা এসে গেছে৷ এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরল৷ গালে গাল ঠেকিয়ে বলল, ‘‘এই ক বছরে তুমি আরও ইয়াং হয়ে গেছ মা৷’’ চোখ নাচিয়ে বললাম, সত্যি? ও হাসতে হাসতে বলল, শুধু ইয়াং আর গ্ল্যামারাস হয়ে উঠেছ, হেয়ার স্টাইলটাও খুব সুন্দর৷’’
ওকে রেস্ট করতে বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেলাম ওর জন্য জলখাবার বানাতে৷ চিজ অমলেট খুব ভালোবাসে ও৷ লুচি, আলুরদমের পাশে ওর মন পসন্দ চিজ অমলেট সাজিয়ে দিলাম৷ প্লেটের দিকে তাকিয়ে ও আঁতকে ওঠে৷ যেন এসব খাবার জীবনে প্রথম দেখল৷ অস্ফুটে বলে উঠল, ‘‘মাংস! এত মাংস দিয়েছ কেন মা?’’ ‘‘মাংস কই? ভালো করে তাকিয়ে দেখ৷’’ আমার কথা শুনে একটা ঘোর থেকে জেগে উঠল ও৷ তারপর হাত ধুয়ে এসে খেতে শুরু করল৷ ঠোঁট টিপে হেসে আমি মনে মনে বললাম, ‘‘যাক এখনও ওষুধ কাজে দিচ্ছে, প্রভাব একটুও নষ্ট হয়নি’’! কী ওষুধ সে আর বললাম না!
মিহি ব্রেকফাস্ট করে স্নান করে শুয়ে পড়ল৷ এ.সি-টা অন করে, পর্দাগুলো টেনে দিয়ে ওর ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি সুবীরকে ফোন করতে বসলাম৷ আজ ডিনারে ওকে ইনভাইট করলাম৷ মিহির অনারে ডিনার৷ রাতের প্ল্যানটা ফোনে আরেকবার ঝালিয়ে নিলাম৷
শেষ অন্তে
নীলাঞ্জনা মোবাইলে একটা ভিডিও দেখছিল বুঁদ হয়ে৷ দেখতে দেখতেই ওর ঠোঁটটা একটু বেঁকে গেল৷ অস্ফুটে বলে উঠল, ‘‘থ্যাঙ্কস সুবীর আঙ্কল৷ প্ল্যানটা নিখুঁত সাজিয়েছিলে৷ নতুন না বুঝতেই পারেনি তুমি আমার পেড কুত্তা৷ তবে তোমার জন্য স্যরি আমি, আসলে আমি সাক্ষী রাখতে চাইনি, তাই তোমাকেও...’’ ড্রিঙ্কসের গ্লাসটা রেখে আয়নার দিকে তাকাল মিহি ওরফে নীলাঞ্জনা৷ একটু হাসল৷ তারপর বলল, ‘‘স্যরি নতুন মা৷ তোমার আমাকে নিয়ে এবারের করা প্ল্যানটা সাকসেসফুল হতে দিতে পারলাম না৷ আসলে তোমারই মেয়ে হয়ে উঠেছিলাম তো তাই তোমারই মতো কালো পুতুলটাকে কাজে লাগানোটা আয়ত্ত করে ফেলেছি এতদিনে৷
নীলাঞ্জনা আয়নার দিকে তাকিয়ে বীভৎসভাবে হেসে উঠল, ওর নখে কালচে রক্তের প্রলেপ৷ সেই রক্ত গড়িয়ে নামছে৷ নীলাঞ্জনা ব্যস্ত হয়ে উঠল৷ ‘‘পুতুলটা কই? ওর খিদে পেয়েছে তো!’’ কালো পুতুলটা নড়েচড়ে উঠল, প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে ওকে, খিদে তো পাবেই৷
ভোররাত্রে লন্ডনে নীলাঞ্জনার মোবাইলটা বেজে উঠল৷ লোকাল পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন, ‘‘মিস নীলাঞ্জনা মিত্র, ইয়োর মাদার হ্যাজ বিন ব্রুটলি কিলড৷’’ যাক সে যে লন্ডনেই আছে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল৷ টেবিল থেকে কালো পুতুলটা তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল৷ ওর গা থেকে গরমমশলা দেওয়া আলুরদমের গন্ধ ভেসে আসছে৷ পুতুলটা নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল৷ এর কাজ শেষ৷ সামনের লেকে আজকেই এটা ফেলে দিতে হবে৷ পুতুলটার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে নিল, কী করুণ মুখটা, দুচোখে টিকে থাকার আকুতি৷ নীলাঞ্জনা ভেবে পেলনা একে রাখবে নাকি আজই এর অস্তিত্ব মুছে ফেলবে? তারপর কি মনে করে পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে ঘরে ফিরে এল৷ মনে হল এই পুতুলটাই তার অস্তিত্ব, এর হাত ধরে অন্ধকারের দরজায় তাকে পা বাড়াতে হবে৷ সে না মায়ের মেয়ে! মন্দিরা মিত্র’র নিজের হাতে গড়া এক তাল অন্ধকার৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন